Course Content
Words in Quran – IN DEPTH
0/56
Words in Quran – IN DEPTH

ইব্রাহিম (আ.)-এর শ্রেষ্ঠ সম্ভাষণ: ব্যাকরণের সূক্ষ্মতায় দয়া ও শিষ্টাচার

পবিত্র কুরআনের সূরা হূদের ৬৯ নম্বর আয়াতে ফেরেশতারা যখন মানুষের বেশে হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর কাছে মেহমান হয়ে আসলেন, তখন তাদের মধ্যে একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু চমৎকার কথোপকথন হয়েছিল। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ কুশল বিনিময় মনে হলেও, এর ব্যাকরণগত গঠনের গভীরে লুকিয়ে আছে এক অসাধারণ শিষ্টাচার।

আয়াতটি হলো: ﴿ قالُوا سَلامًا قالَ سَلامٌ ﴾ (Qālū salāman, qāla salāmun) “তারা বলল: সালাম; তিনি বললেন: সালাম।”

এখানে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ফেরেশতারা যে ‘সালাম’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন এবং ইব্রাহিম (আ.) তার জবাবে যে ‘সালাম’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন—উভয় শব্দের শেষের স্বরচিহ্ন বা হারাকাত ভিন্ন। আরবী ব্যাকরণে এই সামান্য পরিবর্তনই পুরো অর্থের গভীরতা বদলে দিয়েছে।

১. ফেরেশতাদের সম্ভাষণ: সল্লামান (Salāman)

ফেরেশতারা বলেছিলেন: سَلَامًا (Salāman — শেষে ‘আন্’ বা নসব)। আরবী ব্যাকরণ অনুযায়ী, যখন কোনো বিশেষ্য ‘নসব’ (জবরযুক্ত) অবস্থায় থাকে, তখন তার পেছনে একটি উহ্য ক্রিয়াপদ বা ভার্ব (Verb) থাকে।

  • এর পূর্ণ অর্থ দাঁড়ায়: نُسَلِّمُ سَلَامًا (Nusallimu salāman) — “আমরা আপনাকে শান্তির সম্ভাষণ জানাচ্ছি।”
  • এটি একটি কাজ বা একশনকে নির্দেশ করে যা সেই মুহূর্তে ঘটছে। এটি একটি সাময়িক অবস্থা।

২. ইব্রাহিম (আ.)-এর উত্তর: সল্লামুন (Salāmun)

জবাবে ইব্রাহিম (আ.) বলেছিলেন: سَلَامٌ (Salāmun — শেষে ‘উন্’ বা রফ)। আরবী ব্যাকরণ অনুযায়ী, যখন কোনো বিশেষ্য ‘রফ’ (পেশযুক্ত) অবস্থায় থাকে, তখন তা একটি বিশেষ্যবাচক বাক্য বা নমিনাল সেন্টেন্স (Nominal Sentence) গঠন করে।

  • এর পূর্ণ অর্থ দাঁড়ায়: سَلَامٌ عَلَيْكُمْ (Salāmun ‘alaykum) — “শান্তি [আপনার ওপর] চিরস্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হোক।”
  • এটি কোনো সাময়িক কাজ নয়, বরং এটি একটি চিরস্থায়ী এবং স্থিতিশীল অবস্থা। এটি কোনো কাজের ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি একটি সুনিশ্চিত ধ্রুব সত্য হিসেবে অবস্থান করে।

৩. ব্যাকরণের মাধ্যমে ‘উত্তম’ সম্ভাষণ

ইব্রাহিম (আ.) ফেরেশতাদের সম্ভাষণ কেবল ফিরিয়েই দেননি, বরং তিনি সেটিকে আরও উন্নত বা আপগ্রেড করেছেন।

  • ফেরেশতারা দিয়েছিলেন একটি সাময়িক মুহূর্তের শান্তি।
  • ইব্রাহিম (আ.) তার জবাবে দিলেন একটি স্থায়ী ও সুপ্রতিষ্ঠিত শান্তি।

পবিত্র কুরআনের অন্য এক জায়গায় আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন: “যখন তোমাদের কোনো সম্ভাষণ জানানো হয়, তখন তোমরা তার চেয়েও উত্তম অভিবাদন জানাও অথবা অন্তত সেটিই ফিরিয়ে দাও।” (সূরা আন-নিসা ৪:৮৬)

হযরত ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর এই নির্দেশটি পালন করেছিলেন অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে। তিনি কোনো অতিরিক্ত শব্দ ব্যবহার না করে কেবল ব্যাকরণের একটি হারাকাত পরিবর্তন করে (নসব থেকে রফ-এ রূপান্তর করে) আগত মেহমানদের আরও উন্নতমানের দুআ বা সম্ভাষণ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

শিক্ষা ও প্রতিফলন

এই আয়াতটি আমাদের শেখায় যে, আল্লাহর কালাম কত নিখুঁত। যারা আরবী ভাষা ও ব্যাকরণ বোঝেন, তাদের কাছে একটি ‘জবর’ বা একটি ‘পেশ’-এর পরিবর্তন কেবল ব্যাকরণ নয়, বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা এক অলৌকিক জ্ঞান।

ভাবনার খোরাক: আমরা যখন কাউকে সালাম দেই বা কারো সালামের উত্তর দেই, তখন কি আমরা তা দায়সারাভাবে করি, নাকি ইব্রাহিম (আ.)-এর মতো আন্তরিকতা ও শিষ্টাচারের সাথে আরও উত্তমভাবে করার চেষ্টা করি? কুরআনের এই ক্ষুদ্রতম সূক্ষ্মতাগুলোই আমাদের উন্নত নৈতিকতা ও আদব শেখায়।