সূরা আল-বাকারা (২:৩০–৩৪): আদম আ.-এর কাহিনি ও খিলাফত
আল্লাহ এবার মানবজাতির সূচনা-কাহিনি বর্ণনা করেন—যমিনে খলীফারূপে আদম আ.-এর সৃষ্টি, ফেরেশতাদের প্রশ্ন, আদমকে নামসমূহ শিক্ষা দান, জ্ঞানের মাধ্যমে আদমের মর্যাদার প্রকাশ, এবং ফেরেশতাদের প্রতি আদমকে সিজদা করার নির্দেশ—যা ইবলীস ব্যতীত সকলে পালন করে, আর ইবলীস অহংকারবশত অস্বীকার করে।
খলীফা সৃষ্টি ও ফেরেশতাদের প্রশ্ন (২:৩০)
وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَـٰٓئِكَةِ إِنِّى جَاعِلٌ فِى ٱلْأَرْضِ خَلِيفَةً ۖ قَالُوٓا۟ أَتَجْعَلُ فِيهَا مَن يُفْسِدُ فِيهَا وَيَسْفِكُ ٱلدِّمَآءَ وَنَحْنُ نُسَبِّحُ بِحَمْدِكَ وَنُقَدِّسُ لَكَ ۖ قَالَ إِنِّىٓ أَعْلَمُ مَا لَا تَعْلَمُونَ
“আর স্মরণ করো, যখন তোমার রব ফেরেশতাদের বললেন, ‘আমি যমিনে একজন খলীফা সৃষ্টি করতে যাচ্ছি।’ তারা বলল, ‘আপনি কি এমন কাউকে সেখানে সৃষ্টি করবেন, যে তাতে বিপর্যয় ঘটাবে ও রক্তপাত করবে? অথচ আমরা আপনার প্রশংসাসহ পবিত্রতা ঘোষণা করি এবং আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করি।’ তিনি বললেন, ‘নিশ্চয়ই আমি যা জানি, তোমরা তা জানো না।’”
‘ওয়া ইয কালা রাব্বুকা লিল-মালাইকা’—আর স্মরণ করো, যখন তোমার রব ফেরেশতাদের বললেন। ‘ইয’—যরফ (কাল-নির্দেশক)। ‘হে মুহাম্মদ, স্মরণ করো এবং তোমার কওমকেও স্মরণ করাও।’ ‘আল-মালাইকা’ (মালাক-এর বহুবচন)—একটি অদৃশ্য (গায়বী) সৃষ্টি, যাদের আল্লাহ নূর থেকে সৃষ্টি করেছেন: “খুলিকাতিল মালাইকাতু মিন নূর, ওয়া খুলিকাল জান্নু মিম মারিজিম মিন নার, ওয়া খুলিকা আদামু মিম্মা উসিফা লাকুম” (সহীহ মুসলিম, আয়িশা রা.)। ফেরেশতায় বিশ্বাস ঈমানের একটি রুকন। আমরা তাঁদের প্রতি সামগ্রিকভাবে (ইজমালান) বিশ্বাস করি, আর যাঁদের নাম-কাজ নাসে (কুরআন-সুন্নাহয়) উল্লেখিত তাঁদের নির্দিষ্টভাবেও—জিবরীল (ওহীর দায়িত্বপ্রাপ্ত), মালাকুল মাওত (“ইয়াতাওয়াফফাকুম মালাকুল মাওতিল লাযী উক্কিলা বিকুম”—আস-সাজদা ১১), লিপিবদ্ধকারী ফেরেশতাগণ (“কিরামান কাতিবীন”—আল-ইনফিতার ১১), গর্ভের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা, কবরের দুই প্রশ্নকর্তা, আরশ বহনকারীগণ (“ওয়া ইয়াহমিলু ‘আরশা রাব্বিকা ফাওকাহুম ইয়াওমাইযিন সামানিয়া”—আল-হাক্কা ১৭), জাহান্নামের প্রহরীগণ (“আলায়হা মালাইকাতুন গিলাযুন শিদাদ”—আত-তাহরীম ৬)। তাঁরা অক্লান্তভাবে ইবাদত করেন: “ইউসাব্বিহূনাল লায়লা ওয়ান-নাহারা লা ইয়াফতুরূন” (আল-আম্বিয়া ২০); “লা ইয়া‘সূনাল্লাহা মা আমারাহুম ওয়া ইয়াফ‘আলূনা মা ইউমারূন” (আত-তাহরীম ৬)।
‘ইন্নী জা‘ইলুন ফিল আরদি খালীফা’—আমি যমিনে একজন খলীফা সৃষ্টি করতে যাচ্ছি। ‘খালীফা’—যে অপরের স্থলাভিষিক্ত হয়; প্রজন্মের পর প্রজন্ম পরস্পরের স্থলাভিষিক্ত হয়ে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা ও যমিন আবাদ করবে। “ইয়া দাঊদু ইন্না জা‘আলনাকা খালীফাতান ফিল আরদি ফাহকুম বায়নান-নাসি বিল-হাক্ক” (সাদ ২৬); “সুম্মা জা‘আলনাকুম খালাইফা ফিল আরদি মিম বা‘দিহিম” (ইউনুস ১৪); “ওয়া‘আদাল্লাহুল লাযীনা আমানূ মিনকুম ওয়া ‘আমিলুস-সালিহাতি লাইয়াসতাখলিফান্নাহুম ফিল আরদ” (আন-নূর ৫৫)।
‘কালূ আতাজ‘আলু ফীহা মাঁই ইউফসিদু ফীহা ওয়া ইয়াসফিকুদ-দিমা’—তারা বলল, ‘আপনি কি সেখানে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন, যে তাতে বিপর্যয় ঘটাবে ও রক্তপাত করবে?’ এটি আল্লাহর প্রতি আপত্তি নয়, বরং হিকমাত অনুধাবনের প্রশ্ন (ইসতি‘লাম ওয়া ইসতিজলা লিওয়াজহিল হিকমা)—এই খলীফা সৃষ্টির প্রজ্ঞা কোথায়, তা জানার আগ্রহ। ফেরেশতারা জানতেন যে এই প্রজাতির মধ্যে বিপর্যয় ও রক্তপাত থাকবে। ‘ওয়া ইয়াসফিকুদ-দিমা’—রক্তপাত, যা যমিনে বিপর্যয়ের অন্যতম বড় রূপ (‘আতফুল খাস আলাল ‘আম—সামগ্রিকের ওপর বিশেষের সংযোজন)।
‘ওয়া নাহনু নুসাব্বিহু বিহামদিকা ওয়া নুকাদ্দিসু লাক’—অথচ আমরা আপনার প্রশংসাসহ পবিত্রতা ঘোষণা করি এবং আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করি। ‘আত-তাসবীহ’—আল্লাহকে সমস্ত ত্রুটি, দোষ ও সৃষ্টির সাদৃশ্য থেকে পবিত্র ঘোষণা করা (“লাইসা কামিসলিহি শাই”—আশ-শূরা ১১)। ‘বিহামদিকা’—প্রশংসার সঙ্গে যুক্ত (আল-হামদ—পূর্ণতার গুণাবলি দিয়ে প্রশংসিতের বর্ণনা, ভালোবাসা ও সম্মানসহ)। ‘ওয়া নুকাদ্দিসু লাক’—আর আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করি (আত-তাকদীস—তা‘যীম ও পবিত্রকরণ; ‘আরদুল মুকাদ্দাসা’ তথা পবিত্র ভূমি)। এটি আত্মপ্রশংসা (তাযকিয়া) নয়, বরং কেবল সংবাদ প্রদান (ইখবার)—যা নিছক জ্ঞাপনের জন্য বৈধ, অহংকার বা আত্মগর্বের জন্য নয়।
‘কালা ইন্নী আ‘লামু মা লা তা‘লামূন’—তিনি বললেন, ‘নিশ্চয়ই আমি যা জানি তোমরা তা জানো না।’ আল্লাহ এই প্রজাতি সৃষ্টিতে সেই প্রবল কল্যাণ (আল-মাসলাহাতুর রাজিহা) জানেন, যা তাঁদের উল্লেখিত বিপর্যয়ের ঊর্ধ্বে। ইবনু কাসীর রহ. বলেন: “আমি এই প্রজাতি সৃষ্টিতে যে প্রবল কল্যাণ জানি, তোমরা উল্লিখিত সেই ক্ষতির বিপরীতে তা জানো না।” এতে সাব্যস্ত হয় যে আল্লাহর প্রতিটি কাজে হিকমাত রয়েছে। এখানে একটি সূক্ষ্ম মূলনীতি: ‘দারউল মাফাসিদি মুকাদ্দামুন আলা জালবিল মাসালিহ’ (ক্ষতি প্রতিরোধ কল্যাণ অর্জনের ওপর অগ্রগণ্য), তবে যেখানে কল্যাণ প্রবল (মাসলাহা রাজিহা), সেখানে কাজটি সম্পন্ন হয়। আহলুস সুন্নাহর আকীদা—আল্লাহর সমস্ত কাজ হিকমাতপূর্ণ; হিকমাত কখনো আমাদের কাছে গোপন থাকলেও তার অনুপস্থিতি বোঝায় না।
আদমকে নাম শিক্ষা (২:৩১–৩৩)
وَعَلَّمَ ءَادَمَ ٱلْأَسْمَآءَ كُلَّهَا ثُمَّ عَرَضَهُمْ عَلَى ٱلْمَلَـٰٓئِكَةِ فَقَالَ أَنۢبِـُٔونِى بِأَسْمَآءِ هَـٰٓؤُلَآءِ إِن كُنتُمْ صَـٰدِقِينَ قَالُوا۟ سُبْحَـٰنَكَ لَا عِلْمَ لَنَآ إِلَّا مَا عَلَّمْتَنَآ ۖ إِنَّكَ أَنتَ ٱلْعَلِيمُ ٱلْحَكِيمُ قَالَ يَـٰٓـَٔادَمُ أَنۢبِئْهُم بِأَسْمَآئِهِمْ ۖ فَلَمَّآ أَنۢبَأَهُم بِأَسْمَآئِهِمْ قَالَ أَلَمْ أَقُل لَّكُمْ إِنِّىٓ أَعْلَمُ غَيْبَ ٱلسَّمَـٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضِ وَأَعْلَمُ مَا تُبْدُونَ وَمَا كُنتُمْ تَكْتُمُونَ
“আর তিনি আদমকে সমস্ত নাম শিক্ষা দিলেন, অতঃপর সেগুলো ফেরেশতাদের সামনে উপস্থিত করে বললেন, ‘তোমরা সত্যবাদী হলে এদের নামগুলো আমাকে বলো।’ তারা বলল, ‘আপনি পবিত্র! আপনি আমাদের যা শিখিয়েছেন তা ছাড়া আমাদের কোনো জ্ঞান নেই। নিশ্চয়ই আপনিই সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’ তিনি বললেন, ‘হে আদম, তুমি এদের নামগুলো তাদের জানিয়ে দাও।’ অতঃপর যখন সে তাদের নামগুলো জানিয়ে দিল, তিনি বললেন, ‘আমি কি তোমাদের বলিনি যে, আমি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অদৃশ্য বিষয় জানি, আর তোমরা যা প্রকাশ করো ও যা গোপন করো তাও জানি?’”
‘ওয়া ‘আল্লামা আদামাল আসমাআ কুল্লাহা’—আর তিনি আদমকে সমস্ত নাম শিক্ষা দিলেন। ‘আল-আসমা’ (আলিফ-লামটি ইসতিগরাকের—ব্যাপকতাবাচক)—প্রতিটি বস্তুর নাম ও তার অর্থ। এখান থেকেই ভাষার (লুগা) সূচনা। কতিপয় আলিমের মতে ভাষা মূলত তাওকীফী (আল্লাহপ্রদত্ত): আল্লাহ আদমকে নামসমূহ শিক্ষা দিলেন, আর সেখান থেকেই ভাষার জন্ম, যা পরবর্তীতে আদম-সন্তানদের মধ্যে বিবর্তিত ও বহুধা-বিভক্ত হয়েছে।
‘সুম্মা ‘আরাদাহুম আলাল মালাইকাতি ফাকালা আম্বিঊনী বিআসমাই হাউলাই ইন কুনতুম সাদিকীন’—অতঃপর সেগুলো ফেরেশতাদের সামনে উপস্থিত করে বললেন, ‘তোমরা সত্যবাদী হলে এদের নামগুলো আমাকে বলো।’ ‘আম্বিঊনী’ (আন-নাবা তথা গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ থেকে)। ‘ইন কুনতুম সাদিকীন’—যদি তোমরা (নিজেদের অগ্রগণ্যতার অন্তর্নিহিত ধারণায়) সত্যবাদী হও। আল্লাহ জ্ঞানের মাধ্যমে আদমের মর্যাদা প্রকাশ করলেন।
‘কালূ সুবহানাকা লা ‘ইলমা লানা ইল্লা মা ‘আল্লামতানা ইন্নাকা আনতাল ‘আলীমুল হাকীম’—তারা বলল, ‘আপনি পবিত্র! আপনি যা শিখিয়েছেন তা ছাড়া আমাদের কোনো জ্ঞান নেই। নিশ্চয়ই আপনিই সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’ ফেরেশতারা নিজেদের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেন এবং মানেন যে তাঁদের জ্ঞান কেবল আল্লাহপ্রদত্ত। ‘লা ‘ইলমা লানা’—‘লা’ নাফিয়া লিল-জিনস (সর্বাত্মক অস্বীকার)। ‘ইন্নাকা আনতাল ‘আলীম’—‘আনতা’ দমীর ফাসল, তাকীদ ও হাসরের জন্য। ‘আল-‘আলীম’—বিশাল, সর্বব্যাপী জ্ঞানের অধিকারী (“ওয়াসি‘আ কুল্লা শাইয়িন ‘ইলমা”—ত্বাহা ৯৮; “ওয়া ‘ইনদাহু মাফাতিহুল গায়বি লা ইয়া‘লামুহা ইল্লা হু”—আল-আন‘আম ৫৯)। ‘আল-‘ইলম’ অর্থ—বস্তুকে তার প্রকৃত অবস্থায় নিশ্চিতভাবে অনুধাবন করা (ইদরাকুশ-শাইয়ি আলা মা হুওয়া আলায়হি ইদরাকান জাযিমা)। ‘আল-হাকীম’—প্রজ্ঞাময়, হিকমাতের অধিকারী; এতে অন্তর্ভুক্ত ‘আল-হুকম’ (বিধান/মীমাংসা): হুকমে কাওনী (সৃষ্টিগত ফায়সালা), হুকমে শার‘ঈ (বিধানিক—“ওয়া মান আহসানু মিনাল্লাহি হুকমাল লিকাওমিঁই ইউকিনূন”—আল-মায়িদা ৫০), ও হুকমে জাযাঈ (প্রতিদান—“ইন্নাল্লাহা কাদ হাকামা বায়নাল ‘ইবাদ”—গাফির ৪৮)। আল্লাহর প্রতিটি বিধান ও কাজ হিকমাতপূর্ণ, তা আমরা উপলব্ধি করি বা না করি।
‘কালা ইয়া আদামু আম্বিঅহুম বিআসমাইহিম’—তিনি বললেন, ‘হে আদম, তুমি এদের নামগুলো তাদের জানিয়ে দাও।’ ‘ফালাম্মা আম্বাআহুম বিআসমাইহিম’—আদম সঙ্গে সঙ্গে আনুগত্য ও তৎপরতায় (তাআ ওয়া মুসারা‘আ) জানিয়ে দিল। ‘কালা আলাম আকুল লাকুম ইন্নী আ‘লামু গায়বাস-সামাওয়াতি ওয়াল আরদি ওয়া আ‘লামু মা তুবদূনা ওয়া মা কুনতুম তাকতুমূন’—‘আলাম আকুল লাকুম’—ইসতিফহাম লিত-তাকরীর (নিশ্চিতকরণমূলক প্রশ্ন)। ‘গায়বাস-সামাওয়াতি ওয়াল আরদ’—আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অদৃশ্য বিষয়। ‘মা তুবদূন’—তোমরা যা প্রকাশ করো; ‘ওয়া মা কুনতুম তাকতুমূন’—আর যা গোপন করছিলে—ইবনু কাসীর রহ.-এর মতে এর অন্তর্ভুক্ত ইবলীসের গোপন অহংকার, বিরোধিতা ও কুফর, এবং ফেরেশতাদের অন্তরে নিজেদের অগ্রগণ্যতার ধারণা। আল্লাহ যদি অদৃশ্য জানেন, তবে প্রকাশ্য তো অগ্রাধিকারভাবেই জানেন।
সিজদার নির্দেশ ও ইবলীসের অস্বীকার (২:৩৪)
وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَـٰٓئِكَةِ ٱسْجُدُوا۟ لِـَٔادَمَ فَسَجَدُوٓا۟ إِلَّآ إِبْلِيسَ أَبَىٰ وَٱسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ ٱلْكَـٰفِرِينَ
“আর স্মরণ করো, যখন আমি ফেরেশতাদের বললাম, ‘তোমরা আদমকে সিজদা করো,’ তখন তারা সিজদা করল—ইবলীস ব্যতীত। সে অস্বীকার করল, অহংকার করল এবং কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।”
‘ওয়া ইয কুলনা লিল-মালাইকাতিস-জুদূ লিআদাম’—আর স্মরণ করো, যখন আমি ফেরেশতাদের বললাম, ‘তোমরা আদমকে সিজদা করো।’ এই সিজদা ছিল সম্মান ও অভিবাদনের (তাকরীম ওয়া ইহতিরাম) এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের—আদমের ইবাদত নয়। ‘আস-সুজূদ’ ভাষাগতভাবে—বিনয় ও অবনতি (আয-যুল্লু ওয়াল-খুদূ‘); পরিভাষায় (সালাতের সিজদা)—সাত অঙ্গ (কপাল-নাক, দুই হাত, দুই হাঁটু, দুই পায়ের পাতা) মাটিতে রেখে আল্লাহর প্রতি বিনয় ও সম্মান প্রদর্শন। এখানে এটি আল্লাহর নির্দেশে সম্মানের সিজদা।
‘ফাসাজাদূ’—তখন তারা সিজদা করল; ‘ফা’ তৎক্ষণাৎ (তারা আনুগত্যে দ্রুত অগ্রসর হলো)। ‘ইল্লা ইবলীস’—ইবলীস ব্যতীত। ‘আবা’—সে অস্বীকার করল; ‘ওয়াস-তাকবারা’—এবং অহংকার করল; ‘ওয়া কানা মিনাল কাফিরীন’—এবং কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। ইবলীসের কুফর ছিল কুফরুল ইবা ওয়াল ইসতিকবার (অস্বীকার ও অহংকারের কুফর)।
ইবলীস কি ফেরেশতাদের অন্তর্ভুক্ত ছিল, নাকি জিনদের? আলিমগণ এ নিয়ে আলোচনা করেছেন। বিশুদ্ধ মত (কুরআনের ভাষ্য: “কানা মিনাল জিন্ন”—আল-কাহফ ৫০)—ইবলীস জিন-জাতির অন্তর্ভুক্ত, আগুন থেকে সৃষ্ট (“খুলিকাল জান্নু মিম মারিজিম মিন নার”), ফেরেশতাদের অন্তর্ভুক্ত নয় (যাঁরা নূর থেকে সৃষ্ট)। ফেরেশতাদের প্রতি নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত সে হয়েছিল, কারণ সে তাঁদের সঙ্গে ছিল ও তাঁদের মতোই ইবাদত করত, তাই নির্দেশ তাকেও পরিবেষ্টন করেছিল (ইবনু কাসীর রহ.)। ইবনুল কায়্যিম রহ.-এর সমন্বয়: দুই মত মূলত একই—ইবলীস ফেরেশতাদের সঙ্গে ছিল আকৃতি ও সাহচর্যে, কিন্তু উপাদান ও মূলে তাদের অন্তর্ভুক্ত নয় (তার মূল আগুন, তাঁদের মূল নূর)। হাসান বসরী রহ. বলেন: “মা কানা ইবলীসু মিনাল মালাইকাতি তারফাতা ‘আয়নিন কাত্ত, ওয়া ইন্নাহু লাআসলুল জিন্নি কামা আন্না আদামা আসলুল ইনস”—ইবলীস কখনো এক পলকের জন্যও ফেরেশতা ছিল না; সে জিন-জাতির মূল, যেমন আদম মানব-জাতির মূল। তাই ইসতিসনাটি (ব্যতিক্রম) মুনকাতি‘ (বিচ্ছিন্ন—ইবলীস ফেরেশতাদের জাতিভুক্ত নয়), যেমন ‘জাআল কাওমু ইল্লাল হিমার’।
‘ওয়াস-তাকবারা’—‘তাকাব্বারা’-র চেয়ে অধিক তীব্র; ‘ইসতাকবারা’-য় অতিরিক্ত বর্ণ অর্থের তীব্রতা বোঝায় (যিয়াদাতুল মাবনা তাদুল্লু আলা যিয়াদাতিল মা‘না)। ইবলীসের অহংকার: “কালা আনা খায়রুম মিনহু খালাকতানী মিন নারিওঁ ওয়া খালাকতাহু মিন তীন” (আল-আ‘রাফ ১২)—সে আদমের সৃষ্টি-উপাদান (মাটি)-এর ওপর নিজের উপাদান (আগুন) নিয়ে গর্ব করল। অহংকার (আল-কিবর) কী? নবী ﷺ তা সংজ্ঞায়িত করেছেন: “আল-কিবরু বাতরুল হাক্কি ওয়া গামতুন-নাস” (সহীহ মুসলিম, ইবনু মাসঊদ রা.)—সত্য প্রত্যাখ্যান করা ও মানুষকে হেয় করা। নিজের বংশ বা উৎপত্তির ভিত্তিতে গর্ব—তাকওয়ার ভিত্তিতে নয়—এটিই ইবলীসের পাপের মর্মকথা, যা যুগে যুগে গোত্রপ্রীতি ও জাতিগত অহংকারের রূপ নেয়। আল্লামা সা‘দী রহ. বলেন: এই অস্বীকার ও অহংকার ছিল তার অন্তরে সুপ্ত কুফরেরই ফল; তখনই আল্লাহ ও আদমের প্রতি তার শত্রুতা, কুফর ও অহংকার প্রকাশ পেল। তাই ইবলীস দুটি জিনিস একত্র করল—আল্লাহর নির্দেশ পালন থেকে অস্বীকার, এবং সত্য গ্রহণ ও অনুসরণ থেকে অহংকার।
শিক্ষা
প্রথম শিক্ষা—আল্লাহর কালাম (বাক-গুণ) সাব্যস্ত: তিনি যখন ও যেভাবে চান কথা বলেন; তিনি ফেরেশতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন।
দ্বিতীয় শিক্ষা—নবী ﷺ-এর প্রতি আল্লাহর বিশেষ রুবূবিয়্যাত (রাব্বুকা) সাব্যস্ত, যা তাঁর জন্য সম্মান।
তৃতীয় শিক্ষা—ফেরেশতারা সম্মানিত সৃষ্টি, যাঁরা হিকমাত বোঝার জন্য প্রশ্ন করেন (আপত্তির জন্য নয়); তাঁদের প্রতি বিশ্বাস ঈমানের রুকন, আর তাঁদের বোধশক্তি রয়েছে।
চতুর্থ শিক্ষা—আল্লাহর কাজ সাব্যস্ত: তিনি যখন যা ইচ্ছা করেন (জা‘ইল, ইসতাওয়া)।
পঞ্চম শিক্ষা—সৃষ্টির পূর্বেই ঊর্ধ্বজগতে আদম ও তাঁর বংশধরদের উল্লেখ; আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা ও যমিন আবাদের জন্য খলীফার প্রয়োজন।
ষষ্ঠ শিক্ষা—নিছক সংবাদ প্রদানের উদ্দেশ্যে (অহংকার বা আত্মপ্রশংসার জন্য নয়) নিজের ইবাদত বা কল্যাণকর্ম উল্লেখ করা বৈধ—যেমন ফেরেশতারা বলেছিলেন ‘ওয়া নাহনু নুসাব্বিহু বিহামদিক’। তবে গর্বের জন্য আত্মপ্রশংসা বৈধ নয়: “ফালা তুযাক্কূ আনফুসাকুম” (আন-নাজম ৩২)।
সপ্তম শিক্ষা—খলীফা সৃষ্টিতে নিহিত হিকমাত ও কল্যাণ সম্পর্কে আল্লাহর পূর্ণ জ্ঞান, যা ফেরেশতারা জানতেন না।
অষ্টম শিক্ষা—জ্ঞানের মর্যাদা: আল্লাহ আদমকে নামসমূহ শিক্ষা দিয়ে সম্মানিত করেছেন; জ্ঞানই মর্যাদার মানদণ্ড। মানুষকে নিজের সীমা জানতে হবে (যেমন ফেরেশতারা বলেছিলেন ‘সুবহানাকা লা ‘ইলমা লানা ইল্লা মা ‘আল্লামতানা’)—জ্ঞান ছাড়া ফতোয়ায় তাড়াহুড়া করা যাবে না, আর অজানা বিষয়ে ‘আল্লাহ ভালো জানেন’ বলাই উচিত।
নবম শিক্ষা—আল্লাহর কোনো সৃষ্টি, ফায়সালা বা বিধানের হিকমাত গোপন থাকলে বান্দার কর্তব্য সমর্পণ (তাসলীম), নিজের বুদ্ধির সীমাবদ্ধতা স্বীকার এবং আল্লাহর প্রজ্ঞার প্রতি আস্থা।
দশম শিক্ষা—আল্লাহর অদৃশ্য-জ্ঞান (গায়বাস-সামাওয়াতি ওয়াল আরদ) এবং প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সবকিছুর জ্ঞান সাব্যস্ত; তাই সর্বাবস্থায় মুরাকাবা আবশ্যক।
একাদশ শিক্ষা—আদমকে সিজদা ছিল আল্লাহর নির্দেশে সম্মানের সিজদা, ইবাদত নয়।
দ্বাদশ শিক্ষা—ইবলীস জিন-জাতির অন্তর্ভুক্ত, আগুন থেকে সৃষ্ট; তার কুফর ছিল অস্বীকার ও অহংকারের কুফর। অহংকার হলো সত্য প্রত্যাখ্যান ও মানুষকে হেয় করা; উৎপত্তির ভিত্তিতে গর্ব—তাকওয়ার ভিত্তিতে নয়—ইবলীসেরই পাপ।