সূরা আল-বাকারা (২:৯–১২) — মুনাফিকদের প্রতারণা, অন্তরের ব্যাধি ও ফাসাদ
মুনাফিকদের বর্ণনা-সংক্রান্ত আয়াতগুলোর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এদের অর্থে এক ধরনের ব্যাপকতা ও উন্মুক্ততা রয়েছে—একই শব্দাবলি একাধিক শ্রেণির উপর প্রযোজ্য হয়। এই আয়াতগুলো একদিকে মদিনার মুনাফিকদের বর্ণনা করে, আবার অন্যদিকে সেই একই বর্ণনা মদিনার ইয়াহুদি সম্প্রদায়ের বিরোধী ও কপট অংশটির আচরণের সঙ্গেও মিলে যায়। তাই এই আলোচনায় আয়াতগুলোকে দুই দৃষ্টিকোণ থেকে পাঠ করা হবে—প্রথমে মুনাফিকদের প্রসঙ্গে, এরপর মদিনার ইয়াহুদি নেতৃবৃন্দের সেই অংশের প্রসঙ্গে; আর দুই পাঠ থেকেই আমাদের জন্য প্রয়োগযোগ্য শিক্ষা গ্রহণ করা হবে।
প্রেক্ষাপট: তিন ধরনের প্রতিক্রিয়া
রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন আল্লাহর আদেশে নবুওয়াতের ঘোষণা দিলেন, তখন মক্কায় স্বাভাবিকভাবেই তিন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দিল। এক শ্রেণি যে-কোনো মূল্যে সত্যকে গ্রহণ করল এবং তা আঁকড়ে ধরল—পরিবার, সমাজ, ব্যবসা, উত্তরাধিকার, এমনকি নিরাপত্তা হারানোর ঝুঁকি নিয়েও তারা পিছু হটল না; নির্যাতিত হয়েও ইসলাম থেকে সরে দাঁড়াল না। বিপরীত শ্রেণি যে-কোনো মূল্যে ইসলামকে প্রত্যাখ্যান করল; প্রথমে উপহাস ও নানা অপবাদ, অতঃপর ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ ও শত্রুতা পোষণ করল। আর মাঝখানে একটি শ্রেণি সমঝোতার পথ খুঁজতে লাগল—তারা বলল, অহেতুক বিভেদ তৈরি হচ্ছে; কিছুটা ছাড় দিয়ে, মধ্যস্থতা করে দুই পক্ষকে এক টেবিলে বসিয়ে একটা রফা করা যাক। কুরআন এই মধ্যপন্থী মনোভাবের প্রতি ইঙ্গিত করে বলে, তারা চায় তুমি কিছুটা নমনীয় হও, তখন তারাও নমনীয় হবে (সূরা আল-কালাম, ৬৮:৯: “وَدُّوا لَوْ تُدْهِنُ فَيُدْهِنُونَ”)।
নবী ﷺ মদিনায় হিজরত করার পর ঠিক এই তিন প্রতিক্রিয়াই সেখানেও প্রকাশ পেল। এটি সকল নবীর দাওয়াতের ক্ষেত্রেই সত্য। মূসা আলাইহিস সালামের জীবনেও এই তিন প্রতিক্রিয়া বিদ্যমান ছিল, এবং তাঁর জীবনও—নবী ﷺ-এর মক্কী ও মাদানী জীবনের মতোই—দুই পর্বে বিভক্ত: ফিরআউনের অধীন জীবন, আর সমুদ্র পার হওয়ার পর নিজেদের পরিচালনার জীবন। কুরআনে মূসা আলাইহিস সালাম ও বনী ইসরাইলের ইতিহাস সত্তরের অধিক স্থানে উল্লেখিত হয়েছে, কারণ এই উম্মাহর ইতিহাসের সঙ্গে সেই ইতিহাসের গভীর সাদৃশ্য রয়েছে—যেমন মূসা আলাইহিস সালামকে ফিরআউনের মোকাবিলা করতে হয়েছিল, তেমনি নবী ﷺ-কে কুরাইশের; আর যেমন মূসা আলাইহিস সালামকে বনী ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়েছিল, তেমনি নবী ﷺ-কে মুনাফিকদের।
মদিনায় প্রথম প্রতিক্রিয়া—নিঃশর্ত ভালোবাসা—প্রকাশ পেল আনসারদের মধ্যে, যাঁরা মুহাজিরদের নিজেদের ঘরে ঠাঁই দিলেন, নিজেরা অভাবে থেকেও অন্যকে প্রাধান্য দিলেন। কুরআন তাঁদের প্রশংসায় বলে:
وَيُؤْثِرُونَ عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ
“তারা নিজেদের ওপর অন্যকে প্রাধান্য দেয়, যদিও তারা নিজেরা অভাবগ্রস্ত।” — সূরা আল-হাশর, ৫৯:৯
দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়া—তীব্র বিরোধিতা—প্রকাশ পেল সেই নেতৃবৃন্দের মধ্যে, যারা নবী ﷺ-এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিল। আর তৃতীয় প্রতিক্রিয়া—সমঝোতার আকাঙ্ক্ষা—দেখা গেল দুটি অংশে: একদিকে নবদীক্ষিত কিছু মুসলিমের মধ্যে, যারা ইসলাম গ্রহণের পরিণাম পুরোপুরি অনুধাবন করেনি এবং পুরোনো ব্যবসায়িক ও পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন করতে চাইছিল না; অন্যদিকে বিরোধী পক্ষের একাংশের মধ্যে। মদিনায় তখনো সংঘাত সশস্ত্র হয়ে ওঠেনি, ছিল মূলত মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব—আর মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিন প্রশ্রয় পেলে তা ক্রমে সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নেয়, যেমনটা মক্কায় ঘটেছিল।
يُخَادِعُونَ اللَّهَ — আল্লাহ ও মুমিনদের প্রতারণার চেষ্টা (২:৯)
يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَالَّذِينَ آمَنُوا وَمَا يَخْدَعُونَ إِلَّا أَنفُسَهُمْ وَمَا يَشْعُرُونَ
“তারা আল্লাহ ও মুমিনদের প্রতারিত করতে চায়, অথচ তারা নিজেদের ছাড়া আর কাউকে প্রতারিত করে না, কিন্তু তারা তা উপলব্ধি করে না।” — সূরা আল-বাকারা, ২:৯
এই আয়াতে দুটি প্রশ্ন গভীরভাবে ভাবতে হয়। প্রথমত, তারা দুই পক্ষকে প্রতারিত করতে চায়—আল্লাহ ও মুমিনগণ; কিন্তু এই দুইয়ের মাঝে রাসূল ﷺ-এর উল্লেখ নেই কেন? দ্বিতীয়ত, সামান্যতম ঈমান থাকলেও তো মানুষ জানে আল্লাহ প্রকাশ্য-গোপন সবই জানেন—তবে “আল্লাহকে প্রতারিত করা” বলতে কী বোঝায়?
এর উত্তর নিহিত আছে একটি মূলনীতিতে। ইবাদত, তাওয়াক্কুল, দুআ ও সিজদায় আল্লাহ একক ও অদ্বিতীয়—এসবে তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করা যায় না; এ হলো তাঁর তাওহিদের অংশ। কিন্তু আনুগত্যের (ইতাআত) ক্ষেত্রে আল্লাহর আনুগত্য ও রাসূল ﷺ-এর আনুগত্য অবিচ্ছেদ্য; বাস্তবে আমরা আল্লাহর আদেশ পালন করি রাসূল ﷺ-এর অনুসরণের মাধ্যমেই। কুরআন বলে:
مَّن يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ
“যে রাসূলের আনুগত্য করল, সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল।” — সূরা আন-নিসা, ৪:৮০
এই অভিন্নতা কুরআনে বহুভাবে এসেছে। যারা রাসূল ﷺ-এর হাতে বাইআত করে, তারা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহরই হাতে বাইআত করে (সূরা আল-ফাতহ, ৪৮:১০)। এমনকি ভালোবাসার ক্ষেত্রেও আল্লাহ বলেননি “আল্লাহকে ভালোবাসলে আমাকেও ভালোবাসো,” বরং বলেছেন—”বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ করো” (সূরা আলে-ইমরান, ৩:৩১); অর্থাৎ আল্লাহর ভালোবাসাও রাসূল ﷺ-এর অনুসরণের সঙ্গে যুক্ত। আবার আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি শত্রুতাও অভিন্ন—যে আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা, রাসূলগণ, জিবরাইল ও মিকাইলের শত্রু, আল্লাহও তার শত্রু (সূরা আল-বাকারা, ২:৯৮)। আর যখন তারা নবী ﷺ-কে মিথ্যাবাদী বলে, তখন প্রকৃতপক্ষে তারা তাঁকে নয়, আল্লাহর আয়াতকেই অস্বীকার করে (সূরা আল-আনআম, ৬:৩৩)।
তাই মুনাফিকরা প্রকৃতপক্ষে রাসূল ﷺ-কেই প্রতারিত করতে চাইত—তাঁর কাছে এসে নিজেদের অনুগত ও বিশ্বাসী প্রমাণ করার চেষ্টা করত। একটি পূর্ণ সূরাই (সূরা আল-মুনাফিকুন) এই বিষয়ে নাযিল হয়েছে, যেখানে তারা নবী ﷺ-এর কাছে এসে বলে, “আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি আপনি নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূল” (৬৩:১)। কিন্তু তারা বুঝত না যে, রাসূল ﷺ-এর বিরুদ্ধে অপরাধ আল্লাহর কাছে আল্লাহরই বিরুদ্ধে অপরাধ। এ কারণেই এখানে সরাসরি “আল্লাহকে প্রতারিত করতে চায়” বলা হয়েছে; আর যেহেতু রাসূল ﷺ-এর প্রসঙ্গ এতেই অন্তর্ভুক্ত, তাই তাঁকে পৃথকভাবে উল্লেখ করার প্রয়োজন হয়নি। মুমিনদের প্রতারিত করা অবশ্য একটি স্বতন্ত্র বিষয়, তাই “وَالَّذِينَ آمَنُوا”—মুমিনদের কথা আলাদাভাবে এসেছে।
আয়াতের দ্বিতীয় অংশে ভাষার একটি সূক্ষ্মতা লক্ষণীয়। শুরুতে এসেছে “يُخَادِعُونَ” (মুফাআলা রূপ), শেষে এসেছে “يَخْدَعُونَ” (ফাআলা রূপ)। মুফাআলা রূপ চেষ্টা ও প্রয়াস বোঝায়—তারা প্রাণপণ প্রতারণার চেষ্টা করে; আর ফাআলা রূপ সাফল্য বোঝায়—কিন্তু চূড়ান্ত ফলাফলে তারা নিজেদের ছাড়া আর কাউকে প্রতারিত করতে “সফল” হয় না। এখানে “কাউকে” অর্থে “أَحَدًا” শব্দটি উহ্য রাখা হয়েছে, যা তাদের অবস্থার নীচতাকে আরও স্পষ্ট করে। আর “وَمَا يَشْعُرُونَ”—তারা এর বিন্দুমাত্র উপলব্ধি করে না; নিজেদের সঙ্গেই যে প্রতারণা করছে, সে বোধটুকুও তাদের নেই।
فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ — অন্তরের ব্যাধি (২:১০)
فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ فَزَادَهُمُ اللَّهُ مَرَضًا ۖ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ بِمَا كَانُوا يَكْذِبُونَ
“তাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে, অতঃপর আল্লাহ তাদের ব্যাধি আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন; আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি, কারণ তারা মিথ্যা বলত।” — সূরা আল-বাকারা, ২:১০
“তারা উপলব্ধি করে না” বলার পর স্বাভাবিক প্রশ্ন জাগে—তাদের কি অন্তর নেই? উত্তর আসে সঙ্গে সঙ্গেই: “তাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে।” যেমন দেহের কোনো অংশ অবশ হয়ে গেলে সেখানে অনুভূতি থাকে না, তেমনি ব্যাধিগ্রস্ত অন্তরে উপলব্ধি ও অনুভব লোপ পায়। শুআর (অনুভূতি)—ভয়, লজ্জা, অপরাধবোধ—সবই অন্তরের বিষয়; সেই অন্তরই যখন রোগাক্রান্ত, তখন অনুভূতিও রুদ্ধ।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য লক্ষণীয়—আল্লাহ “فِي صُدُورِهِمْ” (তাদের বুকে) না বলে “فِي قُلُوبِهِمْ” (তাদের অন্তরে) বলেছেন। সূরা আন-নাসে শয়তানের কুমন্ত্রণা সম্পর্কে বলা হয়েছে:
الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ
“যে মানুষের বুকে কুমন্ত্রণা দেয়।” — সূরা আন-নাস, ১১৪:৫
সদর (বুক) হলো একটি স্থান, আর সেই স্থানের ভেতরকার সম্পদ হলো কলব (অন্তর)। শয়তানের প্রবেশাধিকার অন্তরে নয়, বুক পর্যন্ত। অন্তরকে ঘরের সঙ্গে এবং বুককে সেই ঘরের সীমানা-প্রাচীর ও আঙিনার সঙ্গে তুলনা করা যায়। শয়তান আঙিনা পর্যন্ত আসতে পারে, দরজায় কড়া নাড়তে পারে; কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না—যতক্ষণ না মানুষ নিজেই দরজা খুলে দেয়। বারবার দরজা খুলে দিলে সে ভেতরে ঢুকে থিতু হয়ে বসে, আর তখন ঘরের সাজসজ্জাই পাল্টে ফেলে—যা ছিল সুন্দর তা কুৎসিত মনে হয়, আর যা ছিল কুৎসিত তা সুন্দর মনে হতে থাকে। এ কারণেই কুরআন বলে, শয়তান তাদের কাছে তাদের মন্দ কাজগুলোকে সুশোভিত করে দেখায় (“وَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ أَعْمَالَهُمْ”)। বিপরীতে, শয়তানকে ভেতরে ঢুকতে না দিলে অন্তরে ঈমানই সুশোভিত থাকে—”আল্লাহ তোমাদের কাছে ঈমানকে প্রিয় করেছেন এবং তা তোমাদের অন্তরে সুশোভিত করেছেন” (সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:৭)।
আয়াত বলছে, তাদের এই ব্যাধি বুকের সীমা ছাড়িয়ে অন্তরে প্রবেশ করেছে। কারও অন্তরে অনুপ্রবেশকারী ঢুকে পড়লে করণীয় হলো উপলব্ধির সঙ্গে সঙ্গেই তাকে বের করে দেওয়া—”আউযু বিল্লাহ” পড়ে, ইস্তিগফার করে শয়তানকে বিতাড়িত করা। মনে রাখতে হবে, শয়তানের প্রকৃত কোনো কর্তৃত্ব নেই; আল্লাহ তার সম্পর্কে বলেছেন, “নিশ্চয়ই আমার বান্দাদের উপর তোমার কোনো কর্তৃত্ব নেই” (সূরা আল-হিজর, ১৫:৪২)। তাই কেউ যদি শয়তানকে ভেতরে থাকতে দেয়, তা শয়তানের ক্ষমতার কারণে নয়, বরং সে তাকে বিতাড়িত করেনি বলেই।
আর যে তাকে বিতাড়িত করতে অস্বীকার করে, তার সম্পর্কে আল্লাহর বিধান—”فَزَادَهُمُ اللَّهُ مَرَضًا”—আল্লাহ তার ব্যাধি আরও বাড়িয়ে দেন। ব্যাধি ক্রমে বাড়তে থাকে: প্রথমে সন্দেহ (রায়ব), তারপর দ্বীনের কিছু বিষয় “অর্থহীন” মনে হওয়া, তারপর ক্রমান্বয়ে আরও গভীর অস্বীকৃতি—এভাবে ব্যাধি বাড়তে বাড়তে মানুষ সম্পূর্ণ বিমুখ হয়ে পড়ে। এই ক্রমবর্ধমান বিপথগামিতা অত্যন্ত ভীতিকর, তাই এ থেকে সদা সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
আয়াতের শেষে “عَذَابٌ أَلِيمٌ” শব্দটি লক্ষণীয়। পূর্বে কাফিরদের সম্পর্কে “عَذَابٌ عَظِيمٌ” (মহাশাস্তি) বলা হয়েছিল; এখানে বলা হয়েছে “عَذَابٌ أَلِيمٌ” (যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি)। “আযীম” শাস্তি এত বিশাল ও তীব্র যে দুনিয়ায় তা কল্পনাও করা যায় না—দুনিয়ায় অতিরিক্ত শাস্তিতে মানুষ মারা যায়, কিন্তু আখিরাতে আল্লাহ শাস্তি দেন অথচ মৃত্যু আসতে দেন না। আর “আলীম” (যা “মুʾলিম”—কষ্টদায়ক—শব্দের পরিবর্তে ব্যবহৃত) নির্দেশ করে অবিরাম, নিরবচ্ছিন্ন যন্ত্রণা; সাধারণ ব্যথায় মানুষ কালক্রমে সহনশীলতা অর্জন করে, কিন্তু এই যন্ত্রণা এক মুহূর্তের জন্যও থামে না।
কুরআনের একটি মূলনীতি হলো—শাস্তি অপরাধের অনুরূপ হয়। মুনাফিকদের অপরাধ হলো তারা মুমিনদের কষ্ট দিত; তাই তাদের শাস্তিও অবিরাম যন্ত্রণাদায়ক। উল্লেখ্য, উম্মাহর ওপর বাইরের শত্রুর আঘাতের চেয়েও ভেতর থেকে আসা আঘাত অধিক পীড়াদায়ক—যখন এক মুসলিম আরেক মুসলিমের রক্ত ঝরায়, তার মর্যাদাহানি করে, তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে, তখন সেই কষ্ট অপ্রত্যাশিত বলেই তীব্রতর। এ থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর কাছে এই দ্বীন ও এর অনুসারীদের মর্যাদা কতটা উঁচু।
لَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ — “সংশোধন” নাকি ফাসাদ? (২:১১–১২)
وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ قَالُوا إِنَّمَا نَحْنُ مُصْلِحُونَ أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ الْمُفْسِدُونَ وَلَٰكِن لَّا يَشْعُرُونَ
“আর যখন তাদের বলা হয়, তোমরা যমিনে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না, তখন তারা বলে, আমরা তো কেবল সংশোধনকারী। জেনে রাখো, নিশ্চয়ই তারাই বিপর্যয় সৃষ্টিকারী, কিন্তু তারা তা উপলব্ধি করে না।” — সূরা আল-বাকারা, ২:১১–১২
“ইসলাহ” অর্থ ভাঙা জিনিসকে ঠিক করা। মুনাফিকরা দাবি করত, তারাই তো সংশোধনকারী—দুই পক্ষের সংঘাত মেটাতে সমঝোতা ও পুনর্মিলনের চেষ্টা করছে; বরং যারা আপসহীন, তারাই বিভেদ সৃষ্টি করছে। কিন্তু আল্লাহ ঘোষণা করেন, প্রকৃত বিপর্যয়কারী তো তারাই।
এই বৈপরীত্য বুঝতে ফাসাদের প্রকৃত সংজ্ঞা জানা প্রয়োজন। কুরআনে এক প্রকার ফাসাদ পার্থিব ও দৃশ্যমান:
ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ
“মানুষের কৃতকর্মের কারণে স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে।” — সূরা আর-রূম, ৩০:৪১
মানুষের নৈতিক ও আত্মিক অপরাধের প্রভাব যমিনেও পড়ে—ফসল উৎপাদন কমে যায়, বরকত উঠে যায়। বিপরীতে, কোনো সমাজ যখন আল্লাহর প্রতি ঈমান ও আনুগত্যে অবিচল থাকে, তখন জমিনে বরকত নেমে আসে। কুরআন বলে, তারা যদি তাওরাত ও ইনজিল যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠা করত, তবে উপর থেকে ও পায়ের নিচ থেকে রিযক লাভ করত (সূরা আল-মায়িদা, ৫:৬৬)। অর্থাৎ আধ্যাত্মিক কল্যাণ ও বস্তুগত কল্যাণের মধ্যে আল্লাহ একটি সংযোগ স্থাপন করেছেন—আত্মিক পবিত্রতা ছড়ালে জগতে বস্তুগত কল্যাণও বিস্তৃত হয়।
কিন্তু ফাসাদের মূল সংজ্ঞা যুদ্ধ বা শান্তি নয়; এর মূল হলো অবিচার ও নৈতিক বিপর্যয়। বিনা অপরাধে কন্যাশিশুকে জীবন্ত পুঁতে ফেলা, ব্যবসায় মানুষকে ঠকানো (যার নিন্দায় “وَيْلٌ لِّلْمُطَفِّفِينَ”—সূরা আল-মুতাফফিফীন, ৮৩:১), অসহায়দের ওপর জুলুম, ইয়াতিমকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়া (সূরা আল-মাউন, ১০৭:২), আর সর্বোপরি স্রষ্টার হক আদায় না করা—আল্লাহর একনিষ্ঠ ইবাদতের জন্য নির্মিত ঘরকে মূর্তিতে পরিবেষ্টিত করা—এই-ই প্রকৃত ও চূড়ান্ত ফাসাদ।
কুরাইশ কন্যাশিশুদের প্রতি নিষ্ঠুর ছিল, নারীদের প্রতি অবিচার করত, ব্যবসায় প্রতারণা করত; অথচ হাজিদের সেবা ও আতিথেয়তার সুনামের আড়ালে তাদের এই অন্যায় ঢাকা পড়ে যেত, আর কাবার তত্ত্বাবধায়ক বলে কেউ তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতও না। ইসলাম এসে ঘোষণা করল—পরিচ্ছন্ন পথঘাট বা প্রাচুর্য ফাসাদহীনতার মাপকাঠি নয়; ফাসাদ মূলত নৈতিক—জুলুম, মিথ্যা, শিরক ও অবিচারই ফাসাদ। তাই মুনাফিকরা যখন অবিচারকারীদের সঙ্গে আপসের কথা বলে, তখন তারা বোঝে না যে সত্য কখনো অবিচারের সঙ্গে আপস করতে পারে না। একই অন্তরে সত্য ও মিথ্যা, ন্যায় ও অবিচার একত্রে বাস করতে পারে না—আল্লাহ কোনো মানুষের বুকে দুটি অন্তর সৃষ্টি করেননি (সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৪)। তাই বাইরে যা “শান্তি প্রতিষ্ঠা” বলে মনে হয়, আধ্যাত্মিক অর্থে তা-ই চূড়ান্ত বিপর্যয়। আল্লাহর পরিপূর্ণ ও সুসংহত দ্বীনে সংযোজন-বিয়োজনের মাধ্যমে “উন্নতি” করতে চাওয়াই সবচেয়ে বড় ফাসাদ; কারণ এই দ্বীন নিজেই সংশোধনের জন্য এসেছে, এর নিজের কোনো সংশোধন প্রয়োজন নেই।
দ্বিতীয় পাঠ: মদিনার ইয়াহুদি নেতৃবৃন্দের প্রসঙ্গে
এবার একই আয়াতগুলো মদিনার ইয়াহুদি সম্প্রদায়ের সেই অংশটির প্রসঙ্গে পাঠ করা যাক, যারা কপটতা ও বিরোধিতায় লিপ্ত ছিল। এখানে স্পষ্ট করে রাখা প্রয়োজন—এই বর্ণনা সমগ্র ইয়াহুদি সম্প্রদায় সম্পর্কে নয়; সে সময়েও তাদের মধ্যে আন্তরিক বন্ধুবৎসল মানুষ ছিলেন। কুরআন এখানে কেবল সেই দ্বিমুখী অংশটির আচরণেরই বর্ণনা দিচ্ছে, যারা এক মুখে মুসলিমদের সঙ্গে সৌহার্দ্য দেখাত, আর অন্তরালে বিরোধী পক্ষের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতো।
“يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَالَّذِينَ آمَنُوا”—তারা মুসলিমদের কাছে এসে বলত, “আমরা তো আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করি; আমরা তোমাদের মতোই বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের অংশ—তোমাদের নবীকে অনুসরণ করা জরুরি নয়, আমরা একসঙ্গে কাজ করতে পারি।” প্রকাশ্যে এই সৌহার্দ্যের আড়ালে তারা অন্তরালে বিরোধী পক্ষের সঙ্গে পরিকল্পনা করত। তাই আল্লাহ বলেন, “وَمَا يَخْدَعُونَ إِلَّا أَنفُسَهُمْ”—তারা নিজেদের ছাড়া কাউকে প্রতারিত করে না, অথচ তা উপলব্ধিও করে না।
“فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ”—এই বাক্য নামবাচক (জুমলা ইসমিয়া) হওয়ায় স্থায়িত্ব বোঝায়: সেই অংশটির অন্তরে ব্যাধি ছিল দীর্ঘকালের, তাদের ঈমান ছিল বাছাইকৃত। এ কারণেই কুরআনে এসেছে যে অতীতে তারা নিজেদের নবীদেরও অন্যায়ভাবে হত্যা করেছিল (“يَقْتُلُونَ النَّبِيِّينَ بِغَيْرِ الْحَقِّ”)। আর “وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ بِمَا كَانُوا يَكْذِبُونَ”—তারা নবীদের কষ্ট দিত, নবী ﷺ-কেও কষ্ট দেওয়ার চেষ্টা করত।
তাদের প্রসঙ্গে “لَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ”—যে ফাসাদ তারা করছিল তা হলো ওহি গোপন করা। নিজেদের কাছে অবশিষ্ট তাওরাত সঠিকভাবে পাঠ করলেই নবী ﷺ-এর সত্যতা স্পষ্ট হয়ে যেত; তাই তারা সেই অংশগুলো এড়িয়ে যেতে লাগল। কুরআন তাদের প্রশ্ন করে:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ
“তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে বিশ্বাস করো এবং কিছু অংশ অস্বীকার করো?” — সূরা আল-বাকারা, ২:৮৫
আল্লাহ তাদের চ্যালেঞ্জ করে বলেন:
قُلْ فَأْتُوا بِالتَّوْرَاةِ فَاتْلُوهَا إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ
“বলুন, তোমরা সত্যবাদী হলে তাওরাত নিয়ে এসো এবং তা পাঠ করো।” — সূরা আলে-ইমরান, ৩:৯৩
কিন্তু তারা তা করতে পারত না, কারণ তা করলে প্রকাশ হয়ে পড়ত যে কুরআনই আল্লাহর চূড়ান্ত ওহি। এভাবে ওহি গোপন করাই ছিল তাদের চূড়ান্ত ফাসাদ; অথচ তারা একে “সংশোধন” বলে দাবি করত।
আমাদের জন্য শিক্ষা: ওহির কোনো অংশ গোপন না করা
এই দ্বিতীয় পাঠ আমাদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। আমাদের কাছে সম্পূর্ণ কুরআন সংরক্ষিত। এর কোনো অংশই গোপন বা এড়িয়ে যাওয়ার নয়; এই কিতাব কেবল মুসলিমদের জন্য নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্য এসেছে, এবং আন্তরিকভাবে ব্যাখ্যা করা হলে প্রতিটি অংশই মানবহৃদয়ের কাছে অর্থবহ। কেবল আত্মপক্ষসমর্থক বা সুবিধাজনক অংশটুকু তুলে ধরে অস্বস্তিকর অংশ চেপে যাওয়া—ইনযার (সতর্কীকরণ) বাদ দিয়ে কেবল তাবশির (সুসংবাদ) শোনানো, কিংবা নিজের পক্ষে যায় এমন হকগুলো প্রচার করে বিপরীত হকগুলো এড়িয়ে যাওয়া—এ এক ধরনের ফাসাদ।
আল্লাহ পরবর্তীতে এই উম্মাহকেও শিক্ষা দেন যে, কেউ ওহির কোনো অংশ গোপন করলে তার পরিণতি ভয়াবহ:
إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنزَلْنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالْهُدَىٰ … أُولَٰئِكَ يَلْعَنُهُمُ اللَّهُ وَيَلْعَنُهُمُ اللَّاعِنُونَ
“নিশ্চয়ই যারা আমার নাযিলকৃত সুস্পষ্ট নিদর্শন ও হিদায়াত গোপন করে … তাদের প্রতি আল্লাহ অভিসম্পাত করেন এবং অভিসম্পাতকারীগণও অভিসম্পাত করে।” — সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৯
“হিকমাহর খাতিরে” কেবল অংশবিশেষ বলা আর বাকি অংশ চেপে যাওয়ার অজুহাত এখানে খাটে না—কারণ কুরআন সম্পূর্ণটাই “আল-কুরআনুল হাকিম,” প্রজ্ঞায় পূর্ণ। মানুষের মতামত, রুচি বা ভয় কখনো আল্লাহর বাণীর ঊর্ধ্বে স্থান পেতে পারে না; আল্লাহর বাণীই সর্বোচ্চ (“وَكَلِمَةُ اللَّهِ هِيَ الْعُلْيَا”—সূরা আত-তাওবা, ৯:৪০)। মানুষের কী সাধ্য যে সে আল্লাহকে তার দ্বীন শেখাবে (“قُلْ أَتُعَلِّمُونَ اللَّهَ بِدِينِكُمْ”—সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১৬)?
শিক্ষা
এই আয়াতগুলো থেকে প্রথম শিক্ষা—আল্লাহ ও রাসূল ﷺ-এর আনুগত্য অবিচ্ছেদ্য। রাসূল ﷺ-এর বিরুদ্ধে কপটতা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহরই বিরুদ্ধে; আর যে প্রতারণা করে, সে শেষ পর্যন্ত কেবল নিজেকেই প্রতারিত করে।
দ্বিতীয় শিক্ষা অন্তরের সুরক্ষা-সংক্রান্ত। শয়তানের প্রবেশাধিকার বুক পর্যন্ত—দরজা খুলে না দিলে সে অন্তরে ঢুকতে পারে না; আর কখনো ঢুকে পড়লে উপলব্ধির সঙ্গে সঙ্গেই আউযু বিল্লাহ ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে তাকে বিতাড়িত করাই কর্তব্য। ব্যাধিকে প্রশ্রয় দিলে তা ক্রমে বাড়তে থাকে, আর সন্দেহ ও কাপুরুষতা থেকে শুরু হয়ে তা সম্পূর্ণ বিমুখতায় পৌঁছে যেতে পারে। তাই দ্বীনের প্রতি নিজের মনোভাব নিয়ে আত্মপর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
তৃতীয় শিক্ষা ফাসাদ-সংক্রান্ত। ফাসাদের মূল যুদ্ধ বা শান্তি নয়, বরং জুলুম, মিথ্যা, শিরক ও অবিচার। আল্লাহর পরিপূর্ণ দ্বীনে “ভারসাম্যের” নামে সংযোজন-বিয়োজন করতে চাওয়া প্রকৃতপক্ষে ফাসাদ; দ্বীন নিজেই ভারসাম্যপূর্ণ, তা মানুষের সংশোধনের মুখাপেক্ষী নয়।
চতুর্থ শিক্ষা—ওহির কোনো অংশ গোপন না করা। এই উম্মাহর দায়িত্ব সমগ্র মানবজাতির কাছে আল্লাহর বাণী নির্ভয়ে পৌঁছে দেওয়া; মানুষের সন্তুষ্টি বা ভয়ের খাতিরে কুরআনের কোনো অংশ চেপে যাওয়া সেই দায়িত্বের বিপরীত। আল্লাহর বাণীকে সর্বোচ্চ স্থানে রেখে তার সেবক ও অনুগত থাকা—এই-ই মুমিনের মানসিকতা, আর এই মানসিকতাই ফাসাদ থেকে রক্ষা করে।