সূরা আল-বাকারা — আলিফ লাম মীম (আয়াত ১)

এখন আমরা সূরা আল-বাকারার দিকে আসি। সূরাটি শুরু হয়েছে “আলিফ লাম মীম” দিয়ে। এই অক্ষরত্রয় দিয়েই কুরআনের সবচেয়ে বড় সূরার সূচনা।

الٓمٓ

— সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১

উচ্চারণ: আলিফ লাম মীম

এই বিচ্ছিন্ন অক্ষরগুলোর কোনো আভিধানিক অনুবাদ নেই; নিচে এগুলোর পরিচয়, তাৎপর্য ও আলিমগণের বক্তব্য আলোচনা করা হলো।

হুরুফে মুকাত্তাআত: কাটা কাটা অক্ষর

“আলিফ লাম মীম” — এই তিনটি অক্ষরকে বলা হয় আল-হুরুফুল মুকাত্তাআত (الحُروف المُقَطَّعات)। ‘হুরুফ’ হলো ‘হরফ’-এর বহুবচন, আর ‘মুকাত্তাআত’ মানে কাটা কাটা, বিচ্ছিন্ন অক্ষর।

আলিফ লাম মীম কোনো একটি শব্দ নয়; এটি তিনটি আলাদা আলাদা অক্ষর, যেগুলো পৃথকভাবে উচ্চারণ করা হয় — ‘আলিফ’, ‘লাম’, ‘মীম’। আমরা একে একটি শব্দের মতো “আলাম” পড়ি না।

এর বিপরীতে পরের শব্দটি লক্ষ করুন — “জালিকাল কিতাবু” (ذَٰلِكَ الْكِتَابُ)। এখানে ‘জালিকা’ একটি পূর্ণ শব্দ, তাই একে ভেঙে ‘যা-লা-কা’ পড়ি না, বরং একসঙ্গে ‘জালিকা’ পড়ি। কিন্তু আলিফ লাম মীম যদি শব্দ হতো, তাহলে আমরা “আলাম” পড়তাম — যেমন সূরা আল-ফীলের শুরুতে “আলাম তারা কাইফা ফাআলা” (أَلَمْ تَرَ كَيْفَ فَعَلَ), যেখানে একই আলিফ-লাম-মীম মিলিতভাবে ‘আলাম’ উচ্চারিত হয়। কিন্তু সূরা আল-বাকারার শুরুতে প্রতিটি অক্ষর আলাদা আলাদা করে পড়া হয়: আলিফ, লাম, মীম।

কোন কোন সূরায়, কত হরফে

এই বিচ্ছিন্ন অক্ষরগুলো কুরআনের অনেক সূরায় রয়েছে — প্রায় উনত্রিশটি সূরার শুরুতে। কোথাও একটি, কোথাও দুটি, কোথাও তিনটি, চারটি, আবার কোথাও পাঁচটি পর্যন্ত অক্ষর দিয়ে সূরা শুরু হয়েছে।

একটি অক্ষর দিয়ে শুরু হয়েছে যেমন সূরা ‘কাফ’ (ق), ‘সাদ’ (ص) ও ‘নূন’ (ن)। দুটি অক্ষর দিয়ে যেমন ‘হা মীম’ (حم)। তিনটি অক্ষর দিয়ে যেমন ‘আলিফ লাম মীম’ (الم)। চারটি অক্ষর দিয়েও সূরা শুরু হয়েছে, আবার পাঁচটি অক্ষর দিয়েও — যেমন সূরা মারইয়ামের শুরুতে ‘কাফ হা ইয়া আইন সাদ’ (كهيعص)। এভাবে প্রায় উনত্রিশটি সূরার শুরুতে এমন কাটা কাটা অক্ষর দেখা যায়।

এগুলোর অর্থ: আল্লাহই ভালো জানেন

আল্লাহ তাআলা এই কাটা অক্ষরগুলো দিয়ে সূরা শুরু করেছেন — এর অর্থ কী? অধিকাংশ মুফাসসির বলেছেন: হিয়া মিম্মাস্তা’সারাল্লাহু বি’ইলমিহি (هِيَ مِمَّا اسْتَأْثَرَ اللَّهُ بِعِلْمِهِ) — অর্থাৎ এগুলোর প্রকৃত অর্থ আল্লাহ তাআলা ছাড়া আর কেউ জানেন না। আল্লাহ তাআলা এর ব্যাখ্যা খুলে দেননি।

তাহলে যখন ব্যাখ্যাই দেবেন না, তখন নাযিল করলেন কেন? এর একটি হিকমত হলো — এটি আমাদের জন্য এক পরীক্ষা। আল্লাহ যেন দেখতে চান, তাঁর কালামের প্রতিটি শব্দের অর্থ না বুঝেও আমরা তা মেনে নিই কি না। আল্লাহ বলে দিলেন, এর অর্থ তোমাদের জানার দরকার নেই — আর আমরা এই অজানা শব্দকেও ঈমানের সঙ্গে গ্রহণ করে নিই। আল্লাহর কালামকে না বুঝেও এভাবে গ্রহণ করে নেওয়াই এখানে ঈমানের পরিচয়।

অনর্থক ব্যাখ্যা তালাশ নিষেধ

যেহেতু এগুলোর অর্থ আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত, তাই জোর করে অর্থ বের করার প্রয়োজন নেই। কেউ কেউ নানা রকম গবেষণা করে এতে কিছু অর্থ যোগ করার চেষ্টা করেছেন; কিন্তু বহু ওলামায়ে কেরাম একে নিষেধ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বিষয়ের ব্যাখ্যা দিয়ে যাননি, তার ব্যাখ্যা আমরা কেন তালাশ করে বের করতে যাব? তদুপরি সেই ব্যাখ্যা সঠিক হবে — এর কোনো নিশ্চয়তা নেই।

হুরুফে মুকাত্তাআত ও কুরআনের ই’জাজ

তবে কেউ কেউ বলেছেন, এই কাটা অক্ষরগুলো কুরআনের ই’জাজ (অলৌকিকতা) ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রকাশ — ওয়া বায়ানু ই’জাজিহি ওয়া আজামাতিহি (وَبَيَانُ إِعْجَازِهِ وَعَظَمَتِهِ)। এমন বিচ্ছিন্ন অক্ষর দিয়ে সূরা শুরু হলেও তা মোটেও বেখাপ্পা লাগে না, কোথাও অমিল হয় না — আর এটিই প্রমাণ যে এই কালাম কোনো মানুষের রচনা নয়।

এটি স্পষ্ট দলিল যে এই কথা নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিজের কথা নয়, বরং আল্লাহ তাআলার কথা। কারণ তিনি সারাজীবন আরবদের সঙ্গে তাদেরই ভাষায় কথা বলেছেন — আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব সকলের সঙ্গে। কিন্তু নিজের কোনো কথার আগে তিনি কখনো ‘হা মীম’ বা ‘আলিফ লাম মীম’ বলেননি; জীবনে একবারও নিজের কথার সঙ্গে এগুলো যোগ করেননি। অথচ যখন কুরআন তিলাওয়াত করেন, তখন কোনো কোনো সূরায় এগুলো উচ্চারণ করেন। এতে বোঝা যায়, তিনি নিজের কথা নয় — আল্লাহর কথাই তিলাওয়াত করছেন।

এই ই’জাজের মধ্য দিয়ে আরবদের প্রতি যেন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হলো: “তোমরা এমন কাটা অক্ষর দিয়ে কিছু রচনা করে আনো তো, পারো কি না দেখি — কুরআনের মতো একটি কালাম তৈরি করে নিয়ে এসো।” তারা তা পারল না। এভাবে আল্লাহ তাআলা হুরুফে মুকাত্তাআতের মাধ্যমে প্রমাণ করলেন যে, কুরআন আল্লাহরই কালাম এবং আল্লাহ ছাড়া কোনো সৃষ্টি এমন কথা রচনা করতে পারে না।

তবে এতসব সত্ত্বেও এগুলোর প্রকৃত, সঠিক অর্থ আল্লাহ তাআলার জ্ঞানেই সংরক্ষিত — আল্লাহু আ’লামু বিমুরাদিহি (اللَّهُ أَعْلَمُ بِمُرَادِهِ), এগুলোর উদ্দেশ্য সম্পর্কে আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন। এর চেয়ে বেশি ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে আমরা যাব না।

দুর্বল ও সনদহীন ব্যাখ্যা

কোনো কোনো তাফসীর বা লেখায় বলা হয়েছে, ‘আলিফ’ মানে আল্লাহ, ‘লাম’ মানে জিব্রাইল, ‘মীম’ মানে মুহাম্মদ — এভাবে এগুলোকে সংকেত হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু এসব ব্যাখ্যার কোনো সঠিক ও নির্ভরযোগ্য সনদ নেই। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যেহেতু এগুলো আমাদের কাছে আসেনি, তাই এগুলো গ্রহণ করার কোনো প্রয়োজন নেই।

শিক্ষা

হুরুফে মুকাত্তাআত হলো সূরার শুরুতে আসা বিচ্ছিন্ন অক্ষর, যেগুলোর প্রকৃত অর্থ আল্লাহ তাআলার কাছেই সংরক্ষিত। এগুলোর অর্থ না বুঝেও ঈমানের সঙ্গে মেনে নেওয়াই বান্দার পরীক্ষা ও পরিচয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বিষয়ের ব্যাখ্যা দেননি, তাতে জোর করে অর্থ আরোপ করা বা সনদহীন ব্যাখ্যা গ্রহণ করা উচিত নয়। আর এই অক্ষরগুলো কুরআনের ই’জাজের এক উজ্জ্বল নিদর্শন — প্রমাণ যে কুরআন মানুষের রচনা নয়, বরং আল্লাহ তাআলার কালাম।