কুরআন শুরু হয় সূরা ফাতিহা দিয়ে। পুরো সূরাটাই আসলে একটা দোয়া — আমরা আল্লাহর প্রশংসা করি, তাঁর রব্ব হওয়া স্বীকার করি, আর শেষে চাই —

“আমাদের সরল পথ দেখাও।”

এখানেই সূরাটা শেষ হয়ে যায়। শুধু একটা আকুতি — “ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকিম।”

এবার পাতা উল্টান। সূরা বাকারা শুরু হচ্ছে। আর প্রথম শব্দ কী? *আলিফ, লাম, মিম।*

চিন্তা করুন — আমরা এইমাত্র চাইলাম, “পথ দেখাও।” আর আল্লাহ যেন সাথে সাথে উত্তর দেওয়া শুরু করলেন। কিন্তু সেই উত্তরের প্রথম শব্দটাই এমন, যার অর্থ আমরা জানি না।

এটা কি একটু অদ্ভুত মনে হচ্ছে না? আমরা পথ চাইলাম, আর পথের শুরুতেই এমন কিছু পেলাম যা রহস্যে মোড়া।হাদীসের কোনো নির্ভরযোগ্য বর্ণনায় পাওয়া যায় না যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কখনো এই আলিফ-লাম-মিমের অর্থ ব্যাখ্যা করে গেছেন। আবু বকর, উমর, উসমান, আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) সহ অনেক সাহাবী থেকেও বর্ণিত আছে যে তাঁরা এর ব্যাখ্যায় না গিয়ে বলতেন — এর প্রকৃত অর্থ আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।

এখানেই লুকিয়ে আছে গাইডেন্সের আসল শর্ত :

এখন লক্ষ্য করুন, এই তিনটা রহস্যময় অক্ষরের ঠিক পরের আয়াতেই কী বলা হচ্ছে —

“এটাই সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই।”

চিন্তা করে দেখুন — একদিকে আল্লাহ এমন কিছু বললেন যা আমরা বুঝিই না, আর সাথে সাথেই বললেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। এটা কাকতালীয় না। এটাই বোধহয় পুরো বিষয়টার কেন্দ্রবিন্দু।

আল্লাহ যেন বলছেন — “তোমরা সব কিছু বুঝবে না, সবকিছুর ব্যাখ্যা তোমাদের কাছে থাকবে না। কিন্তু তার মানে এই না যে তোমরা সন্দেহ করবে।”

বোঝা আর মানা — দুইটা আলাদা জিনিস :

আমরা সাধারণত ভাবি, “আগে বুঝব, তারপর মানব।” কিন্তু ঈমানের জায়গায় ব্যাপারটা উল্টো হতে পারে। কিছু জিনিস এমন আছে যেগুলো আমরা কখনোই পুরোপুরি বুঝব না — না বিজ্ঞান দিয়ে, না যুক্তি দিয়ে, না আলোচনা দিয়ে। আর সেটা স্বাভাবিক, কারণ আমরা সীমাবদ্ধ, আল্লাহ সীমাহীন।

এখানে “সন্দেহ না থাকা” মানে এই না যে আমরা প্রশ্ন করতে পারব না, চিন্তা করতে পারব না, শিখতে চাইব না। প্রশ্ন করা আর সন্দেহ করা এক জিনিস না। প্রশ্ন হলো জানার আগ্রহ, সন্দেহ হলো বিশ্বাস ভেঙে যাওয়া। একজন আলিফ-লাম-মিমের অর্থ না জেনেও পুরোপুরি নিশ্চিত থাকতে পারে যে এটা আল্লাহর কালাম — কারণ বিশ্বাসের ভিত্তি জ্ঞানের পরিপূর্ণতা না, বরং আল্লাহর প্রতি আস্থা।

আয়াতটা আবার পড়ুন —

“এটাই সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই, মুত্তাকীদের জন্য হেদায়েত।

লক্ষ্য করুন শব্দটা — *”মুত্তাকীদের জন্য”*। সবার জন্য না। যাদের মধ্যে তাকওয়া আছে, মানে আল্লাহকে ভয় করা, তাঁর প্রতি সচেতনতা আছে — গাইডেন্স তাদের জন্যই কার্যকর হয়।

তার মানে কী দাঁড়ালো? গাইডেন্স পাওয়ার প্রথম শর্তটা বুদ্ধি বা জ্ঞান না। প্রথম শর্তটা হলো একটা মানসিক অবস্থান — বিনয়, আস্থা, নিজেকে ছোট মনে করা আল্লাহর সামনে।তাই যখন আল্লাহ গাইডেন্স দেওয়া শুরু করলেন, প্রথমেই তিনি এমন কিছু দিলেন যা বুদ্ধি দিয়ে ধরা যায় না। এটা যেন একটা টেস্ট। যে বলবে, “আমি বুঝি না, তাই মানব না” — সে হয়তো এখানেই থমকে যাবে। আর যে বলবে, “আমি বুঝি না, কিন্তু যিনি বলেছেন তাঁকে বিশ্বাস করি” — তার জন্যই আসল হেদায়েত শুরু হবে, পরের আয়াত থেকে।

আমাদের জীবনে এর মানে কী

আমাদের দ্বীনি জীবনেও এমন অনেক কিছু আছে যেগুলোর হিকমত (যুক্তি) আমরা সাথে সাথে বুঝি না — কোনো বিধান, কোনো নির্দেশ, কোনো পরীক্ষা। তখন আমাদের সামনে দুইটা পথ —

– একটা হলো, “যতক্ষণ না বুঝব, ততক্ষণ মানব না।”

– আরেকটা হলো, “না বুঝলেও মানব, কারণ যিনি বলেছেন তার উপর আমার আস্থা আছে — আর সময়মতো হয়তো বুঝও যাব।”

সূরা বাকারার শুরুটা যেন এই দ্বিতীয় পথটাই আমাদের শেখাচ্ছে। আলিফ-লাম-মিম দিয়ে বোঝানো হচ্ছে — গোটা কুরআনজুড়েই এমন কিছু জিনিস পাবে যা তোমার বুদ্ধির বাইরে, কিন্তু তাতে যেন তোমার বিশ্বাসে চিড় না ধরে।

এমনকি রাসূল (ﷺ)-ও এটা ব্যাখ্যা করেননি

এই জায়গাটা একটু থমকে ভাবার মতো। যাঁর কাছে সরাসরি ওহী নাযিল হয়েছে, তিনিও এটা নিয়ে কিছু বলে যাননি। তাহলে আমরা যারা হাজার বছর পরে বসে আছি, আমাদের বুদ্ধি দিয়ে এটা “সমাধান” করার চেষ্টা করাটা আসলে পয়েন্টই মিস করা। এই না-বোঝাটা কোনো ঘাটতি না, বরং এটা ইচ্ছাকৃতভাবে রাখা একটা সীমারেখা — যেন আমরা বুঝি, কিছু জ্ঞান শুধু আল্লাহর জন্যই সংরক্ষিত, আর সেটা মেনে নেওয়াই বিনয়ের প্রথম পাঠ।