সূরা আল-বাকারা (২:১–৭): সূচনা, হুরূফুল মুকাত্তাআত এবং দুই দলের বিবরণ
সূরা আল-ফাতিহা কুরআনের সমগ্র অর্থের একটি সংক্ষিপ্ত সারনির্যাস (মুজমাল); তাওহীদ, আল্লাহর প্রশংসা ও তাঁর গুণকীর্তন, এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত ও পথভ্রষ্টদের পরিচয়—এই মৌলিক বিষয়গুলো সেখানে সংক্ষেপে এসেছে। এরপর সূরা আল-বাকারা এবং পুরো কুরআন আসে সেই সংক্ষিপ্ত রূপরেখার বিস্তারিত ব্যাখ্যা নিয়ে। সূরা আল-বাকারার সূচনায় প্রথমেই আসে কুরআনের মর্যাদা ও গুরুত্বের ঘোষণা, তারপর আসে মানুষের শ্রেণীবিভাগ—কারা এই কিতাব থেকে হিদায়াত গ্রহণ করে আর কারা তা প্রত্যাখ্যান করে।
সূরার পরিচয় ও ফযীলত
সূরা আল-বাকারা সর্বসম্মতভাবে (বিল-ইজমা) মাদানী। হিজরতের প্রথম বছর থেকে শুরু করে নবী ﷺ-এর ওফাতের কিছুকাল পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ব্যাপী এটি অবতীর্ণ হয়েছে। এমনকি কুরআনের সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াতগুলোর একটি—“ওয়াত্তাকূ ইয়াওমান তুরজাঊনা ফীহি ইলাল্লাহ” (২:২৮১)—এই সূরারই অন্তর্ভুক্ত। নীতিগতভাবে, হিজরতের পর যা অবতীর্ণ হয়েছে তা-ই মাদানী গণ্য হয়।
এই সূরার ফযীলত সম্পর্কে বহু সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়েছে।
لَا تَجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ مَقَابِرَ، إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنْفِرُ مِنَ الْبَيْتِ الَّذِي تُقْرَأُ فِيهِ سُورَةُ الْبَقَرَةِ
“তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবরস্থানে পরিণত কোরো না। নিশ্চয়ই যে ঘরে সূরা আল-বাকারা তিলাওয়াত করা হয়, শয়তান সে ঘর থেকে পালিয়ে যায়।” (সহীহ মুসলিম, কিতাবু সালাতিল মুসাফিরীন—আবূ হুরায়রা রা. থেকে)
اقْرَؤُوا الْقُرْآنَ فَإِنَّهُ يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ شَفِيعًا لِأَصْحَابِهِ، اقْرَؤُوا الزَّهْرَاوَيْنِ الْبَقَرَةَ وَسُورَةَ آلِ عِمْرَانَ، فَإِنَّهُمَا تَأْتِيَانِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كَأَنَّهُمَا غَمَامَتَانِ
“তোমরা কুরআন তিলাওয়াত করো, কেননা কিয়ামতের দিন তা তার সঙ্গীদের জন্য সুপারিশকারী হয়ে আসবে। তোমরা যাহরাওয়াইন—বাকারা ও আলে ইমরান—তিলাওয়াত করো, কেননা কিয়ামতের দিন এ দুটি দুই খণ্ড মেঘের মতো (তাদের পাঠকারীর ছায়া হয়ে) আসবে।” (সহীহ মুসলিম—আবূ উমামা আল-বাহিলী রা. থেকে)
اقْرَؤُوا سُورَةَ الْبَقَرَةِ، فَإِنَّ أَخْذَهَا بَرَكَةٌ، وَتَرْكَهَا حَسْرَةٌ، وَلَا تَسْتَطِيعُهَا الْبَطَلَةُ
“তোমরা সূরা আল-বাকারা তিলাওয়াত করো, কেননা তা গ্রহণ করা বরকত এবং তা পরিত্যাগ করা আক্ষেপের কারণ; আর জাদুকরেরা এর মোকাবিলায় অক্ষম।” (সহীহ মুসলিম—আবূ উমামা রা. থেকে)
এখানে ‘বরকত’ অর্থ কল্যাণের বৃদ্ধি ও স্থায়িত্ব (আয-যিয়াদা ওয়ান-নামা ফিল-খায়র); আর ‘আল-বাতালা’ অর্থ জাদুকরের দল। ইমাম আল-কুরতুবী তাঁর আল-জামিঊ লি-আহকামিল কুরআন-এ উল্লেখ করেছেন যে এই সূরাকে “ফুসতাতুল কুরআন” (কুরআনের শামিয়ানা) বলা হয়, কারণ এর মহত্ত্ব, বিধানের প্রাচুর্য এবং উপদেশের বিপুলতা।
হুরূফুল মুকাত্তাআত (২:১)
الٓمٓ
কতিপয় সূরার শুরুতে আসা এই বিচ্ছিন্ন হরফগুলোকে (আলিফ-লাম-মীম প্রভৃতি) ‘হুরূফুল মুকাত্তাআত’ বলা হয়। এগুলো কুরআনের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য; মোট ঊনত্রিশটি সূরা এভাবে শুরু হয়েছে।
এগুলো কি স্বতন্ত্র আয়াত? জমহূর উলামার মতে হুরূফুল মুকাত্তাআত স্বতন্ত্র আয়াত নয়; কূফী গণনাকারীগণ কেবল এগুলোকে আয়াত হিসেবে গণনা করেন। প্রচলিত মুসহাফের আয়াত-সংখ্যায়ন কূফী রীতিতে হওয়ায় “আলিফ-লাম-মীম” সেখানে একটি আয়াত হিসেবে গণিত। (কিছু ক্ষেত্রে গণনায় পার্থক্য দেখা যায়; যেমন সূরা আশ-শূরায় “হা-মীম” এক আয়াত ও “আইন-সীন-কাফ” আরেক আয়াত।)
ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ (ইরাব): আল-খলীল ইবনু আহমাদ আল-ফারাহীদী ও সীবাওয়াইহি-র মতে এগুলো ‘হুরূফু হিজা’ তথা বর্ণনামমাত্র (হুরূফ মাহকিয়্যা), যাদের ব্যাকরণে কোনো নির্দিষ্ট অবস্থান নেই (লা মাহাল্লা লাহা মিনাল ইরাব)। কেউ কেউ এগুলোকে মুবতাদা (খবর ঊহ্য) ধরে রফ‘, কিংবা ঊহ্য ‘ইকরা’ ক্রিয়ার মাফঊল ধরে নসব-এর স্থানে বিশ্লেষণ করেছেন।
অর্থ ও তাৎপর্য: এগুলোর ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ—সালাফ ও খলফ উভয়েই—মতভেদ করেছেন, তবে মতভেদটি বৈধ পরিসরের মধ্যে। একটি বড় দল একে মুতাশাবিহ মুতলাক গণ্য করেন, যার পূর্ণ জ্ঞান কেবল আল্লাহরই কাছে (এ মতের সমর্থনে জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী আল-ইতকান-এ, আশ-শাওকানী ফাতহুল কাদীর-এ এবং আশ-শায়খ আস-সা‘দী রহ. আলোচনা করেছেন)।
অপর প্রবল একটি মত—যা মুজাহিদ ইবনু জাবর রহ. প্রমুখ থেকে বর্ণিত এবং যাকে অনেকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন—এই যে, এগুলো আরবি বর্ণমালারই অক্ষর, যেগুলোর মাধ্যমে কুরআনের ই‘জায (অলৌকিক অক্ষমতাসৃষ্টিকারী গুণ) সুস্পষ্ট হয়। মুজাহিদ স্পষ্টভাবে এই ধারণা খণ্ডন করেছেন যে এগুলো নিছক ভরাট-শব্দ; বরং এতে হিকমাত ও উদ্দেশ্য নিহিত। এই মহাগ্রন্থ সেই একই অক্ষর দিয়ে গঠিত, যেগুলো আরবরা তাদের নিত্যদিনের ভাষায় ব্যবহার করে—তবু তারা এর একটিমাত্র সূরার সমতুল্য কিছু আনতে অক্ষম। এটিই তাহাদ্দী (চ্যালেঞ্জ) ও ই‘জাযের ঘোষণা। লক্ষণীয় যে মুকাত্তাআত-বিশিষ্ট সূরাগুলোর অব্যবহিত পরেই প্রায়শই কিতাব বা কুরআনের উল্লেখ আসে—“আলিফ-লাম-মীম, যালিকাল কিতাব”; “সাদ, ওয়াল-কুরআনি যিয-যিকর”; “কাফ, ওয়াল-কুরআনিল মাজীদ”—যা এই ই‘জাযের ব্যাখ্যাকে শক্তিশালী করে। আল-মুবাররাদ, কুতরুব, আল-ফাররা, আর-রাগিব আল-আসফাহানী, আয-যামাখশারী, ফাখরুদ্দীন আর-রাযী, শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়া, ইবনুল কায়্যিম, ইবনু কাসীর, আশ-শিনকীতী ও ইবনু উসায়মীন রহ. প্রমুখ এই ই‘জাযের দিকটিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
যালিকাল কিতাব—কুরআনের মর্যাদা (২:২)
ذَٰلِكَ ٱلْكِتَـٰبُ لَا رَيْبَ ۛ فِيهِ ۛ هُدًۭى لِّلْمُتَّقِينَ
“এই সেই কিতাব, এতে কোনো সন্দেহ নেই; মুত্তাকীদের জন্য হিদায়াত।”
‘যালিকা’ দূরত্ববাচক ইশারা-সর্বনাম (ইসমু ইশারা), সঙ্গে সম্বোধনসূচক ‘কাফ’—এই দূরত্বের ব্যবহার কিতাবটির উচ্চ মর্যাদা ও সুউচ্চ অবস্থানের প্রতি ইঙ্গিত করে। ‘আল-কিতাব’ শব্দটি ‘ফিআল’ ওজনে ‘মাফঊল’ অর্থে, অর্থাৎ ‘আল-মাকতূব’ (যা লিখিত)—যা লাওহে মাহফূযে লিপিবদ্ধ, সম্মানিত ফেরেশতাদের হাতে লিখিত পবিত্র সহীফায় সংরক্ষিত: “ফী সুহুফিম মুকাররামা, মারফূআতিম মুতাহহারা, বি-আইদী সাফারা, কিরামিম বারারা” (সূরা ‘আবাসা ১৩–১৬)।
এই কুরআন সর্বাবস্থায় সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক সম্মানিত গ্রন্থ। আল্লাহ একে বহু বিশেষণে ভূষিত করেছেন: “ওয়াল-কুরআনিল আযীম” (আল-হিজর ৮৭), “বাল হুওয়া কুরআনুম মাজীদ, ফী লাওহিম মাহফূয” (আল-বুরূজ ২১–২২), “কিতাবুন আনযালনাহু ইলায়কা মুবারাক” (সাদ ২৯), “ইন্নাহু লাকুরআনুন কারীম” (আল-ওয়াকিয়া ৭৭), “ইন্না হাযাল কুরআনা ইয়াহদী লিল্লাতী হিয়া আকওয়াম” (আল-ইসরা ৯)। আর অন্য কিতাবগুলোর সঙ্গে এর সম্পর্ক প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন: “ওয়া আনযালনা ইলায়কাল কিতাবা বিল-হাক্কি মুসাদ্দিকাল লিমা বায়না ইয়াদায়হি মিনাল কিতাবি ওয়া মুহায়মিনান আলায়হি” (আল-মায়িদা ৪৮)—কুরআন পূর্ববর্তী কিতাবগুলোর সত্যায়নকারী এবং সেগুলোর ওপর তত্ত্বাবধায়ক (মুহায়মিন): কোনটি সত্য আর কোনটি বিকৃত, তা কুরআনই নির্ধারণ করে দেয়।
“লা রায়বা ফীহি”—‘আর-রায়ব’ অর্থ সন্দেহ; অর্থাৎ এতে কোনোরূপ সন্দেহ নেই। এখানে ‘মুতাশাবিহ’ বলতে উসূলুল ফিকহে আলোচিত অস্পষ্ট বিষয় বোঝানো হয়নি। কুরআন একদিকে “কিতাবুন উহকিমাত আয়াতুহু” (হূদ ১), অন্যদিকে “কিতাবাম মুতাশাবিহাম মাসানিয়া” (আয-যুমার ২৩)। সমন্বয়: ইহকাম অর্থে কুরআনের সবটুকু সুদৃঢ় ও নির্ভুল; আর তাশাবুহ অর্থে এর অংশগুলো পরস্পর সাদৃশ্যপূর্ণ ও একে অপরের সমর্থক। পক্ষান্তরে সূরা আলে ইমরানে (৩:৭) উল্লিখিত মুহকাম ও মুতাশাবিহের বিভাজন অনুসারে মুতাশাবিহ দুই প্রকার: মুতলাক (যা কেবল আল্লাহই জানেন) এবং নিসবী (আপেক্ষিক—যা আলিমগণ বা তালিবুল ইলম অবগত হতে পারেন)।
“হুদাল লিল-মুত্তাকীন”—‘হুদা’ একটি ঊহ্য মুবতাদার খবর (হুওয়া হুদা), অর্থাৎ এই কুরআন মুত্তাকীদের জন্য হিদায়াত। যদিও অন্যত্র বলা হয়েছে “হুদাল লিন-নাস” (২:১৮৫), তবু এখানে বিশেষভাবে মুত্তাকীদের কথা বলা হয়েছে, কারণ তারাই প্রকৃতপক্ষে এই হিদায়াত গ্রহণ ও তা থেকে উপকৃত হয়। ‘তাকওয়া’ অর্থ—নিজের ও আল্লাহর শাস্তির মাঝে একটি প্রতিরক্ষা-প্রাচীর (ওয়িকায়া) স্থাপন করা তাঁর আদেশ পালন ও নিষেধ বর্জনের মাধ্যমে। শব্দটির মূল ‘ওয়াকা’ (রক্ষা করা) থেকে। আল্লাহ বলেন: “কুল হুওয়া লিল্লাযীনা আমানূ হুদাওঁ ওয়া শিফা” (ফুসসিলাত ৪৪); “ওয়া নুনাযযিলু মিনাল কুরআনি মা হুওয়া শিফাউওঁ ওয়া রাহমাতুল লিল-মুমিনীন” (আল-ইসরা ৮২)।
প্রথম দল: মুত্তাকীদের চারটি গুণ (২:৩–৪)
ٱلَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِٱلْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ ٱلصَّلَوٰةَ وَمِمَّا رَزَقْنَـٰهُمْ يُنفِقُونَ وَٱلَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِمَآ أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَآ أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ وَبِٱلْـَٔاخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ
“যারা গায়েবের প্রতি ঈমান আনে, সালাত কায়েম করে এবং আমি তাদের যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে; আর যারা তোমার প্রতি অবতীর্ণ বিষয়ের এবং তোমার পূর্বে অবতীর্ণ বিষয়ের প্রতি ঈমান আনে এবং আখিরাতের প্রতি দৃঢ় প্রত্যয় রাখে।”
প্রথম গুণ—গায়েবের প্রতি ঈমান। ঈমান আভিধানিকভাবে ‘তাসদীক’ (সত্যায়ন); শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়া রহ.-এর মতে ‘ইকরার’ (স্বীকৃতি)। কিন্তু শরঈ পরিভাষায় ঈমান হলো—“কাওলুন বিল-লিসান, ওয়া ইতিকাদুন বিল-জানান (হৃদয়), ওয়া আমালুন বিল-আরকান (অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ); ইয়াযীদু বি-তাআতির-রাহমান, ওয়া ইয়ানকুসু বি-মাসিয়াতিশ-শায়তান।” আহলুল ইলমের ইজমা এই যে ঈমান অন্তরের বিশ্বাস, জবানের স্বীকৃতি ও অঙ্গের আমল—তিনের সমষ্টি, যা আনুগত্যে বাড়ে ও পাপে কমে (ইমাম আশ-শাফিঈ, আল-হুমায়দী প্রমুখ থেকে বর্ণিত)।
‘আল-গায়েব’ অর্থ—যা বান্দাদের কাছে অদৃশ্য, যা তাদের ইন্দ্রিয়ে ধরা পড়ে না। এর অন্তর্ভুক্ত: আল্লাহ, ফেরেশতাগণ, আসমানী কিতাবসমূহ, নবী-রাসূলগণ, শেষ দিবস এবং তাকদীর—ভালো ও মন্দ। আল্লাহ বলেন: “লাইসাল বিররা আন তুওয়াল্লূ উজূহাকুম… ওয়া লাকিন্নাল বিররা মান আমানা বিল্লাহি ওয়াল-ইয়াওমিল আখিরি ওয়াল-মালাইকাতি ওয়াল-কিতাবি ওয়ান-নাবিয়্যীন” (২:১৭৭)। হাদীসে জিবরীলে এসেছে: “ঈমান হলো তুমি বিশ্বাস করবে আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসূলগণ ও শেষ দিবসের প্রতি এবং বিশ্বাস করবে তাকদীরের—তার ভালো ও মন্দের প্রতি।”
গায়েবের প্রতি ঈমানই দ্বীনের সুদৃঢ় ভিত্তি। মানুষের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত; এমনকি ইন্দ্রিয়ও বহু সময় প্রতারিত করে—পানিতে ডোবানো সোজা কাঠি বাঁকা দেখায়, কখনো মনে হয় কেউ ডাকল অথচ কেউ ডাকেনি। কাজেই কেবল ইন্দ্রিয়কে বিচারক বানিয়ে অদৃশ্যকে অস্বীকার করা—যা যুক্তিবাদী অস্বীকারকারীদের রীতি—জ্ঞানের সীমাবদ্ধতাকেই অগ্রাহ্য করা। আল্লাহ বলেন: “ওয়া ইয়াসআলূনাকা আনির-রূহ, কুলির-রূহু মিন আমরি রাব্বী ওয়া মা ঊতীতুম মিনাল ইলমি ইল্লা কালীলা” (আল-ইসরা ৮৫)।
দ্বিতীয় গুণ—সালাত কায়েম করা। ‘ইকামাতুস সালাত’ অর্থ কেবল সালাত আদায় নয়, বরং তার শর্ত, রুকন, ওয়াজিব ও সুন্নাহসহ পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠা করা—ফরয ও নফল উভয়ই। ‘সালাত’ শব্দের আভিধানিক অর্থ দু‘আ: “ওয়া সাল্লি আলায়হিম ইন্না সালাতাকা সাকানুল লাহুম” (আত-তাওবা ১০৩)। শরঈ অর্থে—“নির্দিষ্ট কিছু কথা ও কাজের মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত, যার সূচনা তাকবীর দিয়ে ও সমাপ্তি সালাম দিয়ে।” সালাত সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত এবং দ্বীনের স্তম্ভ (আমূদুদ দ্বীন)।
তৃতীয় গুণ—আল্লাহপ্রদত্ত রিযিক থেকে ব্যয় করা। এখানে ‘মিন’ (মিম্মা) অংশবাচক—অর্থাৎ প্রদত্ত রিযিকের একাংশ থেকে। ‘আল-ইনফাক’ অর্থ বৈধ খাতে সম্পদ ব্যয় করা। এর অন্তর্ভুক্ত ফরয যাকাত এবং নফল সদকা উভয়ই। ‘রাযাকনাহুম’ শব্দটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে এই সম্পদ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহরই: “ওয়া আনফিকূ মিম্মা জাআলাকুম মুসতাখলাফীনা ফীহি” (আল-হাদীদ ৭); “ওয়া আতূহুম মিম মালিল্লাহিল লাযী আতাকুম” (আন-নূর ৩৩)। রাসূল ﷺ বলেছেন: “আনফিক, উনফিক আলায়ক” (ব্যয় করো, তোমার ওপর ব্যয় করা হবে—বুখারী, মুসলিম; আবূ হুরায়রা রা.); আর আসমা রা.-কে বলেছিলেন: “আনফিকী ওয়া লা তুহসী ফা-ইউহসিয়াল্লাহু আলায়ক”—ব্যয় করো, গুনে গুনে আটকে রেখো না, নতুবা আল্লাহও তোমার প্রতি হিসাব-সংকুচিত করবেন।
চতুর্থ গুণ—অবতীর্ণ সব কিতাব ও আখিরাতের প্রতি ঈমান। তারা তোমার প্রতি অবতীর্ণ (কুরআন) ও তোমার পূর্বে অবতীর্ণ কিতাবসমূহের—তাওরাত, ইনজীল, যাবূর, ইবরাহীম ও মূসার সহীফা—প্রতিও ঈমান আনে। আল্লাহ বলেন: “আমানার-রাসূলু বিমা উনযিলা ইলায়হি মিন রাব্বিহি ওয়াল-মুমিনূন, কুল্লুন আমানা বিল্লাহি ওয়া মালাইকাতিহি ওয়া কুতুবিহি ওয়া রুসুলিহি লা নুফাররিকু বায়না আহাদিম মির রুসুলিহি” (২:২৮৫)।
[ইসরাঈলিয়াত সম্পর্কে নীতিগত টীকা] পূর্ববর্তী কিতাবের বর্ণনার ক্ষেত্রে নবী ﷺ-এর নির্দেশনা: আহলে কিতাবের বর্ণনাকে সরাসরি সত্যায়নও কোরো না, মিথ্যাও বোলো না; বরং বলো “আমান্না বিল্লাহি ওয়া মা উনযিলা ইলায়না” (আল-‘আনকাবূত ৪৬)। এই ধরনের বর্ণনা তিন ভাগ: (ক) যা আমাদের শরীয়ত সত্যায়ন করেছে—তা গ্রহণীয়; (খ) যা আমাদের শরীয়ত মিথ্যা প্রমাণ করেছে—তা প্রত্যাখ্যাত; (গ) যা সম্পর্কে শরীয়ত নীরব—তার ক্ষেত্রে গ্রহণ-বর্জন নিয়ে মতভেদ রয়েছে, তাই এমন বর্ণনায় নিশ্চয়তা দাবি করা যায় না।
“ওয়া বিল-আখিরাতি হুম ইউকিনূন”—আখিরাতের প্রতি দৃঢ় প্রত্যয়। আখিরাত এমনিতেই গায়েবের অন্তর্ভুক্ত, তবু একে পৃথকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে তার বিশেষ গুরুত্বের কারণে (যিকরুল খাস বা‘দাল ‘আম)। কেননা কর্মের প্রতিদানের (আল-মুজাযাতু আলাল আমাল) প্রতি বিশ্বাসই মানুষকে আদিষ্ট কাজে উদ্বুদ্ধ ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত রাখে। উমার ইবনুল খাত্তাব রা. থেকে বর্ণিত: “আখিরাতের প্রতি ঈমান না থাকলে তুমি মানুষদের অন্যরূপ দেখতে।” আল্লাহ বলেন: “ওয়া ইন্নাদ-দারাল আখিরাতা লাহিয়াল হায়াওয়ান” (আল-‘আনকাবূত ৬৪)—ইবনু কাসীর রহ. বলেন, প্রকৃত জীবন তো আখিরাতেরই জীবন। ‘আল-ইয়াকীন’ অর্থ এমন দৃঢ় ঈমান ও নিশ্চিত জ্ঞান, যেখানে সন্দেহের অবকাশ নেই।
এই দলের পরিণাম: হিদায়াত ও সফলতা (২:৫)
أُو۟لَـٰٓئِكَ عَلَىٰ هُدًۭى مِّن رَّبِّهِمْ ۖ وَأُو۟لَـٰٓئِكَ هُمُ ٱلْمُفْلِحُونَ
“তারাই তাদের রবের পক্ষ থেকে হিদায়াতের ওপর অধিষ্ঠিত এবং তারাই সফলকাম।”
‘উলাইকা’ (তারা)—উপরোক্ত গুণসম্পন্নরা। ‘আলা হুদা’—এখানে ‘আলা’ ইসতিলা (আরোহণ/উচ্চতা) অর্থে; অর্থাৎ তারা হিদায়াতের ওপর সুদৃঢ়ভাবে অধিষ্ঠিত, হিদায়াত দ্বারা সমুন্নত। ‘হুদা’ নাকিরা (অনির্দিষ্ট) এসেছে তা‘যীম (মহত্ত্ব) বোঝাতে—মহান হিদায়াত। ‘মিন রাব্বিহিম’—তাদের রবের পক্ষ থেকে, যা তাদের সম্মানের প্রতি ইঙ্গিত। হিদায়াত দুই প্রকার: হিদায়াতুদ দালালা ওয়াল-ইরশাদ (পথ দেখিয়ে দেওয়া—যা যে-কেউ করতে পারে) এবং হিদায়াতুত তাওফীক (সত্যকে অন্তরে গ্রহণ করানো—যা কেবল আল্লাহই পারেন)। আল্লাহ বলেন: “ওয়া ইন্নাল্লাহা লাহাদিল লাযীনা আমানূ ইলা সিরাতিম মুসতাকীম” (আল-হাজ্জ ৫৪); “ইয়াহদিল্লাহু লিনূরিহি মাঁই ইয়াশা” (আন-নূর ৩৫)।
“ওয়া উলাইকা হুমুল মুফলিহূন”—‘আল-ফালাহ’ অর্থ প্রার্থিত বস্তু অর্জন এবং ভীতিকর বস্তু থেকে মুক্তি (আল-ফাওযু বিল-মাতলূব ওয়ান-নাজাতু মিনাল মারহূব)। এরা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে সৌভাগ্যবান: যা চেয়েছিল তা পাবে, আর যা থেকে ভয় পেত তা থেকে রক্ষা পাবে। আল্লাহ স্মরণ করান যে এই হিদায়াত তাঁরই অনুগ্রহ: “বালিল্লাহু ইয়ামুন্নু আলায়কুম আন হাদাকুম লিল-ঈমান” (আল-হুজুরাত ১৭)।
দ্বিতীয় দল: প্রকাশ্য অস্বীকারকারী (২:৬–৭)
إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُوا۟ سَوَآءٌ عَلَيْهِمْ ءَأَنذَرْتَهُمْ أَمْ لَمْ تُنذِرْهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ خَتَمَ ٱللَّهُ عَلَىٰ قُلُوبِهِمْ وَعَلَىٰ سَمْعِهِمْ ۖ وَعَلَىٰٓ أَبْصَـٰرِهِمْ غِشَـٰوَةٌۭ ۖ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌۭ
“নিশ্চয়ই যারা কুফরি করেছে, তুমি তাদের সতর্ক করো বা না করো—তাদের জন্য সমান; তারা ঈমান আনবে না। আল্লাহ তাদের অন্তরে ও কানে মোহর মেরে দিয়েছেন এবং তাদের চোখের ওপর আবরণ; আর তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।”
মুত্তাকীদের—যাদের জন্য এই কিতাব হিদায়াত—উল্লেখের পর আসে দ্বিতীয় দল: সেই কাফিররা, যারা বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণভাবে প্রকাশ্যে কুফরি করে। মূলত মানুষ তিন শ্রেণিতে বিভক্ত: মুমিন, কাফির ও মুনাফিক।
‘কুফর’ শব্দের মূল ‘ক-ফ-র’; ইবনু ফারিস তাঁর মু‘জাম মাকায়ীসিল লুগা-য় দেখিয়েছেন এর মূল অর্থ ‘আচ্ছাদন ও ঢেকে রাখা’ (আস-সাতর ওয়াত-তাগতিয়া)। কৃষককে ‘কাফির’ বলা হয় কারণ সে বীজকে মাটিতে ঢেকে দেয়: “কামাসালি গায়সিন আ‘জাবাল কুফফারা নাবাতুহু” (আল-হাদীদ ২০)—এখানে ‘কুফফার’ অর্থ কৃষকদল।
শরঈ পরিভাষায় কুফর দুই প্রকার: কুফরে আকবার (ঈমানের বিপরীত, যা মিল্লাত থেকে বহিষ্কার করে এবং জাহান্নামে স্থায়িত্ব অনিবার্য করে) এবং কুফরে আসগার (যা মিল্লাত থেকে বের করে না)। ইবনুল কায়্যিম রহ. তাঁর মাদারিজুস সালিকীন-এ কুফরে আকবারের কয়েকটি ধরন উল্লেখ করেছেন: (এক) কুফরে তাকযীব—সত্যকে মিথ্যা বলা; (দুই) কুফরে ইবা ওয়াস্তিকবার—অস্বীকৃতি ও অহংকার, যা ছিল ইবলীসের কুফর: “আবা ওয়াসতাকবারা ওয়া কানা মিনাল কাফিরীন”; (তিন) কুফরে ই‘রায—উপেক্ষা ও মুখ ফিরিয়ে নেওয়া; (চার) কুফরে শাক—সন্দেহ; (পাঁচ) কুফরে নিফাক—মুনাফিকি। এখানে লক্ষণীয়, ফিরআউনের কুফর ছিল জুহূদের (অন্তরে নিশ্চিত জেনেও অস্বীকার): “ওয়া জাহাদূ বিহা ওয়াসতায়কানাতহা আনফুসুহুম” (আন-নামল ১৪); মূসা আ. তাকে বলেছিলেন: “লাকাদ ‘আলিমতা মা আনযালা হাউলাই ইল্লা রাব্বুস সামাওয়াতি ওয়াল-আরদি বাসাইর” (আল-ইসরা ১০২)।
পক্ষান্তরে কুফরে আসগার মিল্লাত থেকে বের করে না—যেমন কুফরুন নি‘মা এবং “কুফরুন দূনা কুফর।” হাদীসে এসেছে: “লা তারজিঊ বা‘দী কুফফারান ইয়াদরিবু বা‘দুকুম রিকাবা বা‘দ” (মুসলিম); “সিবাবুল মুসলিমি ফুসূক, ওয়া কিতালুহু কুফর” (বুখারী, মুসলিম); “ইসনাতানি ফিন-নাসি হুমা বিহিম কুফর: আত-তা‘নু ফিল-আনসাব, ওয়ান-নিয়াহাতু আলাল মায়্যিত” (মুসলিম)। রিয়া সম্পর্কেও নবী ﷺ বলেছেন: “আখওয়াফু মা আখাফু আলায়কুমুশ শিরকুল আসগার… আর-রিয়া।”
“সাওয়াউন আলায়হিম আ-আনযারতাহুম আম লাম তুনযিরহুম”—এখানে হামযাহ ইসতিফহাম তাসবিয়ার (সমতা-জ্ঞাপক) জন্য: এই একগুঁয়ে অস্বীকারকারীদের সতর্ক করা বা না করা সমান, তারা ঈমান আনবে না। এটি নবী ﷺ-এর জন্য সান্ত্বনা—তাঁর দায়িত্ব পৌঁছে দেওয়া, হিদায়াত দেওয়া নয়: “ওয়া লাইন আতায়তাল লাযীনা ঊতুল কিতাবা বিকুল্লি আয়াতিম মা তাবিঊ কিবলাতাক” (২:১৪৫)। তিনি মুমিনদের জন্য সুসংবাদদাতা ও কাফিরদের জন্য সতর্ককারী: “ইন্না আরসালনাকা শাহিদাওঁ ওয়া মুবাশশিরাওঁ ওয়া নাযীরা” (আল-আহযাব ৪৫–৪৬)।
“খাতামাল্লাহু আলা কুলূবিহিম…”—এটি পূর্ববর্তী কথার কারণ-ব্যাখ্যা (তা‘লীল): কেন তারা ঈমান আনে না? কারণ আল্লাহ তাদের অন্তর ও শ্রবণে মোহর মেরে দিয়েছেন এবং দৃষ্টির ওপর দিয়েছেন আবরণ (গিশাওয়া)। ‘আল-খাতম’ অর্থ মোহর, আচ্ছাদন ও রুদ্ধ করা। সমর্থক আয়াত: “আফালা ইয়াতাদাব্বারূনাল কুরআনা আম আলা কুলূবিন আকফালুহা” (মুহাম্মাদ ২৪); “ওয়া কালূ কুলূবুনা গুলফুন বাল লা‘আনাহুমুল্লাহু বিকুফরিহিম” (২:৮৮); “ওয়া জা‘আলনা আলা কুলূবিহিম আকিন্নাতান আন ইয়াফকাহূহু ওয়া ফী আযানিহিম ওয়াকরা” (আল-আন‘আম ২৫)। দৃষ্টির ওপর আবরণের কারণে তারা শরঈ ও কাওনী (সৃষ্টিজগতের) নিদর্শন দেখেও উপলব্ধি করে না: “ফা-ইন্নাহা লা তা‘মাল আবসারু ওয়া লাকিন তা‘মাল কুলূবুল্লাতী ফিস-সুদূর” (আল-হাজ্জ ৪৬)।
অন্তরই সংশোধন ও বিকৃতির কেন্দ্র। নবী ﷺ বলেছেন:
أَلَا وَإِنَّ فِي الْجَسَدِ مُضْغَةً، إِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، أَلَا وَهِيَ الْقَلْبُ
“জেনে রাখো, দেহে একটি গোশতপিণ্ড আছে; তা সুস্থ হলে সমস্ত দেহ সুস্থ থাকে, আর তা বিকৃত হলে সমস্ত দেহ বিকৃত হয়ে যায়। জেনে রাখো, তা হলো অন্তর।” (বুখারী ও মুসলিম—নু‘মান ইবনু বাশীর রা. থেকে)
একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি: এই মোহর মেরে দেওয়া আল্লাহর কোনো যুলুম নয়; বরং এটি তাদের নিজেদের বেছে নেওয়া পথভ্রষ্টতার পরিণাম। আল্লাহ বলেন: “ফালাম্মা যাগূ আযাগাল্লাহু কুলূবাহুম” (আস-সাফ ৫)—যখন তারা নিজেরাই বক্র হলো, তখন আল্লাহ তাদের অন্তরকে বক্র করে দিলেন; “ওয়া নুকাল্লিবু আফইদাতাহুম ওয়া আবসারাহুম কামা লাম ইউমিনূ বিহি আউয়ালা মাররা” (আল-আন‘আম ১১০); “ওয়া মা যালামাহুমুল্লাহু ওয়া লাকিন কানূ আনফুসাহুম ইয়াযলিমূন।”
“ওয়া লাহুম আযাবুন আযীম”—তাদের জন্য মহাশাস্তি: দৈহিক (হিসসী) ও অন্তরের (মা‘নবী) উভয় প্রকার। অন্তরের শাস্তির প্রসঙ্গে: “ওয়া মান আ‘রাদা আন যিকরী ফা-ইন্না লাহু মা‘ঈশাতান দানকা” (ত্বাহা ১২৪)—যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফেরায়, তার জন্য রয়েছে সংকুচিত জীবন।
শিক্ষা
এই আয়াতগুলো থেকে প্রথম শিক্ষা—কুরআন একটি মু‘জিযা। এটি সেই পরিচিত অক্ষরসমূহ দিয়েই গঠিত যা মানুষ ব্যবহার করে, তবু এর সমতুল্য কিছু আনতে কেউ সক্ষম নয়; হুরূফুল মুকাত্তাআত সেই ই‘জাযেরই ইঙ্গিতবাহী।
দ্বিতীয় শিক্ষা—এই কুরআন লাওহে মাহফূযে সংরক্ষিত, লিখিত ও সুরক্ষিত সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।
তৃতীয় শিক্ষা—হিদায়াত মূলত মুত্তাকীদের জন্য, কারণ কেবল তারাই এই কিতাবকে হিদায়াত ও পথনির্দেশ হিসেবে দেখে ও গ্রহণ করে; তাই তাকওয়ার মর্যাদা সুমহান।
চতুর্থ শিক্ষা—আল্লাহ মুত্তাকীদের চারটি গুণ উল্লেখ করেছেন: গায়েবের প্রতি ঈমান (যা সবচেয়ে বড় ও মৌলিক ভিত্তি), সালাত কায়েম করা, আল্লাহপ্রদত্ত রিযিক থেকে ব্যয় করা এবং অবতীর্ণ সব কিতাব ও আখিরাতের প্রতি দৃঢ় প্রত্যয়। এভাবে ইসলামী শরীয়ত অন্তরের আমল ও অঙ্গের আমল—উভয়ের সমন্বয় ঘটায়।
পঞ্চম শিক্ষা—হিদায়াত ও সফলতা এই মুত্তাকীদের জন্যই সীমাবদ্ধ (হাসর); আর এই হিদায়াত তাদের রবের পক্ষ থেকে অনুগ্রহস্বরূপ, তাদের নিজেদের কৃতিত্ব নয়।
ষষ্ঠ শিক্ষা—মানুষ প্রধানত তিন দলে বিভক্ত; দ্বিতীয় দল হলো প্রকাশ্য কাফির, যাদের কুফর বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় দিক থেকে অনাবৃত। তাদের অন্তরে মোহর পড়ার কারণ তাদের নিজেদের অবিচার, আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো যুলুম নয়।
সপ্তম শিক্ষা—নবী ﷺ-এর দায়িত্ব কেবল পৌঁছে দেওয়া ও সতর্ক করা; অন্তরের হিদায়াত একমাত্র আল্লাহর হাতে। কাজেই কেউ সত্য প্রত্যাখ্যান করলে দাঈ যেন হতাশ না হন। আর কাফিরদের জন্য অপেক্ষা করছে ‘আযাবুন আযীম’।