সূরা আল-বাকারা: ২৩–২৫ — কুরআনের চ্যালেঞ্জ, অগ্নির সতর্কতা ও জান্নাতের সুসংবাদ
আল্লাহ তাআলা মানুষকে তাঁর ইবাদতের আহ্বান জানানোর পর এবার তাঁর রাসূল সম্পর্কে আলোচনা শুরু করেন। আমাদের দ্বীনের কালিমার দিকে লক্ষ করলে দেখা যায় — লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, এরপর মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ। তাই “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এর ব্যাখ্যা দেওয়ার পর আল্লাহ তাআলা এখানে “মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” প্রতিষ্ঠিত করছেন — অর্থাৎ মুহাম্মাদ ﷺ যে আল্লাহর রাসূল, তার প্রমাণ পেশ করছেন। আর সেই প্রমাণ হলো স্বয়ং কুরআন।
وَإِن كُنتُمْ فِي رَيْبٍ مِّمَّا نَزَّلْنَا عَلَىٰ عَبْدِنَا فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِّن مِّثْلِهِ وَادْعُوا شُهَدَاءَكُم مِّن دُونِ اللَّهِ إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ
আর আমি আমার বান্দার প্রতি যা নাযিল করেছি, তাতে যদি তোমরা কোনো সন্দেহে থাকো, তবে তার অনুরূপ একটি সূরা নিয়ে এসো এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সাক্ষীদের ডেকে নাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও। (২:২৩)
“রাইব” ও “নাযযালনা” — সন্দেহের প্রকৃতি ও ওহীর ধারা
“রাইব” (رَيْب) শব্দটি এমন এক সন্দেহকে বোঝায় যা মানুষের অন্তরে অস্থিরতা তৈরি করে, তার প্রশান্তি কেড়ে নেয়। তবে শব্দটি এমন সন্দেহের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয় যা পরে স্পষ্ট হয়ে যায় — অর্থাৎ যে বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ, তা মূলত সত্য ও বাস্তব; সন্দেহটি সাময়িক। কুরআন সম্পর্কে যে সন্দেহের কথা এখানে বলা হচ্ছে, তা মূলত এর উৎস নিয়ে — এটি কি সত্যিই আল্লাহর পক্ষ থেকে? নাকি (নাউযুবিল্লাহ) নবী ﷺ নিজে রচনা করেছেন? এই সংশয়ের জবাবেই চ্যালেঞ্জটি পেশ করা হয়েছে।
আয়াতে “নাযযালনা” (نَزَّلْنَا) শব্দটি লক্ষণীয়। এটি “আনযালনা” থেকে ভিন্ন। আনযালা–ইউনযিলু–ইনযাল মানে একবারে কিছু নাযিল করা; আর নাযযালা–ইউনাযযিলু–তানযীল মানে ধীরে ধীরে, অংশে অংশে, ভাগে ভাগে কিছু নাযিল করা। কুরআন নবী ﷺ-এর ওপর একবারে নাযিল হয়নি, বরং প্রায় তেইশ বছর ধরে অংশে অংশে অবতীর্ণ হয়েছে। এই ক্রমান্বয়ে অবতরণই “নাযযালনা” শব্দে ফুটে উঠেছে।
“আবদিনা” — বান্দা হওয়ার সম্মান
আয়াতে আল্লাহ নবী ﷺ-কে “আবদিনা” — “আমাদের বান্দা” — বলে সম্বোধন করেছেন। এই সম্বোধনের কয়েকটি তাৎপর্য রয়েছে।
প্রথমত, এটি প্রমাণ করে যে তিনি একজন মানুষ ছিলেন, আল্লাহর বান্দা ও ইবাদতকারী ছিলেন। দ্বিতীয়ত, আল্লাহ তাঁকে “আমাদের বান্দা” বলায় বোঝা যায় — আল্লাহর দাসত্ব নিজেই এক বিরাট সম্মান। উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন কারও সেবক হওয়াকে মানুষ যেমন গৌরব মনে করে, তেমনি আল্লাহর বান্দা হওয়া তার চেয়ে বহুগুণ বড় সম্মান। তৃতীয়ত, প্রসঙ্গটিও লক্ষণীয়: আল্লাহ আমাদের ইবাদতের আদেশ দিয়েছেন, এরপর নিজের এক আদর্শ বান্দার কথা উল্লেখ করছেন। নবী ﷺ ছিলেন সেই আদর্শ আবদ — যিনি কৃতজ্ঞতাবশত অত্যধিক ইবাদত করতেন।
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ كَانَ يَقُومُ مِنَ اللَّيْلِ حَتَّى تَتَفَطَّرَ قَدَمَاهُ، فَقَالَتْ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَتَصْنَعُ هَذَا وَقَدْ غَفَرَ اللَّهُ لَكَ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِكَ وَمَا تَأَخَّرَ؟ فَقَالَ: «أَفَلَا أَكُونُ عَبْدًا شَكُورًا»
আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, নবী ﷺ রাতে এত দীর্ঘ নামাযে দাঁড়িয়ে থাকতেন যে তাঁর দুই পা ফুলে ফেটে যেত। তিনি বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আপনি এত কষ্ট করছেন, অথচ আল্লাহ তো আপনার অতীত ও ভবিষ্যতের সব ত্রুটি ক্ষমা করে দিয়েছেন?” তিনি বললেন, “আমি কি একজন কৃতজ্ঞ বান্দা হব না?” (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
আমরা প্রায়ই ইবাদত করি যেন আল্লাহর প্রতি অনুগ্রহ করছি, কিংবা কোনো পার্থিব উপকারের আশায়। কিছু কল্যাণের প্রত্যাশায় ইবাদত করা দোষের নয়; বান্দা তো আশাবাদী হবেই। কিন্তু নবী ﷺ-এর ইবাদতের প্রেরণা ছিল কৃতজ্ঞতা — “আমি কি একজন কৃতজ্ঞ বান্দা হব না?” এ কারণেই তিনি আদর্শ বান্দা, আর তাঁর ইবাদতের পদ্ধতিই আমাদের জন্য অনুসরণীয়। আমাদের ইবাদত যেমন আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ হতে হবে, তেমনি তা নবী ﷺ-এর দেখানো পথ অনুযায়ীও হতে হবে — কারণ তাঁর ইবাদতই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য ও পছন্দনীয়।
একটি সূরা নিয়ে এসো — তাহাদ্দী
যদি কারও কুরআন সম্পর্কে এই সন্দেহ থাকে যে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসেনি, নবী ﷺ নিজে রচনা করেছেন — তবে তাকে বলা হচ্ছে: “ফাʾতূ বিসূরাতিম মিম মিসলিহ” — তার অনুরূপ একটি সূরা নিয়ে এসো। “ফাʾতূ বি” মানে “নিয়ে এসো, রচনা করে দেখাও।” আর “মিম মিসলিহ” — কুরআনের সদৃশ একটি সূরা: এর ভাষার অলংকার, সৌন্দর্য, বিন্যাস ও জ্ঞানের গভীরতায় অনুরূপ। গোটা কুরআন নয়, মাত্র একটি সূরা।
এই চ্যালেঞ্জের যুক্তি স্পষ্ট: যদি নবী ﷺ এটি রচনা করে থাকেন বলে কেউ দাবি করে, তবে একজন মানুষ যা রচনা করতে পারে, অন্য মানুষেরও তা রচনা করতে পারার কথা। তাঁর যুগে তাঁর চেয়ে বাগ্মী মানুষ ছিল, কবি ছিল — কিন্তু কেউই কুরআনের অনুরূপ কিছু আনতে পারেনি।
এরপর বলা হচ্ছে, “ওয়াদʿঊ শুহাদাআকুম মিন দূনিল্লাহ” — আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সাক্ষীদের ডেকে নাও। “শুহাদা” (শাহীদ-এর বহুবচন) মানে সাক্ষী, প্রত্যক্ষদর্শী। এখানে তা “সাহায্যকারী, সহযোগী” অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে — যারা কুরআনের মতো কিছু রচনার কাজে তোমাদের সাহায্য করবে, তোমাদের প্রচেষ্টা প্রত্যক্ষ করবে। তবে শর্ত হলো তারা হবে “মিন দূনিল্লাহ” — আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ; অর্থাৎ কুরআনের মতো কিছু আনতে তোমরা আল্লাহর সাহায্য চাইতে পারবে না। “ইন কুনতুম সাদিকীন” — যদি তোমরা তোমাদের এই দাবিতে সত্যবাদী হও যে এটি মুহাম্মাদ ﷺ নিজে রচনা করেছেন।
কুরআন — যুগোপযোগী মুজিযা
এই চ্যালেঞ্জ ছিল সমগ্র মানবজাতির প্রতি, তবে সরাসরি সম্মুখীন হয়েছিল আরবরা — কারণ তারা ছিল ভাষার অধিকারী। মরুবাসী আরবদের গর্ব করার মতো একটিমাত্র বিষয় ছিল — ভাষা ও অলংকার। মরুভূমিতে কৃষি, স্থাপত্য বা শিকার ছিল না; তাদের একমাত্র শিল্প ও বিদ্যা ছিল ভাষা ও বাগ্মিতা। প্রতিটি জাতি কোনো না কোনো বিষয়ে খ্যাত হয়; আরবরা খ্যাত ছিল তাদের অতুলনীয় ভাষাশৈলীতে। অথচ তারাও এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে পারেনি।
আল্লাহ প্রতিটি নবীকে এমন মুজিযা দিয়েছেন যা সে যুগের মানুষ যে বিষয়ে পারদর্শী ছিল, সেই বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। মূসা আলাইহিস সালামের যুগে জাদুর প্রচলন ছিল বলে তাঁকে লাঠি, হাত ও সমুদ্র বিদীর্ণ হওয়ার মতো মুজিযা দেওয়া হয়েছিল। ঈসা আলাইহিস সালামের যুগে চিকিৎসাবিদ্যা খ্যাত ছিল বলে তিনি জন্মান্ধকে সুস্থ করা, মৃতকে জীবিত করার মতো মুজিযা দেখাতেন। আর নবী ﷺ-এর যুগে মানুষ নিরক্ষর হলেও ভাষার কদর করত — তাই কুরআন এসেছে বার্তা ও মুজিযা একসঙ্গে হয়ে। এর ভাষা, শৈলী ও অলংকারই এর মুজিযা, যা অনুকরণ করা বা পরাজিত করা অসম্ভব।
আল্লাহ কুরআনের কয়েক স্থানে এই চ্যালেঞ্জ পুনরাবৃত্তি করেছেন। সূরা ইউনুস (১০:৩৮)-এ তিনি বলেন, তারা কি বলে যে সে এটি রচনা করেছে? বলো, তবে এর অনুরূপ একটি সূরা নিয়ে এসো। সূরা হূদ (১১:১৩)-এ চ্যালেঞ্জ আরও বিস্তৃত — বলো, তবে এর অনুরূপ রচিত দশটি সূরা নিয়ে এসো। আর সূরা আত-তূর (৫২:৩৪)-এ বলা হয়েছে, তবে তারা এর অনুরূপ একটি বাণী নিয়ে আসুক, যদি তারা সত্যবাদী হয়।
فَإِن لَّمْ تَفْعَلُوا وَلَن تَفْعَلُوا فَاتَّقُوا النَّارَ الَّتِي وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ ۖ أُعِدَّتْ لِلْكَافِرِينَ
অতঃপর যদি তোমরা তা করতে না পারো — আর কখনোই তোমরা তা করতে পারবে না — তবে সেই আগুনকে ভয় করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যা প্রস্তুত করা হয়েছে কাফিরদের জন্য। (২:২৪)
অক্ষমতা ও অগ্নির সতর্কবার্তা
“ফাইল্লাম তাফʿআলূ” — যদি তোমরা তা না করো — এরপর আল্লাহ নিশ্চিত করে দিচ্ছেন, “ওয়ালান তাফʿআলূ” — আর কখনোই তোমরা তা করতে পারবে না। এই চ্যালেঞ্জ শুধু বর্তমানের নয়, ভবিষ্যতেরও চিরস্থায়ী ঘোষণা: কুরআন এমন এক মুজিযা যা অনুকরণের অতীত। সূরা আল-ইসরা (১৭:৮৮)-এ আল্লাহ বলেন, মানুষ ও জিন সবাই একত্র হয়ে পরস্পরকে সাহায্য করলেও তারা কুরআনের অনুরূপ কিছু আনতে পারবে না।
ইতিহাসে অনেকেই কুরআনের মতো কিছু রচনার চেষ্টা করেছে, কিন্তু সবাই জেনেছে যে তা কুরআন নয়, আল্লাহর বাণী হতে পারে না। এতে আল্লাহর কালাম ও মানুষের কালামের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য ফুটে ওঠে। কুরআনের বিষয়বস্তু, ভাষা ও শৈলী — এগুলো কোনো মানুষের রচনা হতে পারে না।
যেহেতু কুরআনের অনুরূপ কিছু আনা অসম্ভব, তাই আল্লাহ বলছেন, “ফাত্তাকুন-নার” — সেই আগুনকে ভয় করো, তা থেকে নিজেকে বাঁচাও (তাকওয়ার এই দ্বিমুখী অর্থ — ভয় করা ও আত্মরক্ষা করা)। কোন আগুন? “আল্লাতী ওয়াকূদুহান-নাসু ওয়াল-হিজারাহ” — যার ইন্ধন মানুষ ও পাথর। “ওয়াকূদ” মানে ইন্ধন, যা আগুনকে প্রজ্বলিত রাখে। জাহান্নামের অধিবাসীরা নিজেরাই সেই আগুনের ইন্ধন হবে; মানুষের দেহে থাকা হাড়, চর্বি, ফসফরাস — সবই দাহ্য উপাদান। এর সঙ্গে থাকবে “হিজারাহ” — পাথর। ইবনু মাসʿঊদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর মত অনুযায়ী এখানে বিশেষভাবে কালো গন্ধক (কিবরীত আসওয়াদ) উদ্দেশ্য, যা দ্রুত আগুন ধরে, দুর্গন্ধ ছড়ায় এবং প্রচুর ধোঁয়া উৎপন্ন করে। এসবই আগুনের প্রচণ্ড উত্তাপের ইঙ্গিত দেয় — জাহান্নামিরা যতদিন থাকবে, ততদিন সেই আগুন জ্বলতে থাকবে।
“উʿইদ্দাত লিল-কাফিরীন” — তা কাফিরদের জন্য প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। “উʿইদ্দাত” (মূল: আদাদ — গণনা করা) থেকে আসা, যা কোনো কিছু সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত করাকে বোঝায়। যেমন অতিথি আপ্যায়নে প্লেট, চামচ, খাবার সবকিছু গুনে গুনে প্রস্তুত রাখলে বোঝা যায় আয়োজন পূর্ণ — তেমনি জাহান্নাম কাফিরদের জন্য পূর্ণরূপে প্রস্তুত। যারা কুরআনকে অস্বীকার করে, নবী ﷺ-কে প্রত্যাখ্যান করে, তাদের জন্যই এই প্রস্তুতি।
এই আয়াতগুলোতে একটি মৌলিক বিষয় স্পষ্ট: মুহাম্মাদ ﷺ যে আল্লাহর রাসূল, তার প্রমাণ স্বয়ং কুরআন। তাই তাঁর প্রতি ঈমান অপরিহার্য — কারণ এটিই ঈমান ও কুফরের মধ্যে পার্থক্যকারী। আল্লাহর ইবাদতের প্রমাণ হলো তিনিই আমাদের সৃষ্টিকর্তা, আর নবী ﷺ-এর রিসালাতের প্রমাণ হলো কুরআন। এভাবেই “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” প্রতিষ্ঠিত হয়। আর নবী ﷺ-এর প্রতি ঈমান জরুরি এ কারণেও যে, তিনিই আদর্শ বান্দা, এবং তাঁর দেখানো পথ অনুসরণ ছাড়া প্রকৃত ইবাদত সম্ভব নয়।
وَبَشِّرِ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أَنَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ ۖ كُلَّمَا رُزِقُوا مِنْهَا مِن ثَمَرَةٍ رِّزْقًا ۙ قَالُوا هَٰذَا الَّذِي رُزِقْنَا مِن قَبْلُ ۖ وَأُتُوا بِهِ مُتَشَابِهًا ۖ وَلَهُمْ فِيهَا أَزْوَاجٌ مُّطَهَّرَةٌ ۖ وَهُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
আর যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে, তাদের সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত, যার তলদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত। যখনই তাদের সেখান থেকে ফলমূলের রিযিক দেওয়া হবে, তারা বলবে, “এ তো তা-ই, যা আমাদের পূর্বেও দেওয়া হয়েছিল।” আর তাদের তা দেওয়া হবে সদৃশ করে। সেখানে তাদের জন্য থাকবে পবিত্র সঙ্গীগণ, এবং তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। (২:২৫)
মুমিনদের জন্য সুসংবাদ
কাফিরদের জন্য অগ্নির সতর্কতার পর আল্লাহ মুমিনদের সুসংবাদ দিচ্ছেন। “ওয়া বাশশির” — সুসংবাদ দাও। “বাশশারা” (মূল: বাশর) থেকে; একই মূল থেকে “বাশার” মানে মানুষ এবং মানুষের ত্বক। এর তাৎপর্য হলো — “বিশর” এমন সুসংবাদ যার প্রভাব মানুষের ত্বকে, মুখমণ্ডলে ফুটে ওঠে। মানুষ খুশি হলে তার চেহারায় তা প্রকাশ পায়, ত্বক যেন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
তবে এই সুসংবাদ কেবল যারা ঈমান এনেছে তাদের জন্য নয়, বরং যারা ঈমানের সঙ্গে “আমিলুস-সালিহাত” — সৎকর্মও করেছে, তাদের জন্য। “আমাল” (ফিʿল থেকে ভিন্ন) মানে ইচ্ছাকৃত, সচেতন কর্ম — বিশেষত মানুষের দ্বারা কৃত কাজ। “সালিহাত” (সালিহা-র বহুবচন, মূল: সালাহা) মানে যথাযথ, শুদ্ধ ও কল্যাণকর কাজ।
একটি কাজ “সালিহ” হওয়ার দুটি শর্ত। প্রথমত, তা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একনিষ্ঠভাবে করা হবে; কাজটির প্রতিদান ও প্রশংসা কেবল আল্লাহর কাছেই প্রত্যাশিত হবে, মানুষের কাছে নয়। কারণ মানুষের প্রশংসার আশা করলে, প্রশংসা না পেলে আমরা হতাশ হয়ে সৎকাজ ছেড়ে দিই। দ্বিতীয়ত, তা নবী ﷺ-এর দেখানো পদ্ধতি অনুযায়ী হবে। একনিষ্ঠতা ও সুন্নাহ-অনুসরণ — এ দুটিই “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ”-এর বাস্তব প্রতিফলন।
এ থেকেই বোঝা যায়, সৎকর্ম করতে হলে সৎকর্ম সম্পর্কে জানা আবশ্যক — কারণ তা নবী ﷺ-এর পথ অনুযায়ী হতে হলে সেই পথ জানতে হবে। ইমাম বুখারি তাঁর সহীহ-তে একটি অধ্যায়ের শিরোনাম দিয়েছেন “আল-ইলমু কাবলাল কাওলি ওয়াল আমাল” — জ্ঞান কথা ও কাজের পূর্বে। অর্থাৎ মানুষ যা বলবে বা করবে, তার আগে সে বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করবে। তাই ইলম অর্জন করা অপরিহার্য।
জান্নাত — আচ্ছাদিত বাগান
মুমিনদের জন্য রয়েছে “জান্নাত” (জান্নাহ-র বহুবচন; একটি নয়, বহু বাগান)। “জান্নাহ” শব্দের আভিধানিক অর্থ বাগান — “প্যারাডাইস” এর অনুবাদমাত্র, আভিধানিক অর্থ নয়। “জান্নাহ”-র মূল অর্থ ঢেকে রাখা, আচ্ছাদিত করা; একই মূল থেকে “জিন” — কারণ তারা আমাদের দৃষ্টির অন্তরালে। জান্নাহ এমন বাগান, যার মাটি সম্পূর্ণ আচ্ছাদিত — গাছপালা, ফুল, সবুজ পত্রপল্লবে ঢাকা; কোনো অংশই খালি বা অনাবৃত নয়।
জান্নাতকে “জান্নাহ” বলার কারণ দুটি। প্রথমত, তা এখন আমাদের দৃষ্টি থেকে গোপন। দ্বিতীয়ত, তা এমন এক বাগান যা সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ ও আচ্ছাদিত। দুনিয়ার যেকোনো বাগান গ্রীষ্ম-বসন্তে সুন্দর হলেও কয়েক সপ্তাহ পর হেমন্ত-শীতে তা রিক্ত ও বিবর্ণ হয়ে পড়ে। কিন্তু জান্নাত সর্বদাই জান্নাত — সেখানে সৌন্দর্য চিরস্থায়ী।
এই জান্নাতসমূহের “তাজরী মিন তাহতিহাল আনহার” — তলদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত। “আনহার” (নাহার-এর বহুবচন, মূল: নাহারা — খোদাই করা); নদী পানির প্রবাহে মাটি খোদাই করে নিজের পথ তৈরি করে। এই “তলদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত”-এর দুটি ব্যাখ্যা রয়েছে। প্রথম ব্যাখ্যা: জান্নাতের গাছ ও প্রাসাদগুলোর নিচ দিয়ে নদী বইবে। দ্বিতীয় ব্যাখ্যা: নদীগুলো প্রবাহিত হবে জান্নাতবাসীদের নিয়ন্ত্রণ ও ইচ্ছা অনুযায়ী — তারাই ঠিক করবে কোথায় নদী বইবে, কোন পথে যাবে; নদীগুলো তাদের অধিকারে থাকবে।
فِيهَا أَنْهَارٌ مِّن مَّاءٍ غَيْرِ آسِنٍ وَأَنْهَارٌ مِّن لَّبَنٍ لَّمْ يَتَغَيَّرْ طَعْمُهُ وَأَنْهَارٌ مِّنْ خَمْرٍ لَّذَّةٍ لِّلشَّارِبِينَ وَأَنْهَارٌ مِّنْ عَسَلٍ مُّصَفًّى
সেখানে থাকবে নদীসমূহ — এমন পানির যা দুর্গন্ধযুক্ত হয় না, এমন দুধের যার স্বাদ পরিবর্তিত হয় না, পানকারীদের জন্য সুস্বাদু শরাবের, এবং পরিশুদ্ধ মধুর। (সূরা মুহাম্মাদ, ৪৭:১৫)
জান্নাতের ফল, সঙ্গী ও চিরস্থায়িত্ব
“কুল্লামা রুযিকূ মিনহা মিন সামারাতির রিযকা” — যখনই তাদের সেখানকার ফলমূল রিযিক হিসেবে দেওয়া হবে, তারা বলবে “হাযাল্লাযী রুযিকনা মিন কাবল” — এ তো তা-ই যা আমাদের পূর্বে দেওয়া হয়েছিল। এর দুটি অর্থ। প্রথমত, জান্নাতেই ইতিপূর্বে যা দেওয়া হয়েছিল তার অনুরূপ — অর্থাৎ খাবার তাদের কাছে পরিচিত মনে হবে; সবকিছু সম্পূর্ণ অপরিচিত ও চমকপ্রদ হলে মানুষ স্বস্তি পায় না, তাই এই পরিচিতি স্বস্তিদায়ক। দ্বিতীয়ত, দুনিয়ায় যা তারা পেত তার অনুরূপ। তবে এই সাদৃশ্য কেবল বাহ্যিক রূপে; প্রকৃত স্বাদে ও অভিজ্ঞতায় তা ভিন্ন।
“ওয়া উতূ বিহি মুতাশাবিহা” — তাদের তা দেওয়া হবে সদৃশ করে। “মুতাশাবিহ” (মূল: শাবাহা — সদৃশ হওয়া) মানে বাহ্যিক রূপে একে অপরের অনুরূপ। অর্থাৎ ফলগুলো দেখতে পরস্পর সদৃশ হবে, কিন্তু স্বাদে হবে ভিন্ন।
“ওয়ালাহুম ফীহা আযওয়াজুম মুতাহহারাহ” — সেখানে তাদের জন্য থাকবে পবিত্র সঙ্গীগণ। “আযওয়াজ” (যাওজ-এর বহুবচন) — আরবিতে যাওজ শব্দটি স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, অর্থাৎ জোড়ার একজন। “মুতাহহারাহ” (মূল: তাহারা — পরিশুদ্ধ হওয়া) মানে সম্পূর্ণ পবিত্র — দৃশ্যমান (বাহ্যিক) ও অদৃশ্য (আন্তরিক) উভয় অপবিত্রতা থেকে মুক্ত। বাহ্যিক অপবিত্রতা যেমন দুর্গন্ধ, আর অদৃশ্য অপবিত্রতা যেমন রূঢ়তা, হিংসা, বিদ্বেষ, অশ্লীল ভাষা। দুনিয়ায় সুন্দর পরিবেশেও সঙ্গীর রূঢ় আচরণ বা অশালীন কথা সবকিছুর আনন্দ নষ্ট করে দেয়; জান্নাতে সঙ্গীগণ এসব থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র হবেন।
“ওয়াহুম ফীহা খালিদূন” — তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। “খালিদূন” (খালিদ-এর বহুবচন, মূল: খালাদা) মানে চিরস্থায়ী; “খুলূদ” মানে কোনো কিছু তার আসল অবস্থায় অপরিবর্তিত থেকে যাওয়া। দুনিয়ায় সবকিছু বদলায়, জীর্ণ হয়; কিন্তু জান্নাতে তারা চিরকাল অপরিবর্তিত অবস্থায় থাকবে।
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «يُؤْتَى بِالْمَوْتِ كَهَيْئَةِ كَبْشٍ أَمْلَحَ، فَيُوقَفُ بَيْنَ الْجَنَّةِ وَالنَّارِ… ثُمَّ يُذْبَحُ، ثُمَّ يُقَالُ: يَا أَهْلَ الْجَنَّةِ خُلُودٌ فَلَا مَوْتَ، وَيَا أَهْلَ النَّارِ خُلُودٌ فَلَا مَوْتَ»
আবু সাʿঈদ আল-খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “কিয়ামতের দিন মৃত্যুকে একটি সাদা-কালো মিশ্র রঙের মেষের আকৃতিতে আনা হবে এবং জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝখানে দাঁড় করানো হবে। জান্নাতবাসীদের জিজ্ঞেস করা হবে — তোমরা কি একে চেনো? তারা তাকিয়ে বলবে, হ্যাঁ, এ তো মৃত্যু। জাহান্নামবাসীদেরও তা-ই জিজ্ঞেস করা হবে, তারাও বলবে, হ্যাঁ, এ তো মৃত্যু। অতঃপর তা যবাই করা হবে, এবং ঘোষণা করা হবে — হে জান্নাতবাসী, তোমাদের জন্য চিরস্থায়ী জীবন, আর কোনো মৃত্যু নেই; হে জাহান্নামবাসী, তোমাদের জন্যও চিরস্থায়ী অবস্থান, আর কোনো মৃত্যু নেই।” (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
মৃত্যু নিজেই নিঃশেষ হয়ে যাবে। যারা জান্নাতে, তারা জান্নাতে চিরকাল থাকবে; যারা জাহান্নামে, তারা জাহান্নামে চিরকাল থাকবে। “ওয়াহুম ফীহা খালিদূন।”
শিক্ষা
মুহাম্মাদ ﷺ যে আল্লাহর সত্য রাসূল, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ স্বয়ং কুরআন। এ কারণেই কুরআন সম্পর্কে সন্দেহ পোষণকারীদের প্রতি চিরকালীন চ্যালেঞ্জ — এর অনুরূপ একটিমাত্র সূরাও যদি কেউ রচনা করতে পারে, তবে করে দেখাক। এ চ্যালেঞ্জ আজও অপরাজিত, যা প্রমাণ করে কুরআন মানুষের নয়, আল্লাহর কালাম।
আল্লাহর দাসত্ব কোনো হীনতা নয়, বরং সর্বোচ্চ সম্মান। নবী ﷺ ছিলেন আদর্শ বান্দা, যিনি কৃতজ্ঞতাবশত ইবাদত করতেন — পার্থিব প্রাপ্তির আশায় নয়। তাই ইবাদত দুই শর্তে গ্রহণযোগ্য: আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠতা এবং নবী ﷺ-এর সুন্নাহ-অনুসরণ। আর যেহেতু সৎকর্ম সুন্নাহ অনুযায়ী হতে হবে, তাই জ্ঞান অর্জন কথা ও কাজের পূর্বশর্ত।
কুরআনকে প্রত্যাখ্যানের পরিণতি সেই আগুন, যার ইন্ধন মানুষ ও পাথর, যা কাফিরদের জন্য পূর্ণরূপে প্রস্তুত। বিপরীতে, যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তাদের জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী জান্নাত — প্রবাহিত নদী, পরিচিত অথচ ভিন্ন স্বাদের ফল, পবিত্র সঙ্গী এবং চিরন্তন জীবন, যেখানে মৃত্যুও নিঃশেষ হয়ে যাবে। ঈমান ও আমল — এ দুইয়ের সমন্বয়েই মেলে এই সুসংবাদ।