সহজ ভাষায়, একজন শিক্ষার্থীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই তাফসিরের মূল বিষয়গুলোকে ধাপে ধাপে এবং ভেঙে ভেঙে বুঝে নেওয়া যাক:
১. আয়াতের সূচনা ও ভূমিকা
মূল আয়াত: «إنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا سَواءٌ عَلَيْهِمْ أأنْذَرْتَهم أمْ لَمْ تُنْذِرْهم لا يُؤْمِنُونَ»
-
প্রেক্ষাপট ও ব্যাকরণগত বাক্য সূচনা (استئناف): আগের আয়াতগুলোতে আল্লাহ তাআলা মুত্তাকীদের প্রশংসা ও সফলতার কথা বলেছিলেন। ঠিক তার পরপরই কাফের ও হঠকারীদের অবাধ্যতার কথা আলাদাভাবে বোঝাতে এই নতুন বাক্য আনা হয়েছে।
-
কেন এটিকে আগের কথার সাথে সরাসরি সংযোজন (عطف) করা হয়নি?
-
আগের বর্ণনার মূল উদ্দেশ্য ছিল কোরআনের পূর্ণতা ও হেদায়াতের শক্তি প্রমাণ করা। আর এই আয়াতের উদ্দেশ্য কাফেরদের হঠকারিতা তুলে ধরা।
-
কোরআন দিয়ে উপকৃত হওয়াটা কোরআনের একটি গুণ, কিন্তু কেউ উপকৃত না হওয়াটা কোরআনের দোষ নয়; বরং কাফেরদের নিজেদের ব্যর্থতা।
-
কবিতার মাধ্যমে উদাহরণ: কবি যেমন বলেছেন, চোখ ছোট বা দৃষ্টি ঝাপসা হওয়ার কারণে মানুষ নক্ষত্রকে ছোট দেখে, এতে নক্ষত্রের নিজস্ব আকারের কোনো দোষ নেই। তেমনি কোরআন হেদায়াত না দেওয়া কাফেরদের নিজেদের অন্ধত্বের ফসল।
-
২. কেন অন্য আয়াতে সংযোজন (عطف) করা হয়েছিল?
প্রশ্ন উঠতে পারে: সুরা ইনফিতারে «إنَّ الأبْرارَ لَفي نَعِيمٍ» (সৎকর্মশীলরা নিয়ামতে থাকবে) এর পর «وإنَّ الفُجّارَ لَفي جَحِيمٍ» (পাপীরা জাহান্নামে থাকবে) বলে দুটোকে জোড়া (عطف) দেওয়া হলো, কিন্তু এখানে কেন দেওয়া হলো না?
-
উত্তর: সেখানে দুটো বিষয় ছিল পরকালের বিনিময় সম্পর্কিত এবং দুটোর মধ্যে চমৎকার বিপরীতমুখী ভারসাম্য (تقابل) ছিল। মানুষের মন স্বভাবতই একটি বিষয়ের বিপরীত কথা শুনলে সহজে বিষয় দুটিকে মেলাতে পারে (যেমন: আলো ও আঁধার)। কিন্তু সুরার শুরুর এই আয়াতে উদ্দেশ্য ভিন্ন থাকায় সংযোজন করা হয়নি।
৩. কাফের (الَّذِينَ كَفَرُوا) শব্দটির পরিধি
এখানে ‘কাফের’ কারা? ব্যাকরণগতভাবে দুই ধরনের অর্থ হতে পারে:
১. নির্দিষ্ট দল (عهد): রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর যুগের সেই নির্দিষ্ট কাফেররা, যাদের সামনে সরাসরি দাওয়াত দেওয়া সত্ত্বেও তারা কুফরির ওপর অটল থেকে মারা গেছে (যেমন: আবু জাহেল, আবু লাহাব)।
২. সাধারণ শ্রেণি (جنس): যেকোনো যুগের চরম অবাধ্য ও হঠকারী কাফের শ্রেণি।
৪. ‘কুফর’ (الكُفْرُ)-এর সংজ্ঞা ও ফকিহদের মতভেদ
-
শব্দার্থ: ‘কুফর’ শব্দের মূল অর্থ ঢেকে রাখা বা গোপন করা। সত্য ও নিয়ামতকে ঢেকে রাখার কারণে একে কুফর বলা হয়।
-
ইসলামী পরিভাষায় কুফর কী?
-
শাফেয়ী মাজহাবের মতে: রাসুলুল্লাহ ﷺ দ্বীনের যেসব মৌলিক ও সর্বজনবিদিত বিষয় নিয়ে এসেছেন (যেমন: সালাতের ফরজ হওয়া, মদের হারাম হওয়া), তা জেনেশুনে অস্বীকার করা। তবে আলেমদের গবেষণালব্ধ কোনো গোপন সূক্ষ্ম মাসআলা না জানলে বা অস্বীকার করলে কাফের বলা যাবে না।
-
হানাফী মাজহাবের মতে: কোনো বিষয় চূড়ান্ত ও সুনিশ্চিতভাবে (ক্বাতঈ) প্রমাণিত হওয়ার পর তা জেনেশুনে অস্বীকার করলেই কুফরি হবে।
-
কুফরির আলামত ও পোশাক: কাফেরদের ধর্মীয় প্রতীক বা পোশাক পরা মূলত বিশ্বাসের বিষয় নয়, তবে তা কুফরির বাহ্যিক আলামত। তবে কেউ যদি ঠাট্টা-তামাশা বা বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে পরিধান করে (এবং কোনো ঈমানবিরোধী আকাইদ না থাকে), তবে ঢালাওভাবে তাকে কাফের ফতোয়া দেওয়ার ক্ষেত্রে চরম সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। ইমাম আলুসী (রহ.) পরামর্শ দিয়েছেন—কাউকে কাফের ফতোয়া দেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা আবশ্যক।
-
৫. মু’তাযিলাদের সংশয় ও তার খণ্ডন
মু’তাযিলা সম্প্রদায় দাবি করেছিল যে, কোরআনে অতীত ও বর্তমানের ঘটনার উল্লেখ প্রমাণ করে আল্লাহর কালাম বা বাণী ‘সৃষ্ট’ (حادث)।
-
আহলে সুন্নাতের জবাব: আল্লাহর মূল কালাম অনাদি (قديم)। ঘটনাগুলো যখন ঘটেছে, তখন কালামের ‘সম্পর্ক’ বা প্রয়োগের স্থান তৈরি হয়েছে। সম্পর্ক নতুন হওয়া মানে মূল বাণী সৃষ্ট হওয়া নয়। যেমন: আল্লাহর অনাদি জ্ঞান অনাদিই থাকে, যদিও জগতে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নতুন।
৬. ব্যাকরণগত সূক্ষ্মতা (সতর্ক করা বা না করা সমান)
-
«سَواءٌ» (সমান): এই শব্দটি দিয়ে বোঝানো হয়েছে কাফেরদের জন্য নবীজী ﷺ-এর ভয় প্রদর্শন (ইনযার) করা বা না করা উভয়টিই ফলাফলহীনতার দিক থেকে সমান।
-
ব্যাকরণবিদদের তর্ক: সাধারণ নিয়মে سَواءٌ শব্দের পর ইস্তিফহামের (প্রশ্নবোধক) আলিফ এলে أمْ (অথবা) ব্যবহার করা হয়। কিন্তু অলংকার শাস্ত্রের নিয়ম হলো—নবীজী ﷺ দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন এবং আমানত আদায় করেছেন, তা বোঝাতেই এই ক্রিয়াপদগুলো (أنْذَرْتَهُمْ) আনা হয়েছে।
৭. ইনযার (الإسلام ও الإنذار) এবং সুসংবাদ
-
ইনযার (إنذار): ইনযার হলো ক্ষয়ক্ষতি বা আজাব থেকে বাঁচতে পর্যাপ্ত সময় হাতে রেখে সতর্ক করা।
-
সুসংবাদ (البشارة) কেন বলা হলো না?
-
কারণ ভয় দেখানোই অন্তরে বেশি প্রভাব ফেলে। যখন সর্বোচ্চ ভয় দেখিয়েও কোনো কাজ হলো না, তখন সুসংবাদ দিয়ে যে কোনো কাজ হবে না তা স্বতঃসিদ্ধ।
-
৮. «لا يُؤْمِنُونَ» (তারা ঈমান আনবে না)
এই বাক্যটির কাজ হলো আগের বাক্যের অর্থকে আরও স্পষ্ট করা। অর্থাৎ, ইনযার অতীতে যেমন কাজ করেনি, ভবিষ্যতেও তারা তাদের জেদের কারণে ঈমান আনবে না—এই অটলতার সংবাদটি এই বাক্য স্পষ্ট করে দেয়।
৯. তাকলীফ মা লা ইউত্বাক (অসাধ্য বিষয়ের দায়িত্ব প্রদান)
একটি বহুল আলোচিত কালামী (ধর্মতত্ত্ব সংক্রান্ত) প্রশ্ন: আল্লাহ যখন জেনেই গেছেন এবং জানিয়েই দিয়েছেন তারা ঈমান আনবে না, তবে কেন তাদের ঈমান আনার নির্দেশ দেওয়া হলো? এটা কি অসাধ্য বিষয়ের দায়িত্ব দেওয়া নয়?
-
সহজ জবাব: কাফেরদের ঈমান আনা সত্তাগতভাবে সম্ভব (ممکن في نفسه) ছিল। তারা নিজ ইচ্ছায় অবাধ্যতা করেছে বলেই ঈমান আনেনি। আল্লাহর অনাদি জ্ঞান বা পূর্ব-সংবাদ তাদের জোর করে কাফের বানায়নি, বরং তারা যা নিজেরা করবে—আল্লাহ অনাদি জ্ঞানে তা জানতেন এবং সেই অনুযায়ী সংবাদ দিয়েছেন।
১০. ইনযারের ফায়দা ও আল্লাহর হুজ্জত (প্রমাণ) কায়েম
প্রশ্ন: ইনযার যদি কাফেরদের ঈমানে না-ই আনে, তবে এই ইনযারের লাভ কী?
-
উত্তর:১. আল্লাহর যুক্তি ও প্রমাণ (حجّة) কায়েম করা: পরকালে যেন তারা এই অজুহাত দিতে না পারে যে, “আমাদের কাছে তো কোনো সতর্ককারী আসেনি, এলে তো আমরা ঈমান আনতাম!”২. বান্দার অনাদি সম্ভাবনার প্রকাশ: মানুষ তার নিজ ইচ্ছায় হেদায়াত গ্রহণ করে নাকি বিমুখ হয়—তা সৃষ্টির সামনে প্রকাশ করা।৩. নবীজী ﷺ-এর জন্য সান্ত্বনা: আল্লাহ তাআলা سَواءٌ عَلَيْهِمْ (তাদের জন্য সমান) বলেছেন, سَواءٌ عَلَيْكَ (আপনার জন্য সমান) বলেননি। কারণ সতর্ক করার মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর সর্বোচ্চ সওয়াব ও দায়িত্ব পালন শেষ করেছেন, যা তাঁর জন্য মোটেও নিষ্ফল ছিল না।
১১. গায়েবের খবর (অলৌকিকতা/মোজেযা)
যদি এই আয়াতের ‘কাফের’ দ্বারা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর যুগের নির্দিষ্ট কিছু কাফেরকে বোঝানো হয়ে থাকে, তবে এটি কোরআনের একটি বড় মোজেযা। কারণ কোরআন আগেই ঘোষণা করেছিল তারা কাফের অবস্থায় মারা যাবে, এবং বাস্তবেও তারা ঈমান না এনে কুফরির ওপরই মৃত্যুবরণ করেছে।