কুরআনের শব্দচয়ন: একবচন ও বহুবচনের সূক্ষ্ম রহস্য
পবিত্র কুরআন অধ্যয়ন করলে আমরা প্রায়ই এমন কিছু ভাষাগত গঠন দেখতে পাই যা আপাতদৃষ্টিতে ব্যাকরণিক অমিল বলে মনে হতে পারে, কিন্তু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় তার পেছনে রয়েছে আল্লাহর অসীম হিকমত ও অলৌকিক শব্দশৈলী। আজ আমরা শিখব কেন কুরআন কিছু জায়গায় বহুবচনের পরিবর্তে একবচন ব্যবহার করে এক বিশাল অর্থ প্রকাশ করে।
১. সূরা আন-নূরের একটি বিশেষ আয়াত
সূরা আন-নূরের ৩১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা শিশুদের একটি বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন: “…আবিত তিফ্লিল্লাযীনা লাম ইয়াজহারূ…”।
এখানে লক্ষ্য করার মতো একটি বিষয় রয়েছে:
- ‘আত-তিফ্লি’ (at-tifl): এটি একটি একবচন শব্দ, যার অর্থ ‘শিশু’।
- ‘আল্লাযীনা’ (alladhina): এটি একটি বহুবচনবাচক অব্যয়, যার অর্থ ‘যারা’।
- ‘লাম ইয়াজহারূ’ (lam yazharu): এটি একটি বহুবচন ক্রিয়া।
সাধারণ ব্যাকরণ অনুযায়ী একবচনের সাথে একবচন এবং বহুবচনের সাথে বহুবচন হওয়ার কথা। কিন্তু আল্লাহ এখানে একবচন ‘শিশু’ শব্দের সাথে বহুবচন ব্যবহার করেছেন। আরবী অলঙ্কারশাস্ত্রে একে বলা হয় ‘ইসমুল জিনস’ (Generic Noun)।
২. ইসমুল জিনস বা জাতিবাচক বিশেষ্য কী?
ক্লাসিক্যাল আরবীতে কিছু শব্দ আছে যা একবচন হিসেবে ব্যবহৃত হলেও তা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে না বুঝিয়ে পুরো একটি শ্রেণি বা জাতিকে বোঝায়। ‘শিশু’ (তিফল), ‘শত্রু’ (আদুউ), ‘অতিথি’ (দায়িফ) এবং ‘রাসূল’ শব্দগুলো এই তালিকায় পড়ে।
এখানে ‘আত-তিফল’ মানে কেবল ‘একটি শিশু’ নয়, বরং এর অর্থ হলো ‘শিশুরূপী সমগ্র শ্রেণি’। এই একবচন শব্দটি এখানে একজন, দুইজন বা অসংখ্য—যেকোনো সংখ্যক শিশুকে বোঝাতে পারে।
৩. কেন সরাসরি বহুবচন (আতফাল) ব্যবহার করা হলো না?
প্রশ্ন জাগতে পারে, আল্লাহ কেন এখানে সরাসরি বহুবচন শব্দ ‘আতফাল’ ব্যবহার করলেন না? এর পেছনে ওলামায়ে কেরাম ও ভাষাবিদগণ চমৎকার কিছু কারণ দেখিয়েছেন:
- সংখ্যার চেয়ে গুণের ওপর গুরুত্ব: যখন আল্লাহ একবচন ‘তিফল’ ব্যবহার করেন, তখন তিনি সংখ্যার দিকে নয় বরং ‘শৈশব’ নামক অবস্থার দিকে ইঙ্গিত করেন। এই বিধানটি সেই সব শিশুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যারা নারী ও পুরুষের গোপন বিষয় সম্পর্কে এখনো সচেতন নয়—চাই সে একটি শিশু হোক বা একশ জন। এখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সেই বিশেষ ‘বৈশিষ্ট্য’ বা ‘অবস্থার’ ওপর।
- ব্যাপকতা ও অন্তর্ভুক্তি: একবচন জাতিবাচক শব্দ হিসেবে এটি অনেক বেশি ব্যাপক। এটি যেকোনো শিশুকে এই বিধানের আওতায় নিয়ে আসে।
- ভাষাগত সৌন্দর্য ও সংক্ষিপ্ততা: আরবী অলঙ্কারশাস্ত্রে সংক্ষিপ্ত কথার মাধ্যমে বিশাল অর্থ প্রকাশ করাকে অত্যন্ত উঁচু মানের দক্ষতা ধরা হয়। একবচন শব্দটি উচ্চারণে হালকা হলেও এর অর্থ অনেক গভীর ও বিস্তৃত।
৪. একটি চমৎকার বৈসাদৃশ্য: সূরা আন-নূর ২৪:৩১ বনাম ২৪:৫৯
আল্লাহর কালাম কত নিখুঁত তার প্রমাণ পাওয়া যায় যখন আমরা একই সূরার ৫৯ নম্বর আয়াতের দিকে তাকাই। সেখানে আল্লাহ শিশুদের সম্পর্কেই বলছেন, কিন্তু এবার ব্যবহার করেছেন সরাসরি বহুবচন শব্দ— ‘আল-আতফালু’।
কেন এই পরিবর্তন?
- ২৪:৩১ আয়াতে আলোচনা ছিল সাধারণভাবে যেকোনো শিশুর সামনে পর্দার বিধান নিয়ে। সেখানে কোনো নির্দিষ্ট শিশুকে চিহ্নিত করা হয়নি, বরং শিশুদের একটি সাধারণ অবস্থার কথা বলা হয়েছে।
- ২৪:৫৯ আয়াতে বলা হয়েছে, “তোমাদের সন্তানদের মধ্যে (মিনকুম) যারা বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছেছে…”। এখানে নির্দিষ্টভাবে আপনার পরিবারের বা ঘরের সন্তানদের কথা বলা হচ্ছে যারা বড় হচ্ছে। যেহেতু এখানে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি বা সদস্যদের কথা বলা হচ্ছে, তাই এখানে সরাসরি বহুবচন ‘আতফাল’ ব্যবহার করা হয়েছে।
৫. কুরআনের অন্যান্য উদাহরণ
এই প্যাটার্নটি কুরআনের আরও অনেক জায়গায় দেখা যায়:
- শত্রু (আদুউ): সূরা মুমতাহিনার ১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ‘আদুউয়ী ওয়া আদুউয়াকুম’ (আমার শত্রু ও তোমাদের শত্রু) বলেছেন। এখানে ‘শত্রু’ শব্দটি একবচন হলেও এর মাধ্যমে সকল শত্রুকে বোঝানো হয়েছে।
- রাসূল: অনেক জায়গায় ‘রাসূল’ শব্দটি একবচন হিসেবে আসলেও তা দ্বারা নবীদের পুরো দল বা শ্রেণিকে বোঝানো হয়।
মূল শিক্ষা
কুরআনের প্রতিটি শব্দচয়ন—কখন একবচন হবে আর কখন বহুবচন—তা মোটেও কাকতালীয় নয়। যেখানে আল্লাহ কোনো বিষয়ের সাধারণ অবস্থা বা শ্রেণি বোঝাতে চান, সেখানে তিনি একবচন ব্যবহার করেন। আর যেখানে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দলের দিকে ইঙ্গিত করেন, সেখানে বহুবচন ব্যবহার করেন।
এই ভাষাগত সূক্ষ্মতা আমাদের শেখায় যে, আল্লাহর প্রতিটি বাণীর পেছনে রয়েছে গভীর প্রজ্ঞা। তাই কুরআন পাঠ করার সময় আমাদের কেবল ওপর ওপর পড়লে চলবে না, বরং প্রতিটি শব্দের গভীরে গিয়ে চিন্তা করা উচিত। এটাই হলো কুরআনের সেই ‘তাদাব্বুর’ বা গভীর চিন্তা যার নির্দেশ আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন।