সূরা আল-বাকারা — গায়েবের প্রতি ঈমান (আয়াত ৩)

মুত্তাকীদের প্রথম গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বললেন, তারা গায়েবের প্রতি ঈমান আনে। এই একটি গুণের মধ্যেই ঈমানের প্রকৃত রূপ ও পরীক্ষা নিহিত।

الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ

— সূরা আল-বাকারা, আয়াত ৩

উচ্চারণ: আল্লাযীনা ইউমিনূনা বিল গায়ব

অনুবাদ: “যারা গায়েবের প্রতি ঈমান আনে।”

গায়েব কী, গায়েবের প্রতি ঈমান কী

‘গায়েব’ শব্দের বাংলা অর্থ অদৃশ্য — যা চোখে দেখা যায় না। মুত্তাকীদের প্রথম পরিচয় হলো, এমন অদৃশ্য বিষয়ের প্রতিও তারা ঈমান আনে।

আমরা কী কী দেখি না? আল্লাহ তাআলাকে আমরা দেখি না, জান্নাত দেখিনি, জাহান্নাম দেখিনি, পুলসিরাত দেখিনি — অথচ এসব না দেখেই বিশ্বাস করি। এটাই প্রকৃত ঈমান: গায়েবের প্রতি ঈমান আনা।

বস্তুবাদীদের ভ্রান্তি

পৃথিবীতে অনেকে আছে, যারা দৃষ্টির বাইরের কোনো কিছুর প্রতিই বিশ্বাস করে না — এদের বলা হয় বস্তুবাদী (materialist)। বস্তুর বাইরে তারা কিছু মানে না; যা দেখা যায় না, ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না, অনুভব করা যায় না, তার অস্তিত্বই তারা স্বীকার করে না। এ কারণেই অনেক অমুসলিম পণ্ডিত, বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাবিদ দুনিয়ার বহু লেখাপড়া করেও আল্লাহকে বিশ্বাস করে না — তাদের যুক্তি, “আল্লাহকে তো দেখিনি; না-দেখা জিনিস অনুমানে বিশ্বাস করব কেন?” লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।

না দেখেও তো আমরা বিশ্বাস করি

অথচ একটু ভাবলেই বোঝা যায়, দুনিয়ার জীবনেও আমরা বহু কিছু না দেখে বিশ্বাস করি।

কাউকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনার ভাই কয়জন?” তিনি বললেন, “তিন ভাই।” আমি তো তাঁর সব ভাইকে দেখিনি; তবু তাঁর কথায় বিশ্বাস করে নিলাম।

কেউ যদি বলে, অস্ট্রেলিয়ার বহু দূরে ‘ফিজি আইল্যান্ড’ নামে একটি দ্বীপরাষ্ট্র আছে — আমরা কেউ সেখানে যাইনি, তবু যাঁরা ইতিহাস-ভূগোলের খোঁজ রাখেন, তাঁরা জানেন ও বিশ্বাস করেন যে ফিজি বলে একটি দেশ আছে। একজন নির্ভরযোগ্য মানুষ জানালেই আমরা বিশ্বাস করি। তেমনি আমেরিকা — অনেকেই দেখেননি, তবু বিশ্বাস করেন যে আমেরিকা একটি দেশ।

তাহলে সবকিছু দেখেই বিশ্বাস করতে হয় — এমন নয়; না দেখেও আমরা বিশ্বাস করি। কেন? কারণ যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য সংবাদ এসেছে, বিশ্বাসযোগ্য কেউ জানিয়েছে, অবিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। সুতরাং “কেবল দেখে বিশ্বাস করব, না দেখলে নয়” — এ কথা মোটেই ঠিক নয়; কোনো প্রকৃত জ্ঞানীর মুখে এ কথা মানায় না।

দেখে বিশ্বাসে কৃতিত্ব নেই

দেখে বিশ্বাস করার মধ্যে কোনো কৃতিত্ব নেই — দেখলে তো সবাই বিশ্বাস করবে। না দেখে বিশ্বাস করাই প্রকৃত ঈমান।

যারা না দেখে ঈমান আনবে

এ প্রসঙ্গে সুন্দর একটি হাদিস এসেছে। তাবেঈ ইবনে মুহাইরিয একজন সাহাবি — আবু জুমআ রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে অনুরোধ করলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে নিজ কানে শোনা একটি হাদিস শোনাতে। (তাবেঈনগণ সাহাবিদের পেলে সৌভাগ্যের সঙ্গে তাঁদের কাছে নবীজির কথা জানতে চাইতেন।)

আবু জুমআ বললেন: “নাআম, উহাদ্দিসুকা হাদীসান জাইয়িদা” (نَعَمْ أُحَدِّثُكَ حَدِيثًا جَيِّدًا) — হ্যাঁ, তোমাকে একটি উত্তম হাদিস শোনাব। তিনি বললেন: একদিন আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে খাবার খাচ্ছিলাম; আমাদের সঙ্গে ছিলেন জলিলুল কদর সাহাবি আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: “ইয়া রাসূলাল্লাহ, হাল আহাদুন খাইরুম মিন্না?” (يَا رَسُولَ اللَّهِ، هَلْ أَحَدٌ خَيْرٌ مِنَّا؟) — আমাদের চেয়ে উত্তম কেউ কি হবে? “আসলামনা মাআকা ওয়া জাহাদনা মাআকা” (أَسْلَمْنَا مَعَكَ وَجَاهَدْنَا مَعَكَ) — আমরা তো আপনার হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছি ও আপনার সঙ্গে জিহাদ করেছি।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:

«نَعَمْ، قَوْمٌ يَكُونُونَ مِنْ بَعْدِكُمْ يُؤْمِنُونَ بِي وَلَمْ يَرَوْنِي»

উচ্চারণ: নাআম, কাওমুন ইয়াকূনূনা মিন বাদিকুম ইউমিনূনা বী ওয়া লাম ইয়ারাওনী।

অনুবাদ: “হ্যাঁ, তোমাদের পরে এমন একদল লোক আসবে যারা আমাকে না দেখেই আমার প্রতি ঈমান আনবে।” — অর্থাৎ তারা তোমাদের চেয়েও উত্তম হয়ে যেতে পারে।

আরেকটি রেওয়ায়াতে — সালেহ ইবনে জুবাইর (একজন তাবেঈ, থাকতেন বাইতুল মাকদাসের কাছে) থেকে, একই আবু জুমআ আনসারীর বর্ণনায় বিষয়টি আরও বিস্তারিত এসেছে। একবার আবু জুমআ বাইতুল মাকদাসে নামাজ পড়তে এলে তাবেঈগণ তাঁকে সম্মানের সঙ্গে বিদায় জানাতে গেলেন। তাঁদের মহব্বত দেখে আবু জুমআ বললেন: “তোমরা আমার এত মেহমানদারি ও সম্মান করলে; আমার মনে হয় তোমাদের একটি হক আছে আমার ওপর। টাকাপয়সা তো তোমরা নেবে না; তাই সবচেয়ে দামি উপহার — নবীজি থেকে সরাসরি শোনা একটি হাদিস — তোমাদের দিয়ে যাই।”

তিনি বললেন: আমাদের সঙ্গে ছিলেন মহান সাহাবি মুয়াজ ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহুসহ দশজন সাহাবি। একবার আমরা নবীজির সঙ্গে এক মজলিসে ছিলাম। মুয়াজ ইবনে জাবাল জিজ্ঞেস করলেন: “ইয়া রাসূলাল্লাহ, এই উম্মতে কি এমন কেউ আসবে, যারা কোনো কারণে আমাদের চেয়েও বেশি নেকির অধিকারী হবে? আমরা তো আপনার হাতে ঈমান এনেছি, চোখের সামনে আপনাকে অনুসরণ করছি।”

তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: “তোমরা আমাকে পেয়েছ — এ তোমাদের বড় সৌভাগ্য। তোমাদের জন্য বিষয়টি সহজ: তোমরা আমাকে দেখছ, তোমাদের চোখের সামনেই ওহী নাযিল হয়, তোমরা দেখো আমার অবস্থার পরিবর্তন — এতে তোমাদের কাছে প্রমাণ হয়ে গেছে যে আমি নবী। কিন্তু তোমাদের পরে বহু প্রজন্ম আসবে, যারা আমাকে দেখবে না, ওহী নাযিল হতেও দেখবে না। তাদের কাছে থাকবে কেবল একটি কিতাব — কুরআন — যা তাদের সংবাদ দেবে। তাদের বলা হবে, এই কিতাব আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে, আল্লাহর নবী পৌঁছে দিয়েছেন। শুধু এই কথা শুনেই তারা বিশ্বাস করবে ও আমল করবে — তারা তোমাদের চেয়ে অনেক বেশি নেকির অধিকারী হবে।” — মুসনাদে আহমদে হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে।

তাহলে বোঝা গেল, গায়েবের প্রতি ঈমান আমাদের জন্য আরও বড় এক পরীক্ষা ও সুযোগ। সাহাবিদের নবীজির প্রতি ঈমান সহজ ছিল — চোখের সামনে নবী, ওহী ও কিতাব তাঁরা দেখেছেন। আমরা দেখিনি; তাই যদি আমরা সত্যিকার ঈমানদার হতে পারি, আমাদের জন্য রয়েছে অফুরন্ত নেকির সুযোগ।

গায়েবের পরিধি

গায়েব কী কী? আল্লাহ তাআলা নিজের সত্তাকে এই দুনিয়ায় অদৃশ্য রেখেছেন — এখানে দেখা দেবেন না, তবে আখেরাতে দেখা দেবেন। এরপর কবরে ও বারযাখের জীবনে যা ঘটবে, জান্নাত, জাহান্নাম, পুলসিরাত, মিজান ও হিসাব-নিকাশ, হাউজে কাওসার, দাজ্জালের আগমন, ফেরেশতা, জ্বীন, শয়তান — এসবই গায়েব, আর আমরা এসব না দেখেই বিশ্বাস করি। এই বিশ্বাসই ঈমানের অংশ, ঈমানের রোকন; এগুলো ছাড়া ঈমান পূর্ণ হয় না।

ঈমানের রোকন: ছয় না সাত

ঈমানের রোকন কয়টি? কেউ বলেন ছয়টি, কেউ বলেন সাতটি। ছোটবেলায় আমরা পড়েছি: আমানতু বিল্লাহি ওয়া মালাইকাতিহি ওয়া কুতুবিহি ওয়া রুসুলিহি ওয়াল ইয়াওমিল আখির, ওয়াল কদরি খাইরিহি ওয়া শাররিহি মিনাল্লাহি তাআলা (آمَنْتُ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ مِنَ اللَّهِ تَعَالَى) — কেউ কেউ এর সঙ্গে যোগ করেন ‘ওয়াল বাসি বাদাল মাউত’ (وَالْبَعْثِ بَعْدَ الْمَوْتِ)।

এর হিসাব করলে দাঁড়ায়: প্রথমত আল্লাহর প্রতি, দ্বিতীয়ত ফেরেশতাদের প্রতি, তৃতীয়ত আল্লাহর নাযিলকৃত সকল কিতাবের প্রতি, চতুর্থত সকল নবী-রাসূলের প্রতি, পঞ্চমত আখেরাতের প্রতি, এবং ষষ্ঠত তাকদিরের প্রতি ঈমান — এই ছয়টি।

সপ্তম হিসেবে যোগ করা হয় ‘বাসি বাদাল মাউত’ অর্থাৎ মৃত্যুর পর পুনরুত্থান। কিন্তু মৃত্যুর পর মানুষ উঠবে তো আখেরাতেই; তাই ‘ইয়াওমিল আখির’-এর মধ্যেই তা অন্তর্ভুক্ত। এ কারণেই কুরআন ও হাদিসে ছয়টি রোকনের কথাই এসেছে — কারণ ‘আখিরাত’ বলতে মৃত্যুর পরের সবকিছুই এসে যায়: কবর, মুনকার-নাকীরের প্রশ্ন, হাশর, শিঙায় ফুঁক, মিজান, হিসাব-নিকাশ, কাওসার, জান্নাত-জাহান্নাম, পুলসিরাত — সবই।

আমাদের অঞ্চলে ‘বাসি বাদাল মাউত’-কে আলাদা করে সপ্তম রোকন গণ্য করা হয়, আর আরবসহ অন্যান্য অঞ্চলে ছয়টি বলা হয়। কেউ সাতটি বললেও তা তেমন ভুল নয়, কারণ ‘আখির’-এর মধ্যেই সবকিছু চলে আসে। এই সবই আরকানুল ঈমান — ঈমানের রোকন; এগুলো জানতে হবে, বিশ্বাস করতে হবে, ইয়াকিন রাখতে হবে।

শিক্ষা

মুত্তাকীর প্রথম গুণ গায়েবের প্রতি ঈমান — অদৃশ্য সত্যকে না দেখেও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা। দেখে বিশ্বাসে কোনো কৃতিত্ব নেই; না দেখে বিশ্বাসই প্রকৃত ঈমান, আর এখানেই পরবর্তী উম্মতের জন্য বিরাট মর্যাদার সুযোগ। আল্লাহ, ফেরেশতা, কিতাব, নবী-রাসূল, আখেরাত ও তাকদির — ঈমানের এই রোকনগুলো গায়েবেরই অন্তর্ভুক্ত, যেগুলো জানা, বিশ্বাস করা ও ইয়াকিন রাখা প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য।