সূরা আল-বাকারা — ভূমিকা

ভূমিকা

সূরা আল-বাকারা শুরু করতে যাচ্ছি বি-তাওফিগিল্লাহে তা’আলা (بِتَوْفِيقِ ٱللَّٰهِ تَعَالَىٰ)। এটা হচ্ছে মাদানী সূরা। প্রায় সমস্ত ওলামায়ে কেরাম একমত যে, মাদানী জিন্দেগীতে এই সূরা নাযিল হয়েছে। মাদানী জিন্দেগীর শুরুতেই তিনি হিজরত করার কিছু পরে পরেই এই সূরা নাযিল হয়।

মাক্কী ও মাদানী সূরার বিষয়বস্তুর পার্থক্য

মাক্কী জিন্দেগীতে যে সূরাগুলো নাযিল হয়েছে সেগুলোর বিষয়বস্তু মূলত ছিল তাওহীদ, রিসালাত, আখেরাত। মূল ঈমান আকিদা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা। কিন্তু মানুষের জীবনে ইসলামের বিভিন্ন শরীয়তের হুকুম, আহকাম, ফরজ, ওয়াজিব, হালাল, হারাম এগুলো অনেক বেশি মক্কায় নাযিল হয়নি। শুধু ঈমান আকিদা তৈরি করার কাজ আল্লাহ তা’আলা করিয়েছেন তেরো বছরে। কারণ মাক্কী জিন্দেগীতে ইসলামের এই সমস্ত শরীয়তের অনেকগুলো বিষয় কার্যকরী করার কোনো সুযোগ ছিল না।

মদিনা তাইয়্যিবাতে তিনি আসার পরে ইসলামী রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন হলো। তখন সরকারি পর্যায়ে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে শরীয়তের কার্যকরী করার সুযোগ আল্লাহ তা’আলা দিয়েছেন বিধায়, আহকাম সংক্রান্ত এই সূরা আল-বাকারা মদিনায় নাযিল হয়।

সূরার নাম আল-বাকারা কেন?

এই সূরার মধ্যেই আল্লাহ তা’আলা একটা গরু জবাই করতে বলেছেন এক জায়গায় বনী ইসরাঈলকে। “আন তাজবাহু বাকারাহ” (أَن تَذْبَحُوا۟ بَقَرَةً)।

সূরা আল-বাকারা, আয়াত ৬৭

وَإِذْ قَالَ مُوسَىٰ لِقَوْمِهِۦٓ إِنَّ ٱللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تَذْبَحُوا۟ بَقَرَةً ۖ قَالُوٓا۟ أَتَتَّخِذُنَا هُزُوًا ۖ قَالَ أَعُوذُ بِٱللَّهِ أَنْ أَكُونَ مِنَ ٱلْجَٰهِلِينَ

[সম্পাদকীয় অনুবাদ]: “আর স্মরণ করো, যখন মুসা তার কওমকে বলল, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ দিচ্ছেন একটি গরু জবাই করতে।’ তারা বলল, ‘তুমি কি আমাদের নিয়ে ঠাট্টা করছ?’ সে বলল, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই যে, আমি যেন মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত না হই।'”

মুসা আলাইহিস সালাম তার কওমকে বললেন যে, আল্লাহ তা’আলা নির্দেশ দিচ্ছেন, “তোমরা একটা গরু জবাই করতে হবে।” কেন গরু জবাই করতে হবে? একটা লোককে তারা খুন করেছিল। খুন করে রাতের অন্ধকারে কে খুন করলো এর কোনো পরিচয় পাওয়া যায় না। বরঞ্চ অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানোর চেষ্টা করলো। এটা নিয়ে তাদের মধ্যে বিতণ্ডা সৃষ্টি হয়েছে। খুন করে একজনের দোষ চাপায় আরেকজনের ঘাড়ে। আজকালও তো এগুলো হয় দেখা যায়। সুবহানাল্লাহ (سُبْحَانَ ٱللَّٰه)। পৃথিবীর ইতিহাসে বরাবরই এগুলো হয়ে আসছে।

তখন আসলো নবী মুসা আলাইহিস সালামের কাছে বনী ইসরাঈল যে, “আমাদের লোকটা যে খুন হয়েছে, এটা তো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না, সঠিক প্রমাণ নাই কে খুন করলো। আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেন আল্লাহ তা’আলা এটার একটু খবর আমাদেরকে দিয়ে দিক।” তখন তিনি আল্লাহ তা’আলার কাছে দোয়া করলেন যে, “আল্লাহ, এই লোকটাকে কে খুন করেছে সে খবরটা পাওয়া দরকার। আপনি একটু ব্যবস্থা করে দেন।” তখন আল্লাহ তা’আলা হুকুম দিলেন, “আপনার কওমকে বলেন একটা গরু জবাই করতে। জবাই করে গরুর গোশতটা কবর খুলে মায়িতের গায়ে লাগিয়ে দিলে মায়িতকে আল্লাহ জিন্দা করে দিবেন।” আর তাই করা হলো।

জবাই তারা করতে চায়নি, বহু প্রশ্ন করেছে। সেগুলো জানতে হলে আমরা ওই আয়াতে বিস্তারিত শুনবো ইনশাল্লাহ। এই সূরা বাকারার ভিতরেই এই ঘটনাটা আছে। প্রথম পারার ভিতরেই আছে, বেশি দূর যাওয়া লাগবে না। ইনশাল্লাহ। এরপরে যখন এক টুকরা গোশত টাচ করিয়েছে তার গায়ের মধ্যে, সে তখন উঠে বসে বলল, “আমাকে অমুক খুন করেছে।” এরপরে আবার শুয়ে গেল, আবার তার মরণ হয়ে গেল, শেষ। আর জিন্দা হয়নি।

সেই ঘটনা উপলক্ষ্যে বাকারা শব্দটি এসেছে। আর আল্লাহ তা’আলা এই সূরার নামকরণ করে দিয়েছেন সূরা আল-বাকারা। নামকরণ এর বিভিন্ন কারণ থাকে। যেকোনো কারণেই হোক আল্লাহ তা’আলা এবং তার রসূলের পক্ষ থেকেই নামকরণটা আসে। এই কওলটাই মোতাবার। সেজন্য কোন সময় প্রথম শব্দ থেকে নামকরণ হয়, কোন সময় মাঝখানের একটা শব্দ থেকে, কোন সময় বিষয়বস্তু থেকে।

আয়াত সংখ্যা

নামকরণের পরে আমরা আসি যে, এই সূরার মধ্যে কতগুলো আয়াত আছে? দুইশত ছিয়াসি। কোনো কোনো রেওয়ায়েতে একটু বেশি কম এসেছে। কিছু কিছু আয়াতের গণনার ক্ষেত্রে, সংখ্যায়নের আয়াত শেষ করার ক্ষেত্রে একটু এখতেলাফ আছে। কিন্তু আসলে কেউ কেউ সাতাশি বলেছেন, বিসমিল্লাহকে যারা যোগ করেন। আর বিসমিল্লাহকে যারা বাদ দেন তারা ছিয়াসি বলেছেন।

সূরার বিষয়বস্তু

এই সূরাগুলোর মধ্যে অনেক আহকাম আছে। ইসলামের অনেক মৌলিক কথাগুলো আল্লাহ তা’আলা এই সূরার মধ্যে দিয়েছেন। এই ঈমান আকিদার কথা দিয়ে শুরু হবে। নেফাকের কথা, শেরেকের কথা, ঈমানের কথা, তাওহীদের কথা। এরপরে আমলের কথা আসছে। আমলের মধ্যে দেখবেন নামাজের কথা এই সূরাতে আছে। রোজার কথা কোন সূরায় আছে? এই সূরাতে আছে। হজের কথা এই সূরাতে আছে। যাকাতের কথা এই সূরায় আছে। এরপরে সুদের কথা, লেনদেন, হারাম, হালালের অনেক বিষয়বস্তু এখানে আছে। যুদ্ধ জিহাদের কথা এখানে আছে।