সূরা আল-বাকারা (২:১–৫) — মুত্তাকীদের পরিচয় ও কুরআনের হিদায়াত
কুরআন তিলাওয়াত ও অধ্যয়নের এই যাত্রার একেবারে সূচনায় আল্লাহ তাআলা আমাদের সামনে একটি মৌলিক সত্য উন্মোচন করেন—এই কিতাব সকলের জন্য নাযিল হলেও এর প্রকৃত হিদায়াত লাভ করে কেবল তারাই, যাদের ভেতরে তাকওয়া রয়েছে। সূরা আল-বাকারার প্রথম পাঁচটি আয়াতে সেই মুত্তাকীদের পরিচয় ও গুণাবলি ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এই আলোচনায় সূরাটির সংক্ষিপ্ত পরিচয়ের পর আয়াতগুলো একে একে বিশ্লেষণ করা হবে।
সূরা আল-বাকারা: সংক্ষিপ্ত পরিচয়
সূরা আল-বাকারা একটি মাদানী সূরা, অর্থাৎ হিজরতের পর মদিনায় এর অধিকাংশ অংশ নাযিল হয়েছে। এর আয়াতসংখ্যা ২৮৬। এটি কুরআনের দীর্ঘতম সূরা এবং পরিমাণে প্রায় আড়াই পারা জুড়ে বিস্তৃত। সূরার ভেতরে বর্ণিত গাভীর ঘটনার (কিসসাতুল বাকারা) কারণে এর নাম রাখা হয়েছে “আল-বাকারা”।
এই সূরার বিশেষ ফযিলত সম্পর্কে একাধিক সহীহ হাদিস রয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘরে সূরা তিলাওয়াতের নির্দেশ দিয়ে বলেন:
لَا تَجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ مَقَابِرَ، إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنْفِرُ مِنَ الْبَيْتِ الَّذِي تُقْرَأُ فِيهِ سُورَةُ الْبَقَرَةِ
“তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবরস্থান বানিয়ো না। নিশ্চয়ই যে ঘরে সূরা আল-বাকারা তিলাওয়াত করা হয়, শয়তান সেখান থেকে পালিয়ে যায়।” — সহীহ মুসলিম
অন্য একটি হাদিসে এই সূরা শেখা ও তা থেকে বিমুখ থাকার পরিণতি সম্পর্কে বলা হয়েছে:
اقْرَءُوا سُورَةَ الْبَقَرَةِ، فَإِنَّ أَخْذَهَا بَرَكَةٌ، وَتَرْكَهَا حَسْرَةٌ، وَلَا تَسْتَطِيعُهَا الْبَطَلَةُ
“তোমরা সূরা আল-বাকারা পাঠ করো। কারণ তা গ্রহণ করা বরকত, আর তা পরিত্যাগ করা আক্ষেপের কারণ; আর বাতিলপন্থীরা (যাদুকরেরা) এর মোকাবিলা করতে পারে না।” — সহীহ মুসলিম
আরেকটি হাদিসে সূরা আল-বাকারা ও সূরা আলে-ইমরানকে একত্রে “আয-যাহরাওয়ান” (দুটি আলোকোজ্জ্বল সূরা) আখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে:
اقْرَءُوا الزَّهْرَاوَيْنِ: الْبَقَرَةَ وَسُورَةَ آلِ عِمْرَانَ، فَإِنَّهُمَا تَأْتِيَانِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كَأَنَّهُمَا غَمَامَتَانِ
“তোমরা দুটি আলোকোজ্জ্বল সূরা—আল-বাকারা ও আলে-ইমরান—পাঠ করো। কারণ কিয়ামতের দিন এ দুটি এমনভাবে আসবে যেন দুটি মেঘখণ্ড (যা তার সঙ্গীদের ছায়া দেবে)।” — সহীহ মুসলিম
এই ফযিলতগুলো তাদের জন্য, যারা সূরাটি শেখে, তিলাওয়াত করে এবং তার উপর আমল করে।
الٓمٓ — হুরুফে মুকাত্তাআত (২:১)
الٓمٓ
সূরাটি শুরু হয়েছে বিচ্ছিন্ন হরফ (হুরুফে মুকাত্তাআত) দিয়ে—আলিফ, লাম, মীম। এই হরফগুলোর কোনো নির্দিষ্ট অর্থ বর্ণনা করা হয়নি, তবে এগুলোর গুরুত্ব ও তাৎপর্য রয়েছে। মুফাসসিরগণ এর কয়েকটি উদ্দেশ্যের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, এগুলো শ্রোতার মনোযোগ আকর্ষণ করে—অস্বাভাবিক এই ধ্বনি কানে এলে মানুষ সজাগ হয়। দ্বিতীয়ত, এগুলো কুরআনের ইজায তথা অলৌকিক প্রকৃতির প্রতি ইঙ্গিত করে। আরবরা এই একই হরফমালা দিয়েই কথা বলত ও কবিতা রচনা করত; অথচ সেই হরফ দিয়ে গঠিত কুরআনের মতো একটি সূরাও তারা রচনা করতে পারেনি। এভাবে এই হরফগুলো কুরআনের অতুলনীয়তার একটি নীরব প্রমাণ।
ذَٰلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيهِ (২:২)
ذَٰلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ ۛ فِيهِ ۛ هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ
“এই সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই; মুত্তাকীদের জন্য হিদায়াত।” — সূরা আল-বাকারা, ২:২
এখানে কুরআনকে নির্দেশ করতে “ذَٰلِكَ” (সেই) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যা মূলত দূরবর্তী বস্তুর জন্য ব্যবহৃত হয়। অথচ কুরআন তো পাঠকের সামনেই বিদ্যমান। এর দুটি তাৎপর্য উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমত, ইঙ্গিতটি প্রকৃত কিতাবের দিকে, যা লাওহে মাহফুযে সংরক্ষিত—আমাদের হাতের এই মুসহাফ সেই সংরক্ষিত মূলেরই প্রতিফলন। দ্বিতীয়ত, দূরত্বসূচক ইশারা মহত্ত্ব ও উচ্চ মর্যাদা প্রকাশ করে; কোনো অত্যন্ত সম্মানিত ও গৌরবময় বস্তুর প্রতি ইঙ্গিত করতে এমন শব্দ ব্যবহৃত হয়। তাই “ذَٰلِكَ الْكِتَاب” কুরআনের সুমহান মর্যাদার দিকেই ইশারা করছে।
এরপর আল্লাহ বলেন “لَا رَيْبَ فِيهِ”—এতে কোনো সন্দেহ নেই। “রায়ব” হলো এমন সন্দেহ, যা মানুষের ভেতরে অস্থিরতা তৈরি করে, তার প্রশান্তি কেড়ে নেয়। বিশেষত কোনো কিতাব পড়ার সময় মনে এমন সন্দেহ থাকলে তা স্বস্তির সঙ্গে পড়া যায় না; তা পাঠকের কাছে ভারী হয়ে ওঠে। তাই একেবারে শুরুতেই আল্লাহ জানিয়ে দিচ্ছেন—এতে কোনো সন্দেহ নেই; মনের প্রশান্তি নিয়ে এই কিতাব পড়ো, তুমি পরিতৃপ্ত হবে।
কুরআনে “কোনো সন্দেহ নেই” কথাটির কয়েকটি দিক রয়েছে। এই কিতাব যে আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল হয়েছে—তাতে সন্দেহ নেই; এতে মানবজাতির জন্য যে সর্বোত্তম হিদায়াত রয়েছে—তাতে সন্দেহ নেই; এবং এর কোনো কিছুতেই কোনো ভুল নেই—যা কিছু এতে পড়া হয়, তা সবই নির্ভুল ও যথার্থ।
هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ — তাকওয়া ও দুই প্রকার হিদায়াত (২:২)
এই কিতাব নাযিলের উদ্দেশ্য হলো হিদায়াত দান করা—”হুদাল লিল-মুত্তাকীন”, মুত্তাকীদের জন্য পথনির্দেশ। তাকওয়া হলো আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা—তিনি যা পছন্দ করেন তা করে এবং তিনি যা অপছন্দ করেন তা থেকে বিরত থেকে।
স্বাভাবিক প্রশ্ন জাগে—কুরআন তো সমগ্র মানবজাতির জন্য হিদায়াত; তবে এখানে বিশেষভাবে মুত্তাকীদের কথা কেন? উত্তর হলো, কুরআনের হিদায়াত থেকে প্রকৃত উপকার লাভ করে কেবল মুত্তাকীরাই। বিষয়টি বোঝার জন্য হিদায়াতের দুটি স্তর স্মরণ রাখা প্রয়োজন। প্রথমটি হিদায়াতে ইরশাদ বা হিদায়াতে ইলমি—জ্ঞানের হিদায়াত, অর্থাৎ সঠিক পথ চিনিয়ে দেওয়া। দ্বিতীয়টি হিদায়াতে তাওফিক বা হিদায়াতে আমলি—আল্লাহ কোনো ব্যক্তিকে প্রাপ্ত জ্ঞান অনুযায়ী আমল করার সামর্থ্য দান করেন।
কুরআন উভয় ধরনের হিদায়াতই দান করে। জ্ঞানের হিদায়াত সকলের জন্য; কিন্তু আমলের হিদায়াত কেবল তারাই লাভ করে, যাদের আল্লাহ তাওফিক দিয়েছেন, আর তার শর্ত হলো তাকওয়া। লক্ষণীয়, পরবর্তী আয়াতগুলোতে মুত্তাকীদের যেসব বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে—তারা ঈমান রাখে, সালাত কায়েম করে, ব্যয় করে—এ সবই আমলের সঙ্গে সম্পর্কিত।
الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ — গায়েবে ঈমান (২:৩)
الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ
“যারা গায়েবের প্রতি ঈমান আনে, সালাত কায়েম করে এবং আমি তাদের যে রিযক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে।” — সূরা আল-বাকারা, ২:৩
মুত্তাকীদের প্রথম বৈশিষ্ট্য—তারা গায়েবের প্রতি ঈমান আনে। গায়েবে বিশ্বাস তাকওয়ার ভিত্তি ও মূল। কারণ গায়েবে বিশ্বাস না থাকলে আল্লাহর প্রতি, ফেরেশতাদের প্রতি, কিংবা কুরআনের প্রতি ঈমান আনা সম্ভব নয়। আর প্রকৃত পরীক্ষা এখানেই। দৃশ্যমান কোনো কিছুর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কঠিন কিছু নয়; কিন্তু যা ইন্দ্রিয়ের অগোচরে, তার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপনই মানুষের ঈমানের আসল পরীক্ষা।
وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ — সালাত কায়েম করা (২:৩)
মুত্তাকীদের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য—তারা সালাত কায়েম করে। “সালাত” শব্দটির আভিধানিক অর্থ দুআ বা প্রার্থনা। পাঁচ ওয়াক্তের ফরয নামাযকে “সালাত” বলার কারণ সম্পর্কে কয়েকটি ব্যাখ্যা রয়েছে।
প্রথমত, সালাতের ভেতরে আমরা আল্লাহর কাছে দুআ করি—তাই এর নাম সালাত। দ্বিতীয়ত, একটি মত অনুযায়ী শব্দটি “আস-সালা” থেকে উদ্ভূত, যা ঘোড়ার লেজ ওঠানো-নামানোর ধারাবাহিক গতিকে বোঝায়; সালাতেও আমরা দাঁড়াই, রুকুতে নত হই, আবার দাঁড়াই, সিজদায় যাই, উঠি, পুনরায় সিজদায় যাই—এই ধারাবাহিক নড়াচড়ার সঙ্গে সাদৃশ্যের কারণে এমন নামকরণ। তৃতীয়ত, বলা হয় শব্দটি “صَلَّيْتُ الْعُودَ” থেকে এসেছে; “উদ” অর্থ কাঠ, আর এই প্রয়োগে অর্থ হলো কাঠকে ঘষে ঘষে নরম ও কোমল করা। মুসল্লি বা নামাযিও সালাতে নিজেকে বিনয়ী ও কোমল করে তোলে। অর্থাৎ দুআর কারণে, সালাতের নড়াচড়ার কারণে এবং এর ভেতরকার বিনয়ের কারণে—এই তিন দিক থেকেই “সালাত” নামটি অর্থবহ।
তবে আয়াতে কেবল সালাত আদায়ের কথা নয়, “ইকামাতুস সালাত” তথা সালাত কায়েম করার কথা বলা হয়েছে। সালাত কায়েম করার অর্থ তার হক পুরোপুরি আদায় করা। এর অন্তর্ভুক্ত: নির্ধারিত পদ্ধতিতে সালাত আদায় করা—কিবলামুখী হওয়া, সঠিক অযু, সালাতের সকল শর্ত ও রুকন পূর্ণ করা; নির্ধারিত সময়ে আদায় করা; জামাআতে আদায় করা; এবং নিয়মিত ও ধারাবাহিকভাবে আদায় করা। এই সবগুলো মিলিয়েই সালাতকে তার যথাযথ প্রাপ্য দেওয়া হয়।
وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ — রিযক থেকে ব্যয় (২:৩)
মুত্তাকীদের তৃতীয় বৈশিষ্ট্য—আল্লাহ তাদের যে রিযক দিয়েছেন, তা থেকে তারা ব্যয় করে। “مِمَّا” শব্দটি “মিন” ও “মা”-এর সমন্বয়ে গঠিত। আরবি ভাষায় “মিন” শব্দের একাধিক অর্থ রয়েছে; এই প্রসঙ্গে দুটি অর্থ প্রাসঙ্গিক।
প্রথমত, “মিন” ব্যাখ্যামূলক (বায়ান) অর্থে ধরা যায়। তখন অর্থ দাঁড়ায়—আমি তাদের যা দিয়েছি, তার সবই তারা আল্লাহর পথে ব্যয় করে; অর্থাৎ যে মুহূর্তে যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই তারা দিয়ে দেয়। যেমন তাবুকের অভিযানের সময় আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর সম্পূর্ণ সম্পদ নিয়ে এসেছিলেন, আর উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর অর্ধেক সম্পদ নিয়ে এসেও দেখলেন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু সবকিছুই দান করে দিয়েছেন। কখনো কখনো পরিস্থিতির দাবি অনুযায়ী নিজের সবটুকুই ব্যয় করতে হয়।
দ্বিতীয়ত, “মিন” আংশিকতা (তাবঈদ) অর্থেও ধরা যায়—অর্থাৎ “কিছু অংশ”। তখন অর্থ দাঁড়ায়, আমি তাদের যা দিয়েছি তার কিছু অংশ তারা ব্যয় করে; পুরোটা নয়, বরং একটি অংশ। এ কারণেই আমরা দেখি যাকাত সম্পূর্ণ সম্পদের উপর নয়, বরং আড়াই শতাংশ; সদকাও সম্পূর্ণ সম্পদ নয়, বরং এর একটি অংশ।
“রিযক” শব্দটি এসেছে র-য-ক মূল থেকে, যা থেকে “রিযক” (জীবিকা/প্রদত্ত সম্পদ) শব্দটিও আসে। রিযক হলো প্রতিটি উপকারী বস্তু—যা কিছু মানুষের দৈহিক বা আত্মিক পুষ্টির উৎস। এর মধ্যে বস্তুগত জিনিস রয়েছে—খাদ্য, পানি, অর্থ, ঘর, সম্পত্তি; আবার অবস্তুগত জিনিসও রয়েছে—মানুষের সময়, সামর্থ্য, জ্ঞান, সুযোগ, সম্পর্ক, এবং সে যে সময়কালে বেঁচে আছে সেই সময়। তাই “আমি তাদের যা দিয়েছি” কথাটি কেবল সম্পদেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সময় ও সামর্থ্যকেও অন্তর্ভুক্ত করে।
“ইনফাক” শব্দটি এসেছে ন-ফ-ক মূল থেকে; এর আভিধানিক অর্থ ইখরাজ তথা বের হয়ে যাওয়া, চলে যাওয়া। যেমন বলা হয় “نَفَقَتِ الدَّابَّةُ”—যখন কোনো প্রাণীর রূহ বেরিয়ে যায়, অর্থাৎ সে মারা যায়। তেমনি সম্পদ যখন ব্যয় করা হয়, তখন তা হাত থেকে বেরিয়ে চলে যায়। আরেকটি অর্থে “নাফাক” মানে ছিদ্র করা—কোনো পাত্রে ছিদ্র হলে ভেতরের বস্তু বেরিয়ে যেতে থাকে। ব্যয় করার সঙ্গে এই বেরিয়ে যাওয়ার ভাব সংযুক্ত।
যদি এখানে রিযক দ্বারা বিশেষভাবে সম্পদ বোঝানো হয়, তবে ব্যয় তিন প্রকারকে অন্তর্ভুক্ত করে: এক, যাকাত—ফরয দান, যা শর্তপূরণকারী ব্যক্তির উপর অবশ্যকর্তব্য; দুই, সদকা—স্বেচ্ছামূলক দান, যা মুস্তাহাব; তিন, নাফাকাতে লাযিমা—অপরিহার্য ব্যয়, যেমন স্ত্রী, সন্তান ও পিতামাতার ভরণপোষণ, তাদের খাদ্য-শিক্ষা ইত্যাদির ব্যবস্থা করা। আর যদি রিযক দ্বারা সম্পদ ছাড়া অন্যান্য নিয়ামতও বোঝানো হয়, তবে এর অর্থ দাঁড়ায়—আল্লাহ প্রদত্ত মেধা, যোগ্যতা ও জ্ঞান কেবল নিজের কাছে জমা না রেখে অন্যের কল্যাণে কাজে লাগানো। অনেকে জ্ঞান অর্জন করেও তা দিয়ে মানুষের উপকার করে না। কিন্তু মুত্তাকীরা স্বার্থপর নয়; আল্লাহ তাদের যা দিয়েছেন, তা দিয়ে তারা সৃষ্টির কল্যাণে ব্যয় করে।
وَالَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ — নাযিলকৃত ওহীতে ঈমান (২:৪)
وَالَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ وَبِالْآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ
“আর যারা ঈমান আনে তার প্রতি যা আপনার উপর নাযিল করা হয়েছে এবং যা আপনার পূর্বে নাযিল করা হয়েছে, আর তারা আখিরাতের প্রতি নিশ্চিত বিশ্বাস রাখে।” — সূরা আল-বাকারা, ২:৪
মুত্তাকীরা ঈমান আনে সেই সবকিছুর প্রতি, যা নবী ﷺ-এর উপর নাযিল করা হয়েছে। নবী ﷺ-এর উপর নাযিলকৃত বিষয়ের মধ্যে কেবল কুরআনই নয়, বরং সুন্নাহও অন্তর্ভুক্ত। কারণ আল্লাহ নবী ﷺ-কে এমন কিছু জ্ঞানও দান করেছেন, যা কুরআনে সরাসরি উল্লেখ নেই—যেমন সূরা আল-বাকারার ফযিলত সম্পর্কিত হাদিসগুলো কুরআনে নেই, আমরা তা সুন্নাহ থেকে পাই; আর নবী ﷺ সেই জ্ঞান আল্লাহর পক্ষ থেকেই লাভ করেছেন। তাই “যা আপনার উপর নাযিল করা হয়েছে” কথাটি কুরআন ও সুন্নাহ উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে।
তারা আরও ঈমান আনে সেই সবকিছুর প্রতি, যা নবী ﷺ-এর পূর্বে নাযিল হয়েছে—ইনজিল, তাওরাত, যাবুর, ইবরাহিম ও মুসা আলাইহিমাস সালামের সহিফা, এবং অন্যান্য কিতাব, যেগুলোর কথা হয়তো আমরা জানিও না।
এখানে একটি প্রশ্ন আসে—কালানুক্রমিকভাবে কুরআন তো এই সব কিতাবের পরে নাযিল হয়েছে; তবু কুরআনকে আগে উল্লেখ করা হলো কেন? এর কারণ দুটি। প্রথমত, পূর্ববর্তী সকল কিতাবের সারনির্যাস কুরআনেই সংরক্ষিত। দ্বিতীয়ত, পূর্ববর্তী কিতাবগুলো আজ আর প্রাসঙ্গিক নয়, কারণ সেগুলো পরিবর্তিত, বিলুপ্ত বা বিস্মৃত হয়ে গেছে; কার্যত অনুসরণযোগ্য একমাত্র কিতাব কুরআন। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরাসরি প্রাসঙ্গিক বলেই কুরআনকে প্রথমে উল্লেখ করা হয়েছে—এখানে কুরআনে ঈমান আনার অর্থ তা গ্রহণ করা ও তার অনুসরণ করা।
وَبِالْآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ — আখিরাতে দৃঢ় প্রত্যয় (২:৪)
মুত্তাকীদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য—তারা আখিরাতের প্রতি নিশ্চিত বিশ্বাস রাখে। “আখিরাত” শব্দটি এসেছে হামযা-খা-রা মূল থেকে; “আখির” অর্থ শেষ, যার বিপরীত “আওয়াল” তথা প্রথম। আখিরাত হলো দুনিয়ার বিপরীত—পৃথিবীর জীবন শেষ হওয়ার পর যে জীবন শুরু হবে। মৃত্যুর মুহূর্ত থেকে জান্নাত বা জাহান্নামে অনন্ত জীবন পর্যন্ত এই আখিরাতের বিস্তৃতি।
লক্ষণীয়, আয়াতে বলা হয়েছে “هُمْ يُوقِنُونَ”—তারা দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে বিশ্বাস করে। “ইউকিনূন” এসেছে “ইয়াকিন” থেকে, যার অর্থ সংশয়মুক্ত নিশ্চয়তা। ইয়াকিন হলো এমন বিশ্বাস, যাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই—কোনো বিষয়ে শতভাগ নিশ্চিত থাকা। তাই আয়াতের অর্থ কেবল আখিরাতের জ্ঞান বা সাধারণ বিশ্বাস নয়; বরং কিয়ামত সংঘটিত হওয়া, হিসাব-নিকাশ এবং পুরস্কার ও শাস্তি সম্পর্কে সম্পূর্ণ সংশয়হীন, দৃঢ় প্রত্যয়।
أُولَٰئِكَ عَلَىٰ هُدًى مِّن رَّبِّهِمْ — হিদায়াতপ্রাপ্ত ও সফলকাম (২:৫)
أُولَٰئِكَ عَلَىٰ هُدًى مِّن رَّبِّهِمْ ۖ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
“তারাই তাদের রবের পক্ষ থেকে হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং তারাই সফলকাম।” — সূরা আল-বাকারা, ২:৫
উপরের গুণাবলিসম্পন্ন এই মানুষদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, তারা তাদের রবের পক্ষ থেকে হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত। “أُولَٰئِكَ” অর্থ “তারা”—এটি “ذَٰلِكَ” (সেই)-এর বহুবচন রূপ, আর উভয়ই দূরবর্তী বস্তুর প্রতি ইঙ্গিতের জন্য ব্যবহৃত হয়। যেমন কিতাবের ক্ষেত্রে “এই কিতাব” না বলে “সেই কিতাব” বলা হয়েছিল, তেমনি এই মানুষদের ক্ষেত্রেও “এরা” না বলে “তারা” বলা হয়েছে। এই দূরত্বসূচক শব্দের উদ্দেশ্য তাদের সুউচ্চ মর্যাদার প্রতি ইঙ্গিত করা—এমন মহৎ গুণের অধিকারী, আখিরাতে এত উঁচু স্তরের এই মানুষেরা।
তারা “রবের পক্ষ থেকে হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত”—অর্থাৎ তারা জ্ঞানের উপর এবং আমলের তাওফিকের উপর প্রতিষ্ঠিত, আর এসবই আল্লাহর পক্ষ থেকে। “মিন রব্বিহিম” কথাটি বোঝায়, আল্লাহ তাদের জন্য হিদায়াতের পথ আলোকিত করে দিয়েছেন, তিনি তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করছেন।
এরপর আল্লাহ বলেন “وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ”—আর তারাই সফলকাম। এখানে পূর্ববর্তী আয়াতের মতোই “هُمْ” (তারা) শব্দটি পুনরায় এসেছে। “তারাই সফলকাম” না বলে “তারা, তারাই সফলকাম” বলা হয়েছে দুটি কারণে। প্রথমত, জোর দেওয়ার জন্য—এই গুণাবলির অধিকারীরাই, কেবল তারাই, আর কেউ নয়, সফলকাম হবে। দ্বিতীয়ত, তাদের উন্নত মর্যাদা তুলে ধরার জন্য।
“মুফলিহূন” শব্দটি “মুফলিহ”-এর বহুবচন, যা এসেছে ফ-ল-হ মূল থেকে। “ফালাহ” শব্দটি তিনটি অর্থ বহন করে। প্রথমত, বিদীর্ণ করা, কাটা, চিরে ফেলা—যেমন বলা হয় “إِنَّ الْحَدِيدَ بِالْحَدِيدِ يُفْلَحُ” অর্থাৎ লোহা লোহা দিয়েই কাটা হয়। দ্বিতীয়ত, সফলতা—এখানে “মুফলিহ” এই অর্থেই ব্যবহৃত। তৃতীয়ত, বাকা তথা টিকে থাকা, স্থায়ী হওয়া।
এই একই মূল থেকে “ফাল্লাহ” শব্দটি এসেছে, যার অর্থ কৃষক। কৃষক জমি চিরে-ফেঁড়ে বীজ বপন করে, ফসলের যত্ন নেয়, সফলতা লাভ করে, আর সেই সফলতার মাধ্যমে সে টিকে থাকে ও পরবর্তী বছর পর্যন্ত এই চক্র চালিয়ে যায়। কৃষিকাজ সহজ নয়—আবহাওয়ার নানা প্রতিকূলতা সামলাতে হয়, নির্দিষ্ট সময়ে বীজ বপন করতে হয়, নিয়মিত পানি দিতে হয়, গাছের যত্ন নিতে হয়। এটি প্রতিদিনের কাজ; সামান্য অবহেলা বা যথাসময়ে ফসল না তোলা পুরো পরিশ্রম বিফল করে দিতে পারে। কৃষক ছুটি নিতে পারে না, প্রতিদিন তার ফসলের দেখাশোনা করতে হয়।
এ থেকে বোঝা যায় “ফালাহ” এমন সফলতা নয়, যা সৌভাগ্যক্রমে বিনা পরিশ্রমে পাওয়া যায়; বরং তা প্রচুর পরিশ্রম, ধারাবাহিকতা, নিয়মিততা ও সচেতনতার পর অর্জিত হয়। আর সফলদের বৈশিষ্ট্যগুলোও তা-ই নির্দেশ করে—তাকওয়া (সচেতনতা), গায়েবে ঈমান, এবং সালাত কায়েম (নিয়মিততা ও ধারাবাহিকতা)।
মুফাসসিরগণ বলেছেন, সফলকাম তারাই, যারা যা চায় তা অর্জন করে এবং যা থেকে পালিয়ে বাঁচতে চায় তা থেকে রক্ষা পায়। মুত্তাকীরা আল্লাহর শাস্তি থেকে আত্মরক্ষা করছে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে ধাবিত হচ্ছে। তাই সফলকাম তারাই, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করে এবং তাঁর শাস্তি থেকে রক্ষা পায়। কুরআন এই সফলতার পরিচয় স্পষ্ট করে বলেছে:
فَمَن زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ
“অতঃপর যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সে-ই সফলকাম।” — সূরা আলে-ইমরান, ৩:১৮৫
শিক্ষা
কুরআনের একেবারে সূচনাতেই আল্লাহ আমাদের জানিয়ে দিচ্ছেন যে, এই কিতাব থেকে প্রকৃত উপকার লাভ কেবল জ্ঞানের বিষয় নয়, আমলেরও বিষয়। জ্ঞানের হিদায়াত সকলের জন্য উন্মুক্ত, কিন্তু আমলের তাওফিক লাভ করে তারাই, যাদের ভেতরে তাকওয়া রয়েছে। তাই কুরআন পাঠ করেও কারও জীবনে পরিবর্তন না এলে সমস্যা কুরআনে নয়; সমস্যা এই বৈশিষ্ট্যগুলো নিজের জীবনে বাস্তবায়ন না করায়।
মুত্তাকীদের এই বৈশিষ্ট্যগুলো—গায়েবে ঈমান, সালাত কায়েম, রিযক থেকে ব্যয়, নাযিলকৃত সকল ওহীতে ঈমান এবং আখিরাতে দৃঢ় প্রত্যয়—কেবল স্বীকৃতির বিষয় নয়, বরং প্রতিদিনের আত্মপর্যালোচনার মানদণ্ড। এগুলোর একটি তালিকা নিজের সামনে রেখে প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করা যায়—আমি কি এগুলো যথাযথভাবে পালন করছি?
সূরা আল-ফাতিহায় আমরা প্রতিদিন প্রার্থনা করি, “اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ”—হে আল্লাহ, আমাদের সরল পথ দেখান। আর এখানে আল্লাহ যেন সেই প্রার্থনার উত্তরই দিচ্ছেন—হিদায়াত চাইলে এই কাজগুলোই করতে হবে। কৃষকের সফলতা যেমন নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রম ও ধারাবাহিকতার ফল, তেমনি আখিরাতের সফলতাও এই দুনিয়ায় নিষ্ঠা, ধারাবাহিকতা ও সচেতন প্রচেষ্টার মাধ্যমেই অর্জিত হয়। পরিশ্রমের স্থান এই দুনিয়া, আর ফসল তোলার স্থান আখিরাত।