Course Content
Words in Quran – IN DEPTH
0/56
Words in Quran – IN DEPTH

আসাররু (أَصَرُّوا) — গিঁটবাঁধা হৃদয়

সূরা নূহ (৭১), আয়াত ৭


আমরা দেখব, কুরআনের একটিমাত্র শব্দ কীভাবে একটি পূর্ণ শিক্ষার ভার বহন করতে পারে।

আজকের শব্দটি এসেছে নবী নূহ (আলাইহিস সালাম)-এর সেই দীর্ঘ দাওয়াতের ঘটনা থেকে, যেখানে তিনি আল্লাহর কাছে তাঁর জাতির আচরণ তুলে ধরছেন:

وَإِنِّي كُلَّمَا دَعَوْتُهُمْ لِتَغْفِرَ لَهُمْ جَعَلُوا أَصَابِعَهُمْ فِي آذَانِهِمْ وَٱسْتَغْشَوْا ثِيَابَهُمْ وَأَصَرُّوا وَٱسْتَكْبَرُوا ٱسْتِكْبَارًا

ওয়া ইন্নী কুল্লামা দাআওতুহুম লিতাগফিরা লাহুম, জাআলূ আসাবিআহুম ফী আযানিহিম, ওয়াসতাগশাও সিয়াবাহুম, ওয়া আসাররু ওয়াসতাকবারুস তিকবারা।

“আর আমি যতবারই তাদের ডেকেছি — যাতে আপনি তাদের ক্ষমা করে দেন — ততবারই তারা কানে আঙুল গুঁজেছে, কাপড়ে নিজেদের ঢেকে নিয়েছে, গোঁ ধরে অটল থেকেছে, এবং দম্ভভরে অহংকার করেছে।” — (সূরা নূহ ৭১:৭)

সাধারণ অনুবাদে আসাররু-কে বলা হয় “তারা একগুঁয়েমি করল”। কথাটা ভুল নয় — কিন্তু কেবল এই অনুবাদ শব্দটির ভেতরের ছবিটি ধরতে পারে না। আর সেই ছবিতেই লুকিয়ে আছে পুরো শিক্ষা।


শব্দটি

আসাররু এসেছে আরবি ধাতু ص-ر-ر (সোয়াদ–রা–রা) থেকে। মূল অর্থ পাওয়ার আগে এই ধাতুটি ব্যবহৃত হতো একটি বাস্তব, স্পর্শযোগ্য কাজের জন্য — কোনো থলের মুখ শক্ত গিঁটে বেঁধে ফেলা, এমন আঁটসাঁটভাবে যে ভেতরে কিছু ঢোকেও না, বেরোয়ও না। টাকা রাখার সেই বাঁধা থলেকেই বলা হতো সুর্‌রা (صُرَّة)।

ইমাম আর-রাগিব আল-ইসফাহানী তাঁর মুফরাদাত-এ ইসরার-কে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে: গুনাহের মধ্যে নিজেকে গিঁট দিয়ে বেঁধে ফেলা (তাআক্কুদ), তার উপর শক্ত হয়ে বসে থাকা, এবং তা থেকে সরে আসতে অস্বীকার করা।

তাহলে কুরআন যখন বলে তারা আসাররু করল, ছবিটি দাঁড়ায়:

তারা নিজেদের হৃদয়কে গিঁট দিয়ে শক্ত করে বেঁধে ফেলল।

সত্যের বার্তা বাইরে থেকে আঘাত করছিল, ভেতরে প্রবেশ করতে চাইছিল — কিন্তু গিঁট এত শক্ত যে কোনো আলো ভেতরে পৌঁছাতে পারল না। একগুঁয়েমি এখানে নিছক একটি স্বভাব নয়; এটি একটি সিদ্ধান্ত — হৃদয়ের দরজা সচেতনভাবে বেঁধে রাখার সিদ্ধান্ত।


চারটি স্তরের প্রত্যাখ্যান

আয়াতটি লক্ষ্য করুন — প্রত্যাখ্যানটি একধাপে আসেনি, এসেছে ক্রমে ক্রমে গভীর হয়ে:

প্রথমে কানে আঙুল — বাইরের শব্দটুকু আটকানো। তারপর কাপড়ে মুখ ঢাকা — চোখও বন্ধ, দৃষ্টিও অস্বীকার। এরপর আসাররু — কেবল ইন্দ্রিয় নয়, এবার ভেতরের হৃদয়টাই গিঁটে বাঁধা। আর সবশেষে অহংকার — এবং সেই অহংকারও সাধারণ নয়, ইসতিকবারান — দম্ভের চূড়ান্ত রূপ।

বাইরের অস্বীকার (কান, চোখ) থেকে ভেতরের অস্বীকার (হৃদয়, অহং) — পতনের এই ক্রমটিই মানুষের প্রকৃত বিপদ। কান-চোখ বন্ধ করা যায় এক মুহূর্তে; কিন্তু হৃদয়ে গিঁট পড়ে ধীরে ধীরে, বারবার অস্বীকারের অভ্যাসে।


একটি বীজ, যা ফাটতে চায় না

আরেকটি ছবিতে কথাটা স্পষ্ট হয়। একজন দক্ষ কৃষকের কথা ভাবুন, যিনি একটি বীজকে সবকিছু নিখুঁতভাবে দিচ্ছেন — পরিমিত পানি, যথাযথ রোদ, উর্বর মাটি। কোনো ঘাটতি নেই। তবু বীজটি খুলতে অস্বীকার করছে — শক্ত, বন্ধ, গিঁটের মতো নিজের ভেতরে নিজে আটকা, মাটিতে পড়ে থেকেও অঙ্কুরিত হচ্ছে না।

নবী নূহ (আঃ) ছিলেন সেই নিখুঁত কৃষকের মতো। সাড়ে নয়শ বছরের দীর্ঘ ধৈর্য, রাত-দিনের আহ্বান, প্রকাশ্য ও গোপন সব পথ — নবীসুলভ পদ্ধতির প্রতিটি শর্ত তিনি পূর্ণ করেছিলেন। বার্তায় কোনো ত্রুটি ছিল না, প্রচারকেও কোনো গাফিলতি ছিল না। ত্রুটি ছিল গ্রহণকারীর দিকে — সেই গিঁটবাঁধা বীজে, যা খুলতেই চাইল না।

শিক্ষাটি স্পষ্ট: হিদায়াত পৌঁছে দেওয়া আমাদের কাজ; হৃদয় খুলে তা গ্রহণ করা গ্রহণকারীর সিদ্ধান্ত। নিখুঁত দাওয়াতও বন্ধ হৃদয়ে প্রবেশ করতে পারে না।


যে গিঁট ক্ষমাকেও আটকে দেয়

আয়াতের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী দিকটি এর শুরুতেই: নূহ (আঃ) তাদের ডেকেছিলেন “লিতাগফিরা লাহুম”যাতে আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দেন। অর্থাৎ দরজার ওপাশে অপেক্ষা করছিল ক্ষমা, করুণা, মুক্তি। আর এর জবাবে তারা বেছে নিল ইসরার — গিঁট আরও শক্ত করা।

এখানেই আলিমদের সেই বিখ্যাত নীতিবাক্যটি জীবন্ত হয়ে ওঠে:

“লা কাবীরাতা মাআল ইসতিগফার, ওয়া লা সাগীরাতা মাআল ইসরার।” ইসতিগফারের সাথে কোনো গুনাহ বড় থাকে না, আর ইসরারের সাথে কোনো গুনাহ ছোট থাকে না।

একটি ছোট গুনাহও যখন ইসরার-এর গিঁটে বাঁধা পড়ে — বারবার, অনুতাপহীনভাবে — তখন তা আর ছোট থাকে না। আর সবচেয়ে বড় গুনাহও ইসতিগফার-এর সামনে গলে যায়, কারণ ইসতিগফার গিঁটটাই খুলে দেয়।


আমাদের জন্য

এই একটি শব্দ আমাদের নিজেদের হৃদয়ের দিকে তাকাতে বলে।

প্রথমত, একগুঁয়েমি কোনো ছোট ত্রুটি নয়। যে ভুল আমরা জেনেও আঁকড়ে ধরে রাখি, যে অভ্যাস “পরে ছাড়ব” বলে বছরের পর বছর টেনে নিই — সেটিই ইসরার, সেটিই হৃদয়ের গিঁট।

দ্বিতীয়ত, অহংকারই সেই গিঁটের সুতো। মানুষ সাধারণত নিজের ভুল মেনে নিতে পারে না অহংকারের কারণেই — “আমি তো জানিই”। আর গিঁট খোলার একমাত্র উপায় নম্রতা — নিজের মুখাপেক্ষিতা স্বীকার করা।

তৃতীয়ত, ইসতিগফারই গিঁট-খোলার চাবি। নূহ (আঃ)-এর জাতি যে ক্ষমার দরজা নিজ হাতে বন্ধ করেছিল, সেই দরজা আমাদের জন্য আজও খোলা — যতক্ষণ আমরা গিঁট শক্ত করার বদলে তা খুলে দিতে রাজি থাকি।

আল্লাহ আমাদের হৃদয়কে নরম ও উন্মুক্ত রাখুন, ইসরারের গিঁট থেকে রক্ষা করুন, এবং তাঁর কিতাবের প্রতিটি শব্দের প্রতি আমাদের উপলব্ধি গভীর করে দিন। আমীন।