পূর্ববর্তী আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেছিলেন যে তিনি উপমার দ্বারা কেবল ফাসিকদেরই পথভ্রষ্ট করেন। এই আয়াতে সেই ফাসিকদের তিনটি বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হচ্ছে—তারা আল্লাহর অঙ্গীকার ভঙ্গ করে, আল্লাহ যা জোড়া রাখতে আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে, এবং জমিনে বিপর্যয় সৃষ্টি করে। অতঃপর আল্লাহ সরাসরি অস্বীকারকারীদের সম্বোধন করে তাদের সৃষ্টি, মৃত্যু ও পুনরুত্থানের কথা স্মরণ করিয়ে দেন, এবং জমিন ও আসমানের সৃষ্টিতে তাঁর অপার ক্ষমতা ও জ্ঞানের প্রমাণ তুলে ধরেন।

আহদ ভঙ্গ: ফাসিকের প্রথম বৈশিষ্ট্য

الَّذِينَ يَنقُضُونَ عَهْدَ اللَّهِ مِن بَعْدِ مِيثَاقِهِ وَيَقْطَعُونَ مَا أَمَرَ اللَّهُ بِهِ أَن يُوصَلَ وَيُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ ۚ أُولَٰئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ

“যারা আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার তা দৃঢ় করার পর ভঙ্গ করে, আল্লাহ যা জোড়া রাখতে আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে, এবং জমিনে বিপর্যয় সৃষ্টি করে—তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।” (সূরা আল-বাকারা, ২ঃ২৭)

“ইয়ানকুদূনা” শব্দটি নূন-কাফ-দোয়াদ ধাতু থেকে; “নাকদ” অর্থ ভাঙা, যা “ইবরাম” (দৃঢ় করা, গিঁট বাঁধা)-এর বিপরীত। নাকদ হলো দৃঢ়ভাবে গড়া বা বাঁধা কোনো কিছুকে ভেঙে ফেলা বা খুলে ফেলা—দালানের নাকদ মানে তা ভেঙে ফেলা, আর অঙ্গীকারের নাকদ মানে তার বিরুদ্ধে গিয়ে তা ভঙ্গ করা। “আহদ” (আইন-হা-দাল) অর্থ এমন প্রতিশ্রুতি, যা পূরণের নিয়তে করা হয় এবং যা রক্ষা করা কর্তব্য।

এই “আহদুল্লাহ” বা আল্লাহর অঙ্গীকার বলতে সূরা আল-আরাফের সেই মীসাককে বোঝানো হয়েছে:

وَإِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِن بَنِي آدَمَ مِن ظُهُورِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَأَشْهَدَهُمْ عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ ۖ قَالُوا بَلَىٰ

“আর স্মরণ করো, যখন তোমার রব আদম-সন্তানদের পিঠ থেকে তাদের বংশধরদের বের করলেন এবং তাদের নিজেদের সম্পর্কে সাক্ষী করলেন—আমি কি তোমাদের রব নই? তারা বলল, হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিলাম।” (সূরা আল-আরাফ, ৭ঃ১৭২)

দুনিয়ায় আসার আগে প্রত্যেক মানুষের কাছ থেকে এই অঙ্গীকার নেওয়া হয়েছিল, যেখানে সবাই আল্লাহর একত্ব স্বীকার করেছিল। “মিন বাদি মীসাকিহি”—তা দৃঢ় করার পর। “মীসাক” শব্দটি ওয়াও-সা-কাফ ধাতু থেকে; “ওয়াসাকা” অর্থ দৃঢ় করা। মীসাক বলতে এমন অঙ্গীকার বোঝায় যা শপথের মাধ্যমে আরও দৃঢ় করা হয়। এই অঙ্গীকার দুনিয়ায় দৃঢ় হয়েছে যখন মানুষ “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” স্বীকার করেছে। ফাসিকরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের প্রতি অবিশ্বাসের মাধ্যমে এই দৃঢ় অঙ্গীকারই ভঙ্গ করে।

আল্লাহ যা জোড়া রাখতে বলেছেন তা ছিন্ন করা

দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য—”ওয়া ইয়াকতাউনা মা আমারাল্লাহু বিহি আন ইউসাল।” “ইয়াকতাউনা” (কাফ-তোয়া-আইন) অর্থ কেটে ফেলা, ছিন্ন করা; “ইউসাল” ওয়াও-সোয়াদ-লাম ধাতু থেকে, “ওয়াসালা” অর্থ দুটি জিনিসকে জুড়ে দেওয়া বা সংযুক্ত করা। অর্থাৎ আল্লাহ যা সংযুক্ত রাখতে আদেশ করেছেন, ফাসিকরা তা ছিন্ন করে। মুফাসসিরগণ “আল্লাহ যা জোড়া রাখতে আদেশ করেছেন” এর কয়েকটি ব্যাখ্যা করেছেন।

প্রথম ও প্রধান ব্যাখ্যা—আত্মীয়তার বন্ধন (সিলাতুর রাহিম)। রক্তের সম্পর্ক হোক বা বৈবাহিক সূত্রে সৃষ্ট সম্পর্ক, আল্লাহ যে বন্ধন সৃষ্টি করেছেন তা ছিন্ন করার অধিকার আমাদের নেই; বরং তা রক্ষা করা আমাদের প্রতি আদিষ্ট। আল্লাহ বলেন, অঙ্গীকার রক্ষার সাথে তাঁর সাহায্য জড়িত:

وَأَوْفُوا بِعَهْدِي أُوفِ بِعَهْدِكُمْ

“আর তোমরা আমার অঙ্গীকার পূর্ণ করো, আমি তোমাদের অঙ্গীকার পূর্ণ করব।” (সূরা আল-বাকারা, ২ঃ৪০)

আত্মীয়তা রক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:

مَنْ سَرَّهُ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ وَيُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ

“যে ব্যক্তি চায় তার রিযিকে প্রশস্ততা আসুক এবং তার আয়ু বৃদ্ধি পাক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।” (সহীহ বুখারী, আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে)

আত্মীয়তা রক্ষার অন্তর্ভুক্ত হলো তাদের সাথে সাক্ষাৎ করা, দূরে হলে খোঁজখবর নেওয়া, উপহার দেওয়া, প্রয়োজনে সাহায্য করা—আর্থিকভাবেও, তাদের সৎ পরামর্শ দেওয়া ও পথভ্রষ্টতা থেকে রক্ষা করা, সম্মান রক্ষা করা, এবং তাদের সুখ-দুঃখে শরিক হওয়া। অনেক সময় আমরা কেবল আমন্ত্রিত হওয়ার অপেক্ষায় থাকি; কিন্তু সম্পর্ক রক্ষার জন্য নিজে এগিয়ে যাওয়া, এমনকি ভুল-বোঝাবুঝিতে প্রথমে ক্ষমা চাওয়াও এর অন্তর্ভুক্ত।

এমনকি অমুসলিম আত্মীয়ের সাথেও সম্পর্ক ছিন্ন করা যায় না। আসমা বিনতু আবি বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর মুশরিক মা তাঁর সাথে দেখা করতে এলে তিনি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করলেন—আমি কি তাঁর সাথে সদাচরণ করব? রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “সিলি উম্মাকি”—”তোমার মায়ের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখো।” (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)। আত্মীয় যদি অন্যায়ও করে, তবু আমরা অসন্তোষ প্রকাশ করতে পারি, কিন্তু সীমার মধ্যে; সম্পূর্ণ সম্পর্কচ্ছেদের অনুমতি নেই।

আত্মীয় যদি সম্পর্ক ছিন্নও করে, তবু সম্পর্ক রক্ষাকারীর মর্যাদা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এভাবে বর্ণনা করেছেন এক ব্যক্তির প্রশ্নের জবাবে, যে বলেছিল—আমি আত্মীয়দের সাথে সদ্ব্যবহার করি, কিন্তু তারা আমার সাথে দুর্ব্যবহার করে:

لَئِنْ كُنْتَ كَمَا قُلْتَ فَكَأَنَّمَا تُسِفُّهُمُ الْمَلَّ، وَلَا يَزَالُ مَعَكَ مِنَ اللَّهِ ظَهِيرٌ عَلَيْهِمْ مَا دُمْتَ عَلَىٰ ذَٰلِكَ

“তুমি যা বললে তা যদি সত্য হয়, তবে তুমি যেন তাদের মুখে উত্তপ্ত ছাই ঢেলে দিচ্ছ; আর যতক্ষণ তুমি এ পথে অটল থাকবে, ততক্ষণ আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন সাহায্যকারী তোমার সাথে থেকে তাদের বিরুদ্ধে তোমাকে সহায়তা করতে থাকবে।” (সহীহ মুসলিম, আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে)

দ্বিতীয় ব্যাখ্যা অনুযায়ী “আল্লাহ যা জোড়া রাখতে আদেশ করেছেন” বলতে নবী-রাসূলগণের প্রতি, বিশেষত শেষ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি ঈমান বোঝায়; তাঁকে অস্বীকার করা মানে নিজেকে সঠিক দ্বীন থেকে বিচ্ছিন্ন করা। তৃতীয় ব্যাখ্যা অনুযায়ী এর অর্থ কথা ও কাজের সংযোগ—যে কেবল বলে অথচ করে না, সে এই সংযোগ ছিন্ন করে।

জমিনে বিপর্যয় ও ক্ষতিগ্রস্তরা

তৃতীয় বৈশিষ্ট্য—”ওয়া ইউফসিদূনা ফিল আরদি,” তারা জমিনে বিপর্যয় সৃষ্টি করে। “ফাসাদ” অর্থ কোনো কিছু নষ্ট বা বিকৃত হয়ে যাওয়া। ফাসাদ দুই প্রকার। প্রথম প্রকার দৃশ্যমান বা বস্তুগত ফাসাদ—যেমন হত্যা, পরিবেশ দূষণ, বৃক্ষ ও সৃষ্টির ধ্বংস, এবং খাদ্য ও পানির অপচয়। এত পরিশ্রম, সম্পদ ও প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে খাদ্য বা পানি আমাদের কাছে পৌঁছায়, অথচ তা নষ্ট করা বা অপচয় করা—যখন বহু মানুষ ক্ষুধার্ত—এ-ও ফাসাদ। দ্বিতীয় প্রকার অদৃশ্য বা অবস্তুগত ফাসাদ, যা নাফরমানির মাধ্যমে হয়—যেমন গুজব ও মিথ্যা তথ্য ছড়ানো, সম্পর্ক ভেঙে দেওয়া, এবং মানুষের—বিশেষত শিশুদের—মন ও চরিত্র (আখলাক) কলুষিত করা। এই ফাসাদের মূল কারণ প্রায়ই প্রবৃত্তির অনুসরণ।

“উলাইকা হুমুল খাসিরূন”—তারাই ক্ষতিগ্রস্ত। “উলাইকা” ইশারা-ই-বাইদ (দূরের প্রতি ইঙ্গিত), যা বোঝায় আল্লাহর দৃষ্টিতে তাদের নিম্নতা। “হুম” শব্দটি স্বতন্ত্রভাবে এসে সীমাবদ্ধতা বোঝায়—কেবল তারাই। “খাসিরূন” খুসর (ক্ষতি) থেকে; তারা কোনো লাভ পায় না, বরং সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়—দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই হারিয়ে, জান্নাত হারিয়ে জাহান্নামে পৌঁছে।

“কাইফা তাকফুরূন”: পুনরুত্থানের দলিল

كَيْفَ تَكْفُرُونَ بِاللَّهِ وَكُنتُمْ أَمْوَاتًا فَأَحْيَاكُمْ ثُمَّ يُمِيتُكُمْ ثُمَّ يُحْيِيكُمْ ثُمَّ إِلَيْهِ تُرْجَعُونَ

“তোমরা কীভাবে আল্লাহকে অস্বীকার করছ, অথচ তোমরা ছিলে প্রাণহীন, তারপর তিনি তোমাদের জীবন দিলেন, তারপর তিনি তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন, তারপর আবার জীবিত করবেন, অতঃপর তাঁরই কাছে তোমাদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে।” (সূরা আল-বাকারা, ২ঃ২৮)

“কাইফা” (কীভাবে) এখানে প্রশ্নবোধক, যা একদিকে বিস্ময় প্রকাশ করে—কীভাবে তোমরা আল্লাহকে অস্বীকার করতে পার!—আবার অন্যদিকে তিরস্কারও বহন করে—কী দুঃসাহসে তোমরা অস্বীকার কর! “কুনতুম আমওয়াতান”—তোমরা ছিলে প্রাণহীন। “মাওত” দুই অর্থে বোঝা যায়: অনস্তিত্বের অবস্থা, এবং দেহ ও রূহের বিচ্ছেদ। দুনিয়ায় আসার আগে তোমরা কিছুই ছিলে না; “ফা-আহইয়াকুম”—অতঃপর তিনি তোমাদের জীবন দিলেন, দেহ দিলেন ও তাতে রূহ সংযুক্ত করলেন। “সুম্মা ইউমীতুকুম”—তারপর নির্দিষ্ট সময়ের পর তিনি মৃত্যু ঘটাবেন, দেহ ও রূহ বিচ্ছিন্ন হবে। “সুম্মা ইউহয়িকুম”—তারপর কিয়ামতের দিন আবার জীবিত করবেন। “সুম্মা ইলাইহি তুরজাউন”—অতঃপর হিসাব ও প্রতিদানের জন্য তাঁরই কাছে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। এই চারটি অবস্থা—প্রাণহীনতা, জীবন, মৃত্যু, পুনর্জীবন—পুনরুত্থানের এক অকাট্য দলিল এবং আল্লাহর ক্ষমতার প্রমাণ। যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করলেন, তাঁর পক্ষে দ্বিতীয়বার জীবিত করা কঠিন নয়।

জমিন ও সাত আসমানের সৃষ্টি

هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُم مَّا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا ثُمَّ اسْتَوَىٰ إِلَى السَّمَاءِ فَسَوَّاهُنَّ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ ۚ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ

“তিনিই সেই সত্তা, যিনি জমিনে যা কিছু আছে সবই তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন; অতঃপর তিনি আসমানের দিকে মনোনিবেশ করে সেগুলোকে সাত আসমানে বিন্যস্ত করলেন। আর তিনি সবকিছু সম্পর্কে সর্বজ্ঞ।” (সূরা আল-বাকারা, ২ঃ২৯)

“খালাকা লাকুম”—তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন। এর দুটি অর্থ: এক, তোমাদের উপকার ও ব্যবহারের জন্য; দুই, তোমাদের শিক্ষা ও ইবরতের জন্য, যেন তোমরা চিন্তা করে শিক্ষা নাও। জমিনের প্রতিটি বস্তু মানুষের কল্যাণের জন্যই সৃষ্ট।

“সুম্মাস্তাওয়া ইলাস সামা।” “ইসতাওয়া” সীন-ওয়াও-ইয়া ধাতু থেকে; “সাওয়া” অর্থ সমান হওয়া, আর “ইসতাওয়া” অর্থ সমতল বা সুবিন্যস্ত হওয়া এবং ঊর্ধ্বে ওঠা। তবে যখন “ইসতাওয়া” শব্দটি “ইলা”-র সাথে যুক্ত হয়, তখন তা কোনো কিছুর প্রতি মনোনিবেশ বা তা সৃষ্টির ইচ্ছা করার অর্থ দেয়। তাই “ইসতাওয়া ইলাস সামা”-এর দুটি ব্যাখ্যা: এক, তিনি আসমানের দিকে ঊর্ধ্বে উঠলেন; দুই, তিনি আসমান সৃষ্টির প্রতি মনোনিবেশ করলেন। আল্লাহর সিফাত “ইসতিওয়া” প্রসঙ্গে আহলুস সুন্নাহর সুপরিচিত নীতি—যেমন ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত:

الاسْتِوَاءُ مَعْلُومٌ، وَالْكَيْفُ مَجْهُولٌ، وَالإِيمَانُ بِهِ وَاجِبٌ، وَالسُّؤَالُ عَنْهُ بِدْعَةٌ

“ইসতিওয়ার অর্থ জ্ঞাত, কিন্তু এর ধরন অজ্ঞাত; এতে ঈমান আনা ওয়াজিব, আর এর ধরন সম্পর্কে প্রশ্ন করা বিদআত।” অর্থাৎ আল্লাহর সিফাতসমূহ ধরন-অনুসন্ধান বা সৃষ্টির সাথে তুলনা ছাড়াই যেভাবে অবতীর্ণ হয়েছে সেভাবেই মেনে নিতে হবে।

“ফাসাওয়াহুন্না সাবআ সামাওয়াত”—অতঃপর তিনি সেগুলোকে সাত আসমানে সুবিন্যস্ত করলেন। “ওয়া হুয়া বিকুল্লি শাইয়িন আলীম”—আর তিনি সবকিছু সম্পর্কে সর্বজ্ঞ। “আলীম” ইলম (জ্ঞান) থেকে; “আলিম”-ও জ্ঞানী বোঝায়, তবে “আলীম” গঠনটি প্রাচুর্য ও ধারাবাহিকতা বোঝায়—অর্থাৎ অগাধ জ্ঞান, এবং অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সর্বকালের জ্ঞান। মশা থেকে আসমান পর্যন্ত প্রতিটি বস্তুর সমস্ত খুঁটিনাটি আল্লাহ জানেন।

وَمَا يَعْزُبُ عَن رَّبِّكَ مِن مِّثْقَالِ ذَرَّةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ

“আর তোমার রবের কাছ থেকে অণু পরিমাণ কিছুও গোপন থাকে না—না জমিনে, না আসমানে।” (সূরা ইউনুস, ১০ঃ৬১)। অনুরূপভাবে আল্লাহ বলেন, “ওয়া আন্নাল্লাহা কাদ আহাতা বিকুল্লি শাইয়িন ইলমা”—আল্লাহ জ্ঞানে সবকিছু পরিবেষ্টন করে রেখেছেন (সূরা আত-তালাক, ৬৫ঃ১২)। যাঁর জ্ঞান এমন পরিপূর্ণ, তিনি কিছু জানালে তা বিনা দ্বিধায় মেনে নেওয়াই কর্তব্য—এখন বোধগম্য না হলেও পরে তা স্পষ্ট হবে।

শিক্ষা

প্রথম শিক্ষা—অঙ্গীকার, বিশেষত আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার, ভঙ্গ করা যাবে না। বান্দা যখন আল্লাহর সাথে তার অঙ্গীকার পূর্ণ করে, আল্লাহও তার সাথে তাঁর অঙ্গীকার পূর্ণ করেন; তাই সাহায্য দেখতে না পেলে ধৈর্য ধরে নিজ দায়িত্ব পালন করে যেতে হবে।

দ্বিতীয় শিক্ষা—আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা আবশ্যক, আর এর জন্য প্রয়োজন উদার হৃদয়। সম্পর্ক ছিন্ন করার কোনো যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়; অমুসলিম বা অন্যায়কারী আত্মীয়ের ক্ষেত্রেও নয়। বরং সদাচরণই তাদের হৃদয় জয়ের ও সংশোধনের পথ।

তৃতীয় শিক্ষা—জমিনে বিপর্যয় সৃষ্টি করা যাবে না—তা দৃশ্যমান হোক (অপচয়, দূষণ, ধ্বংস) বা অদৃশ্য (গুজব, সম্পর্কচ্ছেদ, মন ও চরিত্র কলুষিত করা)। এসব কাজের পরিণাম সম্পূর্ণ ক্ষতি।

চতুর্থ শিক্ষা—নিজের সৃষ্টি, মৃত্যু ও পুনর্জীবনের কথা স্মরণ করলে আল্লাহকে অস্বীকার করার কোনো অবকাশ থাকে না; এই চার অবস্থাই পুনরুত্থানের প্রমাণ।

পঞ্চম শিক্ষা—জমিনের সবকিছু আমাদের কল্যাণের জন্য সৃষ্ট; তাই আমরা যেন দুনিয়ার বস্তুর দাসে পরিণত না হই, বরং তা কেবল কল্যাণের জন্য ব্যবহার করি।

ষষ্ঠ শিক্ষা—আল্লাহ সবকিছুর সর্বজ্ঞ; তিনি আমাদের গোপন-প্রকাশ্য, চিন্তা ও নিয়ত সবই জানেন। তাই আমাদের ভয় করা উচিত মানুষকে নয়, আল্লাহকে; আর তিনি যা জানান তা মেনে নেওয়াই প্রকৃত জ্ঞানীর কাজ।