সূরা আল-ফাতিহা

কুরআন মাজীদকে পৃষ্ঠা ধরে ধরে অনুধাবন করার এই যাত্রার সূচনা আমরা করছি কুরআনের প্রথম সূরা — সূরা আল-ফাতিহা দিয়ে। ‘ফাতিহা’ শব্দের অর্থ ‘উদ্বোধন’ বা ‘সূচনা’। এটি আল্লাহর কিতাবের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সূরা, যা প্রতিটি সালাতের প্রতিটি রাকআতে আমরা পাঠ করি। আয়াতগুলোর ভেতরে প্রবেশ করার আগে আমরা এই সূরার নাম ও ফযীলত জেনে নেব, তারপর আয়াত ধরে ধরে এর ভেতরে নিহিত দ্বীনের মৌলিক নীতিগুলো অনুধাবন করব। এই তাফসীরের উদ্দেশ্য গভীর বিশ্লেষণ বা আলিমদের মধ্যকার মতপার্থক্যের বিস্তারিত আলোচনা নয়, বরং সালাফ — সাহাবী, তাবিঈ ও প্রথম প্রজন্মের আলিমগণ — যেভাবে আল্লাহর কিতাব বুঝেছেন, সেই আলোকে একটি সামগ্রিক অনুধাবন।

ফাতিহার নাম ও মর্যাদা

সহীহ বুখারীতে সাহাবী আবু সাঈদ ইবনুল মুআল্লা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত একটি হাদীস এই সূরার মর্যাদা তুলে ধরে। তিনি একবার সালাত আদায় করছিলেন, এমন সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে ডাকলেন; নফল সালাত শেষ করতে গিয়ে তাঁর উত্তর দিতে দেরি হলো। পরে নবীজি তাঁকে বললেন, মসজিদ থেকে বের হওয়ার আগেই তিনি তাঁকে কুরআনের সবচেয়ে মহান সূরা শিখিয়ে দেবেন। বের হওয়ার সময় আবু সাঈদ কথাটি মনে করিয়ে দিলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সেই সূরা হলো সূরা আল-ফাতিহা —

هِيَ السَّبْعُ الْمَثَانِي وَالْقُرْآنُ الْعَظِيمُ الَّذِي أُوتِيتُهُ — সহীহ বুখারী

“এটিই সেই সাতটি বারবার পঠিত আয়াত এবং মহান কুরআন, যা আমাকে দেওয়া হয়েছে।”

এই হাদীস থেকে সূরাটির কয়েকটি নাম জানা যায়। একে বলা হয় ‘আস-সাবউল মাসানী’ — সাতটি বারবার পঠিত আয়াত, কারণ প্রতিটি সালাতের প্রতিটি রাকআতে এটি পুনঃপুনঃ পঠিত হয়। একে বলা হয় ‘আল-কুরআনুল আযীম’ — মহান কুরআন, কারণ এটি যেন সমগ্র কুরআনের সারসংক্ষেপ। আরেকটি নাম ‘উম্মুল কিতাব’ বা ‘উম্মুল কুরআন’ — কিতাবের জননী বা মূল। আরবরা কোনো কিছুকে তার শ্রেণির শ্রেষ্ঠ বা মূল উৎস বোঝাতে ‘উম্ম’ শব্দ ব্যবহার করে; যেমন মক্কাকে বলা হয় ‘উম্মুল কুরা’ — জনপদসমূহের জননী, কারণ এটি সকল নগরীর শ্রেষ্ঠ। তেমনি সূরা ফাতিহা আল্লাহর কিতাবের সূরাসমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। তবে কোনো সূরা বা আয়াতকে শ্রেষ্ঠ বলার অর্থ এই নয় যে কুরআনের বাকি অংশের মর্যাদা কমে যায় কিংবা তা উপেক্ষা করা চলে; বরং এর অর্থ, আল্লাহ এই সূরাকে অতিরিক্ত ফযীলত ও বিশেষ গুরুত্ব দান করেছেন।

ফাতিহার আরও ফযীলত

সহীহ মুসলিমে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত হাদীসে এই সূরার নাযিল হওয়ার প্রসঙ্গ এসেছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার জিবরীল আলাইহিস সালামের সঙ্গে ছিলেন; হঠাৎ উপর থেকে এমন এক শব্দ শোনা গেল যা আগে কখনো শোনা যায়নি। জিবরীল আলাইহিস সালাম উপরে তাকিয়ে বললেন, আজ আকাশের এমন একটি দরজা খোলা হয়েছে যা এর আগে কখনো খোলা হয়নি। সেই দরজা দিয়ে একজন ফেরেশতা অবতরণ করলেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দুটি আলোর সুসংবাদ দিলেন, যা তাঁর আগে আর কোনো নবীকে দেওয়া হয়নি — একটি সূরা আল-ফাতিহা, আর অন্যটি সূরা আল-বাকারার শেষ আয়াতগুলো। এগুলো আল্লাহ বিশেষভাবে তাঁর নবীকে, আর সেই সূত্রে এই উম্মতকে দান করেছেন।

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে সহীহ মুসলিমে বর্ণিত এক হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন, তিনি সালাত — অর্থাৎ সূরা ফাতিহা — কে দুই ভাগে ভাগ করেছেন: এক ভাগ তাঁর জন্য, আর এক ভাগ তাঁর বান্দার জন্য। বান্দা যখন বলে ‘আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন’, আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে। বান্দা যখন বলে ‘আর-রাহমানির রাহীম’, আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা আমার গুণকীর্তন করেছে। বান্দা যখন বলে ‘মালিকি ইয়াওমিদ্দীন’, আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা আমার মহিমা ঘোষণা করেছে। বান্দা যখন বলে ‘ইয়্যাকা নাবুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন’, আল্লাহ বলেন, এটি আমার ও আমার বান্দার মধ্যকার বিষয়, আর আমার বান্দা যা চাইবে তা-ই সে পাবে। আর বান্দা যখন সূরার বাকি অংশে সরল পথের প্রার্থনা করে, আল্লাহ বলেন, এটিও আমার ও আমার বান্দার মধ্যকার বিষয়, আর আমার বান্দা যা চেয়েছে তা-ই সে পাবে। কাজেই আমরা যতবার ফাতিহা পাঠ করি, ততবার আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এভাবে সাড়া দেন।

এই সূরার আরেকটি ফযীলত হলো এতে রয়েছে রোগমুক্তি ও আরোগ্য। সহীহ বুখারীতে বর্ণিত এক ঘটনায় কয়েকজন সাহাবী সফরে বেরিয়ে রাতে এক জনপদে পৌঁছে আতিথেয়তা চাইলেন, কিন্তু সেই জনপদের লোকেরা তা প্রত্যাখ্যান করল। এরপর সেই জনপদের সরদারকে বিষাক্ত কিছু দংশন করলে সে অসুস্থ হয়ে পড়ল; নানা চিকিৎসা করেও কোনো ফল হলো না। তখন তারা এসে সাহাবীদের কাছে সাহায্য চাইল। একজন সাহাবী বললেন, তোমরা আতিথেয়তা প্রত্যাখ্যান করেছিলে, তাই বিনিময় ছাড়া আমি রাজি নই। বিনিময়ে একপাল ছাগলের কথা স্থির হলে সেই সাহাবী তার উপর সূরা ফাতিহা পাঠ করলেন, আর আল্লাহর অনুমতিতে সে সুস্থ হয়ে গেল। পরে তাঁরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে বিষয়টি যাচাই করতে গেলে নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কীভাবে জানলে যে এটি ঝাড়ফুঁকের উপযোগী? এরপর তিনি সেই বিনিময় ভাগ করে নিতে বললেন এবং নিজের জন্যও একটি অংশ রাখতে বললেন। লক্ষণীয়, এই ঘটনায় যার উপর পাঠ করা হয়েছিল সে একজন অমুসলিম ছিল; তাহলে যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর কিতাবে বিশ্বাস রাখে এবং কুরআনের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য কামনা করে, তার জন্য সূরা ফাতিহা নিঃসন্দেহে আরও বড় শিফা, বরকত ও রহমত।

তিলাওয়াতের আগে: আশ্রয় প্রার্থনা ও বিসমিল্লাহ

কুরআন তিলাওয়াত শুরু করার আগে আমরা আল্লাহর কাছে শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করি — ‘আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম’। এটি আল্লাহরই নির্দেশ:

فَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْآنَ فَاسْتَعِذْ بِاللّٰهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ — সূরা আন-নাহল, ১৬:৯৮

“অতএব যখন তুমি কুরআন পাঠ করবে, তখন বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করো।”

সূরার শুরুতে হোক বা মাঝপথে, তিলাওয়াতের আগে এই আশ্রয় প্রার্থনা করা নির্দেশিত। এরপর অত্যন্ত উত্তম হলো বিসমিল্লাহ পাঠ করা, যা সূরা আত-তাওবা ছাড়া কুরআনের প্রতিটি সূরার শুরুতে রয়েছে।

بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ — সূরা আল-ফাতিহা, ১:১

“পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে।”

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর — ১:২

الْحَمْدُ لِلّٰهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ — সূরা আল-ফাতিহা, ১:২

“সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সকল সৃষ্টিজগতের প্রতিপালক।”

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কুরআন শুরু করেছেন প্রশংসার এই বাণী দিয়ে। আল্লাহর প্রশংসা করার অর্থ তাঁর মহিমার উপযুক্ত প্রতিটি উত্তম গুণে তাঁকে বর্ণনা করা, তাঁর পরিপূর্ণতা স্বীকার করা, এবং ভালোবাসা, বিনয় ও দাসত্বের অনুভূতি নিয়ে তাঁকে স্মরণ করা। এটিই ‘হামদ’। আল্লাহ কুরআনের সূচনাতেই যেন আমাদের শিক্ষা দিচ্ছেন, আমরা যেন অবিরাম তাঁর প্রশংসাকারী হই। জান্নাতবাসীরাও জান্নাতে প্রবেশের পর তাদের সর্বশেষ আহ্বান হবে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ — সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। তিনি ‘রব’ — মালিক, প্রতিপালক, লালনকর্তা, পরিচর্যাকারী, সংশোধনকারী, এবং একমাত্র তিনিই ইবাদতের যোগ্য। তিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন, রূপ দিয়েছেন, জীবন দিয়েছেন, রিযিক দেন, জীবন-মৃত্যু ও ক্ষতি-কল্যাণের ফয়সালা করেন। আর ‘আলামীন’ অর্থ আল্লাহ ছাড়া সবকিছু — সমগ্র সৃষ্টিজগত; কারণ আল্লাহ স্রষ্টা, আর তিনি ছাড়া সবই তাঁর সৃষ্টি।

পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু — ১:৩

الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ — সূরা আল-ফাতিহা, ১:৩

“যিনি পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু।”

কুরআনের অন্যতম প্রধান বিষয় হলো আল্লাহর নাম ও গুণাবলি, কারণ আল্লাহ চান আমরা যেন তাঁকে চিনি। আর আমরা আমাদের রবকে চিনি তাঁর নিজের বর্ণনার মাধ্যমেই। তাই আমরা যত বেশি আল্লাহর নাম ও গুণ সম্পর্কে জানি, তত বেশি তাঁর ইবাদত করি, তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও ঈমান বাড়ে। আল্লাহর যে গুণ কুরআনে সবচেয়ে বেশি উল্লেখিত, তা হলো তাঁর রহমত। তাঁর রহমত এক ধরনের ব্যাপক — সৃষ্টির সবকিছুই এর অংশীদার: মুসলিম-অমুসলিম, মানুষ-জিন, পশু-উদ্ভিদ, সবই এই সাধারণ রহমতে উপকৃত। আবার তাঁর রহমতের একটি বিশেষ রূপ রয়েছে, যা কেবল মুমিনদের জন্য — এই দুনিয়ায়, আর সবচেয়ে বেশি আখিরাতে। এজন্যই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর রহমত ছাড়া কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না; এমনকি তিনি নিজেও নন, যদি না আল্লাহ তাঁকে তাঁর রহমতে আচ্ছন্ন করেন। আর আল্লাহর সবচেয়ে বড় রহমতের একটি — যা তিনি সামনের আয়াতগুলোতেও ইঙ্গিত করবেন — হলো তিনি আমাদের হিদায়াত দান করেছেন, ইসলামের পথ দেখিয়েছেন, তাঁর একত্বে বিশ্বাস, তাঁর একক ইবাদত এবং কুরআনকে পথনির্দেশক হিসেবে গ্রহণের তাওফীক দিয়েছেন।

বিচার দিনের মালিক — ১:৪

مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ — সূরা আল-ফাতিহা, ১:৪

“যিনি বিচার দিনের মালিক।”

দুনিয়ায় নানা রাজা-বাদশাহ ও নেতা রয়েছে; তাদের কেউ কেউ মনে করে তারা অনেক কিছুর মালিক বা তাদের হাতে নিয়ন্ত্রণ আছে, এবং একটি সীমিত অর্থে তা সত্যও। কিন্তু সেই কর্তৃত্ব সর্বদাই সীমাবদ্ধ, ক্ষণস্থায়ী ও দুর্বল। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কর্তৃত্ব, রাজত্ব ও সার্বভৌমত্ব প্রতিটি দিক থেকে পরিপূর্ণ। বিচার দিনে তিনি ছাড়া আর কোনো রাজা, কোনো নেতা, কোনো মালিক থাকবে না। সেটিই প্রকৃত রাজত্ব — আখিরাতের রাজত্ব, যেখানে প্রকৃত মালিকানা ও কর্তৃত্ব প্রকাশ পাবে। আল্লাহ কুরআনের অন্যত্র জানিয়েছেন, সেদিন জিজ্ঞাসা করা হবে — আজ রাজত্ব কার? উত্তর আসবে, একক ও পরাক্রমশালী আল্লাহর। লক্ষণীয়, আল্লাহ তাঁর রহমতের বর্ণনার ঠিক পরেই এই মালিকানার কথা যুক্ত করেছেন।

কেবল তোমারই ইবাদত, কেবল তোমারই সাহায্য — ১:৫

إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ — সূরা আল-ফাতিহা, ১:৫

“আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি এবং কেবল তোমারই কাছে সাহায্য চাই।”

আল্লাহর প্রশংসা, তাঁর রুবূবিয়্যাত (প্রভুত্ব), নাম ও গুণাবলি জানার পর আসে ইবাদতের ঘোষণা। এই সূরা যেসব মৌলিক নীতির কথা বলে, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো তাওহীদ — আল্লাহকে তাঁর প্রভুত্বে, তাঁর ইবাদতে এবং তাঁর নাম ও গুণে একক জানা ও মানা। সাধারণত আমরা বলি ‘আমরা তোমারই ইবাদত করি’; কিন্তু এখানে আল্লাহ কর্মের বদলে কর্মটির লক্ষ্যকে — অর্থাৎ নিজেকে — আগে এনে বলেছেন ‘ইয়্যাকা’ — কেবল তোমারই। এই বিন্যাস একত্ব ও একনিষ্ঠতার উপর জোর দেয়। পৃথিবীতে অনেকে বহু উপাস্যের ইবাদত করে; কেউ কেউ আল্লাহর ইবাদতের সঙ্গে অন্যদেরও শরিক করে। কিন্তু আমাদের দ্বীনের ভিত্তি হলো একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করা — দুআ কেবল আল্লাহর কাছে, সাহায্য কেবল আল্লাহর কাছে, কুরবানি কেবল আল্লাহর জন্য; জিহ্বার ইবাদত, অঙ্গের ইবাদত কিংবা অন্তরের ইবাদত — আল্লাহর উপর ভরসা, তাঁর কাছে চিরস্থায়ী প্রতিদানের আশা, তাঁর শাস্তির ভয় — সব ধরনের ইবাদতই একমাত্র আল্লাহর জন্য নিবেদিত। এরপর আসে সাহায্য প্রার্থনা। এই বিন্যাসই দেখায়, দ্বিতীয় অংশটি (সাহায্য চাওয়া) প্রথম অংশটি (ইবাদত) বাস্তবায়িত হওয়ার পরই আসে; বান্দা যখন তার জীবন আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যে সমর্পণ করে, তখন সে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে পারে, আর আল্লাহ তাকে তাঁর সহায়তা দান করেন। এটি যেন আল্লাহ ও বান্দার মধ্যকার এক অঙ্গীকার।

সরল পথের দিশা — ১:৬

اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ — সূরা আল-ফাতিহা, ১:৬

“আমাদের সরল পথ দেখাও।”

এটি কুরআনে উল্লিখিত প্রথম দুআ, এবং আমরা প্রতিদিন সবচেয়ে বেশি যে দুআ পড়ি তা-ও এটি — অন্তত সতেরো বার। আমরা আল্লাহর কাছে হিদায়াত চাই। এই হিদায়াত দুই প্রকার। প্রথমটি প্রাথমিক হিদায়াত — ইসলাম, কুরআন ও সুন্নাহ গ্রহণের হিদায়াত। কিন্তু কেউ যখন হিদায়াত পেয়ে গেছেন, তখন বারবার এই দুআ পড়ার অর্থ কী? তখন এটি হয়ে ওঠে অবিচলতার দুআ — হে আল্লাহ, এই সরল পথে আমাদের অবিচল ও দৃঢ় রাখুন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রী উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, নবীজি সবচেয়ে বেশি কোন দুআ করতেন। তিনি বললেন, তাঁর সবচেয়ে বেশি করা দুআগুলোর একটি ছিল —

يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَىٰ دِينِكَ

“হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী, আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর অবিচল রাখুন।”

কুরআন ও সুন্নাহর মধ্যে কোনো বিরোধ নেই; সুন্নাহ কুরআনেরই ব্যাখ্যা। তাই আল্লাহ কুরআনে যা গুরুত্ব দিয়েছেন, নবীজিও সুন্নাহতে প্রায়ই তার উপর জোর দিয়েছেন। আমরা প্রত্যেকেই প্রতিদিন এই হিদায়াত ও অবিচলতার মুখাপেক্ষী, কারণ কেউ কেউ আজ মুসলিম হলেও ইসলামের উপর মৃত্যুবরণ না-ও করতে পারে — আল্লাহ আমাদের এ থেকে রক্ষা করুন। এজন্যই জান্নাতবাসীরা জান্নাতে প্রবেশের সময় আল্লাহর প্রশংসায় বলবে, সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি আমাদের হিদায়াত দিয়েছেন; আল্লাহর হিদায়াত না হলে আমরা কখনো পথ পেতাম না।

যাদের প্রতি অনুগ্রহ করা হয়েছে — ১:৭

صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ — সূরা আল-ফাতিহা, ১:৭

“তাদের পথ, যাদের প্রতি তুমি অনুগ্রহ করেছ; তাদের পথ নয়, যারা তোমার ক্রোধের শিকার হয়েছে, আর নয় পথভ্রষ্টদের পথ।”

আমরা যে সরল পথের কামনা করি, সেটি হলো কুরআন ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহর পথ। নবীজি একদিন মাটিতে একটি সোজা রেখা টেনে বললেন, এটিই সেই সরল পথ যা আল্লাহর দিকে নিয়ে যায়; এরপর তিনি ডানে-বাঁয়ে কয়েকটি রেখা টেনে বললেন, এগুলো সেই পথ যা সোজা পথ থেকে সরিয়ে বিপথে নিয়ে যায়। যাদের প্রতি অনুগ্রহ করা হয়েছে, তারা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণকারী: আল্লাহ যা আদেশ করেন তারা তা পালন করে, যা নিষেধ করেন তা থেকে দূরে থাকে, আর দ্বীন সম্পর্কে ক্রমাগত জেনে সেই পথে অবিচল থাকার চেষ্টা করে। অন্যদিকে, কিছু তাফসীরকার বলেছেন, ‘যারা ক্রোধের শিকার হয়েছে’ তারা এমন লোক যাদের জ্ঞান আছে কিন্তু তারা সে অনুযায়ী আমল করে না — তারা হালাল-হারাম ও আল্লাহর আদেশ জানে, তবু তা উপেক্ষা করে নিজেদের খেয়ালখুশির পথ ধরে। আর ‘পথভ্রষ্টরা’ এর বিপরীত: তারা কোনো জ্ঞান ছাড়াই, অজ্ঞতার ভিত্তিতে ইবাদত করে; আল্লাহ কী চান তা না জেনেই ইবাদতে লিপ্ত হয়। উভয় দলই বিপথগামী — একদল জেনেও উপেক্ষা করে, আরেক দল না জেনেই আমল করে। এখান থেকেই আসে তৃতীয় নীতি: সঠিক পথে চলতে হলে জ্ঞান ও আমল — দুটোই প্রয়োজন।

শিক্ষা

সূরা আল-ফাতিহা সংক্ষিপ্ত হলেও এতে দ্বীনের মৌলিক ভিত্তিগুলো নিহিত। প্রথম নীতি তাওহীদ — আল্লাহকে তাঁর প্রভুত্ব, নাম ও গুণাবলির মাধ্যমে চেনা এবং একমাত্র তাঁরই ইবাদত করা; এজন্যই আল্লাহ ইবাদতের আয়াতের আগে নিজের প্রশংসা, রুবূবিয়্যাত ও গুণাবলির পরিচয় দিয়েছেন। দ্বিতীয় নীতি হলো সেই সরল পথ অনুসরণ করা, যা কুরআন ও সুন্নাহর পথ। আর তৃতীয় নীতি হলো, এই সরল পথে চলার জন্য জ্ঞান ও আমল উভয়ই অপরিহার্য — কেবল জেনে উপেক্ষা করা কিংবা না জেনে আমল করা, কোনোটিই যথেষ্ট নয়। সালাতে ফাতিহা পাঠের পর আমরা বলি ‘আমীন’ — অর্থাৎ, হে আল্লাহ, আমাদের এই দুআ কবুল করুন। এভাবে দিনে বহুবার আমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা, রহমত, হিদায়াত ও অবিচলতা প্রার্থনা করি। সমগ্র কুরআনের সারমর্মকে ধারণ করে বলেই এই সূরা প্রতিটি সালাতে পঠিত হয়।