সূরা আল-বাকারা — হুদাল লিলমুত্তাকীন: তাকওয়া ও মুত্তাকীর পরিচয় (আয়াত ২)
আল্লাহ তাআলা কুরআনের পরিচয় ও নাযিলের উদ্দেশ্য জানিয়ে বললেন, এই কুরআন মুত্তাকীদের জন্য হেদায়েত। এই এক টুকরো কথায় লুকিয়ে আছে গভীর তাৎপর্য — কুরআন কার জন্য হেদায়েত, আর মুত্তাকী বা তাকওয়া বলতে আসলে কী বোঝায়।
هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ
— সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২
উচ্চারণ: হুদাল লিলমুত্তাকীন
অনুবাদ: “মুত্তাকীদের জন্য হেদায়েত।”
সবার জন্য, তবু মুত্তাকীদের জন্য
এখানে বলা হলো কুরআন মুত্তাকীদের জন্য হেদায়েত। অথচ অন্য আয়াতে এসেছে হুদাল লিন নাস (هُدًى لِلنَّاسِ) — কুরআন সমস্ত মানুষের জন্য হেদায়েত (সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৫)। তাহলে কি দুটো ভিন্ন কথা, নাকি একই কথার দুটো দিক?
আসলে কুরআন নিঃসন্দেহে সমস্ত মানুষের জন্য। কিন্তু মানুষের মধ্যে যারা প্রকৃত মানুষ হতে চায় না, তারা এই হেদায়েত পায় না। আর যারা সত্যিকার মানুষ হতে চায়, তাকওয়া শিখতে ও তার দিকে এগোতে চায় — মানুষের মধ্যকার সেই তাকওয়া-অন্বেষীদেরই কুরআন হেদায়েত দেয়। কাজেই দুটো কথা বিপরীতমুখী নয়, বরং একটি আরেকটির পরিপূরক: আহ্বান সবার প্রতি, কিন্তু হেদায়েতের ফসল ঘরে তোলে কেবল মুত্তাকীরা।
মুত্তাকী কারা: সালাফের বর্ণনা
মুত্তাকীর পরিচয় বিভিন্ন ইমাম ও সাহাবি তুলে ধরেছেন; উপস্থাপনা কিছুটা ভিন্ন হলেও মূল বিষয় এক।
মুফাসসিরদের উস্তাদ, সবচেয়ে বড় মুফাসসির ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: আল-মুত্তাকূনা হুমুল মুমিনূনাল্লাযীনা ইয়াত্তাকূনাশ শিরকা ওয়া ইয়ামালূনা বি তাআতিল্লাহ (الْمُتَّقُونَ هُمُ الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ يَتَّقُونَ الشِّرْكَ وَيَعْمَلُونَ بِطَاعَةِ اللَّهِ) — মুত্তাকী তারাই, যারা এক নম্বরে শিরককে বর্জন করে, কোনো অবস্থাতেই শিরকের কাছেও যায় না; আর দুই নম্বরে আল্লাহর হুকুম-আহকাম মেনে চলে।
ইমাম হাসান বাসরি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন: (আল-মুত্তাকূনা) ইত্তাকাও মা হাররামা আলাইহিম ওয়া আদ্দাও মা উফতুরিদা আলাইহিম (اتَّقَوْا مَا حَرَّمَ عَلَيْهِمْ وَأَدَّوْا مَا افْتُرِضَ عَلَيْهِمْ) — আল্লাহ যা হারাম করেছেন তারা তা বর্জন করে, আর যা ফরজ করেছেন তা আদায় করে।
তাবেঈ মুফাসসির কাতাদা রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন: হুমুল্লাযীনা নাআতাহুমুল্লাহু বি কাওলিহি (هُمُ الَّذِينَ نَعَتَهُمُ اللَّهُ بِقَوْلِهِ) — মুত্তাকী তারাই, আল্লাহ নিজেই যাদের গুণ বর্ণনা করে দিয়েছেন। দূরে যাওয়ার দরকার নেই; আল্লাহ তাআলা হুদাল লিলমুত্তাকীন বলার পরপরই তাদের পরিচয় দিয়েছেন: আল্লাযীনা ইউমিনূনা বিল গায়বি ওয়া ইউক্বীমূনাস সালাহ (الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ) — যারা গায়েবের প্রতি ঈমান আনে ও সালাত কায়েম করে। এই গুণাবলিই মুত্তাকীর পরিচয়।
তাকওয়ার চূড়ান্ত রূপ: হাদিসের আলোকে
তাকওয়া সম্পর্কে হাদিসেও সুন্দর ব্যাখ্যা এসেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
لَا يَبْلُغُ الْعَبْدُ أَنْ يَكُونَ مِنَ الْمُتَّقِينَ حَتَّى يَدَعَ مَا لَا بَأْسَ بِهِ حَذَرًا لِمَا بِهِ الْبَأْسُ
উচ্চারণ: লা ইয়াবলুগুল আবদু আন ইয়াকূনা মিনাল মুত্তাকীন, হাত্তা ইয়াদাআ মা লা বাসা বিহি হাজারাল লিমা বিহিল বাস।
অনুবাদ: “বান্দা মুত্তাকীদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না, যতক্ষণ না সে ক্ষতিকর নয় এমন জিনিসও পরিত্যাগ করে — ক্ষতিকর জিনিসের ব্যাপারে সতর্কতাস্বরূপ।” (তিরমিযি)
অর্থাৎ বান্দা কেবল হারাম ও গুনাহ ছাড়বে তা-ই নয়; বরং যা সরাসরি হারাম বা গুনাহ নয়, যাতে সামান্য সন্দেহ বা মতভেদ আছে, তা-ও সে সতর্কতাবশত বর্জন করে। অনেক কিছু একেবারে হারাম না হলেও অতিরিক্ত সাবধানতা হিসেবে সে তা করে না। গুনাহ ও হারামের ব্যাপারে যাদের এমন সূক্ষ্ম সতর্কতা থাকে, তারাই প্রকৃত মুত্তাকী।
কাঁটাপথের উপমা: ওমর ও উবাই ইবনে কাব (রা.)
তাকওয়ার আরেকটি চমৎকার ব্যাখ্যা এসেছে ওমর ইবনুল খাত্তাব ও উবাই ইবনে কাব রাদিয়াল্লাহু আনহুমার এক কথোপকথনে। উবাই ইবনে কাব ছিলেন কুরআনের বিশেষজ্ঞ সাহাবি। ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন তাকওয়া সম্পর্কে — যেন একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি ভালোভাবে বুঝিয়ে দেন।
উবাই বললেন: আমা সালাক্তা তারীকান যা শাওক? (أَمَا سَلَكْتَ طَرِيقًا ذَا شَوْكٍ؟) — “হে খলিফা, আপনি কি কখনো এমন কোনো কাঁটাযুক্ত পথে হাঁটেননি?” ওমর বললেন: বালা (بَلَى) — “অবশ্যই হেঁটেছি।” উবাই বললেন: ফামা আমিলতা? (فَمَا عَمِلْتَ؟) — “তখন কী করেছিলেন?” ওমর বললেন: শাম্মারতু ওয়াশতাহাদতু (شَمَّرْتُ وَاجْتَهَدْتُ) — “আমি কাপড় গুটিয়ে আঁটসাঁট করে নিতাম, যেন কাঁটা কাপড়ে আটকে না যায়; আর খুব খেয়াল করে পা ফেলতাম, যেন কাঁটায় পা না পড়ে।” তখন উবাই বললেন: ফাযালিকাত তাকওয়া (فَذَلِكَ التَّقْوَى) — “এটিই তাকওয়া।”
অর্থাৎ প্রতিটি পদক্ষেপে সতর্ক থাকা — কোন দিকে পা রাখছি, কোন ব্যবসা শুরু করছি, কোন দিকে সফরে বেরোচ্ছি — প্রতিটি কাজের শুরুতে খেয়াল করা যে এটি ঠিক না বেঠিক। এমন সতর্ক, হিসেবি চলাফেরাই তাকওয়া।
ফাতিহার দোয়ার জবাব
এই হেদায়েতের প্রসঙ্গে বহু মুফাসসির সুন্দর একটি সংযোগ দেখিয়েছেন। সূরা আল-ফাতিহায় আমরা একটি দরখাস্ত পেশ করেছিলাম — ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকীম (اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ), “আমাদের সরল পথ দেখান।” সেই দরখাস্তের জবাব এলো সূরা আল-বাকারার শুরুতেই: জালিকাল কিতাবু লা রাইবা ফীহি, হুদাল লিলমুত্তাকীন। যেন আল্লাহ বলছেন — তোমরা যে হেদায়েত চেয়েছ, তা পেতে হলে এই কিতাব গ্রহণ করো; পড়ো, শেখো, বোঝো ও আমল করো। এই কিতাবই মুত্তাকীদের হেদায়েত দেবে।
কবির ভাষায় তাকওয়া
তাকওয়ার স্বরূপ নিয়ে কবি আব্দুল্লাহ ইবনুল মুতায একটি ছোট্ট কবিতা লিখেছেন:
خَلِّ الذُّنُوبَ صَغِيرَهَا وَكَبِيرَهَا ذَاكَ التُّقَى وَاصْنَعْ كَمَاشٍ فَوْقَ أَرْضِ الشَّوْكِ يَحْذَرُ مَا يَرَى لَا تَحْقِرَنَّ صَغِيرَةً إِنَّ الْجِبَالَ مِنَ الْحَصَى
উচ্চারণ: খাল্লিয যুনূবা সাগীরাহা ওয়া কাবীরাহা যাকাত তুকা / ওয়াসনা কামাশিন ফাওকা আরদিশ শাওকি ইয়াহযারু মা ইয়ারা / লা তাহকিরান্না সাগীরাতান ইন্নাল জিবালা মিনাল হাসা।
অনুবাদ: “ছোট-বড় সব গুনাহ ছেড়ে দাও — এটিই তাকওয়া। আর সেই ব্যক্তির মতো চলো, যে কাঁটাভরা জমিনের উপর দিয়ে হাঁটে, যা দেখে তা থেকেই সতর্ক থাকে। কোনো ছোট গুনাহকে তুচ্ছ মনে করো না; নিশ্চয়ই পাহাড়গুলো তো ছোট ছোট নুড়িপাথর জমেই তৈরি হয়।”
কবি এখানে উবাই ইবনে কাবের সেই কাঁটাপথের উপমাটিকেই কবিতায় গেঁথেছেন। শেষ চরণে বলেছেন — ছোট গুনাহকে হালকা মনে করে বারবার করতে থেকো না; কারণ বিশাল পাথুরে পাহাড়ও গড়ে ওঠে ছোট ছোট পাথর জমে। (আরব দেশের পাহাড় পাথরের, তাই কবি পাথরের উপমা এনেছেন।) সুতরাং ছোটখাটো গুনাহও বর্জন করলে তবেই মানুষের মধ্যে সত্যিকার তাকওয়া আসে।
শিক্ষা
কুরআন সব মানুষের জন্য অবতীর্ণ হলেও তার হেদায়েত লাভ করে কেবল তারাই, যারা তাকওয়া অর্জনে আগ্রহী। মুত্তাকীর মূল পরিচয় — শিরক ও হারাম বর্জন এবং ফরজ ও আল্লাহর আনুগত্য আদায়। তাকওয়ার পূর্ণতা হলো এমন সতর্কতা, যেখানে বান্দা সন্দেহজনক ও অস্পষ্ট বিষয়ও এড়িয়ে চলে — যেন কাঁটাপথে সাবধানে পা ফেলা। ছোট গুনাহকেও তুচ্ছ মনে না করা তাকওয়ার অপরিহার্য অংশ, কেননা ছোট ছোট পাথরেই বড় পাহাড় গড়ে ওঠে। আর এই হেদায়েতই সূরা ফাতিহার ‘ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকীম’ দোয়ার বাস্তব জবাব।