সূরা আল-বাকারা (২:৬–৭): কুফরের স্বরূপ ও অন্তরে মোহর — নাযমের আলোকে

সফলকাম দল—মুত্তাকীদের—বিপরীতে এবার সূরা সেই লোকদের প্রসঙ্গে আসে, যারা কিতাব প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই অংশ একই সঙ্গে নবী ﷺ-এর জন্য সান্ত্বনা (তাসলিয়া) এবং তাঁর বিরোধীদের জন্য ভর্ৎসনা।

নবী ﷺ-এর জন্য সান্ত্বনা (২:৬)

إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُوا۟ سَوَآءٌ عَلَيْهِمْ ءَأَنذَرْتَهُمْ أَمْ لَمْ تُنذِرْهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ

“নিশ্চয়ই যারা প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাদের তুমি সতর্ক করো বা না করো—উভয়ই সমান; তারা ঈমান আনবে না।”

এখান থেকে সূরায় বর্ণনার ভঙ্গি বদলায়—শুরু হয় নবী ﷺ-এর জন্য সান্ত্বনা ও তাঁর বিরোধীদের জন্য ভর্ৎসনা। কিতাবপ্রাপ্ত এই রাসূল মানুষকে সতর্ক করছেন (ইনযার) ও ইতমামুল হুজ্জাত করছেন—আর আল্লাহর রাসূলের ইনযার ও ইতমামুল হুজ্জাত কোনো সাধারণ বিষয় নয়; কুরআন একে ‘ভারী বাণী’ (কাওলান সাকীলা—আল-মুয্‌যাম্মিল ৫) বলেছে। নবীগণকে বহু উত্থান-পতনের মুখোমুখি হতে হয়। নবী ﷺ নিরন্তর চেষ্টা করছেন, দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন, অথচ লোকেরা শুনছে না—অথচ তিনি তাদেরই মঙ্গলকামী; এমতাবস্থায় একজন প্রকৃত দাঈ স্বভাবতই ভাবতে পারেন, ভুলটি হয়তো তাঁরই কোনো দিকে। তাই আল্লাহ বহু স্থানে তাঁকে আশ্বস্ত করেন: লোকেরা যে শুনছে না, তা তাঁর কোনো দোষ নয়, তাঁর দাওয়াতেও কোনো ত্রুটি নেই—বরং তাদের অন্তরের বিকৃতিই তাদের সত্যের শত্রু বানিয়েছে।

ইমাম আমীন আহসান ইসলাহী রহ. লিখেছেন: দ্বীনের সুস্পষ্ট সত্যসমূহ ক্রমাগত অস্বীকারের পর এখন আল্লাহর বিধান অনুযায়ী তাদের শাস্তি হতে পারে। এটি হিদায়াত ও গোমরাহি সংক্রান্ত আল্লাহর সুন্নতের দিকে ইঙ্গিত। তারা অস্বীকার করেছে, অস্বীকার করতেই থেকেছে; এই ধারায় যখন সেই মুহূর্ত আসে যেখানে আল্লাহ স্বীয় অনুগ্রহ প্রত্যাহার করেন, তখন সেই ব্যক্তি, জাতি বা দল তাঁর ফায়সালার মুখোমুখি হয়। এই আচরণ তাদের অন্তরকে এমন করে দিয়েছে যে সত্য আর তা গলাতে পারে না; শিক্ষা নেওয়ার জন্য চোখ আর দেখে না, সত্যের ডাক শোনার জন্য কান আর খোলে না। নবী ﷺ-এর এখন আর আশা রাখা উচিত নয় যে তারা শুধরে যাবে; কেবল আল্লাহর ক্রোধ ও শাস্তিই তাদের জন্য অপেক্ষমাণ।

‘কাফারূ’: সিদ্ধান্তবাচক ক্রিয়া

‘ইন্নাল্লাযীনা কাফারূ’-তে ‘কাফারূ’ ক্রিয়াটি এখানে একটি সিদ্ধান্ত বোঝায়। আরবিতে ক্রিয়া নানা অর্থ-ছায়ায় ব্যবহৃত হয়—কখনো কেবল কাজের সূচনা বোঝায় (যেমন “ইন্না আনযালনাহু ফী লায়লাতিল কাদর”—আল-কাদর ১—‘আমি এই কুরআন অবতীর্ণ করতে শুরু করেছি’), কখনো কাজের সংকল্প, সমাপ্তি বা ফলাফল; কোন অর্থ প্রযোজ্য তা নির্ধারিত হয় বাক্যগঠন, প্রসঙ্গ ও পরিণাম দেখে। এখানে ‘কাফারূ’ একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বোঝায়—যারা সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েও নিছক অহংকার ও একগুঁয়েমিবশত কুরআন ও নবী ﷺ-কে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং কিছুতেই মানতে চায় না। সকর্মক ক্রিয়ার কর্ম আবশ্যক; এখানে কর্মটি (কিতাব) প্রসঙ্গ থেকেই স্পষ্ট (বর্ণনার সূচনা ‘যালিকাল কিতাব’ থেকে), তাই তা ঊহ্য রাখা হয়েছে।

তাদের কাছে সত্য চূড়ান্তভাবে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল (ইতমামুল হুজ্জাত); কীভাবে তা হলো, সূরা পরে বিস্তারিত বলবে। তাদের অন্তর সত্য চিনেছিল, কিন্তু তারা তা স্বীকার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এটি সূক্ষ্মভাবে ইয়াহূদী আলিম ও নেতৃবৃন্দের দিকে ইঙ্গিত করে, যাঁরা নবী ﷺ-এর আবির্ভাবের পরপরই তাঁকে চিনেছিলেন—জানতেন তিনিই সেই প্রতিশ্রুত নবী, যাঁর কথা তাঁদের গ্রন্থে ছিল (মূসা আ. যাঁর ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, ইবরাহীম আ. যাঁর আগমনের জন্য দুআ করেছিলেন, ঈসা আ. যাঁর সুসংবাদ দিয়েছিলেন)। কুরআন জানায়, তাঁরা তাঁকে চিনতেন যেমন নিজেদের সন্তানদের চেনেন (আল-বাকারা ১৪৬)। তবু তাঁরা প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত নিলেন।

কুফরের দুই অর্থ: সাধারণ ও পারিভাষিক

প্রত্যাখ্যানের এক প্রকার হলো কেবল কোনো কিছু অস্বীকার বা তাতে দ্বিমত করা—যেমন কেউ বিশ্বজগৎকে অনাদি মনে করে না, বা কোনো গ্রামবাসী সূর্যের চারপাশে পৃথিবীর আবর্তন অস্বীকার করে। আরবিতে কোনো বাস্তবতা না মানা বা কোনো বক্তব্য প্রত্যাখ্যানকে ‘কুফর’ বলা হয়—এটি একটি সাধারণ শব্দ; এই অর্থে যেকোনো অস্বীকারকারীকে ‘কাফির’ বলা চলে। শব্দ তার আভিধানিক অর্থে টিকে থাকে (যেমন ‘রাসূল’ কুরআনি পরিভাষা হলেও আভিধানিক অর্থে দূত—‘রাসূলুল হিন্দ’ মানে ভারতের দূত)। তেমনি সাধারণ অর্থে ‘কুফর’ যেকোনো অস্বীকার বোঝাতে পারে।

কিন্তু বিশেষ বা পারিভাষিক অর্থে ‘কুফর’ দ্বীনের ক্ষেত্রে এক গুরুতর অপরাধ, যা আল্লাহর অভিশাপ ও ক্রোধের যোগ্য করে তোলে। এই অর্থে কুফর মানে কেবল অস্বীকার নয়, বরং সত্য চূড়ান্তভাবে স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও অহংকার ও একগুঁয়েমিবশত তা অস্বীকার করা। আল্লাহ কেবল তখনই শাস্তি দেন যখন সত্য চূড়ান্তভাবে স্পষ্ট হয়ে যায়: “ওয়া মা কুন্না মু‘আয্‌যিবীনা হাত্তা নাব‘আসা রাসূলা” (আল-ইসরা ১৫)—আমি রাসূল প্রেরণ না করা পর্যন্ত শাস্তি দিই না।

তাকফীর আল্লাহর অধিকার

কোনো ব্যক্তি অহংকার ও একগুঁয়েমিবশত সত্য অস্বীকার করে চিরস্থায়ী শাস্তির যোগ্য কাফির হয়ে গেছে—এই ঘোষণা তথা তাকফীর কেবল আল্লাহই করতে পারেন। কুরআনে ‘কুফর’ শব্দ সাধারণ আভিধানিক অর্থেও ব্যবহৃত হয়েছে (সূরায় এর দৃষ্টান্ত আসবে), কিন্তু আল্লাহ কাউকে অপরাধী কাফির ঘোষণা করার পরই তা আল্লাহর অভিশাপ অর্জনের বিশেষ অর্থ ধারণ করে (‘লা‘নাতুল্লাহি আলাল কাফিরীন’)। কুফর অপরাধ হয় তখনই, যখন কেউ জেনে-বুঝে সেই সত্য অস্বীকার করে যা মেনে নেওয়া আল্লাহ আবশ্যক করেছেন। এই আয়াতে এমন কাফিরদের কথাই সংক্ষেপে বলা হয়েছে; বিস্তারিত পরে আসবে।

অন্তরে ও শ্রবণে মোহর (২:৭)

خَتَمَ ٱللَّهُ عَلَىٰ قُلُوبِهِمْ وَعَلَىٰ سَمْعِهِمْ ۖ وَعَلَىٰٓ أَبْصَـٰرِهِمْ غِشَـٰوَةٌ ۖ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ

“আল্লাহ তাদের অন্তরে ও শ্রবণে মোহর মেরে দিয়েছেন, আর তাদের দৃষ্টির ওপর আবরণ; আর তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।”

এই মোহর আল্লাহ তাঁর বিধান ও সুন্নত অনুযায়ীই মারেন—যা কুরআনে সর্বত্র অন্তর্নিহিত ও বহু স্থানে সুস্পষ্ট। এই সুন্নত হলো: কোনো ব্যক্তি যখন সত্যের সামনে অহংকার দেখায় ও ইচ্ছাকৃতভাবে তা অস্বীকার করে, তখন আল্লাহ প্রথমেই শাস্তি দেন না, বরং অবকাশ দেন; বারবার তাকে ভেতর ও বাইরে থেকে চিন্তা-ভাবনার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়—আল্লাহ স্বীয় হুজ্জাত প্রতিষ্ঠায় অসাধারণ ব্যবস্থা রেখেছেন, আর নবীগণ সেই বহু ব্যবস্থার সর্বশেষ, যাঁদের মাধ্যমে ইতমামুল হুজ্জাত চূড়ান্ত রূপ পায়। (নবী উপস্থিত না থাকলে আল্লাহর ব্যবস্থা ত্রুটিপূর্ণ থাকে না; সত্য নানাভাবেই স্পষ্ট হয়।) এই অবকাশেও যদি সে না শুধরায়, তবে তার অন্তর ও মনে মোহর পড়ে যায়। এখানে প্রকাশ পায় আল্লাহর মহিমা ও সত্যের প্রতি তাঁর মর্যাদাবোধ—তিনি তাৎক্ষণিক পাকড়াও করেন না, বরং হিদায়াতের দরজা বন্ধ করে দেন।

এই মোহর দুনিয়াতেই এক শাস্তি এবং চূড়ান্ত শাস্তির ভূমিকা। প্রথম স্তরে অন্তর যেন মরিচার মতো কলুষিত হয়ে হিদায়াতের প্রতি রুদ্ধ হয়ে যায়; এরপর আর কিছুই তাতে প্রবেশ করে না। অর্থাৎ আল্লাহ সেই ব্যক্তি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন, তাকে মন্দের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন, বিদ্রোহে অবাধ ছুটি দিয়েছেন। তখন তার স্বভাব ও রুচি এমন বিকৃত হয়, বোধশক্তি এমন কলুষিত হয় যে কেবল সেই মন্দ জিনিসেই সে স্বাদ পায় যা তার বিকৃত স্বভাবকে তৃপ্ত করে; পাপই হয় তার একমাত্র আকর্ষণ; আর যত যুক্তিসঙ্গতভাবেই সৎকর্ম ও তাকওয়ার কথা তার সামনে পেশ করা হোক, তা তার প্রকৃতির কাছে অচেনা ঠেকে, সে তাতে বিতৃষ্ণা বোধ করে, অন্তরের আগ্রহ নিয়ে কখনো সৎ কথা শুনতে প্রস্তুত হয় না। (হিদায়াত ও গোমরাহি সংক্রান্ত এই সুন্নতের দলিল: আন-নিসা ১৫৫; আল-আ‘রাফ ১০০–১০২; আন-নাহল ১০৬–১০৮; আস-সাফ ৫।)

শব্দগত সূক্ষ্মতা: এখানে ‘সাম‘’ (শ্রবণ) একটি মাসদার (ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য), তাই একবচনে ব্যবহৃত; আর ‘কালব’ বিশেষ্য বলে তার বহুবচন ‘কুলূব’ এসেছে। প্রসঙ্গে যখন স্পষ্ট ইঙ্গিত থাকে, তখন লিঙ্গ বা বচন নিয়ে ভাবার প্রয়োজন হয় না—মূল শব্দই ব্যবহার করা যায়। ‘ওয়া লাহুম আযাবুন আযীম’—আর তাদের জন্য মহাশাস্তি, যা তারা কিয়ামতের দিন ভোগ করবে।

শিক্ষা

প্রথম শিক্ষা—এই আয়াতগুলো নবী ﷺ-এর জন্য সান্ত্বনা: লোকেরা না মানলে তা তাঁর দোষ নয়, তাঁর দাওয়াতেও ত্রুটি নেই; তাদের অন্তরের বিকৃতিই তাদের সত্যবিমুখ করেছে।

দ্বিতীয় শিক্ষা—‘কাফারূ’ এখানে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বোঝায়—সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েও অহংকার ও একগুঁয়েমিতে অস্বীকার; সকর্মক ক্রিয়ার কর্ম (কিতাব) প্রসঙ্গ থেকেই স্পষ্ট বলে ঊহ্য।

তৃতীয় শিক্ষা—‘কুফর’-এর দুই অর্থ: সাধারণ আভিধানিক অর্থে যেকোনো অস্বীকার; আর পারিভাষিক অর্থে—সত্য চূড়ান্তভাবে স্পষ্ট হওয়ার পরও অহংকারবশত অস্বীকার, যা আল্লাহর অভিশাপ ও ক্রোধের যোগ্য অপরাধ।

চতুর্থ শিক্ষা—আল্লাহ কেবল সত্য চূড়ান্তভাবে স্পষ্ট হওয়ার পরই শাস্তি দেন (‘ওয়া মা কুন্না মু‘আয্‌যিবীনা হাত্তা নাব‘আসা রাসূলা’); আর কাউকে অপরাধী অর্থে কাফির ঘোষণা তথা তাকফীর একমাত্র আল্লাহরই অধিকার।

পঞ্চম শিক্ষা—অন্তরে মোহর আল্লাহর সুন্নত অনুযায়ী: অহংকারে ইচ্ছাকৃত অস্বীকার → অবকাশ → অবকাশেও না-শুধরানো → হিদায়াতের দরজা রুদ্ধ। এটি দুনিয়াবি এক শাস্তি ও চূড়ান্ত শাস্তির ভূমিকা।

ষষ্ঠ শিক্ষা—শব্দগতভাবে ‘সাম‘’ মাসদার বলে একবচন, ‘কুলূব’ বিশেষ্য বলে বহুবচন; প্রসঙ্গে স্পষ্ট ইঙ্গিত থাকলে লিঙ্গ-বচন নিয়ে ভাবার প্রয়োজন হয় না।