সূরা আল-বাকারা (২:১৩–১৬) — সত্যকে মূর্খতা বলা, দ্বিমুখী আচরণ ও হিদায়াত বিক্রি
মুনাফিকদের কপটতার বর্ণনা এখানে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। তারা প্রকৃত মুমিনদের মূর্খ আখ্যা দেয়, মুমিন ও নিজেদের নেতৃবৃন্দের সামনে দুই রকম মুখ দেখায়, মুমিনদের নিয়ে ঠাট্টা করে—আর পরিণামে হিদায়াত বিসর্জন দিয়ে গোমরাহি কিনে নেয়। এই চারটি আয়াতে তাদের এই সম্পূর্ণ চিত্র উন্মোচিত হয়েছে।
آمِنُوا كَمَا آمَنَ النَّاسُ — “মানুষের মতো ঈমান আনো” (২:১৩)
وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ آمِنُوا كَمَا آمَنَ النَّاسُ قَالُوا أَنُؤْمِنُ كَمَا آمَنَ السُّفَهَاءُ ۗ أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ السُّفَهَاءُ وَلَٰكِن لَّا يَعْلَمُونَ
“আর যখন তাদের বলা হয়, তোমরা ঈমান আনো যেমন মানুষ ঈমান এনেছে, তখন তারা বলে, আমরা কি ঈমান আনব যেমন নির্বোধরা ঈমান এনেছে? জেনে রাখো, নিশ্চয়ই তারাই নির্বোধ, কিন্তু তারা জানে না।” — সূরা আল-বাকারা, ২:১৩
এখানে “كَمَا” শব্দে “কা” (যেমন) হলো হারফে তাশবিহ—সাদৃশ্য বোঝায়। “মানুষ যেমন ঈমান এনেছে”—এই “মানুষ” বলতে বিশেষভাবে সাহাবিগণকে বোঝানো হয়েছে, যাঁদের ঈমান ছিল সত্য, আন্তরিক ও নিষ্ঠাপূর্ণ; তাঁরা যা মুখে বলতেন তা অন্তরেও ধারণ করতেন এবং কর্মেও প্রমাণ করতেন—ত্যাগ ও আমলে ভরা সেই ঈমান। তাই “তাদের মতো ঈমান আনো” অর্থ কেবল মুখে দাবি নয়, বরং কর্মেও প্রমাণ করো।
এর উত্তরে মুনাফিকরা বলে, “أَنُؤْمِنُ كَمَا آمَنَ السُّفَهَاءُ”—আমরা কি নির্বোধদের মতো ঈমান আনব? শুরুর হামযা এখানে অলংকারিক প্রশ্ন (রেটোরিক্যাল প্রশ্ন)—উত্তর কাম্য নয়, বরং এর উদ্দেশ্য অস্বীকার (আমরা ঈমান আনব না) ও তাহকির (তুচ্ছ করা)। তারা প্রকৃত মুমিনদের—সাহাবিদের—”সুফাহা” তথা নির্বোধ আখ্যা দেয়।
“সুফাহা” হলো “সাফিহ”-এর বহুবচন; “সাফাহ” অর্থ মূর্খতা, স্বল্পবুদ্ধি। আভিধানিকভাবে এর অর্থ ওজনে হালকা হওয়া—যেমন বলা হয় বাতাস হালকা জিনিসকে উড়িয়ে নেয় (শুকনো পাতা বা কাগজ সহজেই উড়ে যায়)। মূর্খ ব্যক্তি মানসিকভাবে “হালকা”—সহজেই প্রভাবিত ও বিচলিত হয়; পক্ষান্তরে গভীর বোধ ও দৃঢ়তাসম্পন্ন মানুষকে সহজে টলানো যায় না।
মুনাফিকরা মুমিনদের নির্বোধ বলত কেন? কারণ মুমিনরা অদৃশ্যে বিশ্বাস করত, রাসূল ﷺ-কে পূর্ণভাবে অনুসরণ করত, নবী ﷺ-এর সত্যতা দেখামাত্র নিঃসংশয়ে ঈমান এনেছিল—অথচ মুনাফিকরা প্রবেশ করেছিল সংশয় নিয়ে। সর্বোপরি মুমিনরা আল্লাহর পথে ত্যাগ স্বীকার করত—পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, সদকা, সম্পদ ব্যয়, কুরবানি—আর এতে পার্থিব স্বার্থ হারাত। মুনাফিকরা যেহেতু কেবল পার্থিব সুবিধার জন্যই ইসলামে এসেছিল, তাই এই ত্যাগস্বীকারকারী মুমিনদের আচরণ তাদের কাছে মূর্খতা মনে হতো।
আল্লাহ উত্তর দেন, “أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ السُّفَهَاءُ”—তিন স্তরের জোরে (আলা, ইন্না, হুম) স্পষ্ট করে দেন যে, প্রকৃতপক্ষে তারাই নির্বোধ। কারণ প্রকৃত মূর্খতা হলো নিজের জন্য যা প্রকৃত কল্যাণকর তা দেখতে ও তা থেকে উপকৃত হতে না পারা। মানুষের জন্য প্রকৃত কল্যাণ দ্বীন; দুনিয়ার সুবিধা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু এখন ত্যাগ স্বীকার করে পরে স্থায়ী প্রতিদান পাওয়াই প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা—যেমন মানুষ ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করে বা বিনিয়োগ করে। এই নীতি জীবনের সব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হলেও দ্বীনের বেলায় মানুষ উল্টো ভাবে। কুরআন বলে:
وَمَن يَرْغَبُ عَن مِّلَّةِ إِبْرَاهِيمَ إِلَّا مَن سَفِهَ نَفْسَهُ
“আর যে নিজেকে নির্বোধ বানায়, সে ছাড়া আর কে ইবরাহিমের ধর্ম থেকে বিমুখ হবে?” — সূরা আল-বাকারা, ২:১৩০
অথচ মুনাফিকরা নিজেদের মূর্খতা উপলব্ধি করে না (“وَلَٰكِن لَّا يَعْلَمُونَ”)—কারণ তারা দাল্লীন, যাদের সঠিক জ্ঞান নেই এবং যারা সে অনুযায়ী আমলও করে না।
وَإِذَا لَقُوا الَّذِينَ آمَنُوا — দুই মুখের আচরণ (২:১৪)
وَإِذَا لَقُوا الَّذِينَ آمَنُوا قَالُوا آمَنَّا وَإِذَا خَلَوْا إِلَىٰ شَيَاطِينِهِمْ قَالُوا إِنَّا مَعَكُمْ إِنَّمَا نَحْنُ مُسْتَهْزِئُونَ
“আর যখন তারা মুমিনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, তখন বলে, আমরা ঈমান এনেছি; আর যখন তারা নিজেদের শয়তানদের সঙ্গে একান্তে মিলিত হয়, তখন বলে, আমরা তো তোমাদের সঙ্গেই আছি, আমরা তো কেবল ঠাট্টা করছিলাম।” — সূরা আল-বাকারা, ২:১৪
“লাকু” (মূল ল-ক-য়) অর্থ মুখোমুখি হওয়া, সাক্ষাৎ করা। মুমিনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে তারা বলে “আমরাও ঈমান এনেছি,” এবং তৎক্ষণাৎ নিজেদের ধার্মিকতা ও নেকির কথা বলতে শুরু করে। কেন? কারণ ভেতরে অপরাধবোধ ও ভয় কাজ করে।
কিন্তু “وَإِذَا خَلَوْا إِلَىٰ شَيَاطِينِهِمْ”—যখন নিজেদের শয়তানদের সঙ্গে একান্তে মিলিত হয়। “খালা/ইয়াখলু” (মূল খ-ল-ও) অর্থ শূন্য হওয়া; আর “খালা ইলা” অর্থ কারও সঙ্গে একান্তে মিলিত হওয়া—বিশেষত পরামর্শ গ্রহণের উদ্দেশ্যে। “শায়াতিন” হলো “শয়তান”-এর বহুবচন; “শয়তান” অর্থ দূরবর্তী—আল্লাহর রহমত, সত্য, হিদায়াত ও সকল কল্যাণ থেকে দূরে। শয়তান কেবল ইবলিসেই সীমাবদ্ধ নয়; সূরা আন-নাস অনুযায়ী শয়তান জিন ও মানুষ উভয়ের মধ্যেই থাকতে পারে (“مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ”)। যে-কেউ মন্দে প্ররোচিত ও উদ্বুদ্ধ করে, সে-ই শয়তান। এখানে “তাদের শয়তান” বলতে তাদের সেই মন্দ নেতৃবৃন্দকে বোঝানো হয়েছে, যারা তাদের আল্লাহর অবাধ্যতায় প্ররোচিত করত।
নেতৃবৃন্দের কাছে তারা বলে “إِنَّا مَعَكُمْ”—আমরা তোমাদের সঙ্গেই আছি, তোমাদের অনুসারী, তোমাদের আদেশ পালনকারী। মুমিনদের কাছে ভয়ে বলে “আমরা ঈমান এনেছি,” আবার নেতৃবৃন্দের কাছে ভয়ে বলে “আমরা তোমাদের সঙ্গে”—অর্থাৎ এমন ব্যক্তি কারও প্রতিই অনুগত নয়; সে দ্বিমুখী, কারণ সে ভীত। আর তারা যোগ করে “إِنَّمَا نَحْنُ مُسْتَهْزِئُونَ”—আমরা তো কেবল ঠাট্টা করছিলাম, অর্থাৎ মুমিনদের নিয়ে। “ইস্তিহযা” (মূল হ-য-আ) অর্থ কাউকে তুচ্ছ ও নগণ্য গণ্য করে ঠাট্টা করা, উপহাস করা।
اللَّهُ يَسْتَهْزِئُ بِهِمْ — আল্লাহর প্রত্যুত্তর (২:১৫)
اللَّهُ يَسْتَهْزِئُ بِهِمْ وَيَمُدُّهُمْ فِي طُغْيَانِهِمْ يَعْمَهُونَ
“আল্লাহ তাদের সঙ্গে ঠাট্টা করেন এবং তাদের অবাধ্যতায় তাদের ঢিল দেন, ফলে তারা দিশেহারা হয়ে ঘুরতে থাকে।” — সূরা আল-বাকারা, ২:১৫
“আল্লাহ তাদের সঙ্গে ঠাট্টা করেন”—এ বোঝার জন্য আরবি ভাষার “মুশাকালা” রীতি জানা প্রয়োজন। মুশাকালা হলো, অপরাধ বর্ণনায় যে শব্দ ব্যবহৃত হয়, সেই একই শব্দ সেই অপরাধের শাস্তি বোঝাতেও ব্যবহার করা—যদিও দুই ক্ষেত্রে অর্থ ভিন্ন। যেমন কুরআন বলে, “মন্দের প্রতিফল তার অনুরূপ মন্দ” (সূরা আশ-শূরা, ৪২:৪০)—প্রতিশোধ গ্রহণ প্রকৃতপক্ষে মন্দ নয়, তবু একে “মন্দ” বলা হয়েছে, যাতে বোঝা যায় প্রতিশোধ গ্রহণকারীর সেই সামর্থ্য ও ক্ষমতা রয়েছে। তেমনি “আল্লাহ তাদের সঙ্গে ঠাট্টা করেন” অর্থ—আল্লাহর তাদের শাস্তি দেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে, আর তাদের ঠাট্টার প্রতিফল তাদের ওপরই বর্তাবে। এখানে আল্লাহ মুমিনদের পক্ষ নিচ্ছেন—মুনাফিকরা মুমিনদের নিয়ে ঠাট্টা করেছিল, তাই আল্লাহ নিজেই তাদের প্রত্যুত্তর দিচ্ছেন। কুরআন বলে:
إِنَّ اللَّهَ يُدَافِعُ عَنِ الَّذِينَ آمَنُوا
“নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের পক্ষে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।” — সূরা আল-হাজ্জ, ২২:৩৮
তাই কেউ আল্লাহর পথে চলতে গিয়ে অপমান, কষ্ট বা ক্লান্তির শিকার হলে জেনে রাখা উচিত, আল্লাহ তার পক্ষে আছেন। ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত একটি বর্ণনায় এসেছে, আখিরাতে মুনাফিকদের সঙ্গে এভাবে “ঠাট্টা” করা হবে—তারা জাহান্নামে থাকা অবস্থায় তাদের জন্য জান্নাতের দিকে একটি দরজা খুলে দেওয়া হবে, তারা সেদিকে ছুটবে, কিন্তু কাছে পৌঁছতেই দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে; এরপর আরেকটি দরজা খোলা হবে, কাছে গেলেই তা-ও বন্ধ হবে—এভাবে চলতে থাকবে। অন্যকে নিয়ে ঠাট্টা করা তাই অত্যন্ত বিপজ্জনক।
وَيَمُدُّهُمْ فِي طُغْيَانِهِمْ يَعْمَهُونَ — অবকাশ ও অন্ধ বিচরণ (২:১৫)
“يَمُدُّهُمْ” (মূল ম-দ-দ) অর্থ লম্বায় বাড়ানো, প্রসারিত করা; অর্থাৎ আল্লাহ তাদের অবকাশ দেন, তৎক্ষণাৎ পাকড়াও করেন না, তাদের ইচ্ছেমতো চলতে দেন। “তুগইয়ান” (মূল ত-গ-য়) অর্থ সীমা অতিক্রম করা—যেমন সূরা আল-হাক্কায় নূহের প্লাবন সম্পর্কে বলা হয়েছে, “পানি যখন সীমা ছাড়িয়ে গেল” (৬৯:১১)। কর্মক্ষেত্রে তুগইয়ান হলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমার তোয়াক্কা না করা। তাদের এই তুগইয়ান হলো তাদের ঠাট্টা, মিথ্যা, অহংকার ও অস্বীকৃতি। আল্লাহ তাদের অবকাশ দেওয়ায় তারা ভাবে সব ঠিকই আছে—কারণ ভুল হলে তো তাদের থামিয়ে দেওয়া হতো।
আর এই অবস্থায় তারা “يَعْمَهُونَ”—দিশেহারা হয়ে ঘুরতে থাকে। “আমাহ” (মূল আইন-মিম-হা) অর্থ অন্তরের অন্ধত্ব—দৃষ্টির অন্ধত্ব নয়, বরং অনুধাবন ও উপলব্ধির অক্ষমতা; বিভ্রান্তির এমন অবস্থা, যেখানে মানুষ সামনের সুস্পষ্ট সত্যও দেখে না। তারা নিজেদের অন্যায় কাজে এমন নিমগ্ন যে সেই অন্যায় তারা দেখতেই পায় না।
এই “কিছুতেই পরোয়া নেই” মনোভাবই মুনাফিকের বৈশিষ্ট্য—সতর্ক করলে উপলব্ধি করে না, দেখালে দেখে না, বোঝালে ঠাট্টা করে, গুরুতর বিষয়েও তামাশা করে; সীমা অতিক্রম করে চলে। পক্ষান্তরে মুমিনরা সচেতন ও সতর্ক—তারা মুত্তাকি। একটি ঘটনায় এসেছে, একবার এক প্রতিনিধিদলের নেতা নিয়োগ নিয়ে আবু বকর ও উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমার মতভেদ হয় এবং নবী ﷺ-এর উপস্থিতিতে তাঁদের কণ্ঠস্বর উঁচু হয়ে যায়। তখন আল্লাহ নাযিল করেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ
“হে মুমিনগণ, তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের ওপর তোমাদের কণ্ঠস্বর উঁচু করো না।” — সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:২
এরপর উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুর কণ্ঠস্বর এত নিচু হয়ে যেত যে নবী ﷺ-কে তা পুনরাবৃত্তি করতে বলতে হতো (সহীহ বুখারী)। মুমিনরা সচেতন—তারা তুগইয়ান করে না; কিন্তু মুনাফিককে ভুল ধরিয়ে দিলেও সে পরোয়া করে না, ফলে আল্লাহ তাকে তার অবাধ্যতায় ছেড়ে দেন এবং সে অন্তর্দৃষ্টি হারিয়ে ফেলে। নবী ﷺ বলেছেন:
خَصْلَتَانِ لَا تَجْتَمِعَانِ فِي مُنَافِقٍ: حُسْنُ سَمْتٍ وَفِقْهٌ فِي الدِّينِ
“দুটি গুণ মুনাফিকের মধ্যে একত্র হয় না: উত্তম আচরণ এবং দ্বীনের গভীর বোধ।” — জামিʿ আত-তিরমিযি
اشْتَرَوُا الضَّلَالَةَ بِالْهُدَىٰ — গোমরাহি কিনে হিদায়াত বিসর্জন (২:১৬)
أُولَٰئِكَ الَّذِينَ اشْتَرَوُا الضَّلَالَةَ بِالْهُدَىٰ فَمَا رَبِحَت تِّجَارَتُهُمْ وَمَا كَانُوا مُهْتَدِينَ
“এরাই তারা, যারা হিদায়াতের বিনিময়ে গোমরাহি কিনে নিয়েছে; তাদের এই ব্যবসা লাভজনক হয়নি, আর তারা হিদায়াতপ্রাপ্তও ছিল না।” — সূরা আল-বাকারা, ২:১৬
“أُولَٰئِكَ” (এরা/ওরা) দূরত্বসূচক শব্দ, যা এখানে তাদের অতি-নীচু ও অবনমিত অবস্থান নির্দেশ করে—আগেই উল্লেখ হয়েছে তারা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকবে। “اشْتَرَوُا” (মূল শ-র-য়) অর্থ একটি জিনিসের বিনিময়ে অন্যটি নেওয়া—কেনা ও বেচা উভয়ই। কেউ কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে কিছু কিনলে বোঝা যায় সেই জিনিসটিকে সে বেশি মূল্য দেয়। মুনাফিকরা হিদায়াত দিয়ে গোমরাহি কিনেছে—অর্থাৎ তারা ঈমানের চেয়ে কুফরকে, ইয়াকিনের চেয়ে সংশয়কে প্রাধান্য দিয়েছে।
বিষয়টি অদ্ভুত। যে গুরুতর অসুস্থ, তার চিকিৎসার সামর্থ্য থাকলেও যদি বলে “আমি স্বাস্থ্যের চেয়ে অর্থকে বেশি ভালোবাসি”—এমন কেউ করে না; বরং মানুষ ঋণ নেয়, সম্পদ বন্ধক রাখে, চিকিৎসার জন্য সব করে। কিন্তু মুনাফিকরা এর উল্টো—তারা সুস্থতার বদলে অসুস্থতা, জ্ঞানের বদলে অজ্ঞতা, ইয়াকিনের বদলে সংশয় বেছে নেয়। আল্লাহ তাদের কাছে রাসূল ও জ্ঞান পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু তারা তা চায়নি, বরং তা বিসর্জন দিয়েছে।
এই ব্যবসায় তারা কোনো লাভ করেনি (“فَمَا رَبِحَت تِّجَارَتُهُمْ”)—”রিবহ” অর্থ লাভ, “তিজারা” অর্থ লাভের উদ্দেশ্যে ক্রয়-বিক্রয়। দুনিয়াতেও তারা লাভবান হয়নি—না মুমিনদের পক্ষে, না কাফিরদের পক্ষে; দোদুল্যমান অবস্থায় থেকেছে। আখিরাতেও তারা লাভবান নয়—জান্নাত তাদের জন্য নয়। “وَمَا كَانُوا مُهْتَدِينَ”—আর তারা হিদায়াতপ্রাপ্তও ছিল না। “মুহতাদি” সেই ব্যক্তি, যে হিদায়াত গ্রহণ করে ও অন্তরে ধারণ করে; মুনাফিকরা তা নয়, তাই তারা পথভ্রষ্ট।
জ্ঞানের বদলে অজ্ঞতা বেছে নেওয়া
এই শেষ আয়াতের একটি বাস্তব প্রতিফলন হলো, কেউ কেউ জেনেশুনে জ্ঞানের চেয়ে অজ্ঞতাকে বেছে নেয়। কেউ বলে, “আমি কুরআন বা দ্বীন শিখতে চাই না, কারণ শিখলে তা মানতে হবে; না শিখলে মানার দায়ও থাকবে না।” এটি জ্ঞানের বদলে অজ্ঞতা বেছে নেওয়া—আর এ-ই মুনাফিকদের রীতি। এমনকি কখনো কেউ অন্যকে দ্বীনে পূর্ণভাবে প্রবেশ করা থেকে বিরত রাখতে চায়, শিথিলতাকে “স্বাধীনতা” বলে উপস্থাপন করে—এ-ও হিদায়াতের বিনিময়ে গোমরাহি বেছে নেওয়ারই একটি রূপ।
অথচ আমরা প্রতিদিন সূরা আল-ফাতিহায় প্রার্থনা করি, “اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ”—হে আল্লাহ, আমাদের সরল পথ দেখান; আর সেই সরল পথই কুরআনে বর্ণিত। যে হিদায়াত আমরা প্রতিদিন চাই, তা পেয়ে বিসর্জন দেওয়া মুনাফিকির লক্ষণ।
শিক্ষা
এই আয়াতগুলো থেকে প্রথম শিক্ষা—প্রকৃত মূর্খতা হলো নিজের জন্য যা সত্যিকারের কল্যাণকর তা দেখতে না পারা। দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী সুবিধার জন্য দ্বীনের স্থায়ী কল্যাণ বিসর্জন দেওয়াই প্রকৃত নির্বুদ্ধিতা, যদিও তা বাইরে “বুদ্ধিমত্তা” মনে হতে পারে।
দ্বিতীয় শিক্ষা—দ্বিমুখিতা কপটতার লক্ষণ। যে একেক পক্ষের কাছে একেক মুখ দেখায়, সে প্রকৃতপক্ষে কারও প্রতিই অনুগত নয়; আর এই দ্বিমুখিতার মূলে থাকে ভয়। মুমিনের বৈশিষ্ট্য এর বিপরীত—প্রকাশ্যে ও গোপনে অভিন্ন সততা।
তৃতীয় শিক্ষা—অন্যকে নিয়ে ঠাট্টা করা অত্যন্ত বিপজ্জনক; তার প্রতিফল ঠাট্টাকারীর ওপরই বর্তায়। আর আল্লাহ তাঁর পথে চলা মুমিনদের পক্ষ নেন; কেউ আল্লাহর জন্য কষ্ট বা অপমান সহ্য করলে জেনে রাখা উচিত, আল্লাহ তার সঙ্গে আছেন।
চতুর্থ শিক্ষা—”পরোয়া নেই” মনোভাব ও সীমালঙ্ঘন (তুগইয়ান) থেকে বিরত থাকা। ভুল ধরিয়ে দিলে সচেতন হওয়া ও সংশোধিত হওয়াই মুমিনের গুণ; অবজ্ঞা ও ঔদ্ধত্য মানুষকে অন্তর্দৃষ্টিহীন করে ফেলে। আর জেনেশুনে জ্ঞান ও হিদায়াত এড়িয়ে যাওয়া হলো সবচেয়ে বড় ক্ষতির ব্যবসা—যাতে দুনিয়া-আখিরাত কোনোটিতেই লাভ নেই।