Taqwa

কুরআনে বর্ণিত ‘কাযম’ (Kaẓm) শব্দটির মূল অর্থ এবং এর গভীর তাৎপর্য নিচে সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হলো:

১. মূল অর্থ: ভেতরে আটকে রাখা বা মুখ বন্ধ করা

আরবিতে ক-য-ম (ك ظ م) মূল ধাতুর প্রধান অর্থ হলো কোনো কিছু পূর্ণ অবস্থায় ভেতরে আটকে রাখা বা কোনো কিছুর মুখ এমনভাবে বন্ধ করে দেওয়া যাতে ভেতরের জিনিস বাইরে বের হতে না পারে ।

আরবরা এই শব্দটি বিভিন্নভাবে ব্যবহার করত:

  • পানির মশক: যখন একটি চামড়ার থলে বা মশক পানিতে ভরে তার মুখ শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হয়।
  • উটের জাবর কাটা: উট যখন ভয় বা চাপের কারণে জাবর কাটা বন্ধ করে খাবার পেটের ভেতরে আটকে রাখে ।
  • শ্বাসনালী: গলার সেই অংশ যা শ্বাস-প্রশ্বাসে পূর্ণ থাকে ।

সবগুলো উদাহরণেই একটি সাধারণ ছবি ফুটে ওঠে: কোনো কিছু কানায় কানায় পূর্ণ এবং তা শক্তভাবে আটকে রাখা হয়েছে

 কুরআনের উদাহরণসমূহ

কুরআনে মোট ৬টি জায়গায় এই মূল শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যা থেকে আমরা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাই:

১.প্রশংসনীয় রাগ নিয়ন্ত্রণ (৩:১৩৪): আল্লাহ সেই মুমিনদের প্রশংসা করেছেন যারা তাদের রাগ চেপে রাখে (al-kāẓimīn)। এখানে ব্যক্তি তার রাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তা প্রকাশ করে না । এখানে ব্যক্তি তার আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণকারী বা ‘মালিক’ হিসেবে কাজ করে
  • আরবি: ﴿وَٱلۡكَـٰظِمِینَ ٱلۡغَیۡظَ﴾
  • অনুবাদ: “…এবং যারা নিজেদের রাগকে চেপে রাখে (Restrain their anger)” ।
২.মর্যাদাপূর্ণ শোক (১২:৮৪): হযরত ইয়াকুব (আ.) তাঁর পুত্র ইউসুফ (আ.)-এর বিরহে শোকে কাতর ছিলেন কিন্তু তিনি তাঁর দুঃখ মানুষের কাছে প্রকাশ না করে নিজের ভেতরে চেপে রেখেছিলেন। 
  • আরবি: ﴿وَٱبۡیَضَّتۡ عَیۡنَاهُ مِنَ ٱلۡحُزۡنِ فَهُوَ كَظِیمٌ﴾
  • অনুবাদ: “…এবং শোকে তার দুই চোখ সাদা হয়ে গিয়েছিল, আর তিনি ছিলেন শোক সংবরণকারী  ।
  • শিক্ষা: ইয়াকুব (আ.) তাঁর প্রচণ্ড দুঃখ মানুষের কাছে প্রকাশ না করে নিজের ভেতরেই চেপে রেখেছিলেন এবং আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করেছিলেন ।
৩.নিন্দনীয় রাগ (১৬:৫৮, ৪৩:১৭): প্রাচীন আরবরা কন্যাসন্তান হওয়ার খবর শুনলে রাগে ও দুঃখে কালো হয়ে যেত এবং সেই ক্ষোভ ভেতরে চেপে রাখত। এখানে একই শব্দ (kaẓīm) ব্যবহৃত হয়েছে কিন্তু এটি একটি মন্দ গুণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
  • আরবি: ﴿وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُم بِٱلۡأُنثَىٰ ظَلَّ وَجۡهُهُۥ مُسۡوَدࣰّا وَهُوَ كَظِیمٌ﴾
  • অনুবাদ: “যখন তাদের কাউকে কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার মুখ কালো হয়ে যায় এবং সে অসহ্য মনস্তাপে ভোগে।
৪. মুশরিকদের বৈপরীত্য (সূরা আয-যুখরুফ ৪৩:১৭):
মুশরিকরা নিজেরা যা ঘৃণা করত, তা-ই আল্লাহর প্রতি আরোপ করত—এই ভণ্ডামির বর্ণনা এখানে এসেছে।
  • আরবি: ﴿وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُم بِمَا ضَرَبَ لِلرَّحۡمَٰنِ مَثَلࣰا ظَلَّ وَجۡهُهُۥ مُسۡوَدࣰّا وَهُوَ كَظِیمٌ﴾
  • অনুবাদ: “যখন তাদের কাউকে সেই সন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয় যা সে রহমানের প্রতি আরোপ করে, তখন তার মুখ কালো হয়ে যায় এবং সে ক্ষোভে ফেটে পড়ে ।
৫.কিয়ামত দিবসের আতঙ্ক (৪০:১৮): বিচার দিবসে মানুষের হৃদয় ভয়ে গলার কাছে চলে আসবে। তারা প্রচণ্ড আতঙ্কে থাকবে কিন্তু সেই ভয় প্রকাশ করতে বা তা থেকে মুক্তি পেতে পারবে না ।বিচার দিবসের ভয়াবহতার বর্ণনা দিতে গিয়ে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।
  • আরবি: ﴿وَأَنذِرۡهُمۡ یَوۡمَ ٱلۡـَٔازِফَةِ إِذِ ٱلۡقُلُوبُ لَدَى ٱلۡحَنَاجِرِ كَـٰظِمِینَ﴾
  • অনুবাদ: “আর আপনি তাদেরকে আসন্ন দিন (কিয়ামত) সম্পর্কে সতর্ক করুন, যখন প্রাণ কণ্ঠাগত হবে, তারা হবে নির্বাক বা আতঙ্কিত।
  • শিক্ষা: এখানে মানুষের হৃদয়ে ভয় এত বেশি পূর্ণ হবে যে তা গলার কাছে চলে আসবে, কিন্তু তারা তা প্রকাশ করতে বা তা থেকে মুক্তি পেতে পারবে না [৬], [৭]।
৬. মাছের পেটে হযরত ইউনুস (আ.) (সূরা আল-কালাম ৬৮:৪৮)
ইউনুস (আ.)-এর চরম দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থার বর্ণনা এখানে দেওয়া হয়েছে।
  • ইউনুস (আ.)-এর অবস্থা : মাছের পেটে থাকাকালীন হযরত ইউনুস (আ.) প্রচণ্ড মর্মপীড়ায় ছিলেন। কুরআনে তাঁকে ‘মাকযুম’ (makẓūm) বলা হয়েছে, যার অর্থ তিনি পরিস্থিতির চাপে বা চরম দুঃখে একদম চারপাশ থেকে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন ।
  • আরবি: ﴿وَلَا تَكُن كَصَاحِبِ ٱلۡحُوتِ إِذۡ نَادَىٰ وَهُوَ مَكۡظُومٌ﴾
  • অনুবাদ: “এবং আপনি মাছের সাথির (ইউনুস আ.) মতো হবেন না, যখন তিনি কাতর অবস্থায় ডাক দিয়েছিলেন” ।

মূল শিক্ষা

‘কাযম’-এর মূল শিক্ষা হলো নিয়ন্ত্রণ

১. যখন আপনি আল্লাহর জন্য সচেতনভাবে আপনার ক্ষোভ বা আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করেন, তখন আপনি প্রশংসিত হন (যেমন: রাগ নিয়ন্ত্রণ)।

২. আবার কখনো কখনো মানুষ দুঃখ বা ভয়ে এত বেশি পূর্ণ হয়ে যায় যে সে নিজেই সেই আবেগের কাছে বন্দি হয়ে পড়ে (যেমন: কিয়ামতের ভয় বা মাছের পেটে ইউনুস আ.-এর অবস্থা)।

সহজ কথায়, কাযম হলো একটি পূর্ণ পাত্রের মুখ বন্ধ রাখার মতো অবস্থা—তা হতে পারে ধৈর্যের সাথে স্বেচ্ছায় অথবা পরিস্থিতির চাপে বাধ্য হয়ে