“লা রাইবা ফীহি” — এই তিনটি শব্দ কেন থমকে দাঁড় করিয়ে দেয়

ভাবুন তো, কেউ আপনাকে একটা বই হাতে দিয়ে বলল, “এই নাও।” আপনি স্বাভাবিকভাবেই জিজ্ঞেস করবেন — বইটা কী নিয়ে, কে লিখেছে, ভরসা করা যায় তো?

কুরআন এখানে একটু অন্যরকম। “এই সেই কিতাব” বলার পরপরই, দ্বিতীয় আয়াতেই, এটি নিজের সম্পর্কে একটা কথা বলে বসে —

لَا رَيْبَ فِيهِ — “এতে কোনো সন্দেহ নেই।”

মাত্র তিনটি শব্দ। কিন্তু ওজনটা টের পাচ্ছেন? বইটা শুরুই হচ্ছে না, বরং হাত তুলে যেন বলছে — “থামো, আগে এটা বুঝে নাও।”

চলুন ধীরে ধীরে খুলি।

আগে শব্দ তিনটা চিনে নিই

তাড়াহুড়ো নয়, একটা একটা করে:

  • লা (لَا) — “নেই।” সোজা, সাফ, কোনো রাখঢাক নেই।
  • রাইব (رَيْب) — “সন্দেহ।” সেই খচখচে অনুভূতি, মন যখন বলে “হুম, তা কি সত্যিই?”
  • ফীহি (فِيهِ) — “এর ভেতরে।” (“ফি” মানে ভেতরে, আর “হি” সর্বনামটা ইশারা করছে কুরআনের দিকেই।)

জোড়া লাগালে দাঁড়ায়: “এই কিতাবে কোনো সন্দেহ নেই।”

সহজ শোনাচ্ছে। কিন্তু ঠিক এখান থেকেই আসল ব্যাপারটা শুরু।

“সন্দেহ নেই” — আসলে কীসের সন্দেহ?

মজাটা এখানেই। এই ছোট্ট বাক্যের ভেতর একটা নয়, তিন-তিনটা অর্থ পাশাপাশি বসে আছে। আর সবচেয়ে সুন্দর কথা হলো — আপনাকে বেছে নিতে হবে না “কোনটা ঠিক।” তিনটাই একসাথে ঠিক।

১. কুরআন সত্য — এতে সন্দেহ নেই। এর বার্তা ফাঁপা নয়, বাস্তব। যা বলছে, তার ওপর পা রেখে দাঁড়ানো যায়। “এটা আসল তো?” — এই “হয়তো”টা এখানে নেই।

২. এর ভেতরে সন্দেহ করার মতো কিছুই নেই। পুরো কিতাবটা মেলে ধরুন, কিংবা যেকোনো এক লাইনে জুম করুন — কোথাও একটা ফাটল পাবেন না। ভুল তো দূরের কথা, ভুলের সম্ভাবনাটুকুও নেই। যত ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে যাচাই করুন, এটি জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে।

৩. এটি কোথা থেকে এসেছে — তা নিয়েও সন্দেহ নেই। এটি নেমেছে সমস্ত জগতের প্রতিপালক, রাব্বুল আলামীন-এর পক্ষ থেকে। উৎসটা ঝাপসা নয়, একদম নিশ্চিত।

তিনটা কেন একসাথে দরকার

খেয়াল করেছেন? এই তিনটা অর্থ যেন একটা শেকলের তিনটা কড়া — কিতাবটা সত্য, এর ভেতরের সবকিছু নির্ভুল, আর এটি এসেছে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে।

একটা কড়া খুলে নিন, বাকি দুটোও টলমল করে উঠবে। উৎস নিশ্চিত না হলে ভেতরের কথায় ভরসা আসে না; ভেতরে ভুল থাকলে উৎস যতই বড় হোক, দাগ পড়ে যায়। কিন্তু এখানে তিনটাই একসাথে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, অটল।

তাই কুরআন যখন একেবারে গোড়াতেই বলে “লা রাইবা ফীহি,” তখন এটা কেবল একটা দাবি ছুড়ে দিচ্ছে না — এটা আপনার পায়ের নিচে শক্ত মাটি এনে দিচ্ছে। যেন দ্বিতীয় আয়াত থেকেই হাত বাড়িয়ে বলছে: এরপর যা আসছে, নিশ্চিন্তে ভরসা রেখো।

আর এখানেই সবচেয়ে বড় চমকটা

একবার থেমে ভাবুন। এই আয়াতটা কিন্তু শুধু একটা দাবি করেই থেমে থাকেনি — চ্যালেঞ্জও ছুড়ে দিয়েছে। “এতে কোনো সন্দেহ নেই” মানে কার্যত বলা হচ্ছে: পারলে একটা সন্দেহ প্রমাণ করে দেখাও।

প্রায় ১৪০০ বছর পেরিয়ে গেছে। কত প্রজন্ম, কত সভ্যতা, কত পণ্ডিত, কত সমালোচক — সবাই এসেছে, নেড়েচেড়ে দেখেছে, খুঁটিয়ে যাচাই করেছে। অথচ আজও সেই দাবি ঠিক যেমন ছিল তেমনই দাঁড়িয়ে — একটা সন্দেহও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

এটা কি নিজেই একরকম মুজিযা নয়? একটা বই প্রথম পাতাতেই এত বড় বাজি ধরল, আর চৌদ্দ শতাব্দী ধরে সেই বাজি জিতেই চলেছে। কিয়ামত পর্যন্ত এই কথাটা যেমন সত্য ছিল, তেমনই সত্য থাকবে — কেউ কোনোদিন এর মধ্যে সন্দেহ গেঁথে দিতে পারবে না।

আর হয়তো এটাই মূল শিক্ষা: যে দাবিটা এতগুলো শতাব্দীর ঝড় সয়েও অক্ষত থেকে গেছে, সেটা আর নিছক দাবি থাকে না — সেটা নিজেই একটা প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়।

তিনটা ছোট্ট শব্দ। একটা বিশাল আস্থা। আর সময়ের হাতে বারবার পরীক্ষা দিয়েও অটুট থাকা একটা সত্য।