“মাতাব” (Mataba): আল্লাহর অসীম দয়া ও ভাষাগত রহমতের এক অনন্য নিদর্শন
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-ফুরকানের ৭১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা তওবা বা অনুশোচনা বুঝাতে একটি বিশেষ শব্দ ব্যবহার করেছেন। তিনি কেবল ‘তাওবাহ’ (tawbah) না বলে ব্যবহার করেছেন ‘মাতাব’ (mataba)।
১. শব্দের সূক্ষ্মতা ও ব্যাকরণগত তেজ আরবী ভাষায় ‘তাওবাহ’ এবং ‘মাতাব’—উভয় শব্দের অর্থই হলো তওবা বা আল্লাহর দিকে ফিরে আসা। কিন্তু তাদের ওজনে অনেক পার্থক্য রয়েছে। আরবী ব্যাকরণ অনুযায়ী, শব্দের শুরুতে এই অতিরিক্ত ‘মীম’ (meem) যুক্ত হওয়া শব্দটির গুরুত্ব বা তেজকে অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয়। ‘মাতাব’ হলো এমন এক শক্তিশালী তওবা, যাকে আল্লাহ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছেন এবং কবুল হওয়ার অকাট্য নিশ্চয়তা বা সিলমোহর দিয়েছেন। আল্লাহ এখানে কেবল তওবাকে স্বীকৃতি দেননি, বরং এর মাহাত্ম্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন।
২. প্রেক্ষাপট: যখন পাপ পাহাড়সম হয় এই আয়াতের ঠিক আগের অংশগুলোতে শিরক, হত্যা এবং ব্যভিচারের মতো ভয়াবহ গুনাহর কথা বলা হয়েছে। এগুলো একজন মানুষের করা সবচেয়ে বড় ও জঘন্যতম অপরাধ। যখন কেউ এই ধরণের পাপে লিপ্ত হয়, তখন তার মনে সংশয় জাগতে পারে—”আমার এই সামান্য অনুশোচনা কি এতো বড় পাপ মুছে ফেলার জন্য যথেষ্ট? আল্লাহ কি আমাকে আদৌ ক্ষমা করবেন?”
আল্লাহ সেই সংশয় দূর করতেই ‘মাতাব’ শব্দটি বেছে নিয়েছেন। এটি কেবল ক্ষমা প্রার্থনা গ্রহণ করা নয়, বরং এটি সেই ব্যক্তির ফিরে আসাকে উদযাপন করার সমান। এটি গুনাহগার বান্দাকে বলে যে—তোমার তওবা এতটাই শক্তিশালী যে, আল্লাহ এর মাধ্যমে কেবল তোমার পাপ মোচনই করবেন না, বরং তোমার সেই বড় বড় অপরাধগুলোকে নেকি দিয়ে বদলে দেবেন।
৩. আমাদের জন্য মূল শিক্ষা যদি সবচেয়ে বড় বড় পাপের ক্ষেত্রে আল্লাহ বান্দার ফিরে আসাকে ‘মাতাব’ বা অত্যন্ত শক্তিশালী ও প্রভাবশালী তওবা হিসেবে স্বীকৃতি দেন, তবে আমরা আমাদের ছোটখাটো গুনাহর ক্ষেত্রে কেন আল্লাহর দয়া নিয়ে সন্দেহ পোষণ করব? আল্লাহ যেখানে আমাদের তওবাকে শক্তিশালী বলে ঘোষণা করেছেন, সেখানে আমাদের কাজ হলো পূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে তাঁর দিকে ফিরে আসা।
কুরআনের একটি আয়াতের ভেতরে নীরবে বসে থাকা এই ছোট্ট শব্দ চয়নটিই আসলে আল্লাহর সেই অসীম রহমতের বহিঃপ্রকাশ, যা আমরা অধিকাংশ সময় খেয়ালই করি না। এই ‘মাতাব’ শব্দটিই আমাদের আশার আলো দেখায় যে, ফিরে আসাটা যদি খাঁটি হয়, তবে ক্ষমা অবধারিত।