Course Content
Words in Quran – IN DEPTH
0/56
Words in Quran – IN DEPTH

অলঙ্কারিক বিদ্রুপ: সূরা আল-মাসাদে ‘জীদ’ শব্দের রহস্য

পবিত্র কুরআনের সূরা আল-মাসাদের শেষ আয়াতে আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামিলের শাস্তির বর্ণনা দিতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা একটি বিশেষ শব্দ ব্যবহার করেছেন। আয়াতটি হলো:

﴿ فِي جِيدِهَا حَبْلٌ مِّن مَّسَدٍ ﴾  “তার গলায় থাকবে পাকানো রশি।”

এখানে ‘গলা’ বা ‘ঘাড়’ বুঝাতে আল্লাহ ‘জীদ’ (جِيد) শব্দটি ব্যবহার করেছেন। আরবী ভাষায় ঘাড় বুঝাতে সাধারণ শব্দ হলো ‘উনুর্ক’ (عُنُق)। কিন্তু এখানে আল্লাহ কেন ‘উনুর্ক’ না বলে ‘জীদ’ ব্যবহার করলেন? এই শব্দচয়নের গভীরে লুকিয়ে আছে এক চরম বিদ্রুপ এবং ভাষাগত অলৌকিকতা।

১. ‘উনুর্ক’ বনাম ‘জীদ’: শাব্দিক পার্থক্য

আরবী ভাষায় এই দুটি শব্দের প্রয়োগ সম্পূর্ণ ভিন্ন:

  • عُنُق (ʿunuq): এটি ঘাড়ের একটি সাধারণ ও শারীরিক নাম। এটি কোনো বিশেষ অর্থ বহন করে না, কেবল শরীরের একটি অঙ্গকে বোঝায়।
  • جِيد (jīd): এই শব্দটি আরবরা তখন ব্যবহার করে যখন কোনো নারীর ঘাড়ের সৌন্দর্য এবং তার অলঙ্কারের বর্ণনা দেওয়া হয়। প্রাচীন আরবী কবিতায় কোনো নারীর রূপের প্রশংসা করতে গিয়ে এই শব্দটির ব্যবহার করা হতো।

২. ইবনুল কাইয়ুম ও আল-যামাখশারীর বিশ্লেষণ

বিখ্যাত ভাষাবিদ আল-যামাখশারীর মতে, এটি কুরআনের এক শক্তিশালী অলঙ্কারিক বিদ্রুপ। ‘জীদ’ শব্দটি হলো সৌন্দর্যের শব্দ। আরবরা যখন কোনো নারীর সুদীর্ঘ ও অলঙ্কারমণ্ডিত ঘাড়ের বর্ণনা দিত, তখন তারা বলত— “وَجِيدٌ كَجِيدِ الرِّيمِ” “হরিণের ঘাড়ের মতো সুন্দর একটি ঘাড়।”

উম্মে জামিল ছিল একজন অত্যন্ত অহংকারী নারী, যে তার উচ্চ বংশমর্যাদা এবং দামী গলার হারের জন্য গর্বিত ছিল। সে তার সেই দামী হার পরা সুন্দর ঘাড় দিয়েই নবীজি (সা.)-এর বিরুদ্ধে আভিজাত্য প্রদর্শন করত। কুরআন তার সেই অহংকারের জায়গাতেই আঘাত করেছে।

৩. কেন ‘জীদ’ শব্দটি এখানে নিখুঁত?

১. অহংকারের প্রতিশোধ: উম্মে জামিল যে সুন্দর ঘাড় নিয়ে গর্ব করত এবং যা দামী গয়না দিয়ে সাজাত, আল্লাহ সেই ঘাড়ের জন্যই ‘জীদ’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। যেন বলা হচ্ছে— “তার সেই অতি আদরের সুন্দর ঘাড়, যা নিয়ে সে এত গর্বিত ছিল, সেখানেই এখন দামী হারের বদলে জ্বলন্ত আগুনের শক্ত পাকানো রশি ঝুলবে।” ২. বিদ্রুপের তীব্রতা: যদি এখানে সাধারণ ‘উনুর্ক’ ব্যবহার করা হতো, তবে অর্থ দাঁড়াত কেবল “তার ঘাড়ে রশি থাকবে।” কিন্তু ‘জীদ’ ব্যবহার করায় এর অর্থ দাঁড়িয়েছে— “তার সেই অলঙ্কারমণ্ডিত সুন্দর ঘাড়ে এখন অপমানের রশি থাকবে।” এটি উম্মে জামিলের আভিজাত্যকে ধূলিসাৎ করে দেওয়ার এক ভাষাগত অস্ত্র।

৪. কুরআনের একটি বিশেষ প্যাটার্ন

ইমাম আর-রাযীর মতে, কুরআন মাজিদের অন্যান্য জায়গায় যেখানেই শাস্তি বা লাঞ্ছনার বর্ণনা এসেছে, সেখানে সবসময় ‘উনুর্ক’ (عُنُق) বা এর বহুবচন ‘আ’নাক’ (أَعْنَاق) ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন:

  • ﴿ إِنَّا جَعَلْنَا فِي أَعْنَاقِهِمْ أَغْلَالًا ﴾  “নিশ্চয় আমি তাদের ঘাড়ে বেড়ী পরিয়েছি।” (সূরা ইয়াসীন ৩৬:৮)
  • ﴿ وَلَا تَجْعَلْ يَدَكَ مَغْلُولَةً إِلَىٰ عُنُقِكَ ﴾  “আর তুমি তোমার হাতকে নিজের ঘাড়ের সাথে শিকলবদ্ধ করো না।” (সূরা বনী ইসরাঈল ১৭:২৯)

কিন্তু কেবল উম্মে জামিলের ক্ষেত্রে এই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে ‘জীদ’ ব্যবহার করা হয়েছে তার নারীসুলভ সৌন্দর্য ও অলঙ্কারের দম্ভকে বিদ্রুপ করার জন্য।

৫. একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বোঝা যাক

কল্পনা করুন, কেউ একজন তার দামী ব্র্যান্ডের ঘড়ি নিয়ে খুব অহংকার করে। তাকে যখন কেউ অপমান করতে চায়, তখন সে কেবল “তোমার হাতের শিকল” না বলে বলবে— “তোমার ওই দামী ব্র্যান্ডের হাতের ওপর এখন একটা লোহার শেকল থাকবে।” এখানে সেই ‘দামী হাতের’ উল্লেখ করাটাই হলো সবচেয়ে বড় অপমান। আল্লাহ ঠিক এই কাজটিই করেছেন উম্মে জামিলের ক্ষেত্রে।

শিক্ষা ও প্রতিফলন

সূরা আল-মাসাদের এই একটি শব্দ আমাদের শেখায় যে, মানুষ যা নিয়ে অহংকার করে, আল্লাহ সেই জিনিসটি দিয়েই তাকে লজ্জিত করতে পারেন। উম্মে জামিল তার সম্পদ ও সৌন্দর্যকে ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছিল, আর আল্লাহ সেই সৌন্দর্য ও আভিজাত্যের শব্দ ‘জীদ’ ব্যবহার করেই তাকে কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের কাছে উপহাসের পাত্র বানিয়ে দিলেন।

ভাবনার খোরাক: কুরআনের শব্দচয়ন কতটা নিখুঁত হতে পারে যে, কেবল একটি শব্দের পরিবর্তনের মাধ্যমে আল্লাহ একইসাথে শাস্তি এবং ব্যক্তির অহংকারের ওপর বিদ্রুপ—উভয়টিই প্রকাশ করতে পারেন। এটিই হলো আল-কুরআনের ভাষাগত অলৌকিকতা।