ফেরাআউনের জনতাত্ত্বিক যুদ্ধ: কেন ‘কন্যা’ নয়, ‘নারী’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে?
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-বাকারার ৪৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বনী ইসরাঈলকে ফেরাআউনের দাসত্ব থেকে মুক্তি দেওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। সেখানে ফেরাআউনের অত্যাচারের বর্ণনা দিতে গিয়ে আল্লাহ বলেন:
﴿يُذَبِّحُونَ أَبۡنَاۤءَكُمۡ وَيَسۡتَحۡيُونَ نِسَاۤءَكُمۡۚ﴾ “তারা তোমাদের পুত্রদের যবেহ করত এবং তোমাদের নারীদের জীবিত রাখত।”
এই আয়াতে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভাষাগত রহস্য লুকিয়ে আছে। সাধারণত ‘পুত্র’ শব্দের বিপরীত শব্দ হিসেবে ‘কন্যা’ বা আরবী بَنَاتِكُمْ (Banātakum) শব্দটি আসার কথা ছিল। কিন্তু আল্লাহ এখানে তা না বলে ব্যবহার করেছেন نِسَاءَكُمْ (Nisā’akum) যার অর্থ ‘তোমাদের নারী’। কেন এই পরিবর্তন? এর পেছনে লুকিয়ে আছে ফেরাআউনের এক ভয়ংকর ও সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের ইতিহাস।
১. ভবিষ্যতের দাসত্ব ও শোষণ
ফেরাআউন কেবল কন্যা শিশুদের দয়া করে বাঁচিয়ে রাখত এমন নয়। ক্লাসিক্যাল মুফাসসিরগণের মতে, এখানে ‘নারী’ শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে সেই শিশুদের পরিণতির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
- ফেরাআউনের উদ্দেশ্য ছিল এই কন্যা শিশুরা বড় হয়ে যেন এক প্রজন্ম দাসীতে পরিণত হয়।
- আল্লাহ এখানে نِسَاءَكُمْ (তোমাদের নারী) বলে বোঝাচ্ছেন যে, তাদের শৈশবের সেই জীবন বাঁচিয়ে রাখাটা আসলে দয়া ছিল না, বরং তা ছিল নারী হিসেবে তাদের সারাজীবন শ্রম ও শোষণের জালে আটকে রাখার একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা।
২. يَسْتَحْيُونَ (ইস্তাহইউন): এক হাড়হিম করা শব্দ
কন্যাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য আল্লাহ يَسْتَحْيُونَ (Yastahyūn) শব্দটি ব্যবহার করেছেন।
- এর আক্ষরিক অর্থ “তারা জীবিত রাখত”, কিন্তু এর ভেতরের অর্থ অত্যন্ত বেদনাদায়ক। এটি এমনভাবে কোনো কিছুকে বাঁচিয়ে রাখা বোঝায়, যেমন মানুষ গবাদি পশুকে নিজের প্রয়োজনে বা সেবার জন্য লালন-পালন করে।
- ফেরাআউনের কাছে বনী ইসরাঈলের কন্যারা কোনো সম্মানিত মানুষ ছিল না, বরং তারা ছিল স্রেফ একটি ‘রিসোর্স’ বা সম্পদ, যাদের নিজেদের প্রয়োজনে বাঁচিয়ে রাখা হতো।
৩. জনতাত্ত্বিক যুদ্ধ (Demographic Warfare)
ফেরাআউনের এই নীতি ছিল একটি সুপরিকল্পিত যুদ্ধকৌশল:
- পুত্রদের যবেহ করা: এর মাধ্যমে বনী ইসরাঈলের ভবিষ্যৎ যোদ্ধাদের শেষ করে দেওয়া হতো, যাতে কেউ তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে না পারে।
- নারীদের বাঁচিয়ে রাখা: এর মাধ্যমে বনী ইসরাঈলকে একটি পুরুষশূন্য এবং কেবল দাসীনির্ভর জাতিতে পরিণত করার চেষ্টা করা হতো, যারা পুরোপুরি ফেরাআউনের কর্তৃত্বের অধীনে থাকবে।
৪. করুণা নয়, বরং একটি ‘ফাঁদ’
যদি আল্লাহ এখানে بَنَاتِكُمْ (তোমাদের কন্যা) বলতেন, তবে মনে হতে পারতো যে পুত্রদের মেরে ফেলার বিপরীতে কন্যাদের বাঁচিয়ে রাখাটা বুঝি ফেরাআউনের এক ধরণের করুণা ছিল। কিন্তু نِسَاءَكُمْ (তোমাদের নারী) বলে আল্লাহ পরিষ্কার করে দিলেন যে— “তারা তোমাদের কন্যাদের বাঁচায়নি, বরং তোমাদের নারীদের ফাঁদে ফেলেছিল।” অর্থাৎ তাদের বড় হতে দেওয়া হয়েছিল কেবল নারী হিসেবে লাঞ্ছিত ও শোষিত হওয়ার জন্য।
৫. লাঞ্ছনা ও ট্র্যাজেডি
ইমাম আর-রাযীর মতে, পুত্রদের হারিয়ে ফেলা ছিল একটি ট্র্যাজেডি বা চরম দুঃখের বিষয়। কিন্তু ঘরের নারীদের শত্রুর কবলে দাসী হিসেবে বেঁচে থাকতে দেখা ছিল পুরুষদের জন্য চরম লাঞ্ছনা ও অপমানের বিষয়। এই দুটি বিষয়—পুত্রদের যবেহ এবং নারীদের লাঞ্ছনা—মিলে তৈরি হয়েছিল সেই بَلَاءٌ عَظِيمٌ (Balā’un ‘azīm) বা ‘মহা পরীক্ষা’, যার কথা আল্লাহ আয়াতের শেষে উল্লেখ করেছেন।
শিক্ষা ও প্রতিফলন
এই আয়াতটি আমাদের শেখায় যে কুরআনের প্রতিটি শব্দ কত নিখুঁতভাবে বাছাই করা হয়েছে। ‘কন্যা’ শব্দের বদলে ‘নারী’ শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে আল্লাহ সেই সময়ের বনী ইসরাঈল নারীদের প্রতি হওয়া দীর্ঘমেয়াদী জুলুম এবং মানসিক যন্ত্রণার কথা স্বীকৃতি দিয়েছেন।