﴿مَثَلُهُمۡ كَمَثَلِ ٱلَّذِی ٱسۡتَوۡقَدَ نَارࣰا فَلَمَّاۤ أَضَاۤءَتۡ مَا حَوۡلَهُۥ ذَهَبَ ٱللَّهُ بِنُورِهِمۡ وَتَرَكَهُمۡ فِی ظُلُمَـٰتࣲ لَّا یُبۡصِرُونَ ۝١٧ صُمُّۢ بُكۡمٌ عُمۡیࣱ فَهُمۡ لَا یَرۡجِعُونَ ۝١٨ أَوۡ كَصَیِّبࣲ مِّنَ ٱلسَّمَاۤءِ فِیهِ ظُلُمَـٰتࣱ وَرَعۡدࣱ وَبَرۡقࣱ یَجۡعَلُونَ أَصَـٰبِعَهُمۡ فِیۤ ءَاذَانِهِم مِّنَ ٱلصَّوَ ٰ⁠عِقِ حَذَرَ ٱلۡمَوۡتِۚ وَٱللَّهُ مُحِیطُۢ بِٱلۡكَـٰفِرِینَ ۝١٩ یَكَادُ ٱلۡبَرۡقُ یَخۡطَفُ أَبۡصَـٰرَهُمۡۖ كُلَّمَاۤ أَضَاۤءَ لَهُم مَّشَوۡا۟ فِیهِ وَإِذَاۤ أَظۡلَمَ عَلَیۡهِمۡ قَامُوا۟ۚ وَلَوۡ شَاۤءَ ٱللَّهُ لَذَهَبَ بِسَمۡعِهِمۡ وَأَبۡصَـٰرِهِمۡۚ إِنَّ ٱللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَیۡءࣲ قَدِیرࣱ ۝٢٠ یَـٰۤأَیُّهَا ٱلنَّاسُ ٱعۡبُدُوا۟ رَبَّكُمُ ٱلَّذِی خَلَقَكُمۡ وَٱلَّذِینَ مِن قَبۡلِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ ۝٢١ ٱلَّذِی جَعَلَ لَكُمُ ٱلۡأَرۡضَ فِرَ ٰ⁠شࣰا وَٱلسَّمَاۤءَ بِنَاۤءࣰ وَأَنزَلَ مِنَ ٱلسَّمَاۤءِ مَاۤءࣰ فَأَخۡرَجَ بِهِۦ مِنَ ٱلثَّمَرَ ٰ⁠تِ رِزۡقࣰا لَّكُمۡۖ فَلَا تَجۡعَلُوا۟ لِلَّهِ أَندَادࣰا وَأَنتُمۡ تَعۡلَمُونَ ۝٢٢ وَإِن كُنتُمۡ فِی رَیۡبࣲ مِّمَّا نَزَّلۡنَا عَلَىٰ عَبۡدِنَا فَأۡتُوا۟ بِسُورَةࣲ مِّن مِّثۡلِهِۦ وَٱدۡعُوا۟ شُهَدَاۤءَكُم مِّن دُونِ ٱللَّهِ إِن كُنتُمۡ صَـٰدِقِینَ ۝٢٣ فَإِن لَّمۡ تَفۡعَلُوا۟ وَلَن تَفۡعَلُوا۟ فَٱتَّقُوا۟ ٱلنَّارَ ٱلَّتِی وَقُودُهَا ٱلنَّاسُ وَٱلۡحِجَارَةُۖ أُعِدَّتۡ لِلۡكَـٰفِرِینَ ۝٢٤﴾ [البقرة ١٧-٢٤]

  • تدبرমূলক অনুধ্যান (الوقفات التدبرية)
১- ﴿مَثَلُهُمْ كَمَثَلِ ٱلَّذِى ٱسْتَوْقَدَ نَارًا فَلَمَّآ أَضَآءَتْ مَا حَوْلَهُۥ ذَهَبَ ٱللَّهُ بِنُورِهِمْ وَتَرَكَهُمْ فِى ظُلُمَٰتٍ لَّا يُبْصِرُونَ﴾
যদি প্রশ্ন করা হয়: মুনাফিকদেরকে এমন এক ব্যক্তির সাথে তুলনা করার রহস্য কী, যে আগুন জ্বালিয়েছে যা চারপাশে আলো ছড়ানোর পর নিভে অন্ধকার হয়ে গিয়েছে? তবে এর উত্তর তিনটি দিক থেকে দেওয়া যায়: প্রথমত: ঈমানের দাবির মাধ্যমে দুনিয়াতে তাদের যে উপকার হয় তা আলোর মতো, আর আখেরাতে তাদের যে শাস্তি হবে তা আলোর পরের অন্ধকারের মতো। দ্বিতীয়ত: তাদের কুফরি গোপন রাখা আলোর মতো, আর তাদের গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়া অন্ধকারের মতো। তৃতীয়ত: এটি তাদের মধ্যকার এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যারা প্রথমে ঈমান এনেছিল এবং পরে কাফির হয়ে গিয়েছে; ফলে তাদের ঈমান ছিল আলো এবং এর পরবর্তী কুফরি হলো অন্ধকার। আর তাঁর এই বাণী একে প্রাধান্য দেয়: ﴿ذلك بأنهم آمنوا ثم كفروا﴾ (এটি এজন্য যে তারা ঈমান এনেছিল, অতঃপর কাফির হয়ে গিয়েছে)। [ইবনে জুযাই: ১/৫৪]
প্রশ্ন: মুনাফিকদেরকে আগুন প্রজ্জ্বলনকারী এমন ব্যক্তির সাথে তুলনা করার দিক কোনটি, যার আগুন চারপাশ আলোকিত করার পর আবার অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল?

২- ﴿صُمٌّۢ بُكْمٌ عُمْىٌ فَهُمْ لَا يَرْجِعُونَ﴾
আল্লাহ তাআলা [তাদের সম্পর্কে] বলেছেন: ﴿صم﴾ অর্থাৎ: কল্যাণকর কিছু শোনা থেকে বধির, ﴿بكم﴾ [অর্থাৎ]: কল্যাণকর কিছু বলা থেকে মূক, ﴿عمي﴾: সত্য দেখা থেকে অন্ধ, ﴿فهم لا يرجعون﴾: তারা ফিরে আসবে না; কারণ তারা সত্যকে জানার পর তা ত্যাগ করেছে, ফলে তারা আর তার দিকে ফিরে আসবে না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতার কারণে সত্য ত্যাগ করেছে, সে তো বোঝে না, এবং তাদের চেয়ে তার ফিরে আসার সম্ভাবনা অধিক কাছাকাছি। [সাদী: ৪৪]
প্রশ্ন: আল্লাহ তাআলা কেন মুনাফিকদের এমনভাবে বর্ণনা করেছেন যে ‘তারা ফিরে আসবে না’?

৩- ﴿وَلَوْ شَآءَ ٱللَّهُ لَذَهَبَ بِسَمْعِهِمْ وَأَبْصَٰرِهِمْ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَىْءٍ قَدِیرٌ﴾
আল্লাহ তাআলা এই স্থানে নিজেকে প্রতিটি বিষয়ে সর্বশক্তিমান বলে কেবল এই কারণেই বর্ণনা করেছেন, কারণ তিনি মুনাফিকদেরকে তাঁর শাস্তি ও পাকড়াও সম্পর্কে সতর্ক করেছেন এবং তাদেরকে জানিয়েছেন যে তিনি তাদেরকে পরিবেষ্টন করে আছেন, এবং তাদের শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নিতে সম্পূর্ণরূপে সক্ষম। [ইবনে কাছীর: ১/৫৫]
প্রশ্ন: আয়াতটিকে আল্লাহর ‘প্রতিটি বিষয়ে সর্বশক্তিমান’ গুণ দ্বারা সমাপ্ত করার রহস্য কী?

৪- ﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ ٱعْبُدُوا۟ رَبَّكُمُ ٱلَّذِى خَلَقَكُمْ وَٱلَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ﴾
﴿اعبدوا ربكم﴾ (তোমাদের রবের ইবাদত করো): এর মধ্যে আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান আনা, তাঁর তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করা এবং তাঁর আনুগত্য করা অন্তর্ভুক্ত; সুতরাং তাঁর প্রতি ঈমান আনার নির্দেশটি তাদের জন্য যারা তা অস্বীকারকারী ছিল, তাওহীদের নির্দেশ তাদের জন্য যারা শিরককারী ছিল, আর আনুগত্যের নির্দেশ তাদের জন্য যারা মুমিন ছিল। [ইবনে জুযাই: ১/৫৬]
প্রশ্ন: আয়াতে আহ্বানকৃত মানুষদের প্রকারভেদ স্পষ্ট করো।

৫- ﴿فَلَا تَجْعَلُوا۟ لِلَّهِ أَندَادًا وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ﴾
এই আয়াতটি এমন সুস্পষ্ট ও সুদৃঢ় নির্দেশনাবলীর অন্তর্ভুক্ত যার ওপর সকল শরীয়ত একমত হয়েছে এবং সকল আসমানী কিতাব একত্রিত হয়েছে। আর এটি হলো বিনম্রতার মূল স্তম্ভ, এবং এর ওপরই চরম আত্মসমর্পণ ও অনুগত্য আবর্তিত হয়। [বিকাঈ: ১/৫৯]
প্রশ্ন: এই আয়াতে আল্লাহর ইবাদতের একটি মূল নীতিমালা রয়েছে, তা কী?

৬- ﴿وَإِن كُنتُمْ فِى رَیۡبٍ مِّمَّا نَزَّلۡنَا عَلَىٰ عَبۡدِنَا فَأۡتُوا۟ بِسُورَةٍ مِّن مِّثۡلِهِۦ وَٱدۡعُوا۟ شُهَدَاۤءَكُم مِّن دُونِ ٱللَّهِ إِن كُنتُمۡ صَـٰدِقِینَ (٢٣) فَإِن لَّمۡ تَفۡعَلُوا۟ وَلَن تَفۡعَلُوا۟﴾
অর্থাৎ: তোমরা এটি কখনোই করতে পারবে না। আর এটিও আরেকটি অলৌকিক বিষয় (মোজেজা); কারণ তিনি অত্যন্ত দৃঢ়, নিশ্চিত এবং আগাম ঘোষণা দিয়ে কোনো ভয় বা আশঙ্কা ছাড়াই খবর দিয়েছেন যে, এই কোরআনের সমকক্ষ কোনো কিছু কিয়ামত পর্যন্ত কখনোই আনা সম্ভব নয়। আর বাস্তবেও তাই ঘটেছে, তাঁর জামানা থেকে শুরু করে আমাদের এই সময় পর্যন্ত এর সমকক্ষ কোনো কিছু আনা যায়নি এবং তা সম্ভবও নয়; আর তা কারও পক্ষে কীভাবে সম্ভব হতে পারে! [ইবনে কাছীর: ১/৫৮]
প্রশ্ন: এই আয়াতটি কোরআনে কারীমের একটি স্পষ্ট অলৌকিকত্ব নির্দেশ করে, তা ব্যাখ্যা করো।

৭- ﴿وَقُودُهَا ٱلنَّاسُ وَٱلۡحِجَارَةُ ۖ أُعِدَّتۡ لِلۡكَـٰفِرِینَ﴾
আর আল্লাহ তাআলা মানুষকে পাথরের আগে উল্লেখ করেছেন; কারণ তারাই কষ্ট ও যন্ত্রণা অনুভব করে, অথবা অনমনীয় বস্তুর চেয়ে তারা দ্রুত দাহ্য হওয়ায় আগুন প্রজ্জ্বলনে অধিক ভূমিকা রাখে—যেহেতু তাদের মধ্যে চামড়া, গোশত ও চর্বি রয়েছে, আর এতে ভীতি প্রদর্শনের মাত্রাও বেশি রয়েছে। [আলূসী: ১/১৯৯]
প্রশ্ন: আগুন প্রজ্বলনের ক্ষেত্রে মানুষকে পাথরের আগে কেন আনা হলো?

  • নির্দেশনা (التوجيهات)
    ১- আল্লাহর ইবাদতের নির্দেশ কেবল একটি দায়িত্ব নয়, বরং জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার মাধ্যম, ﴿وَقُودُهَا ٱلنَّاسُ وَٱلۡحِجَارَةُ ۖ أُعِدَّتۡ لِلۡكَـٰفِرِینَ﴾, ﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ ٱعْبُدُوا۟ رَبَّكُمُ﴾
    ২- আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি গভীর চিন্তা-ভাবনা করা বান্দার অন্তরে ইয়াকীন ও ঈমান বৃদ্ধির অন্যতম মাধ্যম, ﴿ٱلَّذِى جَعَلَ لَكُمُ ٱلۡأَرۡضَ فِرَ ٰ⁠شࣰا وَٱلسَّمَاۤءَ بِنَاۤءࣰ وَأَنزَلَ مِنَ ٱلسَّمَاۤءِ مَاۤءࣰ فَأَخۡرَجَ بِهِۦ مِنَ ٱلثَّمَرَ ٰ⁠تِ رِزۡقࣰا لَّكُمۡ﴾
    ৩- কোনো পরম দাতা যখন তোমাকে সম্মানিত ও নিয়ামত দান করেন, তখন তাঁর সাথে অন্য কাউকে শরীক করা চরম বুদ্ধিহীনতা ও শরীয়তবিরোধী কাজ, ﴿ٱلَّذِى جَعَلَ لَكُمُ ٱلۡأَرۡضَ فِرَ ٰ⁠شࣰا وَٱلسَّمَاۤءَ بِنَاۤءࣰ وَأَنزَلَ مِنَ ٱلسَّمَاۤءِ مَاۤءࣰ فَأَخۡرَجَ بِهِۦ مِنَ ٱلثَّمَرَ ٰ⁠تِ رِزۡقࣰا لَّكُمۡ ۖ فَلَا تَجۡعَلُوا۟ لِلَّهِ أَندَادًا وَأَنتُمۡ تَعۡلَمُونَ﴾
  • আয়াত অনুযায়ী আমল (العمل بالآيات)
    ১- আজ কোরআনের দৃষ্টান্তগুলোর মধ্যে একটি দৃষ্টান্ত পাঠ করুন এবং তা অনুধাবন করার চেষ্টা করুন, ﴿مَثَلُهُمْ كَمَثَلِ ٱلَّذِى ٱسْتَوْقَدَ نَارًا فَلَمَّآ أَضَآءَتْ مَا حَوْلَهُۥ ذَهَبَ ٱللَّهُ بِنُورِهِمْ وَتَرَكَهُمْ فِى ظُلُمَٰتٍ لَّا يُبْصِرُونَ﴾
    ২- অন্তরের আলো আল্লাহ তাআলার হাতে; তাই আল্লাহর কাছে এই বলে দোয়া করুন: «اللهم اجعل في قلبي نورا، وفي سمعي نورا، وفي بصري نورا» (হে আল্লাহ! আমার অন্তরে আলো দান করুন, আমার শ্রবণেন্দ্রিয়ে আলো দান করুন এবং আমার দৃষ্টিশক্তিতে আলো দান করুন), ﴿ذَهَبَ ٱللَّهُ بِنُورِهِمْ وَتَرَكَهُمْ فِى ظُلُمَٰتٍ لَّا يُبْصِرُونَ﴾
    ৩- এই আয়াতটি নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করুন, অতঃপর তা থেকে একটি শিক্ষা বের করে কোনো বার্তা পাঠের মাধ্যমে শেয়ার করুন, ﴿فَٱتَّقُوا۟ ٱلنَّارَ ٱلَّتِى وَقُودُهَا ٱلنَّاسُ وَٱلۡحِجَارَةُ﴾
  • শব্দার্থ (معاني الكلمات)
    ﴿بُكْمٌ﴾ তারা সত্য কথা বলে না।
    ﴿كَصَيِّبٍ﴾ প্রবল বর্ষণের মতো।
    ﴿أَنْدَادًا﴾ সমকক্ষ ও সদৃশ বস্তু।
    ﴿رَيْبٍ﴾ সংশয় ও সন্দেহ।