চোখের আগে কান: কেন কুরআন শ্রবণকে অগ্রাধিকার দেয়?
মূল উদ্দেশ্য: কুরআনে “দেখার আগে শোনার” যে বিশেষ ধারাবাহিকতা রয়েছে, তার আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক তাৎপর্য এবং বর্তমান যুগে আমাদের জন্য এর গুরুত্ব বোঝা।
১. একটি প্যাটার্ন
কুরআন মাজিদের যেখানেই শ্রবণ ও দর্শনকে জোড়ায় জোড়ায় ব্যবহার করা হয়েছে, সেখানে প্রায় সবসময়ই দেখার (আল-বাসার) আগে শ্রবণকে (আস-সাম) রাখা হয়েছে।
- আল্লাহর গুণাবলী: আল্লাহ নিজের বর্ণনা দেওয়ার সময় ‘আস-সামিউল বাসির’ (সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা) ক্রমটি ব্যবহার করেছেন।
- মানুষের সৃষ্টি: মানুষকে সৃষ্টি করার বর্ণনায় আল্লাহ বলেছেন যে, তিনি আমাদের “শ্রবণকারী ও দর্শনকারী” হিসেবে বানিয়েছেন (সূরা আল-ইনসান ৭৬:২)।
- ইন্দ্রিয়ের অনুপস্থিতি: এমনকি যারা সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে, তাদের বর্ণনা দেওয়ার সময়ও কুরআন “অন্ধত্বের” আগে “বধিরতার” (শুনতে না পারা) কথা উল্লেখ করেছে।
২. ওহীর যুক্তি: একটি বাণী যা শোনার জন্য
এই অগ্রাধিকারের গভীরতম কারণ হলো—ওহী বা প্রত্যাদেশ মূলত শোনার বিষয়।
- রাসূলের (সা.) ভূমিকা: নবীরা একটি বার্তা নিয়ে এসেছিলেন—এমন কিছু শব্দ যা গ্রহণ করতে হয় এবং তেলাওয়াত করতে হয়। তেইশ বছর ধরে সাহাবীদের কাছে কুরআন কোনো পড়ার বই ছিল না, বরং এটি ছিল একটি তেলাওয়াত যা তারা শুনতেন।
- শ্রবণ ও বিচারবুদ্ধি (আকল): কুরআন শ্রবণশক্তিকে চোখের সাথে নয়, বরং মন এবং বিচারবুদ্ধির সাথে যুক্ত করেছে। সূরা আল-মুলক-এ জাহান্নামীরা আক্ষেপ করে বলবে, “আমরা যদি শুনতাম অথবা বুদ্ধি খাটিয়ে চিন্তা করতাম, তবে আমরা আজ প্রজ্বলিত আগুনের অধিবাসী হতাম না।”
- ঈমানের প্রবেশদ্বার: ঈমান হৃদয়ে প্রবেশ করে একটি “আহ্বান শোনা এবং তা বিবেচনা করার” মাধ্যমে, কোনো দৃশ্যমান জাদুকরী প্রদর্শনী দেখে নয়। একজন মুমিনের পরিচয় হলো সে বলে, “হে আমাদের পালনকর্তা, আমরা একজন আহ্বানকারীকে ঈমানের দিকে আহ্বান করতে শুনেছি… তাই আমরা ঈমান এনেছি।”
৩. “দেখলেই বিশ্বাস”—এই মানসিকতার ফাঁদ
অনেকে বিশ্বাস করার আগে অলৌকিক কিছু দেখার দাবি করে, কিন্তু কুরআন এই প্রবণতাকে নাকচ করে দেয়।
- অলৌকিক ঘটনাই যথেষ্ট নয়: আগের জাতিগুলোকে অনেক অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখানো হয়েছিল—যেমন মুসা (আ.)-এর জন্য সমুদ্র দ্বিখণ্ডিত হওয়া বা সালেহ (আ.)-এর উটনী; তবুও দেখা মাত্রই যে তারা বিশ্বাস করেছিল এমন নয়।
- পরিপক্কতার লক্ষণ: একজন মানুষের উচিত সত্য শুনে এবং তা নিয়ে চিন্তা করে শিক্ষা গ্রহণ করা। চাক্ষুষ প্রমাণের জন্য জেদ করা মানে হলো হিদায়াত বা পথপ্রদর্শন কীভাবে হৃদয়ে পৌঁছায় সে সম্পর্কে ভুল ধারণা রাখা।
৪. সূরা সাজদাহ-তে ভীতিকর ক্রম পরিবর্তন
কুরআনের একটি জায়গায় আল্লাহ এই ক্রমটি উল্টে দিয়েছেন। সূরা আস-সাজদাহ (৩২:১২)-তে কিয়ামতের দিন অপরাধীরা মিনতি করে বলবে, “হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা এখন দেখেছি এবং শুনেছি—অতএব আমাদের আবার পাঠিয়ে দিন।”
- কেন এই পরিবর্তন? এরা ছিল সেই সব লোক যারা জেদ ধরেছিল যে তারা কেবল যা চোখে দেখে তা-ই বিশ্বাস করবে। সেদিন জাহান্নামের আগুন সামনে দেখে তারা তাদের দেখার অভিজ্ঞতাকে আগে গুরুত্ব দেবে।
- আল্লাহর জবাব: আল্লাহ তাদের সেই “শোনার আগে দেখা”-র যুক্তিটিই তাদের কাছে ফিরিয়ে দেবেন, কিন্তু তখন দেখা আর কোনো কাজে আসবে না। দুনিয়ায় তিনি কানকে আগে অগ্রাধিকার দিয়ে ইন্দ্রিয় দিয়েছিলেন, কিন্তু তারা অনেক দেরিতে চোখকে আগে রেখে স্বীকারোক্তি দিচ্ছে।
৫. বাস্তব জীবনে প্রয়োগ: শ্রবণ কীভাবে আমাদের দৃষ্টিকে বদলে দেয়
দৈনন্দিন জীবনে কানকে বা শ্রবণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার গভীর নৈতিক গুরুত্ব রয়েছে।
- দৃশ্যমান বিচারের অবসান: আমরা প্রায়ই অপরিচিত মানুষের বাহ্যিক চেহারা দেখে তাৎক্ষণিক বিচার করে ফেলি। কিন্তু যখন আমরা তাদের কথা শুনি, তখন আমাদের সেই চাক্ষুষ ধারণাগুলো ভেঙে যায় এবং আমরা মানুষের প্রকৃত রূপ দেখতে পাই।
- বাহ্যিকতার চেয়ে সারমর্ম: কুরআন আমাদের শেখায় যে মানুষের সম্পদ, পোশাক বা গায়ের রং দেখে নয়, বরং সে কী বার্তা বহন করছে তা দিয়ে বিচার করতে।
- তুফায়েল (রা.)-এর উদাহরণ: তুফায়েল ইবনে আমর আদ-দাওসি (রা.) শুরুতে তাঁর কানে তুলা গুঁজে রাখতেন যাতে নবীজি (সা.)-এর কথা তাঁর কানে না পৌঁছায়। কিন্তু যখন তিনি তুলা সরিয়ে সেই বার্তাটি শুনলেন, তখনই তিনি ঈমান আনলেন।
CONNECT :