ইবরাহীম (আঃ)-এর ‘আসলামতু’ থেকে শিক্ষা
কুরআনের সূরা বাকারার ১৩১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা এবং ইবরাহীম (আঃ)-এর মধ্যে একটি অসাধারণ কথোপকথন বর্ণিত হয়েছে: “যখন তার রব তাকে বললেন, ‘আত্মসমর্পণ করো!’ সে বলল, ‘আমি আত্মসমর্পণ করলাম (আসলামতু) জগৎসমূহের রবের কাছে।’” আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ কথোপকথন মনে হলেও, এর ব্যাকরণের গভীরে লুকিয়ে আছে ইবরাহীম (আঃ)-এর ঈমানের এক বিস্ময়কর দ্রুততা এবং দৃঢ়তা।
১. ব্যবধান ঘুচিয়ে দেওয়া
আমরা সাধারণত ভাষায় দুটি ঘটনার মাঝে ‘এবং’, ‘অতঃপর’ বা ‘তারপর’-এর মতো সংযোজক শব্দ ব্যবহার করি । কিন্তু এই আয়াতে আল্লাহর আদেশ এবং ইবরাহীম (আঃ)-এর উত্তরের মাঝে কোনো সংযোজক শব্দই নেই—না ‘ফা’ (ঠিক পরপরই), না ‘সুম্মা’ (কিছুকাল পরে) [৩]। এর অর্থ হলো, আল্লাহর আদেশ শোনা এবং তাঁর আনুগত্য করার মাঝে ভাবনার জন্য এক মুহূর্তের অবকাশও তিনি নেননি; তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ আর আল্লাহর আদেশ ছিল এক অবিচ্ছিন্ন গতি।
২. “ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে”
যখন আমাদের কিছু করতে বলা হয়, আমরা সাধারণত বলি “আমি করব”। কিন্তু ইবরাহীম (আঃ) এমন একটি শব্দ ব্যবহার করেছেন যার অর্থ “আমি তো আত্মসমর্পণ করেই ফেলেছি” [৪]। যদিও আদেশটি ছিল ভবিষ্যতের জন্য করণীয় এক কাজ, তিনি এমনভাবে উত্তর দিয়েছেন যেন কাজটি ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়ে গেছে । তিনি কেবল করার এক ইচ্ছা প্রকাশ করেননি, বরং একটি সম্পন্ন ফলাফল পেশ করেছেন, যা তাঁর অটল নিশ্চয়তারই পরিচয় দেয়।
৩. “পরে করব”-এর ফাঁদ
আমাদের অধিকাংশের মাঝেই একটি প্রবণতা কাজ করে যাকে বলা হয় আত-তাসবীফ, অর্থাৎ অন্তহীন “পরে করব-করব” বলা । যখনই আল্লাহর কোনো স্পষ্ট নির্দেশ আমাদের কাছে পৌঁছায়—যেমন সময়মতো সালাত পড়া, হারাম বর্জন করা বা কাউকে ক্ষমা করা—আমরা মাঝে একটি ব্যবধান তৈরি করি এই বলে যে, “আরেকটু বড় হয়ে করব” বা “জীবন একটু থিতু হলে করব” । কিন্তু ইবরাহীম (আঃ) তাঁর জীবনে এই “পরে” বা কোনো শর্তের ফাঁকই রাখেননি ।
- শিক্ষা: তিনি যখন বললেন, “আমি আত্মসমর্পণ করলাম জগৎসমূহের রবের কাছে“, তখন তিনি আসলে বুঝিয়েছেন যে, যখন পরম করুণাময় রব কথা বলেন, তখন দ্বিধা বা বিলম্বের কোনো মানেই হয় না। আপনি আপনার রবকে যত গভীরভাবে চিনবেন, তাঁর আদেশ এবং আপনার আনুগত্যের মাঝখানের দূরত্ব তত কমে আসবে।
একটি আদর্শ জীবন
এই ‘আসলামতু’ বা তাৎক্ষণিক আত্মসমর্পণ কেবল একবারের কোনো বাক্য ছিল না, বরং এটি ছিল ইবরাহীম (আঃ)-এর গোটা জীবনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য । নিজের প্রিয় সন্তানকে কুরবানি করার মতো কঠিনতম পরীক্ষাতেও তিনি একইভাবে কোনো টানাপোড়েন ছাড়াই আত্মসমর্পণ করেছিলেন । এই উত্তরাধিকারই তিনি তাঁর সন্তানদের দিয়ে গেছেন যাতে তারা পূর্ণ সমর্পণকারী বা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ না করে ।
আজকের শিক্ষা থেকে আমাদের জন্য প্রশ্ন: আমার জীবনের কোথায় আমি আল্লাহর আদেশের বিপরীতে একটি “পরে করব” বসিয়ে রেখেছি? কোন আনুগত্যের জবাব আমি “করেছি”-র বদলে “করব” দিয়ে দিচ্ছি? ইবরাহীম (আঃ)-এর ‘আসলামতু’ আমাদের জন্য সেই আদর্শ, যেখানে আদেশ এবং পালনের মাঝে কোনো ‘যদি’, ‘কিন্তু’ বা ‘পরে’ অবশিষ্ট থাকে না।