সূরা আল-বাকারা (২:৬–৭) — কুফরের পরিণতি ও অন্তরে মোহর

সূরার সূচনায় মুত্তাকীদের পরিচয় ও তাদের সৌভাগ্যের কথা বলার পর আল্লাহ তাআলা এবার এমন একটি শ্রেণির কথা তুলে ধরেন, যারা সত্য প্রত্যাখ্যান করে এবং সেই প্রত্যাখ্যানে অটল থাকে। এই দুটি আয়াতে সেই কাফিরদের অবস্থা, তাদের অন্তর-কর্ণ-চক্ষুর রুদ্ধ হয়ে যাওয়া এবং আখিরাতে তাদের জন্য অপেক্ষমাণ মহাশাস্তির বর্ণনা এসেছে।

সূরা আল-ফাতিহার তিন শ্রেণি ও প্রসঙ্গের সংযোগ

সূরা আল-ফাতিহায় আমরা তিন শ্রেণির মানুষের কথা পড়েছি। প্রথম শ্রেণি “আল্লাযীনা আনআমতা আলাইহিম”—যাদের আল্লাহ হিদায়াত ও ঈমান দিয়ে অনুগ্রহ করেছেন। সূরা আল-বাকারার শুরুতে “أُولَٰئِكَ عَلَىٰ هُدًى مِّن رَّبِّهِمْ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ” আয়াতে এই মুত্তাকীদের কথাই বলা হয়েছে। দ্বিতীয় শ্রেণি “আল-মাগদূবি আলাইহিম”—যারা আল্লাহর ক্রোধ অর্জন করেছে; যাদের কাছে জ্ঞান পৌঁছেছে, কিন্তু তারা তা গ্রহণ করেনি, সে অনুযায়ী আমল করেনি। পরবর্তী দুটি আয়াত এই শ্রেণির মানুষদের নিয়েই আলোচনা করে—যারা জানে, তবু বিশ্বাস করে না, গৃহীত জ্ঞানের ভিত্তিতে কিছুই করে না; আর তাদের জন্য রয়েছে কঠিন পরিণতি।

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا — কুফরের প্রকৃতি (২:৬)

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا سَوَاءٌ عَلَيْهِمْ أَأَنذَرْتَهُمْ أَمْ لَمْ تُنذِرْهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ

“নিশ্চয়ই যারা কুফরি করেছে, তাদের জন্য সমান—আপনি তাদের সতর্ক করুন বা না করুন, তারা ঈমান আনবে না।” — সূরা আল-বাকারা, ২:৬

আয়াতের শুরুতে “إِنَّ” শব্দটি দৃঢ়তা প্রকাশ করে এবং কোনো বাস্তব সত্যকে জোর দিয়ে বর্ণনা করতে ব্যবহৃত হয়—অর্থাৎ ব্যাপারটি এমনই, এটিই বাস্তবতা।

“كَفَرُوا” এসেছে ক-ফ-র মূল থেকে, যা থেকে “কুফর” শব্দটিও আসে। কুফরের পরিভাষিক অর্থ আমরা সবাই জানি—অবিশ্বাস, অস্বীকার। তবে শব্দটির আভিধানিক অর্থ হলো ঢেকে রাখা, আড়াল করা। এই আভিধানিক অর্থেই আরবিতে কৃষককেও “কাফির” বলা হয়—কারণ সে বীজ মাটির নিচে ঢেকে রাখে; রাতকেও “কাফির” বলা হয়—কারণ তা সবকিছুকে অন্ধকারে ঢেকে ফেলে।

শরিয়তের পরিভাষায় কুফর মানে অবিশ্বাস। এর সঙ্গে আভিধানিক অর্থের সংযোগ স্পষ্ট: যখন কোনো মানুষ কুফর করে, তখন সে সেই সহজাত ফিতরাতকে ঢেকে ফেলে যার উপর আল্লাহ প্রতিটি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন; সে সত্যকে ঢেকে দেয়, অস্বীকার করে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্মরণ রাখা প্রয়োজন—”কাফির” কোনো গালি নয়। অনেক সময় একে অন্যকে অপমান করার জন্য এই শব্দ ব্যবহৃত হয়, যা ঠিক নয়। কোনো ব্যক্তিকে “কাফির” আখ্যা দেওয়া আমাদের অধিকার নয়, বিশেষত যে নিজেকে মুমিন বলে দাবি করে। বিচারক আল্লাহ; আমরা কাউকে এমন তকমা দেওয়ার অধিকার রাখি না। শব্দটি মূলত একটি বাস্তবতা-নির্দেশক পরিভাষা—যাদের কাছে সত্য পৌঁছানো হয়েছে, অথচ তারা তা ঢেকে দেয়, গ্রহণ করে না, অস্বীকার করে, তাদের আচরণ বোঝাতে এটি ব্যবহৃত হয়।

আভিধানিকভাবে কুফর শব্দটি অকৃতজ্ঞতার অর্থেও ব্যবহৃত হয়। কারণ কেউ যখন প্রাপ্ত অনুগ্রহের প্রতি অকৃতজ্ঞ হয়, তখন সে সেই অনুগ্রহকে যেন আড়াল করে; আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে সেই অনুগ্রহ প্রকাশিত ও পরিচিত হয়। তবে এই আয়াতের প্রসঙ্গে কুফর অর্থ অবিশ্বাসই।

সুতরাং “যারা কুফরি করেছে” বলতে বোঝায় তারা, যারা সত্যকে অস্বীকার করে ও গ্রহণ করে না। তারা কী অস্বীকার করে? যা কিছুতে ঈমান আনা অপরিহার্য—আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ, রাসূলগণ, আখিরাত এবং তাকদির। এগুলোর কোনোটিতে ঈমান না থাকলে ঈমান অসম্পূর্ণ থেকে যায়, আর তা অস্বীকার করাই কুফর। এই আয়াতের কাফির বলতে সকল যুগের কাফিরই উদ্দেশ্য—নবী ﷺ-এর সমকালের হোক বা তার পরবর্তী সময়ের।

سَوَاءٌ عَلَيْهِمْ — সতর্ক করা না-করা সমান (২:৬)

“سَوَاءٌ” এসেছে স-ও-য় মূল থেকে; এর অর্থ যা উভয় দিক থেকে সমান। বিশেষত “سَوَاء” যখন “عَلَى”-এর সঙ্গে আসে—যেমন এখানে “سَوَاءٌ عَلَيْهِمْ”—তখন অর্থ দাঁড়ায়, কোনো কিছু কোনো পার্থক্য সৃষ্টি করে না; করা আর না-করা সমান। তাই “তাদের জন্য সমান—আপনি সতর্ক করুন বা না করুন” অর্থাৎ আপনার সতর্কীকরণ তাদের কোনো উপকার করবে না, কোনো পরিবর্তন আনবে না।

এখানে “أَأَنذَرْتَهُمْ”-এর শুরুর “أَ” হলো হামযাতুল ইস্তিফহাম—প্রশ্নবোধক হামযা। “আনযারতা” ও “তুনযির” উভয়ই ন-য-র মূল থেকে, যা থেকে “নাযির” (সতর্ককারী) শব্দটি আসে। “ইনযার” মানে সতর্ক করা, কিন্তু এটি বিশেষ ধরনের সতর্কীকরণ, যার কয়েকটি দিক লক্ষণীয়।

প্রথমত, ইনযার হলো স্পষ্টভাবে ও পূর্ণরূপে জানিয়ে দেওয়া—কেবল ইঙ্গিত নয়, বরং বিপজ্জনক বা ক্ষতিকর কোনো বিষয়ে পরিষ্কারভাবে অবহিত করা, যাতে অপরজন তা বুঝতে পারে। দ্বিতীয়ত, জানানোর সঙ্গে সঙ্গে অন্তরে ভয়ের একটি উপাদান সঞ্চার করা—কারণ ক্ষতিকর কিছুর কথা শুনলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই শঙ্কিত হয়। তৃতীয়ত, সতর্কবার্তা না মানার পরিণতিও উল্লেখ করা—যেমন কোনো শিশুকে বিষাক্ত কিছু পান করতে দেখলে শুধু “থামো” বলা নয়, বরং “এতে তোমার ক্ষতি হতে পারে” এ কথাও বলা। চতুর্থত, ইনযার কোনো রূঢ় বা ভীতিপ্রদ ধমক নয়, বরং কোমলভাবে, শুভাকাঙ্ক্ষা ও সহানুভূতি থেকে সতর্ক করা—কারণ তুমি তার মঙ্গল চাও বলেই সতর্ক করছ, ঘৃণা থেকে নয়। পঞ্চমত, ইনযার হলো আগেভাগে সতর্ক করা, যাতে সতর্কতা কার্যকর হয়—যেমন রাস্তার সংকেত বিপদের ঠিক মুখে নয়, বরং আগেই থাকে, যাতে মানুষ নিজেকে রক্ষা করতে পারে।

সকল রাসূলই ছিলেন নাযির, আর নবী ﷺ-ও ছিলেন নাযির—কারণ তাঁরা এই সতর্কবার্তা শুভাকাঙ্ক্ষা, আন্তরিকতা, দয়া ও করুণা থেকে পৌঁছে দিয়েছেন। নবী ﷺ যখন সাফা পাহাড়ে দাঁড়িয়ে কুরাইশদের সতর্ক করেছিলেন, তখন বলেছিলেন:

فَإِنِّي نَذِيرٌ لَكُمْ بَيْنَ يَدَيْ عَذَابٍ شَدِيدٍ

“নিশ্চয়ই আমি তোমাদের জন্য এক কঠিন শাস্তির পূর্বে সতর্ককারী।” — সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম (সাফা পাহাড়ে কুরাইশদের সতর্ককরণের ঘটনা)

আয়াতে “আপনি” বলতে বিশেষভাবে নবী ﷺ-কে বোঝানো হয়েছে। নবী ﷺ-এর অন্তরে ছিল প্রবল আকাঙ্ক্ষা যে, সকল মানুষ ঈমান আনুক। তিনি জানতেন তিনিই শেষ রাসূল, তাঁর পরে আর কোনো রাসূল আসবেন না; তাই তিনি চাইতেন প্রতিটি মানুষ তাঁর আনা হিদায়াত থেকে উপকৃত হোক। কুরআনে তাঁর এই মানসিক অবস্থার বর্ণনা এসেছে:

فَلَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَّفْسَكَ عَلَىٰ آثَارِهِمْ إِن لَّمْ يُؤْمِنُوا بِهَٰذَا الْحَدِيثِ أَسَفًا

“তবে কি তারা এই বাণীতে ঈমান না আনায় তাদের পেছনে শোকে-দুঃখে আপনি নিজেকে বিনাশ করে ফেলবেন?” — সূরা আল-কাহফ, ১৮:৬

এই আয়াতে নবী ﷺ-কে দুটি বিষয় জানানো হচ্ছে। প্রথমত, এমন কিছু মানুষ আছে, যারা আপনি যতই চেষ্টা করুন না কেন ঈমান আনবে না—যেমন আবু জাহল, আবু লাহাব। তিনি চাইতেন তাঁর এই নিকটজনেরাও ঈমান আনুক; কিন্তু কুরআন জানিয়ে দেয়, “إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ”—আপনি যাকে ভালোবাসেন, তাকে হিদায়াত দিতে পারবেন না (সূরা আল-কাসাস, ২৮:৫৬)। দ্বিতীয়ত, তাঁকে আশ্বস্ত করা হচ্ছে যে, তারা ঈমান না আনলে তা তাঁর ত্রুটি নয়। কেউ উপদেশ গ্রহণ না করলে উপদেশদাতার মনে হতে পারে হয়তো তিনি ঠিকমতো বোঝাতে পারেননি; কিন্তু নবী ﷺ-কে জানানো হচ্ছে, তিনি তাঁর পূর্ণ প্রচেষ্টা চালিয়েছেন—দোষ তাদেরই, যারা প্রত্যাখ্যান করছে।

خَتَمَ اللَّهُ عَلَىٰ قُلُوبِهِمْ — অন্তরে মোহর (২:৭)

خَتَمَ اللَّهُ عَلَىٰ قُلُوبِهِمْ وَعَلَىٰ سَمْعِهِمْ ۖ وَعَلَىٰ أَبْصَارِهِمْ غِشَاوَةٌ ۖ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ

“আল্লাহ তাদের অন্তরে ও শ্রবণে মোহর এঁটে দিয়েছেন এবং তাদের চোখের উপর রয়েছে আবরণ; আর তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।” — সূরা আল-বাকারা, ২:৭

তারা কেন ঈমান আনবে না—পরবর্তী আয়াত তার কারণ জানায়: আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর এঁটে দিয়েছেন। “خَتَمَ” এসেছে খ-ত-ম মূল থেকে; এর অর্থ কোনো কিছুতে মোহর দেওয়া, বন্ধ করা, তালাবদ্ধ করা—যেমন চিঠি লেখা শেষ হলে তা খামে ভরে সিলমোহর করা হয়। একবার সিল করে দিলে ভেতরে কিছু ঢোকে না, বাইরেও কিছু বের হয় না। এই মোহর সর্বদা সমাপ্তিতে দেওয়া হয়; যেমন খতমুল কুরআন হলো সম্পূর্ণ কুরআন পাঠ শেষ করা। এই একই মূল থেকে নবী ﷺ-এর উপাধি “খাতামুন নাবিয়্যিন” তথা শেষ নবী—কারণ তাঁর পরে আর কোনো নবী আসবেন না।

“قُلُوب” হলো “قَلْب”-এর বহুবচন; কলব অর্থ অন্তর। কুরআনে “কলব” শব্দটি প্রায়ই কেবল রক্ত সঞ্চালনকারী দৈহিক অঙ্গকে নয়, বরং উপলব্ধি, বোধশক্তি ও যুক্তির সামর্থ্য বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। আভিধানিকভাবে “কলব” মানে উল্টেপাল্টে যাওয়া—আর আমাদের অন্তর তো সদা পরিবর্তনশীল; আজ এক অনুভূতি, কাল আরেক অনুভূতি, ক্ষণে ভালো লাগা, ক্ষণে অনীহা। এই অবিরাম পরিবর্তনশীলতার কারণেই অন্তরকে “কলব” বলা হয়।

অন্তরে মোহর এঁটে দেওয়ার অর্থ হলো আল্লাহর বাণী গ্রহণ, উপলব্ধি ও অনুধাবনে তাদের অক্ষমতা। যেহেতু অন্তর হলো বোঝা ও চিন্তা করার সামর্থ্য, তা মোহরাঙ্কিত হলে সেখানে কিছু প্রবেশ করে না, কিছু বেরও হয় না—তারা কিছু গ্রহণ করে না, কিছু নিয়ে চিন্তাও করে না। ফলে সেই অন্তরে ঈমান প্রবেশ করে না।

وَعَلَىٰ سَمْعِهِمْ — শ্রবণে মোহর (২:৭)

“سَمْع” এসেছে স-ম-ঈন মূল থেকে; এর দুটি অর্থ—শোনার সামর্থ্য এবং কান। শ্রবণে মোহরের অর্থ এই নয় যে তারা আক্ষরিক অর্থে বধির হয়ে যায়। আবু লাহাব মৃত্যু পর্যন্ত শুনতে পেত। বরং এর অর্থ কল্যাণকর কিছু শোনা ও তা থেকে উপকৃত হওয়ায় তাদের অক্ষমতা ও অনীহা। আরবিতে “শোনা” কেবল শব্দ শোনা নয়, বরং যা শোনা হলো তা গ্রহণ করা ও মেনে নেওয়াও বোঝায়—যেমন “আমার কথা শোনো” মানে আমি যা বলছি তা করো। আবু জাহল গোপনে কুরআন শুনতে যেত, কিন্তু তা তার কোনো উপকার করেনি—কারণ তার কান ছিল রুদ্ধ।

وَعَلَىٰ أَبْصَارِهِمْ غِشَاوَةٌ — দৃষ্টিতে আবরণ (২:৭)

“أَبْصَار” হলো “بَصَر”-এর বহুবচন; বাসার অর্থ দৃষ্টি ও চোখ উভয়ই। তাদের চোখের উপর রয়েছে “غِشَاوَة” তথা আবরণ। “গিশাওয়া” এসেছে গ-শ-য় মূল থেকে; এর অর্থ ঢেকে দেওয়া, পর্দা টেনে দেওয়া। তবে বিশেষভাবে গিশাওয়া এমন পর্দা, যার ভেতর দিয়ে সামান্য কিছু এখনো দেখা যায়—রং হয়তো স্পষ্ট বোঝা যায় না, কিন্তু আকৃতি আঁচ করা যায়।

চোখের উপর এই আবরণের অর্থ সত্যকে দেখা ও চিনতে তাদের অক্ষমতা। সামান্য দেখা গেলেও তারা তা থেকে উপকৃত হয় না; আল্লাহর সুস্পষ্ট নিদর্শনও দেখে হিদায়াত পায় না, সেগুলোর উপর চিন্তা করে না। যাঁরা আন্তরিক ছিলেন, তাঁরা নবী ﷺ-কে দেখে তাঁর নবুওয়াত চিনে নিয়েছিলেন; অথচ এই প্রত্যাখ্যানকারীরা নবী ﷺ-কে সামনে দেখেও কোনো উপকার লাভ করেনি। যে চোখ নবী ﷺ-কে দেখেও তাঁর প্রতি ঈমান আনে না, সেই দৃষ্টির কী মূল্য?

وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ — মহাশাস্তি (২:৭)

এই সব মানুষের পরিণাম—তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি। “عَذَاب” এসেছে আইন-যাল-বা মূল থেকে; এর অর্থ শাস্তি, যা মানুষকে যন্ত্রণা ও কষ্ট দেয়। আভিধানিকভাবে মূলটি তিনটি অর্থ বহন করে। প্রথমত, প্রচণ্ড পিপাসায় খেতে ও ঘুমাতে না পারা—মরুভূমিতে পানিহীন অবস্থায় গলা-মুখ শুকিয়ে গেলে মানুষ খাবার গিলতে পারে না, ঘুমাতেও পারে না। এ থেকে বোঝা যায় আযাব কেবল দৈহিক নয়, মানসিক যন্ত্রণাও—শারীরিক কষ্টের সঙ্গে “পানি কোথায় পাব” এই মানসিক অস্থিরতাও যুক্ত। দ্বিতীয়ত, “আযব” মানে মধুর/মিষ্ট; সেই অর্থে “আযাব” হলো কোনো কিছুর মাধুর্য, আনন্দ ও স্বস্তি সম্পূর্ণ কেড়ে নেওয়া—শাস্তি মানুষের সুখ ও আনন্দের পুরোপুরি অবসান ঘটায়। তৃতীয়ত, মূলটি বন্দিত্ব ও অবরুদ্ধতার অর্থও দেয়—শাস্তি মানুষকে কেবল সেই শাস্তি ভোগেই আবদ্ধ করে রাখে।

শাস্তিটি “عَظِيم” তথা মহা। “আযীম” এসেছে আইন-জ্বা-মীম মূল থেকে এবং এটি “হাকির” (তুচ্ছ, নগণ্য)-এর বিপরীত। “বড়” অর্থে “কাবীর” শব্দও ব্যবহৃত হয়, তবে “আযীম” কেবল আকারে বড় বোঝায় না, বরং এর সঙ্গে কুওয়া (শক্তি) ও শিদ্দা (তীব্রতা)-এর অর্থও যুক্ত। এই মূল থেকেই বড় ও শক্ত হাড়কে “আযম” বলা হয়—কারণ তা কেবল বড় নয়, মজবুতও। তাই “আযাবুন আযীম” মানে এমন শাস্তি, যা বিশাল, তীব্র এবং চিরস্থায়ী। জাহান্নামবাসীদের জন্য আল্লাহ যে শাস্তি প্রস্তুত করেছেন, তার চেয়ে কঠোর কিছু সৃষ্টি করা হয়নি। এই শাস্তির গভীরতা সম্পর্কে একটি হাদিসে এসেছে—আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, একবার আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সঙ্গে ছিলাম, এমন সময় একটি বিকট শব্দ শোনা গেল। রাসূলুল্লাহ ﷺ জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কি জানো এটি কিসের শব্দ? আমরা বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি বললেন:

هَذَا حَجَرٌ رُمِيَ بِهِ فِي النَّارِ مُنْذُ سَبْعِينَ خَرِيفًا، فَهُوَ يَهْوِي فِي النَّارِ الْآنَ حَتَّى انْتَهَى إِلَى قَعْرِهَا

“এটি একটি পাথর, যা সত্তর বছর আগে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়েছিল; তা এতক্ষণ জাহান্নামে পড়তে পড়তে এইমাত্র তার তলদেশে পৌঁছেছে।” — সহীহ মুসলিম

অন্তরে মোহর দেওয়া হয় কেন?

এখানে স্বাভাবিক প্রশ্ন জাগে—আল্লাহই যদি তাদের অন্তরে মোহর এঁটে দেন, তবে তাদের দোষ কোথায়? এর কয়েকটি কারণ মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেছেন।

প্রথমত, যে সামর্থ্য ব্যবহার করা হয় না, তা ক্রমে অকার্যকর হয়ে পড়ে। যে পেশি বা অঙ্গ ব্যবহৃত হয় না, তা দুর্বল হয়ে যায়; যে যন্ত্র ব্যবহৃত হয় না, তাতে মরিচা ধরে। এরা তাদের অন্তর, বিবেক, শ্রবণ ও দৃষ্টি ব্যবহার করেনি। আল্লাহ তাদের ফিতরাত দিয়ে সৃষ্টি করেছিলেন, তাদের কাছে নবী ﷺ ও বহু নিদর্শন পাঠিয়েছিলেন; কিন্তু আল্লাহ-প্রদত্ত সামর্থ্য কাজে না লাগানোয় তারা সেই সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছে। কুরআন বলে:

فَلَمَّا زَاغُوا أَزَاغَ اللَّهُ قُلُوبَهُمْ

“অতঃপর তারা যখন বক্রতা অবলম্বন করল, তখন আল্লাহ তাদের অন্তরকে বাঁকা করে দিলেন।” — সূরা আস-সফ, ৬১:৫

অর্থাৎ তারা নিজেরা যখন বিপথগামিতার সিদ্ধান্ত নিল, তখনই আল্লাহ তাদের অন্তর বিপথগামী করলেন। সত্য তাদের সামনে উপস্থাপিত হয়েছিল, কিন্তু তারা নিজেদের চোখ, অন্তর ও কান বন্ধ করে দিল; নিজেদের সামর্থ্য কাজে না লাগানোয় আল্লাহ সেই সামর্থ্য কেড়ে নিলেন। এটি অত্যন্ত ভীতিজনক—আল্লাহ আমাদের যে সামর্থ্য, সময় বা সুযোগ দিয়েছেন, তা কল্যাণের কাজে ব্যবহার না করলে তা আমাদের জন্য দায় হয়ে দাঁড়ায়।

দ্বিতীয়ত, তাদের ইচ্ছাকৃত ও অবিরাম প্রত্যাখ্যানের শাস্তি হিসেবেই আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর এঁটেছেন। নবী ﷺ দীর্ঘকাল তাদের মধ্যে ছিলেন; নবুওয়াতের আগে-পরে তারা তাঁকে চিনত, তাঁকে দেখেছে, জানত তিনি নবী—তবু ইচ্ছাকৃতভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। এই অবিরাম অস্বীকারের কারণেই আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর এঁটে শাস্তি দিয়েছেন। কুরআন বলে:

بَلْ طَبَعَ اللَّهُ عَلَيْهَا بِكُفْرِهِمْ فَلَا يُؤْمِنُونَ إِلَّا قَلِيلًا

“বরং তাদের কুফরির কারণে আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর এঁটে দিয়েছেন; তাই তারা অল্পসংখ্যক ছাড়া ঈমান আনে না।” — সূরা আন-নিসা, ৪:১৫৫

অর্থাৎ আল্লাহ অন্তরে মোহর তখনই এঁটেন, যখন মানুষ প্রথমে নিজে ইচ্ছাকৃতভাবে কুফর করে। আল্লাহ প্রত্যেককে অন্তর, বিবেক ও নানা সামর্থ্য দান করেছেন; সেগুলোকে ভুল পথে ব্যবহার করার পরিণতি রয়েছে।

শিক্ষা

এই দুটি আয়াত সেই মানুষদের কথা বলে, যাদের কাছে জ্ঞান ও হিদায়াত পৌঁছানো হয়েছে—তারা জানে কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা—তবু সত্যের সামনে নতিস্বীকার করে না, তা গ্রহণ করে না। এর পরিণামে আল্লাহ শাস্তিস্বরূপ তাদের সামর্থ্যের উপর মোহর এঁটে দেন, আর আখিরাতে রয়েছে ভয়াবহ পরিণতি।

পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে আমাদের জানানো হয়েছিল, কুরআন থেকে হিদায়াত পেতে হলে কী কী কাজ করতে হবে; এখানে সতর্ক করা হচ্ছে, হিদায়াত থেকে বঞ্চিত না হতে হলে কী করা যাবে না। এর মূল শিক্ষা হলো—সত্য যখন সামনে আসে, যখন আমরা তা দেখি বা শুনি, তখন তা গ্রহণ করা। কোনো বিষয় বুঝতে বা মেনে নিতে কঠিন মনে হলে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া। অনেক কিছু অধ্যয়ন করতে গিয়ে মনে “কেন, কীভাবে” জাতীয় প্রশ্ন জাগতে পারে; কিন্তু “ذَٰلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيهِ”—এই কিতাবে কোনো সন্দেহ নেই। এতে যে কল্যাণ আছে, তা নিশ্চিত জেনে গ্রহণ করলে আল্লাহ অন্তর উন্মুক্ত করে দেবেন।

আমাদের প্রত্যেকের জন্যই এতে গভীর সতর্কবার্তা রয়েছে—আল্লাহ যে অন্তর, শ্রবণ ও দৃষ্টি দিয়েছেন, তা সত্য গ্রহণে ব্যবহার না করলে তা ক্রমে অকার্যকর হয়ে পড়ে। তাই আল্লাহ-প্রদত্ত সামর্থ্য, সময় ও সুযোগকে সেই পথেই কাজে লাগানো উচিত, যা নিজের ও অন্যের কল্যাণ বয়ে আনে।