Course Content
Words in Quran – IN DEPTH
0/56
Words in Quran – IN DEPTH

অবিচল হৃদয়: প্রাচুর্যে কৃতজ্ঞতা ও বিপদে ধৈর্য

পবিত্র কুরআনের একটি অত্যন্ত বিস্ময়কর দিক হলো, আল্লাহ তাআলা অনেক সময় ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতির মানুষকে একই শব্দ ব্যবহার করে প্রশংসা করেন। আজ আমরা এমন দুই জন মহান নবী সম্পর্কে জানব যাঁদের জীবন ছিল একে অপরের সম্পূর্ণ বিপরীত, কিন্তু আল্লাহর কাছে তাঁদের মূল্যায়ন ছিল হুবহু এক। তাঁরা হলেন—হযরত সুলাইমান (আ.) এবং হযরত আইয়ুব (আ.)।

১. হযরত সুলাইমান (আ.): নেয়ামতের শিখরে এক অনন্য বান্দা

হযরত সুলাইমান (আ.)-এর কাছে একজন মানুষের কল্পনা করা সম্ভব এমন সবকিছুই ছিল। তাঁর ছিল এক বিশাল রাজত্ব, অগাধ সম্পদ, জিনদের সেনাবাহিনী এবং এমনকি বাতাসকেও তাঁর অধীনস্থ করে দেওয়া হয়েছিল।

এত বিপুল ক্ষমতা এবং সম্পদ থাকা সত্ত্বেও কোনো কিছুই তাঁকে তাঁর রবের স্মরণ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। সূরা সাদে (৩৮:৩০) আল্লাহ তাঁর সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন:

“কী চমৎকার বান্দা! সে ছিল বড়ই প্রত্যাবর্তনশীল (অর্থাৎ বারবার আল্লাহর দিকে ফিরে আসত)।”

২. হযরত আইয়ুব (আ.): বিপদের সাগরে এক ধৈর্যশীল বান্দা

সুলাইমান (আ.)-এর ঠিক বিপরীত জীবন ছিল হযরত আইয়ুব (আ.)-এর। তিনি তাঁর স্বাস্থ্য, সম্পদ, পরিবার এবং আরাম-আয়েশ—প্রায় সবকিছুই হারিয়েছিলেন। দীর্ঘ বছর ধরে তিনি কঠিন অসুস্থতা ও কষ্টের মধ্যে অতিবাহিত করেছেন।

এত চরম বিপদের মুখেও তিনি এক মুহূর্তের জন্যও বিচলিত হননি বা আল্লাহর প্রতি অসন্তুষ্ট হননি। সূরা সাদে (৩৮:৪৪) আল্লাহ তাঁর সম্পর্কেও ঠিক একই ভাষায় প্রশংসা করে বলেছেন:

“আমি তাঁকে পেলাম ধৈর্যশীল। কী চমৎকার বান্দা! সে ছিল বড়ই প্রত্যাবর্তনশীল।”

৩. পরিস্থিতির ভিন্নতা, প্রশংসার অভিন্নতা

খেয়াল করে দেখুন, এই দুই নবীর জন্য আল্লাহ হুবহু একই বাক্য ব্যবহার করেছেন: “কী চমৎকার বান্দা! সে ছিল বড়ই প্রত্যাবর্তনশীল।”

অথচ তাঁদের পরিস্থিতি ছিল দুই মেরুর:

  • সুলাইমান (আ.) ছিলেন তাঁর ওপর বর্ষিত নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ (শুকরগুজার)
  • আইয়ুব (আ.) ছিলেন তাঁর ওপর আসা চরম বিপদের মুখে ধৈর্যশীল (সবরকারী)

৪. মূল শিক্ষা: পরিস্থিতির ঊর্ধ্বে আল্লাহর আনুগত্য

আল্লাহর কাছে এটি বড় বিষয় নয় যে আপনি রাজপ্রাসাদে আছেন নাকি অসুস্থ অবস্থায় পড়ে আছেন। বরং তাঁর কাছে বড় বিষয় হলো—আপনি সেই পরিস্থিতিতে আল্লাহর নির্দেশ কতটুকু পালন করছেন।

  • আল্লাহর নির্দেশ হলো: নেয়ামত পেলে কৃতজ্ঞ হও এবং বিপদ আসলে ধৈর্য ধরো।
  • উভয় নবীই তাঁদের নিজ নিজ পরিস্থিতিতে আল্লাহর এই নির্দেশ পূর্ণরূপে পালন করেছিলেন এবং উভয়েই আল্লাহর দিকে বারবার ফিরে আসতেন।

এ কারণেই তাঁদের উভয়ের জন্য আল্লাহ একই প্রশংসা বরাদ্দ করেছেন। এটি আমাদের শেখায় যে, ‘কৃতজ্ঞতা’ এবং ‘ধৈর্য’—উভয়ই আসলে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার দুটি ভিন্ন পথ মাত্র।


আমাদের জীবনের কাজ হলো পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন—সুখ কিংবা দুঃখ—সব অবস্থাতেই আল্লাহর নির্দেশ পালন করা। সুলাইমান (আ.)-এর মতো প্রাচুর্য আমাদের যেন অহংকারী না করে, আর আইয়ুব (আ.)-এর মতো বিপদ যেন আমাদের হতাশ না করে। সব সময় আল্লাহর দিকে ফিরে থাকাই হলো একজন “চমৎকার বান্দা” হওয়ার চাবিকাঠি।