কুরআনে বর্ণিত ‘কাযম’ (Kaẓm) শব্দটির মূল অর্থ এবং এর গভীর তাৎপর্য নিচে সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হলো:
১. মূল অর্থ: ভেতরে আটকে রাখা বা মুখ বন্ধ করা
আরবিতে ক-য-ম (ك ظ م) মূল ধাতুর প্রধান অর্থ হলো কোনো কিছু পূর্ণ অবস্থায় ভেতরে আটকে রাখা বা কোনো কিছুর মুখ এমনভাবে বন্ধ করে দেওয়া যাতে ভেতরের জিনিস বাইরে বের হতে না পারে ।
আরবরা এই শব্দটি বিভিন্নভাবে ব্যবহার করত:
- পানির মশক: যখন একটি চামড়ার থলে বা মশক পানিতে ভরে তার মুখ শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হয়।
- উটের জাবর কাটা: উট যখন ভয় বা চাপের কারণে জাবর কাটা বন্ধ করে খাবার পেটের ভেতরে আটকে রাখে ।
- শ্বাসনালী: গলার সেই অংশ যা শ্বাস-প্রশ্বাসে পূর্ণ থাকে ।
সবগুলো উদাহরণেই একটি সাধারণ ছবি ফুটে ওঠে: কোনো কিছু কানায় কানায় পূর্ণ এবং তা শক্তভাবে আটকে রাখা হয়েছে ।
কুরআনের উদাহরণসমূহ
কুরআনে মোট ৬টি জায়গায় এই মূল শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যা থেকে আমরা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাই:
- আরবি: ﴿وَٱلۡكَـٰظِمِینَ ٱلۡغَیۡظَ﴾
- অনুবাদ: “…এবং যারা নিজেদের রাগকে চেপে রাখে (Restrain their anger)” ।
- আরবি: ﴿وَٱبۡیَضَّتۡ عَیۡنَاهُ مِنَ ٱلۡحُزۡنِ فَهُوَ كَظِیمٌ﴾
- অনুবাদ: “…এবং শোকে তার দুই চোখ সাদা হয়ে গিয়েছিল, আর তিনি ছিলেন শোক সংবরণকারী ।
- শিক্ষা: ইয়াকুব (আ.) তাঁর প্রচণ্ড দুঃখ মানুষের কাছে প্রকাশ না করে নিজের ভেতরেই চেপে রেখেছিলেন এবং আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করেছিলেন ।
- আরবি: ﴿وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُم بِٱلۡأُنثَىٰ ظَلَّ وَجۡهُهُۥ مُسۡوَدࣰّا وَهُوَ كَظِیمٌ﴾
- অনুবাদ: “যখন তাদের কাউকে কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার মুখ কালো হয়ে যায় এবং সে অসহ্য মনস্তাপে ভোগে।
- আরবি: ﴿وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُم بِمَا ضَرَبَ لِلرَّحۡمَٰنِ مَثَلࣰا ظَلَّ وَجۡهُهُۥ مُسۡوَدࣰّا وَهُوَ كَظِیمٌ﴾
- অনুবাদ: “যখন তাদের কাউকে সেই সন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয় যা সে রহমানের প্রতি আরোপ করে, তখন তার মুখ কালো হয়ে যায় এবং সে ক্ষোভে ফেটে পড়ে ।
- আরবি: ﴿وَأَنذِرۡهُمۡ یَوۡمَ ٱلۡـَٔازِফَةِ إِذِ ٱلۡقُلُوبُ لَدَى ٱلۡحَنَاجِرِ كَـٰظِمِینَ﴾
- অনুবাদ: “আর আপনি তাদেরকে আসন্ন দিন (কিয়ামত) সম্পর্কে সতর্ক করুন, যখন প্রাণ কণ্ঠাগত হবে, তারা হবে নির্বাক বা আতঙ্কিত।
- শিক্ষা: এখানে মানুষের হৃদয়ে ভয় এত বেশি পূর্ণ হবে যে তা গলার কাছে চলে আসবে, কিন্তু তারা তা প্রকাশ করতে বা তা থেকে মুক্তি পেতে পারবে না [৬], [৭]।
- ইউনুস (আ.)-এর অবস্থা : মাছের পেটে থাকাকালীন হযরত ইউনুস (আ.) প্রচণ্ড মর্মপীড়ায় ছিলেন। কুরআনে তাঁকে ‘মাকযুম’ (makẓūm) বলা হয়েছে, যার অর্থ তিনি পরিস্থিতির চাপে বা চরম দুঃখে একদম চারপাশ থেকে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন ।
- আরবি: ﴿وَلَا تَكُن كَصَاحِبِ ٱلۡحُوتِ إِذۡ نَادَىٰ وَهُوَ مَكۡظُومٌ﴾
- অনুবাদ: “এবং আপনি মাছের সাথির (ইউনুস আ.) মতো হবেন না, যখন তিনি কাতর অবস্থায় ডাক দিয়েছিলেন” ।
মূল শিক্ষা
‘কাযম’-এর মূল শিক্ষা হলো নিয়ন্ত্রণ ।
১. যখন আপনি আল্লাহর জন্য সচেতনভাবে আপনার ক্ষোভ বা আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করেন, তখন আপনি প্রশংসিত হন (যেমন: রাগ নিয়ন্ত্রণ)।
২. আবার কখনো কখনো মানুষ দুঃখ বা ভয়ে এত বেশি পূর্ণ হয়ে যায় যে সে নিজেই সেই আবেগের কাছে বন্দি হয়ে পড়ে (যেমন: কিয়ামতের ভয় বা মাছের পেটে ইউনুস আ.-এর অবস্থা)।
সহজ কথায়, কাযম হলো একটি পূর্ণ পাত্রের মুখ বন্ধ রাখার মতো অবস্থা—তা হতে পারে ধৈর্যের সাথে স্বেচ্ছায় অথবা পরিস্থিতির চাপে বাধ্য হয়ে ।