সূরা আল-বাকারা (২:১১–১২) — ফাসাদ বনাম ইসলাহ: সংশোধনের নামে বিপর্যয়

মুনাফিকদের মুখে ঈমানের দাবি ও অন্তরের ব্যাধির বর্ণনার পর কুরআন এবার তাদের একটি বিশেষ আচরণ তুলে ধরে—তারা যমিনে বিপর্যয় সৃষ্টি করে, অথচ তা “সংশোধন” বলে দাবি করে। এই দুটি আয়াতে ফাসাদের স্বরূপ এবং মুনাফিকদের বিকৃত আত্মোপলব্ধির চিত্র স্পষ্ট হয়েছে।

মুনাফিক: শব্দের ব্যুৎপত্তি

“মুনাফিক” সেই ব্যক্তি, যে নিফাক তথা কপটতায় আক্রান্ত। “নিফাক” শব্দটি ন-ফ-ক মূল থেকে, যেখান থেকে “ইনফাক” (ব্যয় করা) শব্দটিও আসে—”وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ” আয়াতে যা এসেছে। “নাফাক্ব”-এর আভিধানিক অর্থ “খারাজা” তথা বেরিয়ে যাওয়া। মুনাফিক ইসলামে প্রবেশ করে বটে, কিন্তু সামান্য কষ্ট বা চ্যালেঞ্জ দেখা দিলেই বেরিয়ে যায়—কারণ সে প্রথম থেকেই আন্তরিকভাবে প্রবেশ করেনি; দ্বীনের প্রতি তার কোনো নিষ্ঠা নেই।

একই মূল থেকে “নাফিকা” শব্দটি মরুভূমির একপ্রকার ইঁদুরের গর্ত বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যে গর্তের একাধিক মুখ থাকে। এর কারণ—কোনো সাপ বা শিকারি এক মুখে ওত পেতে থাকলে ইঁদুর অন্য মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়। মুনাফিকও তেমনি; সে ইসলামে প্রবেশ করে ঠিকই, কিন্তু বিপদ দেখা দিলে পালানোর পথ খোলা রাখে—কঠিন মুহূর্তে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে না, বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ খুঁজে নেয়।

وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ — যমিনে বিপর্যয় করো না (২:১১)

وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ قَالُوا إِنَّمَا نَحْنُ مُصْلِحُونَ

“আর যখন তাদের বলা হয়, তোমরা যমিনে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না, তখন তারা বলে, আমরা তো কেবল সংশোধনকারী।” — সূরা আল-বাকারা, ২:১১

“قِيلَ” (বলা হলো) শব্দটি কর্মবাচ্যে রাখা হয়েছে—কে বলল তা নির্দিষ্ট করা হয়নি। এই ব্যাপকতা নির্দেশ করে যে, যে-ই তাদের এ কথা বলুক—আল্লাহর বিধানই হোক, মুমিনগণই হোক বা নবী ﷺ-ই হোক—তাদের প্রতিক্রিয়া একই। কেউ ভাইকে দিয়ে কোনো কথা না শোনালে সে পিতামাতার শরণাপন্ন হয়, আর তখন সে শোনে; কিন্তু মুনাফিকদের ক্ষেত্রে উৎস নির্বিশেষে তাদের প্রতিক্রিয়া অপরিবর্তিত থাকে।

“ফাসাদ” শব্দের আভিধানিক অর্থ কোনো কিছু নষ্ট বা বিকৃত হয়ে যাওয়া—যেমন খাদ্য পচে গেলে তা আর ব্যবহারযোগ্য থাকে না, বরং ক্ষতির কারণ হয়। তাই “ইফসাদ” অর্থ বিপর্যয়, বিশৃঙ্খলা ও অনিষ্ট সৃষ্টি করা, যাতে অবস্থা স্বাভাবিক না থাকে। কেউ মিথ্যা বললে, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলে বা প্রতারণা করলে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়—তা-ই ফাসাদ। আর “আরদ” শব্দটি সমগ্র পৃথিবী, কোনো নির্দিষ্ট ভূমি, অঞ্চল বা দেশ—সবকিছু বোঝাতে পারে।

যমিনে ফাসাদ মূলত আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে জন্ম নেয় এবং তা দুই প্রকার। প্রথমত, ভৌত পৃথিবীতে ফাসাদ—মানুষ যখন পরস্পরকে প্রতারণা করে, মিথ্যা বলে, লেনদেনে অসততা করে, তখন আল্লাহর শাস্তি দুর্ভিক্ষ ও অনাবৃষ্টির মতো বিপর্যয়ের রূপে নেমে আসে। ফিরআউন যখন মূসা আলাইহিস সালামের কথা শোনেনি, তখন তার সম্প্রদায়ও এমন বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছিল:

وَلَقَدْ أَخَذْنَا آلَ فِرْعَوْنَ بِالسِّنِينَ وَنَقْصٍ مِّنَ الثَّمَرَاتِ لَعَلَّهُمْ يَذَّكَّرُونَ

“আর আমি ফিরআউনের অনুসারীদের দুর্ভিক্ষ ও ফল-ফসলের ঘাটতি দিয়ে পাকড়াও করেছিলাম, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।” — সূরা আল-আরাফ, ৭:১৩০

দ্বিতীয়ত, ভূমির অধিবাসীদের মধ্যে ফাসাদ—মিথ্যা, প্রতারণা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও অঙ্গীকার লঙ্ঘন সম্পর্ক নষ্ট করে, মানুষে-মানুষে অবিশ্বাস তৈরি করে, এমনকি সংঘাত ও রক্তপাত পর্যন্ত ডেকে আনে। মুনাফিকরা এই উভয় প্রকার ফাসাদই ঘটাত—একদিকে আল্লাহর অবাধ্যতার মাধ্যমে তাঁর শাস্তি ডেকে আনত, অন্যদিকে মিথ্যা ও পরনিন্দার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ ও অসদ্ভাব ছড়াত।

قَالُوا إِنَّمَا نَحْنُ مُصْلِحُونَ — “আমরা তো সংশোধনকারী” (২:১১)

তাদের এই ফাসাদ থেকে বিরত থাকতে বলা হলে তারা উত্তর দেয়, “إِنَّمَا نَحْنُ مُصْلِحُونَ”—আমরা তো কেবল সংশোধনকারী। “ইন্নামা” শব্দে “ইন্না” (নিশ্চয়ই)-এর সঙ্গে অতিরিক্ত “মা” যুক্ত হয়ে “হাসর” তথা সীমাবদ্ধতা বোঝায়—অর্থাৎ “বাস্তবতা কেবল এটিই।” তারা দাবি করে, তারা কেবলই সংশোধনকারী, ফাসাদ থেকে বহু দূরে।

“মুসলিহ” শব্দটি “ইসলাহ” থেকে, আর “ইসলাহ” এসেছে “সালাহ” (সঠিক ও যথাযথ হওয়া) থেকে; ইসলাহ অর্থ বিকৃত হয়ে যাওয়া জিনিসকে ঠিক করা, সংস্কার করা, উন্নত করা। তারা দাবি করে, তারা মুফসিদ নয়, বরং মুসলিহ—কিন্তু বাস্তবে এই দাবিই প্রমাণ করে যে তারা নিজেদের কর্মের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে অজ্ঞ। তারা নিজেদের অন্যায় কাজকেই সঠিক মনে করে, মন্দকে ভালো ভাবে; সঠিকভাবে বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারে না। যেমন কেউ বলে, “আমি কেবল কাউকে খুশি করতে বা মানুষকে হাসাতে মিথ্যা বলছি—সবাই বিষণ্ন ছিল, আমি একটা কৌতুক করে সবাইকে হাসালাম, এ তো ভালো কাজ!” এভাবে তারা মন্দ কাজকেই কল্যাণ বলে চালায়।

এরা আসলে সেই দাল্লীন—যাদের সঠিক জ্ঞান নেই। কুরআন এমন মানুষদের সম্পর্কে বলে:

قُلْ هَلْ نُنَبِّئُكُم بِالْأَخْسَرِينَ أَعْمَالًا ۝ الَّذِينَ ضَلَّ سَعْيُهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُونَ صُنْعًا

“বলুন, আমি কি তোমাদের সেই মানুষদের কথা জানাব, যারা আমলের দিক থেকে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত? তারাই, যাদের পার্থিব জীবনের প্রচেষ্টা বিফলে গেছে, অথচ তারা মনে করে যে তারা ভালো কাজই করছে।” — সূরা আল-কাহফ, ১৮:১০৩–১০৪

অর্থাৎ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত তারাই, যাদের কর্ম কেবল দুনিয়ায় সীমাবদ্ধ, অথচ তারা নিরন্তর ভাবে যে তারা উত্তম কাজ করছে—ঠিক মুনাফিকদের মতোই, যারা নিজেদের মন্দ কাজকে কল্যাণ মনে করে।

أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ الْمُفْسِدُونَ — তারাই প্রকৃত বিপর্যয়কারী (২:১২)

أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ الْمُفْسِدُونَ وَلَٰكِن لَّا يَشْعُرُونَ

“জেনে রাখো, নিশ্চয়ই তারাই বিপর্যয় সৃষ্টিকারী, কিন্তু তারা তা উপলব্ধি করে না।” — সূরা আল-বাকারা, ২:১২

আয়াতটি শুরু হয়েছে “أَلَا” দিয়ে, যা “হারফে তানবিহ” তথা সতর্ককারী শব্দ। এটি “আ” ও “লা”-এর সমন্বয়ে গঠিত একটি একক শব্দ (প্রশ্নবোধক হামযা ও নিষেধবাচক লা নয়)। বাক্যের শুরুতে এটি শ্রোতাকে সজাগ করে এবং যা বলা হচ্ছে তার সত্যতা ও দৃঢ়তা নিশ্চিত করে—অনেকটা “ইন্না”-র মতোই। তাই “আলা” একদিকে সতর্কীকরণ, অন্যদিকে সত্যতার নিশ্চয়তা—উভয় সুবিধা দেয়।

এরপর “إِنَّهُمْ هُمُ الْمُفْسِدُونَ”—এখানে “হুম” (তারা) সর্বনামটি দুবার এসেছে (“ইন্নাহুম”-এর সঙ্গে যুক্ত এবং পৃথকভাবে “হুমু”)। স্বতন্ত্রভাবে আসা এই পুনরাবৃত্ত সর্বনাম জোর ও হাসর—উভয়ই বোঝায়; অর্থাৎ কেবল তারাই, তারা ছাড়া আর কেউ নয়, প্রকৃত বিপর্যয়কারী। এভাবে “আলা,” “ইন্না” ও “হুম”—তিন স্তরের জোর দিয়ে আল্লাহ স্পষ্ট করে দিচ্ছেন যে, এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ করো না এবং তাদের দাবিতে বিভ্রান্ত হয়ো না—প্রকৃতপক্ষে তারাই বিপর্যয়কারী।

তবু “وَلَٰكِن لَّا يَشْعُرُونَ”—তারা তা উপলব্ধি করে না। তারা বোঝে না যে তাদের কাজ ইসলাহ নয়, বরং ফাসাদ; আর গোপনে ফাসাদ করে প্রকাশ্যে নেককার সাজলেও আল্লাহ তাদের সব কাজই জানেন—এ সত্যটুকুও তাদের উপলব্ধিতে আসে না।

ইসলাহের নামে ফাসাদ

এই আয়াতের একটি বাস্তব প্রয়োগ আমাদের চারপাশেই দেখা যায়—কখনো কখনো “তোমার ভালোর জন্যই বলছি” বলে এমন পরামর্শ দেওয়া হয়, যা আসলে সম্পর্কে বিপর্যয় ডেকে আনে। যেমন নবদম্পতির ক্ষেত্রে কাউকে বলা হতে পারে, “স্বামীর সব কথা শুনো না, নিজের অবস্থান শক্ত করো”—আপাতদৃষ্টিতে শুভাকাঙ্ক্ষামূলক শোনালেও এমন পরামর্শ সম্পর্কের শুরুতেই অবিশ্বাস ও বিরোধের বীজ বুনে দিতে পারে। বহু ক্ষেত্রে মানুষ ভাবে তারা সংশোধন করছে, পরিস্থিতি উন্নত করছে—অথচ প্রকৃতপক্ষে তারা ফাসাদই সৃষ্টি করছে, বুঝতে না পেরে। এ-ই মুনাফিকদের বিকৃত আত্মোপলব্ধির সমকালীন প্রতিফলন।

শিক্ষা

এই আয়াতগুলো থেকে প্রথম শিক্ষা—নিজের কর্মের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে সচেতন থাকা। মানুষ অনেক সময় মন্দ কাজকে কল্যাণ মনে করে এবং ফাসাদকে ইসলাহ ভেবে বসে; তাই কেবল নিজের অভিপ্রায় “ভালো” মনে হওয়াই যথেষ্ট নয়, কাজের প্রকৃত পরিণাম যাচাই করা প্রয়োজন। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত সেই মানুষ, যে ভুল পথে শ্রম দিয়েও ভাবে সে উত্তম কাজ করছে।

দ্বিতীয় শিক্ষা—ফাসাদ কেবল প্রকাশ্য অপকর্ম নয়। মিথ্যা, প্রতারণা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও পরনিন্দার মতো কাজ সম্পর্ক নষ্ট করে ও সমাজে বিশৃঙ্খলা ছড়ায়; আর আল্লাহর অবাধ্যতা ভৌত জগতেও বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। “তোমার ভালোর জন্য” বলা পরামর্শও যদি অবিশ্বাস ও বিরোধের জন্ম দেয়, তবে তা ইসলাহ নয়, ফাসাদ।

তৃতীয় শিক্ষা—আল্লাহর কাছে কোনো কিছুই গোপন নেই। মুনাফিকরা ভাবত তাদের গোপন কপটতা কেউ জানে না; কিন্তু আল্লাহ সব জানেন। তাই প্রকাশ্যে নেককার সাজা নয়, বরং অন্তর ও কর্মে প্রকৃত সততাই কাম্য।