Course Content
Words in Quran – IN DEPTH
0/56
Words in Quran – IN DEPTH

একটি শব্দ, দুটি গন্তব্য: দুই ধরণের ‘কাযিমীন’ (Kāẓimīn)

আজকের পাঠে আমরা শিখব কীভাবে কুরআন মাজিদ একটি নির্দিষ্ট শব্দকে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করেছে এবং সেই বৈসাদৃশ্যের মধ্যে আমাদের জীবনের জন্য কী গভীর শিক্ষা লুকিয়ে আছে। আমাদের আজকের আলোচনার মূল বিষয় হলো সূরা আল-ইমরানের ১৩৪ নম্বর আয়াত এবং সূরা গাফিরের ১৮ নম্বর আয়াতে ব্যবহৃত একটি শব্দ—‘কাযিমীন’

শব্দটির উৎস ও মূল ভাব

আরবি শব্দ ‘কাযিম’ (Kāẓim) যার বহুবচন হলো ‘কাযিমীন’ (Kāẓimīn)। এই শব্দটি ‘কাফ-যা-মীম’ (ক-য-ম) মূল ধাতু থেকে এসেছে। এর মূল ধারণাটি হলো—কোনো কিছু ভেতরে চেপে রাখা এবং পূর্ণ কোনো বস্তুর মুখ শক্ত করে বন্ধ বা সিল করে দেওয়া।

শব্দটির ছবি পরিষ্কার করার জন্য কল্পনা করুন একটি পুরনো চামড়ার পানির মশক (Water-bag) যা কানায় কানায় পূর্ণ এবং এর মুখটি খুব শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হয়েছে যাতে এক ফোঁটা পানিও বাইরে উপচে না পড়ে। অর্থাৎ, ভেতরে প্রচণ্ড চাপ থাকা সত্ত্বেও বাইরে থেকে তা শক্তভাবে আটকে রাখা—এটাই হলো ‘কাযম’।

কুরআনে এই একই শব্দকে দুটি ভিন্ন দৃশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে:


দৃশ্য ১: মুমিনের বৈশিষ্ট্য (সূরা আল-ইমরান ৩:১৩৪)

আল্লাহ তাআলা মুমিনদের বর্ণনা দিয়ে বলেন: “ওয়াল কাযিমীনাল গাইযা” অর্থাৎ— “এবং যারা নিজেদের রাগকে সংবরণ করে।”

এখানে এমন একজন মুমিনের কথা বলা হয়েছে যার হৃদয় রাগে পূর্ণ। হয়তো কেউ তার সাথে অন্যায় করেছে এবং তার পাল্টা আঘাত করার পূর্ণ অধিকার ও ক্ষমতা আছে। কিন্তু সে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারায় না; সে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সচেতনভাবে এবং শান্তভাবে নিজের রাগের মুখটি বন্ধ করে রাখে।

লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো—এখানে নিয়ন্ত্রক কে? এখানে ব্যক্তি নিজেই তার রাগের নিয়ন্ত্রক। রাগ তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে না, বরং সে নিজেই তার হৃদয়ের মালিক। এই ধরণের ‘কাযিম’ বা আত্মনিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তিদের সম্পর্কে আয়াতের শেষে বলা হয়েছে: “আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।” অর্থাৎ এই ধরণের গুণ আল্লাহ তাআলার অত্যন্ত প্রিয়।


দৃশ্য ২: কিয়ামতের দিন (সূরা গাফির ৪০:১৮)

আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের ভয়াবহতা বর্ণনা করে বলেন: “ওয়া আনযিরহুম ইয়াওমাল আযিফাতি ইযিল কুলুবু লাদাল হানাজিরি কাযিমীন” অর্থাৎ— “তাদেরকে সতর্ক করে দাও সেই আসন্ন দিন সম্পর্কে, যখন প্রাণবায়ু কণ্ঠাগত হবে এবং তারা হবে দমবন্ধ (কাযিমীন) অবস্থায়।”

দেখুন, এখানেও সেই একই শব্দ ‘কাযিমীন’ ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু দৃশ্যটি সম্পূর্ণ আলাদা। এটি কিয়ামতের দিন, যখন মানুষ আতঙ্কে এতটাই আচ্ছন্ন হয়ে পড়বে যে তাদের হৃদয় ভয়ে কণ্ঠনালীর কাছে উঠে আসবে। তারা কথা বলতে পারবে না, চিৎকার করতে পারবে না, এমনকি সেই ভয়টুকু গিলে ফেলতেও পারবে না।

তারাও এখানে ‘কাযিমীন’, কিন্তু এখানে তাদের কোনো পছন্দ বা নিয়ন্ত্রণ নেই। এখানে আতঙ্ক বা ভয়াবহতা তাদের নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা স্বেচ্ছায় কিছু চেপে রাখছে না; বরং তারা নিজেরাই সেই আতঙ্কের চাপে পিষ্ট এবং অভিভূত।


আয়নার মতো তুলনা: কে কার মালিক?

এই দুটি দৃশ্য পাশাপাশি রাখলে একটি চমৎকার মিল পাওয়া যায়। উভয় ক্ষেত্রেই হৃদয় কোনো কিছুতে কানায় কানায় পূর্ণ এবং তার মুখ বন্ধ বা সিল করা। কিন্তু পার্থক্যটি হলো—সেই মুখটি কে চেপে ধরে আছে?

১. সূরা আল-ইমরানে মুমিন ব্যক্তি নিজেই ‘কাযিম’। সে আল্লাহর জন্য স্বেচ্ছায় নিজের রাগের মুখ চেপে ধরেছে। ফলে সে আল্লাহর প্রশংসিত ও প্রিয় পাত্রে পরিণত হয়েছে। ২. সূরা গাফিরে অবিশ্বাসীরাও ‘কাযিমীন’। কিন্তু সেখানে তাদের হৃদয়ের মুখ চেপে ধরে আছে চরম আতঙ্ক। তারা তাদের ভেতরের সেই ভয়াবহ অনুভূতির কাছে পরাজিত ও বন্দী।


আমাদের জীবনের জন্য শিক্ষা

প্রতিবার যখন আপনার ভেতরে রাগ বা ক্রোধের জন্ম হয় এবং আপনি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সেই রাগের মুখ বন্ধ করে রাখার সিদ্ধান্ত নেন, তখন আপনি কেবল “ধৈর্য” ধরছেন না; বরং আপনি সেই মানসিক পেশিকে শক্তিশালী করছেন যা আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় দিনে (কিয়ামতের দিন) প্রয়োজন হবে।

যে ব্যক্তি এখন দুনিয়ায় নিজের রাগকে সংবরণ করতে শেখে—স্বেচ্ছায় এবং সচেতনভাবে—সে নিজেকে সেই ভয়াবহ দিনের জন্য প্রস্তুত করছে। সে চেষ্টা করছে যেন তাকে কিয়ামতের দিন সেইসব ‘কাযিমীন’ বা দমবন্ধ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত হতে না হয়, যাদের আর কোনো পছন্দ করার সুযোগ থাকবে না।

চিন্তার খোরাক

পরের বার যখন আপনি প্রচণ্ড রাগান্বিত হবেন এবং আপনার হাতে পাল্টা আঘাত করার সুযোগ থাকবে, তখন নিজেকে একবার থামিয়ে প্রশ্ন করুন: “এই মুহূর্তে আমি কোন ধরণের ‘কাযিম’? আমি কি আমার হৃদয়কে নিয়ন্ত্রণ করছি, নাকি আমার হৃদয় আমাকে নিয়ন্ত্রণ করছে?”

শান্তভাবে আল্লাহর জন্য নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা এমন একটি গুণ যা আল্লাহ ভালোবাসেন। এই চর্চাটি আজ থেকেই শুরু করুন, যতক্ষণ পর্যন্ত পছন্দ করার সুযোগটি আপনার হাতে আছে।