সূরা আল-বাকারা — জালিকাল কিতাবু লা রাইবা ফীহি (আয়াত ২)
আলিফ লাম মীমের পর আল্লাহ তাআলা কুরআনের পরিচয় দিতে শুরু করলেন। এই আয়াতে একইসঙ্গে ফুটে ওঠে কুরআনের মহিমা, তার নিশ্চিত সত্যতা এবং নাযিলের উদ্দেশ্য।
ذَٰلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ
— সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২
উচ্চারণ: জালিকাল কিতাবু লা রাইবা ফীহি, হুদাল লিলমুত্তাকীন।
অনুবাদ: “এই সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই; মুত্তাকীদের জন্য হেদায়েত।”
‘জালিকা’: দূরের ইশারায় মহিমা
আরবি ব্যাকরণে ذَٰلِكَ ও هَٰذَا — উভয়ই ইসমে ইশারা (اسم الإشارة), অর্থাৎ নির্দেশক শব্দ (‘এই’ বা ‘ঐ’)। এর মধ্যে هَٰذَا ব্যবহৃত হয় কাছের কোনো কিছু বোঝাতে, আর ذَٰلِكَ ব্যবহৃত হয় দূরের কিছু বোঝাতে।
এখন প্রশ্ন জাগে — কুরআন তো সামনেই, নিকটে; তাহলে আল্লাহ তাআলা এখানে দূরত্ববোধক ذَٰلِكَ কেন ব্যবহার করলেন, هَٰذَا কেন নয়?
এর একটি ব্যাখ্যা: আরবি ভাষায় কখনো কখনো هَٰذَا-এর জায়গায় ذَٰلِكَ এবং ذَٰلِكَ-এর জায়গায় هَٰذَا ব্যবহারের রীতি আছে। তবে এখানে আরও গভীর তাৎপর্য রয়েছে — ذَٰلِكَ শব্দে এক ধরনের অসাধারণত্ব ও উচ্চ মর্যাদার ভাব ফুটে ওঠে। هَٰذَا বললে বিষয়টি খুব সাধারণ শোনাত; কিন্তু কুরআনের মহত্ত্ব ও অসাধারণত্ব প্রকাশ করতে দূরত্ববোধক ذَٰلِكَ-ই অধিক উপযুক্ত। এই দূরত্ব স্থানের নয়, বরং মর্যাদার উচ্চতা ও শ্রেষ্ঠত্বের ইঙ্গিত।
‘আল-কিতাব’: কোন কিতাব?
এই ‘কিতাব’ বলতে কোন কিতাবকে বোঝানো হয়েছে? — আল-কুরআন। আল্লাহ তাআলা কুরআনকে কোথাও ‘কুরআন’ নামে, আবার কোথাও ‘আল-কিতাব’ নামে উল্লেখ করেছেন। যেমন এক জায়গায় বলেছেন: লাও আনযালনা হাযাল কুরআন (لَوْ أَنزَلْنَا هَٰذَا الْقُرْآنَ — সূরা আল-হাশর, ৫৯:২১) — এখানে ‘কুরআন’ শব্দ এসেছে; আবার অন্যত্র ‘কিতাব’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। সুতরাং এই আয়াতে ‘কিতাব’ দ্বারা কুরআনকেই বোঝানো হয়েছে।
‘লা রাইবা ফীহি’: কোনো সন্দেহ নেই
رَيْب (রাইব) শব্দের অর্থ সন্দেহ। لَا رَيْبَ فِيهِ অর্থ — এই কুরআনে কোনো সন্দেহ নেই। এর দুটি দিক রয়েছে।
প্রথমত, এই কথাগুলো সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল হওয়া — এতে কোনো সন্দেহ নেই।
দ্বিতীয়ত, এই কথাগুলো নিরেট সত্য। কুরআন যে সংবাদ ও বক্তব্য নিয়ে আসে, যে হুকুম-আহকাম আমাদের দেয়, তার প্রতিটি কথা চূড়ান্ত হক ও সত্য — যাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ বা দুর্বলতা কল্পনা করার কোনো সুযোগ নেই।
আল্লাহ তাআলা অন্য এক আয়াতেও একই কথা বলেছেন: তানযীলুল কিতাবি লা রাইবা ফীহি মিন রাব্বিল আলামীন (تَنزِيلُ الْكِتَابِ لَا رَيْبَ فِيهِ مِن رَّبِّ الْعَالَمِينَ — সূরা আস-সাজদা, ৩২:২) — “এই কিতাবের অবতরণ, যাতে কোনো সন্দেহ নেই, তা রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে।” অর্থাৎ যিনি সমগ্র জগতের রব, এই কিতাব তাঁরই কাছ থেকে এসেছে — এতে কোনো সন্দেহ নেই।
‘হুদাল লিলমুত্তাকীন’: কুরআনের উদ্দেশ্য
ذَٰلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيهِ বলার পর আল্লাহ তাআলা বললেন হুদাল লিলমুত্তাকীন (هُدًى لِلْمُتَّقِينَ)। এখানে তিনি কুরআনের পরিচয় ও নাযিলের উদ্দেশ্য জানিয়ে দিলেন — এই কুরআন মুত্তাকীদের জন্য হেদায়েত। অর্থাৎ এই কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে যেন তা মুত্তাকীদের সঠিক পথ দেখায়।
শিক্ষা
কুরআনের ক্ষেত্রে দূরত্ববোধক ذَٰلِكَ-এর ব্যবহার তার অসাধারণ মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের ইঙ্গিত বহন করে। এই কিতাব — আল-কুরআন — সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল হওয়া এবং নিরেট সত্য; এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। আর এর অবতরণের উদ্দেশ্য হলো মুত্তাকীদের হেদায়েত দান করা।