সূরা আল-বাকারা (২:১৭–২০): মুনাফিকদের দুই উপমা
মুনাফিকদের প্রতারণা, দ্বিমুখিতা ও ঠাট্টার বিবরণ (২:৮–১৬) দেওয়ার পর আল্লাহ এখানে তাদের অন্তরের অবস্থাকে দুটি উপমার (মাসাল) মাধ্যমে স্পষ্ট করে তোলেন—একটি আগুনের উপমা, অপরটি বৃষ্টি-ঝড়ের উপমা। উপমা মূর্ত দৃষ্টান্তের মাধ্যমে বিমূর্ত অর্থকে বোধগম্য করে; আর “ওয়া তিলকাল আমসালু নাদরিবুহা লিন-নাসি ওয়া মা ইয়া‘কিলুহা ইল্লাল ‘আলিমূন” (আল-‘আনকাবূত ৪৩)—এই উপমাগুলো কেবল জ্ঞানীরাই যথার্থ অনুধাবন করে। ইবনুল কায়্যিম রহ. তাঁর ই‘লামুল মুওয়াক্কিঈন-এ উল্লেখ করেছেন যে কুরআনের উপমাসমূহ এক প্রকার কিয়াস (যুক্তিসাদৃশ্য), যা কিয়াসের বৈধতার দলিল।
আগুনের উপমা (২:১৭–১৮)
مَثَلُهُمْ كَمَثَلِ ٱلَّذِى ٱسْتَوْقَدَ نَارًا فَلَمَّآ أَضَآءَتْ مَا حَوْلَهُۥ ذَهَبَ ٱللَّهُ بِنُورِهِمْ وَتَرَكَهُمْ فِى ظُلُمَـٰتٍ لَّا يُبْصِرُونَ صُمٌّۢ بُكْمٌ عُمْىٌ فَهُمْ لَا يَرْجِعُونَ
“তাদের উপমা সেই ব্যক্তির মতো, যে আগুন প্রজ্বলিত করল; অতঃপর যখন তা তার চারপাশ আলোকিত করল, তখন আল্লাহ তাদের আলো নিয়ে নিলেন এবং তাদের ছেড়ে দিলেন গভীর অন্ধকারে—তারা কিছুই দেখতে পায় না। তারা বধির, বোবা, অন্ধ; তাই তারা ফিরে আসবে না।”
আল্লাহ মুনাফিকদের—কিংবা তাদের সেই দলটিকে, যারা ঈমান এনে পরে কুফরি করেছে—উপমা দিয়েছেন সেই ব্যক্তির সঙ্গে, যে আগুন প্রজ্বলিত করল। ‘ইসতাওকাদা’ (ইসতিফ‘আল কাঠামো) মুবালাগা (আধিক্য) বোঝায়—সে যত্নসহকারে আগুন জ্বালাতে চাইল। এখানে দলবদ্ধ (জামাআ) মানুষকে একবচন (ওয়াহিদ) দিয়ে উপমা দেওয়া হয়েছে, যেমন অন্যত্র “কাল্লাযী ইয়াগশা আলায়হি মিনাল মাওত।”
‘ফালাম্মা আদাআত মা হাওলাহু’—যখন আগুন তার চারপাশ আলোকিত করল, সে উপকৃত হলো, ডানে-বামে-সামনে-পেছনে দেখতে পেল। তখন—‘যাহাবাল্লাহু বিনূরিহিম’—আল্লাহ তাদের আলো নিয়ে নিলেন। লক্ষণীয়, আল্লাহ যা উপকারী তা-ই (নূর, আলো) নিয়ে নিলেন, আর যা ক্ষতিকর—দহন ও ধোঁয়া—তা তাদের জন্য রেখে দিলেন। এখানে সর্বনাম বহুবচনে (বিনূরিহিম) এসেছে, কারণ ‘আল-লাযী’ (ইসম মাওসূল) ব্যাপকতা ও বহুত্ব বোঝায়—সেই প্রজ্বলনকারী ও তার সঙ্গীরা।
শব্দগত সূক্ষ্মতা: ‘দাও’ হলো ‘নূর’-এর তীব্র রূপ (নূরের বৃদ্ধি)। আয়াতে ‘আদাআত’ (দাও থেকে) বলার পর ‘যাহাবাল্লাহু বিনূরিহিম’ বলা হয়েছে—অর্থাৎ আল্লাহ মূল নূরই নিয়ে নিলেন; তাই তার তীব্র রূপ ‘দাও’ তো আরও অগ্রাধিকারভাবেই বিলুপ্ত।
‘ওয়া তারাকাহুম ফী যুলুমাতিন লা ইউবসিরূন’—আল্লাহ তাদের ছেড়ে দিলেন স্তরে স্তরে অন্ধকারে (যুলুমাত—বহুবচন), যেখানে তারা কিছুই দেখে না। এটি দ্বিতীয় ও গভীরতর অন্ধকার—আলো চলে যাওয়ার পরের অন্ধকার আদি অন্ধকারের চেয়ে তীব্র, কারণ আলোর অভ্যস্ত চোখ হঠাৎ অন্ধকারে কিছুই ঠাহর করতে পারে না। ‘লা ইউবসিরূন’ সেই তীব্রতার তাকীদ।
২:১৮-এ ‘সুম্মুন বুকমুন ‘উমইউন’—বধির, বোবা, অন্ধ। ‘সুম্ম’ (আসাম্ম-এর বহুবচন) যে শোনে না; ‘বুকম’ (আবকাম) যে কথা বলে না; ‘‘উমই’ (আ‘মা) যে দেখে না। ‘ফাহুম লা ইয়ারজিঊন’—তাই তারা (সত্যের দিকে) ফিরে আসবে না। তারা সত্যের প্রতি বধির, সত্য থেকে বোবা, সত্য দেখতে অন্ধ—হিদায়াতের তিন দরজাই তাদের জন্য রুদ্ধ। ইবনুল কায়্যিম রহ. বাদাইউল ফাওয়াইদ-এ বলেন: হিদায়াত বান্দার কাছে তিন দরজা দিয়ে আসে—যা সে কানে শোনে, চোখে দেখে ও অন্তরে বোঝে; এদের জন্য এই তিন দরজাই বন্ধ।
উপমার প্রয়োগ: মুনাফিকদের একটি ‘আলো’ দেওয়া হয়েছিল—বাহ্যিক ইসলাম-স্বীকৃতির আলো, যা তাদের দুনিয়াবি সুবিধা দিয়েছিল (মুমিনদের মাঝে নিরাপদে বসবাস, খাওয়া-দাওয়া, লেনদেন)। কিন্তু বাস্তবতা উন্মোচিত হলে ভেতরের অন্ধকার, শূন্যতা, সংশয়, দোদুল্যমানতা ও বিভ্রান্তি স্তরে স্তরে তাদের ওপর চেপে বসে। এই আলো তাদের অন্তরের নয়—এটি বাইরে থেকে ধার-করা আলো, যার কোনো অন্তর্নিহিত মূল্য তাদের কাছে নেই।
এই আলোর উৎসও আল্লাহ। তিনি স্বীয় অনুগ্রহে যাকে ইচ্ছা আলো দেন, স্বীয় ন্যায়ে যাকে ইচ্ছা তা থেকে বঞ্চিত করেন: “ইয়াহদিল্লাহু লিনূরিহি মাঁই ইয়াশা” (আন-নূর ৩৫); “ওয়া মান লাম ইয়াজ‘আলিল্লাহু লাহু নূরান ফামা লাহু মিন নূর” (আন-নূর ৪০)। ঈমানের এই আলো টিকে থাকতে জ্বালানি চায়—উপকারী ইলম ও নেক আমল। এগুলোর জোগান বন্ধ হলে আগুন নিভে যায়, আর অবশিষ্ট থাকে অন্ধকার।
কিয়ামতের দিনও তাদের সেই সামান্য বাহ্যিক আলো পুলসিরাতে দেওয়া হয়ে অতঃপর নিভিয়ে দেওয়া হবে: “ইয়াওমা ইয়াকূলুল মুনাফিকূনা ওয়াল মুনাফিকাতু লিল্লাযীনা আমানুন-যুরূনা নাকতাবিস মিন নূরিকুম, কীলার-জিঊ ওয়ারাআকুম ফালতামিসূ নূরা” (আল-হাদীদ ১৩)। নবী ﷺ থেকে সহীহ মুসলিমে (জাবির রা.) বর্ণিত: আল্লাহ প্রত্যেক মুমিন ও মুনাফিককে একটি করে আলো দেবেন, অতঃপর মুনাফিকদের আলো নিভিয়ে দেওয়া হবে।
বৃষ্টি-ঝড়ের উপমা (২:১৯–২০)
أَوْ كَصَيِّبٍ مِّنَ ٱلسَّمَآءِ فِيهِ ظُلُمَـٰتٌ وَرَعْدٌ وَبَرْقٌ يَجْعَلُونَ أَصَـٰبِعَهُمْ فِىٓ ءَاذَانِهِم مِّنَ ٱلصَّوَٰعِقِ حَذَرَ ٱلْمَوْتِ ۚ وَٱللَّهُ مُحِيطٌۢ بِٱلْكَـٰفِرِينَ يَكَادُ ٱلْبَرْقُ يَخْطَفُ أَبْصَـٰرَهُمْ ۖ كُلَّمَآ أَضَآءَ لَهُم مَّشَوْا۟ فِيهِ وَإِذَآ أَظْلَمَ عَلَيْهِمْ قَامُوا۟ ۚ وَلَوْ شَآءَ ٱللَّهُ لَذَهَبَ بِسَمْعِهِمْ وَأَبْصَـٰرِهِمْ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَىْءٍ قَدِيرٌ
“অথবা (তাদের উপমা) আকাশ থেকে বর্ষিত মুষলধারার মতো, যাতে রয়েছে অন্ধকার, বজ্রধ্বনি ও বিদ্যুৎচমক। মৃত্যুভয়ে তারা বজ্রাঘাত থেকে বাঁচতে কানে আঙুল গুঁজে দেয়; আর আল্লাহ কাফিরদের পরিবেষ্টন করে আছেন। বিদ্যুৎচমক যেন তাদের দৃষ্টি ছিনিয়ে নেবে; যখনই তা তাদের জন্য আলোকিত করে, তারা তাতে চলতে থাকে, আর যখন তা তাদের ওপর অন্ধকার করে দেয়, তখন তারা থমকে দাঁড়ায়। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের শ্রবণ ও দৃষ্টি নিয়ে নিতে পারতেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।”
‘আও’ (অথবা) এখানে সন্দেহ নয়, বরং তানওঈ ও তাকসীম (বৈচিত্র্য ও বিভাজন)—আগুনের উপমার পাশাপাশি এটি পানির উপমা, যা মুনাফিকদের প্রচণ্ড ভীতির চিত্র আঁকে। ‘সাইয়িব’ অর্থ মুষলধারা বৃষ্টি (সাবা ইয়াসূব থেকে)। ‘ফীহি যুলুমাতুন ওয়া রা‘দুন ওয়া বারক’—তাতে অন্ধকার, বজ্রধ্বনি ও বিদ্যুৎ। ‘আর-রা‘দ’ হলো মেঘ থেকে শোনা শব্দ, ‘আল-বারক’ হলো বিদ্যুৎচমক।
‘ইয়াজ‘আলূনা আসাবিআহুম ফী আযানিহিম মিনাস-সাওয়াইকি হাযারাল মাওত’—বজ্রপাতের ভয়ে, মৃত্যুভীতিতে তারা কানে আঙুল (আঙুলের অগ্রভাগ) গুঁজে দেয়। ‘সা‘িকা’ শব্দটি ‘সা‘ক’ (ধ্বংস/মৃত্যু) থেকে। কিন্তু মৃত্যু অনিবার্য: “কুল্লু নাফসিন যাইকাতুল মাওত” (আলে ইমরান ১৮৫); “কুল্লু মান আলায়হা ফান” (আর-রাহমান ২৬)। ‘ওয়াল্লাহু মুহীতুম বিল-কাফিরীন’—আল্লাহ কাফিরদের জ্ঞানে ও ক্ষমতায় পরিবেষ্টন করে আছেন; এটি ওয়াঈদ ও হুমকি। (এখানে ‘কাফিরীন’ বলা হয়েছে, কারণ নিফাক কুফরেরই একটি শাখা।)
২:২০-এ ‘ইয়াকাদুল বারকু ইয়াখতাফু আবসারাহুম’—বিদ্যুৎ যেন তাদের দৃষ্টিই ছিনিয়ে নেয়। ‘ইয়াকাদু’ (কাদা থেকে—নৈকট্যবাচক ক্রিয়া)। ‘কুল্লামা আদাআ লাহুম মাশাউ ফীহি’—যখনই বিদ্যুৎ আলোকিত করে, তারা তাতে চলে; ‘ওয়া ইযা আযলামা আলায়হিম কামূ’—আর অন্ধকার হলে থমকে দাঁড়ায়। এটি তাদের দোদুল্যমানতার চিত্র—ইসলামের বিরতিহীন-আলো যখন সুবিধাজনক তখন এগোয়, আর বিভ্রান্তির অন্ধকার ফিরে এলে থমকে যায়।
‘ওয়া লাও শাআল্লাহু লাযাহাবা বিসাম‘িহিম ওয়া আবসারিহিম’—আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের শ্রবণ ও দৃষ্টি নিয়ে নিতে পারতেন। ‘লাও’ এখানে হারফু ইমতিনা‘ লি-ইমতিনা‘ (শর্তবাচক, অঘটনজ্ঞাপক)। ‘ইন্নাল্লাহা আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর’—এটি তা‘লীল, যা আল্লাহর সর্বব্যাপী কুদরত সাব্যস্ত করে।
শিক্ষা
প্রথম শিক্ষা—আল্লাহ উপমার মাধ্যমে অর্থকে বোধগম্য করে তোলেন, যা কিয়াস তথা যুক্তিসাদৃশ্যের বৈধতার দলিল।
দ্বিতীয় শিক্ষা—এই দুই উপমা মুনাফিকদের অবস্থা চিত্রিত করে: তারা হিদায়াতের বিনিময়ে ভ্রষ্টতা বেছে নিয়েছে এবং স্তরে স্তরে অন্ধকার, বিভ্রান্তি ও আতঙ্কের মধ্যে নিমজ্জিত।
তৃতীয় শিক্ষা—মুনাফিকের ‘আলো’ কেবল বাহ্যিক ও ধার-করা; তার অন্তর অন্ধকারের ওপর অন্ধকারে ডুবে আছে। ঈমানের আলো টিকে থাকতে উপকারী ইলম ও নেক আমলের জ্বালানি প্রয়োজন।
চতুর্থ শিক্ষা—হিদায়াত অন্তরে প্রবেশ করে শ্রবণ, দৃষ্টি ও অনুধাবনের পথে; এই তিন পথ রুদ্ধ হলে ফিরে আসার আর উপায় থাকে না।
পঞ্চম শিক্ষা—সৃষ্টিজগতের প্রাকৃতিক শক্তির (বজ্র, বিদ্যুৎ, মৃত্যু) সামনে মানুষ অসহায়; এই উপলব্ধি তাকে স্রষ্টার প্রতি বিনয়ী করে তোলা উচিত।
ষষ্ঠ শিক্ষা—“ওয়াল্লাহু মুহীতুম বিল-কাফিরীন”—এতে কাফির ও মুনাফিকদের প্রতি হুমকি; আর “লাও শাআল্লাহু… ইন্নাল্লাহা আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর”—এতে আল্লাহর ইচ্ছা ও সর্বব্যাপী কুদরতের সাব্যস্তকরণ।