সূরা আল-বাকারার ফযীলত

সূরা আল-বাকারা অত্যন্ত উপকারী একটি সূরা। এ সম্পর্কে কিছু হাদিস:

“তোমাদের ঘরগুলোকে কবরস্থান বানিও না” — অর্থাৎ ঘরে কুরআন তিলাওয়াত করো, কারণ এখান থেকে বোঝা যায় কবরস্থান কুরআন তিলাওয়াতের স্থান নয়। অনেক সময় দেখা যায়, মানুষ কবরে গিয়ে কবরের উপর বসে কুরআন তিলাওয়াত করে এবং তার সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে দেয়। যদিও এ বিষয়ে কিছু আলেমের মতামত রয়েছে, তবে যতদূর অধ্যয়ন করা হয়েছে, এর কোনো ভিত্তি পাওয়া যায় না। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলছেন, ঘরকে তিলাওয়াতের স্থান বানাও — ঘর যেন কবরের মতো না হয়ে যায়, যেখানে কুরআন তিলাওয়াত হয় না, নামাজ হয় না। তাই ঘরে অবশ্যই নামাজ ও কুরআন তিলাওয়াতের একটি অংশ থাকা উচিত।

“ইন্নাশ শাইতানা ইয়ানফিরু মিন বাইতিন তুকরাউ ফিহি সুরাতুল বাকারা” — যে ঘরে সূরা আল-বাকারা তিলাওয়াত করা হয়, সেই ঘর থেকে শয়তান পালিয়ে যায়। অতএব, সূরা বাকারা শয়তান থেকে সুরক্ষার একটি চমৎকার উপায়।

এই হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কুরআন পড়ো, কুরআন পড়ো।” যখনই বলা হয় “কুরআন পড়ো,” এটিই একমাত্র বই যা আমরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে, ডিফল্টভাবে মনে করি না বুঝেই পড়ব। অন্য যেকোনো বইয়ের ক্ষেত্রে যদি বলা হয় “পড়ো,” তাহলে প্রথমেই বোঝা যায় যে আমাকে বুঝে পড়তে হবে। এটি লক্ষণীয় একটি বিষয়। কুরআন না বুঝলেও তিলাওয়াতের জন্য সওয়াব আছে — আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা না বুঝে তিলাওয়াতেরও সওয়াব দিয়েছেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন “কুরআন পড়ো” বলেন, তখন এর অর্থ এই নয় যে শুধু অক্ষর পড়তে হবে, অর্থ বুঝতে হবে না। আল্লাহ তায়ালা কুরআন নাযিল করেছেন বোঝার ও জানার জন্য — না বুঝে পড়ার জন্য নয়।

এই কথা আরও স্পষ্ট হয় পরবর্তী অংশে: “কুরআন পড়ো, কারণ কিয়ামতের দিন কুরআনের সাথীরা তাদের সাথীদের জন্য সুপারিশকারী হয়ে আসবে” — আর কুরআনের সাথী তারাই, যারা কুরআন তিলাওয়াত করে, কুরআন অনুযায়ী আমল করে, তার অর্থ জানে এবং তদনুযায়ী কাজ করে। অর্থাৎ, কুরআন পড়া মানে কুরআন বোঝা, তদনুযায়ী আমল করা, কুরআনের ঈমান অন্তরে ধারণ করা, কুরআনের আমল দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ধারণ করা এবং কুরআনের আখলাক চরিত্রে ধারণ করা।

এরপর তিনি বললেন — শুধু আল-বাকারা নয়, সূরা আলে ইমরানও: “তোমরা এই দুটি উজ্জ্বল সূরা পাঠ করো — একটি আল-বাকারা, অন্যটি আলে ইমরান। কারণ কিয়ামতের দিন এই দুটি সূরা দুটি মেঘের মতো, অথবা দুটি ছায়াপ্রদানকারী ছাউনির মতো, অথবা ডানা মেলে উড়ন্ত দুই সারি পাখির মতো এসে তাদের সাথীদের পক্ষে বিতর্ক করবে” — যারা বাকারা ও আলে ইমরান পড়েছে এবং তদনুযায়ী আমল করেছে, নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করেছে।

আরও বলা হয়েছে: “সূরা বাকারা পড়ো, কারণ এটি আয়ত্ত করা বরকত, আর তা ত্যাগ করা আফসোসের কারণ। জাদুকররা এর মোকাবিলা করতে পারে না” — অর্থাৎ সূরা আল-বাকারা জাদুর বিরুদ্ধে অত্যন্ত কার্যকর। সুতরাং আমরা দেখলাম, সূরা আল-বাকারা শয়তান ও জাদুর বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।

আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেন যে বাকারা ও আলে ইমরান — এখানেও লক্ষণীয় একটি বিষয় হলো, সাহাবীদের ভাষায় কারও “একটি সূরা পড়া” বলতে কী বোঝাত? যদি বলা হতো কোনো সাহাবী সূরা আল-বাকারা পড়েছেন, তাহলে তাদের কাছে এর অর্থ ছিল — তিনি এই সূরাটি মুখস্থ করেছেন, এর অর্থ বুঝেছেন, এর মধ্যে থাকা সমস্ত বিধি-বিধান শিখেছেন এবং তা আয়ত্ত করেছেন। এই সবকিছু মিলিয়েই বলা হতো কেউ “আল-বাকারা পড়েছে।” যদি কেউ সূরা আল-বাকারা ও আলে ইমরান — এই দুই সূরা আয়ত্ত করত, তাহলে তার মর্যাদা বৃদ্ধি পেত। কেন? কারণ এই দুই সূরায় অনেক বিধি-বিধান রয়েছে।

এই দুটি সূরা মুমিন সমাজের জন্য নাযিল করা হয়েছিল। যখন আমরা মুসহাফ খুলে পড়া শুরু করি, তখন আল-বাকারা ও আলে ইমরান শুরুতেই থাকে। কিন্তু নাযিল হওয়ার ক্রম হিসেবে এটি শুরুতে ছিল না। এটি মাক্কী যুগে নাযিল হয়নি, বরং মাদানী যুগে নাযিল হয়েছে — অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মদিনায় হিজরতের পর, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর, মুসলিম সমাজ ও মুমিন জামাতের জন্য সমস্ত বিধি-বিধানসহ এই দুটি সূরা নাযিল হয়েছিল। এতে অনেক বিধান রয়েছে — এই কারণেই এই দুটি সূরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


প্রথম আয়াত: আলিফ লাম মীম — হুরুফে মুকাত্তাআত

সূরা আল-বাকারার প্রথম আয়াত হলো الم (আলিফ লাম মীম)। এগুলো প্রকৃতপক্ষে বিচ্ছিন্ন অক্ষর (হুরুফে মুকাত্তাআত), এবং বিচ্ছিন্ন অক্ষরের নিজস্ব কোনো অর্থ থাকে না। যেমন যেকোনো ভাষায় — বাংলায় যদি আমি ক, খ, গ, ঘ বলি, বা ইংরেজিতে A, B, C, D আলাদা আলাদা অক্ষর হিসেবে কোনো অর্থ বহন করে না। অক্ষরগুলো একসাথে হলে শব্দের অর্থ তৈরি হয়, আর শব্দগুলো একসাথে হলে বাক্য তৈরি হয়।

কুরআনের কতগুলো সূরার শুরুতে এই বিচ্ছিন্ন অক্ষর পাওয়া যায় এবং কতগুলো অক্ষর ব্যবহৃত হয়েছে? এই বিচ্ছিন্ন অক্ষর কুরআনের ২৯টি সূরার শুরুতে পাওয়া যায়, এবং এতে মোট ১৪টি বর্ণ রয়েছে। এই তালিকা মুখস্থ করার প্রয়োজন নেই, তবে কোন বিচ্ছিন্ন অক্ষর কোন সূরার শুরুতে আছে, তা জেনে রাখা আগ্রহের বিষয় হতে পারে।

আলিফ লাম মীম ছয়টি সূরার শুরুতে আছে। সবচেয়ে বেশি হা মীম — সাতটি সূরার শুরুতে। আবার আলিফ লাম রা পাঁচটি সূরার শুরুতে। একটি সূরার নাম দুই জায়গায় দেখা যাবে — সূরা আশ-শূরায় হা মীম এবং আইন সীন কাফ দুটোই আছে। এছাড়া তা সীন মীম দুটি সূরায় আছে — সূরা শু’আরা ও সূরা কাসাস — আর বাকিগুলো একটি করে সূরার শুরুতে আছে। যেমন আলিফ লাম মীম সাদ, অথবা একক বর্ণ — নূন, সাদ, ইয়াসীন বা ত্বাহা ইত্যাদি।

এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কোনো নির্ভরযোগ্য বর্ণনা পাওয়া যায় না, তবে মুফাসসিরগণ এর বিভিন্ন সম্ভাব্য অর্থ উল্লেখ করেছেন। এতে কী ইঙ্গিত রয়েছে, এর তাৎপর্য কী — এই বিচ্ছিন্ন অক্ষরগুলোর নিজস্ব কোনো অর্থ নেই, তবুও আল্লাহ কেন এগুলো নাযিল করলেন? মুফাসসিরগণ অতীত থেকে এ নিয়ে গবেষণা করে এসেছেন।

সালাফদের ব্যাখ্যা: ইমাম তাবারী

ইমাম তাবারীর সময়কাল ছিল ৩১০ হিজরি — অর্থাৎ বেশ প্রাথমিক যুগ। ইমাম তাবারীর আগে মুসলিম উম্মাহর সর্বোত্তম তিনটি প্রজন্ম অতিবাহিত হয়েছিল — সাহাবীদের প্রজন্ম, তাবি’ঈনদের প্রজন্ম এবং তাবা-তাবি’ঈনদের প্রজন্ম। এই তিন প্রজন্মের তাফসীরই আমাদের তাফসীরের ভিত্তি — বিশুদ্ধ তাফসীর। কারণ তারাই সর্বোত্তম প্রজন্ম। “আমার উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম হলো আমার প্রজন্ম” — অর্থাৎ সাহাবীগণ, এরপর তাদের পরের দুই প্রজন্ম। এই তিন প্রজন্ম সর্বোত্তম প্রজন্ম, এবং কুরআন সম্পর্কে তাদের বোঝাপড়াও ছিল সর্বোত্তম।

তাদের তাফসীর সাধারণত বর্ণনার আকারে পাওয়া যায় — ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এই আয়াতের এই শব্দ সম্পর্কে এটি বলেছেন, সনদসহ পাওয়া যায়; ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সনদসহ এটি বলেছেন — এগুলো হাদিস ও তাফসীরের গ্রন্থে পাওয়া যায়। সাহাবীরা আজকের মুফাসসিরদের মতো শব্দে শব্দে কুরআনের তাফসীর করতেন না। আজ কাউকে তাফসীর করতে বললে বোঝা যায় — আয়াতের প্রতিটি শব্দের অর্থ ব্যাখ্যা করা হবে, বাক্যের অর্থ ব্যাখ্যা করা হবে, তা থেকে কী বোঝা গেল তা ব্যাখ্যা করা হবে ইত্যাদি। সাহাবী বা তাবি’ঈনরা সবসময় এভাবে তাফসীর করতেন না, কারণ তারা আরব ছিলেন এবং আরবি ভাষা শুনেই তারা কুরআনের মূল অর্থ বুঝতেন।

তবে কিছু শব্দ ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন হতো, অথবা কিছু আয়াত সমন্বয় করার প্রয়োজন হতো। কিছু শাস্তীয় (শারয়ী) দৃষ্টিকোণ থেকেও ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ত। যখন এই প্রয়োজন দেখা দিত যে সবাই এই শব্দটি বুঝবেন না, অথবা কোনো পরিভাষা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন আছে, তখনই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যাখ্যা করতেন, সাহাবীরাও তাই করতেন। এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় — যখনই কোনো শব্দ ব্যাখ্যা করা হয়নি, তখন তা আরবিতে তার বাহ্যিক অর্থেই বুঝতে হবে।

উদাহরণ — জুলুম শব্দের ব্যাখ্যা: আল্লাহ যখন এই আয়াত নাযিল করলেন — “যারা ঈমান আনে এবং তাদের ঈমানের সাথে জুলুম মিশ্রিত করে না, তারাই নিরাপদ এবং তারাই হিদায়াতপ্রাপ্ত” — তখন সাহাবীদের একটু ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়েছিল। কেন প্রয়োজন পড়েছিল? কারণ সাহাবীরা প্রথমে আয়াতটি আক্ষরিক অর্থে বুঝেছিলেন যে, ঈমানের সাথে কোনোরকম জুলুম মিশ্রিত না থাকলেই নিরাপদ থাকা যাবে, আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে এবং হিদায়াত পাওয়া যাবে। আরবিতে জুলুম বলতে ছোট-বড় সব ধরনের অন্যায়কে বোঝায়। সাহাবীরা এটি খুব ভালোভাবেই জানতেন, আর তাদের কাছে এটি কঠিন মনে হয়েছিল — যদি ঈমানের পর নিরাপদ থাকতে হয়, শাস্তি থেকে রক্ষা পেতে হয়, হিদায়াত পেতে হয়, তাহলে কোনোভাবেই — ছোট হোক বা বড় — জুলুম করা যাবে না, এমনকি নিজের প্রতিও নয়। তারা এ নিয়ে চুপ থাকেননি, বরং প্রশ্ন করেছিলেন — প্রতিটি অক্ষরের জন্য দশটি সওয়াবের আশা না করে, তারা এর অর্থ জানতে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন, কারণ তারা তা বাস্তবায়ন করবেন।

তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যাখ্যা করলেন যে বিষয়টি তারা যেমন ভাবছেন তেমন নয়। তিনি অন্য একটি আয়াত দিয়ে ব্যাখ্যা করলেন — লুকমান আলাইহিস সালাম তাঁর ছেলেকে বলছেন: “হে বৎস, শিরক কোরো না, নিশ্চয়ই শিরক মহা জুলুম।” এভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যাখ্যা করলেন যে, ঈমানের পর যে জুলুমের কথা বলা হয়েছে তা দ্বারা শিরক বোঝানো হয়েছে — এখানে “জুলুম” শব্দটি শিরক অর্থেই এসেছে। তাই মৌলিক নিরাপত্তা ও হিদায়াত পেতে হলে ঈমানের পাশাপাশি নিজের ঈমানকে শিরক থেকে রক্ষা করতে হবে।

এসব বলার উদ্দেশ্য এটাই বোঝানো যে, সাহাবীদের প্রথম তিন প্রজন্ম আরবি হওয়ায়, যে শব্দের নতুন অর্থ যোগ হয়েছে বা বিশেষ শারয়ী অর্থ বোঝানো হয়েছে, শুধু সেটুকুই ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন হতো। বাকি সব শব্দ ব্যাখ্যার প্রয়োজন হতো না, কারণ তারা তা আরবি ভাষা থেকেই বুঝতেন। তাই সাহাবীদের কাছ থেকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এমন পূর্ণাঙ্গ তাফসীর পাওয়া যায় না যেমনটা আমরা এখন প্রত্যাশা করি। এ ধরনের তাফসীরের প্রথম ও সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ হলো ইমাম তাবারীর তাফসীর, যেখানে তিনি অনেক কিছু ব্যাখ্যা করেছেন — যদিও তখনও প্রতিটি শব্দ ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়নি, কারণ তা আরবি।

ইমাম তাবারী (রাহিমাহুল্লাহ) যা করেছেন তা হলো — সালাফদের এই তিন প্রজন্মের মতামত একত্র করা। “সালাফ” শব্দ শুনে অনেকে মনে করতে পারেন এটি কোনো নির্দিষ্ট দল বা মতাদর্শের বিষয়। এটি কোনো দলের বিষয় নয় — আমরা সবাই সালাফের সাথে নিজেদের সম্পর্কিত রাখতে বাধ্য। এটি ইসলামের মূলধারা। কারণ কেউ নতুন করে ইসলামের শিক্ষা আবিষ্কার করবে না — তা অবশ্যই এই তিন প্রজন্মের হাত থেকে আসতে হবে। তাদের কাছ থেকেই আমরা কুরআন ও হাদিস পেয়েছি — মূল টেক্সট এবং তার ব্যাখ্যা, দুটোই তাদের কাছ থেকে পাওয়া।

ইমাম তাবারীর মতো ব্যক্তিরা যখন এলেন, তারা তাফসীর খুলে দেখলেন — কোনো আয়াত সম্পর্কে সাহাবীরা কী বলেছেন। উদাহরণস্বরূপ, “আলিফ লাম মীম” খুললে এ সম্পর্কে ১৩টি বক্তব্য পাওয়া যায় — এই প্রথম তিন প্রজন্মের। ইমাম তাবারী যেহেতু পরবর্তী ইমাম (৩১০ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন), তিনি প্রথম তিন প্রজন্মের পরের ব্যক্তি। তিনি প্রথমে সনদসহ উল্লেখ করেন — ইবনে আব্বাস এটি বলেছেন, ইবনে মাসউদ এটি বলেছেন, আলী এটি বলেছেন, যার যা বক্তব্য আছে; এরপর তাবি’ঈনদের মধ্যে মুজাহিদ কী বলেছেন, কাতাদাহ কী বলেছেন, তৃতীয় প্রজন্মে যায়েদ ইবনে আসলাম কী বলেছেন, মুকাতিল কী বলেছেন — এরপর তিনি তাদের বক্তব্যগুলো বিশ্লেষণ করে নিজের গবেষণা উপস্থাপন করেন, এবং মাঝে মাঝে ভাষাবিদদের মতামতও যুক্ত করেন।

এখানে দেখা যায় যে, আলিফ লাম মীম এবং এই বিচ্ছিন্ন অক্ষরগুলো — যা কুরআনের ২৯টি সূরার শুরুতে আছে — সে সম্পর্কে ১৩টি বক্তব্য পাওয়া যায়। এখান থেকে ভাবার বিষয় হলো — আলিফ লাম মীম, হা মীম, ইয়াসীন, কাফ, নূন — এই বিচ্ছিন্ন অক্ষরগুলোর নিজস্ব কোনো অর্থ নেই, তবু নিশ্চিতভাবেই আল্লাহ কোনো কারণে এটি নাযিল করেছেন, এর একটি তাৎপর্য রয়েছে। যদিও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এর অর্থ সম্পর্কে কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না, তবুও সাহাবী ও তাবি’ঈনদের কাছ থেকে এ বিষয়ে ১৩ ধরনের বক্তব্য পাওয়া যায়।

এখান থেকে যে উপসংহার টানা যায় তা হলো — আমাদের প্রাথমিক প্রজন্ম, যাদের আমরা “সালাফ” বলছি — সাহাবী, তাবি’ঈন ও তাবা-তাবি’ঈন — কুরআনের অর্থ জানতে ও ব্যাখ্যা করতে অত্যন্ত আগ্রহী ও গভীরভাবে সিরিয়াস ছিলেন। এই কারণেই অনেকের কাছ থেকে শোনা যেতে পারে যে, “আলিফ লাম মীম হা মীম-এর তাফসীর করা যায় না, কেউ এর তাফসীর করেননি, একমাত্র আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন” — এখানেই বিষয়টি শেষ। কিন্তু যেকোনো দাবির সঠিকতা বুঝতে চাইলে কোথায় ফিরে যেতে হবে? সালাফ কী বলেছেন, সেখানে ফিরে যেতে হবে। মূলে ফিরে যেতে হবে। আমরা যদি মূলে ফিরে যেতে পারতাম, আজ এত বিভ্রান্তি থাকত না। এখন মুসলিম উম্মাহর অবস্থা দেখলে দেখা যায়, সর্বত্র বিবাদ — প্রতিটি বিষয়ে বিবাদ ও মতভেদ, একে অপরকে পথভ্রষ্ট বলা। এই সব বিবাদ ও মতভেদ সমাধান করা সম্ভব ছিল, এখনও সম্ভব — যদি আমরা সেই একটি জায়গায়, অর্থাৎ সালাফের বক্তব্যরূপ মূলে ফিরে যাই।

তাফসীরের ক্ষেত্রেও তাই — সাহাবীরা কী করেছেন তা দেখা প্রয়োজন। সাহাবীরা এসেই বলেননি যে “এ নিয়ে কথা বলা যাবে না।” বরং তারা তাফসীর করেছেন — যদিও এর কোনো নির্দিষ্ট অর্থ নেই, তবুও তারা ইঙ্গিত খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন — হয়তো অর্থ নেই, কিন্তু কোনো কারণ আছে কি, কোনো ইঙ্গিত আছে কি? তাবি’ঈনরাও বলেছেন, হ্যাঁ, এতে ইঙ্গিত আছে।

ইবনুল জাওযীর জাদুল মাসীর

আরেকজন, একটু পরের যুগের — ইবনুল জাওযী, ইমাম তাবারীর (৩১০ হিজরি) পরের যুগের ব্যক্তি। তাঁর গ্রন্থের নাম “জাদুল মাসীর”। এর বৈশিষ্ট্য হলো, এটি ইমাম তাবারীর মতো বিশাল তাফসীর নয় — ইমাম তাবারীর তাফসীর প্রায় ২৪ খণ্ড, আর জাদুল মাসীর ছয় খণ্ড। এর বিশেষত্ব হলো, এতে শুধু “আকওয়াল” অর্থাৎ মতামত বর্ণনা করা হয় — কোনো শব্দ বা আয়াতের অর্থ নিয়ে যদি বিভিন্ন মত থাকে — তিন, চার, পাঁচ, ছয় যতগুলোই হোক — সেগুলো উল্লেখ করা হয়েছে।

এই গ্রন্থে “আলিফ লাম মীম” ও হুরুফে মুকাত্তাআত সম্পর্কে ছয়টি ভিন্ন মতামত উল্লেখ করা হয়েছে। সংক্ষেপে তা এখানে তুলে ধরা হলো:

১. কারও মতে, এগুলো আল্লাহর ইসমুল আজম (মহাসত্তা নাম)-এর ইঙ্গিত — অর্থাৎ এটি একটি সাংকেতিক বিষয়, কারণ এগুলো অক্ষর, যাদের কোনো অর্থ নেই। যদি এটি ডিকোড করা যায়, তাহলে জানা যাবে আল্লাহর ইসমুল আজম কী — সেই নামে ডাকলে আল্লাহ অবশ্যই তা দেবেন।

২. কারও মতে, এগুলো আল্লাহর নাম দ্বারা করা কসম — এক প্রকার শপথ, আল্লাহর নামের শপথ।

৩. কারও মতে, এগুলো কুরআনের বিভিন্ন নাম।

৪. কারও মতে, এগুলো সংশ্লিষ্ট সূরার নাম।

৫. কারও মতে, এগুলো আসলে কিছু বাক্যের সংক্ষিপ্ত রূপ। ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন “আলিফ লাম মীম” মানে “আনাল্লাহু আ’লাম” — আমি আল্লাহ, আমি সর্বজ্ঞ — অর্থাৎ আলিফ লাম মীম দিয়ে এই বাক্যের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।

এসব ভিন্ন ভিন্ন মতামত থাকলেও, যেহেতু এর কোনোটিই হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়, তাই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না কোনটি সঠিক বা কোনটি ভুল, এ ব্যাপারে দৃঢ়ভাবে কিছু বলা যায় না।

ইঙ্গিত: কুরআনের অলৌকিকত্ব

শেষ মতটি হলো — এগুলো কুরআনের মু’জিযা (অলৌকিকত্ব)-র ইঙ্গিত দেয়। এই মতটি অতীতের আলেমদের মধ্যে ইবনে কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) এবং সাম্প্রতিক আলেমদের মধ্যে ইবনে উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) সমর্থন করেছেন। ইবনে কাসীরের জন্ম প্রায় ৭০০ হিজরির দিকে, মৃত্যু ৭৭৪ হিজরিতে — অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময় থেকে বর্তমান পর্যন্ত যে সময় অতিক্রান্ত হয়েছে, তার মাঝামাঝি সময়ে ইবনে কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) ছিলেন। তাঁর তাফসীরও অত্যন্ত বিখ্যাত — নিশ্চয়ই এর নাম শুনেছেন, ইবনে কাসীরের তাফসীর। আর ইবনে উসাইমীন — ১৪২১ হিজরি — অর্থাৎ আমাদের সাম্প্রতিক সময়ের একজন আলেম। তিনি সৌদি আরবের একজন মহান আলেম ছিলেন, প্রায় ২০০০ সালের দিকে মৃত্যুবরণ করেন।

তারা বলছেন, এই বিচ্ছিন্ন অক্ষরগুলো প্রকৃতপক্ষে আল-কুরআনের অলৌকিকত্বের দিকে ইঙ্গিত করছে। অর্থাৎ, “আলিফ লাম মীম” বলে আরবদের মনোযোগ আকর্ষণ করা হচ্ছে — দেখো, তোমাদের সামনে আল-কুরআন রয়েছে। আরবদের জন্য, এই কুরআন এই সমস্ত অক্ষরের সমন্বয়ে গঠিত, যেগুলো তোমাদের কাছে পরিচিত — আলিফ, লাম, মীম, হা, রা, সাদ, কাফ, নূন, কাফ, হা, ইয়া, আইন, সাদ। তোমাদের পরিচিত এই সব অক্ষরের সমন্বয়েই আল-কুরআন গঠিত — তবুও এর মতো একটি সূরা রচনা করা তোমাদের সাধ্যের বাইরে। সুতরাং তোমরা বুঝতে পারো, এই কুরআন আল্লাহর কাছ থেকেই এসেছে। এটাই এই বিচ্ছিন্ন অক্ষরগুলোর ইঙ্গিত। এই মত ইবনে কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর তাফসীরে উল্লেখ করেছেন এবং সাম্প্রতিক সময়ে ইবনে উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) তা সমর্থন করেছেন।


দ্বিতীয় আয়াত: ذَٰلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ ۛ فِيهِ ۛ هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ

“যালিকাল কিতাবু লা রাইবা ফীহি হুদাল্লিল মুত্তাক্বীন” — “এটি সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই; এটি মুত্তাকীদের জন্য পথনির্দেশ।”

“যালিকা” শব্দের ব্যাখ্যা

প্রথমেই, “যালিকা” শব্দটি ইঙ্গিত করার জন্য ব্যবহৃত হয়। “যালিকা” দিয়ে সাধারণত দূরের কিছু নির্দেশ করা হয় — আরবিতে এটিকে বলা হয় ইসমুল ইশারাহ (দূরত্ব নির্দেশক সর্বনাম)। কিন্তু এখানে এটি “হাযা” (কাছের কিছু নির্দেশ করার শব্দ)-এর অর্থে এসেছে। অর্থাৎ, যালিকাল কিতাব মানে হাযাল কিতাব — এটি আমাদের কাছেই আছে। কারণ আল-কুরআন আমাদের থেকে দূরে নয়। কুরআনকে নির্দেশ করার জন্য “হাযা” শব্দও ব্যবহার করা যেত — “হাযাল কিতাব” বলা যেত। তাহলে কেন “হাযাল কিতাব” না বলে “যালিকাল কিতাব” বলা হলো?

এর তাৎপর্য সম্পর্কে ইবনে উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন — এটি কুরআনের উচ্চ মর্যাদার প্রতি ইঙ্গিত করছে। একই শব্দ দিয়ে অনেক কিছু ব্যাখ্যা করা হচ্ছে — নির্দেশ করার কাজটি একই, কিন্তু “হাযা”-র বদলে দূরবর্তী নির্দেশক “যালিকা” ব্যবহার করে কুরআনের উচ্চ মর্যাদার প্রতি ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে। যেন বলা হচ্ছে — এই কিতাবের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ, এবং যারা এই কিতাব ধরে রাখবে, তাদেরও দুনিয়াতে উচ্চ মর্যাদা থাকবে। ইবনে উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর তাফসীরে “যালিকা” শব্দ থেকে এই ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

“লা রাইবা ফীহি” — তিনটি সম্ভাব্য অর্থ

“লা রাইবা” — আরবিতে “লা” মানে “নেই।” রাইব মানে সন্দেহ। ফীহি দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত — ফি মানে মধ্যে/ভেতরে, আর হি একটি সর্বনাম, যা এখানে কুরআনকে নির্দেশ করছে। তাই ফীহি মানে “এর মধ্যে/ভেতরে।” যালিকাল কিতাবু লা রাইবা ফীহি — অর্থাৎ, “এটি সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই।”

কুরআনে কোনো সন্দেহ নেই, এর অর্থ কী? এখানে তিনটি সম্ভাব্য অর্থ রয়েছে, এবং তিনটিই একসাথে গ্রহণযোগ্য:

১. এর অর্থ হতে পারে, কুরআন সত্য হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।

২. এর অর্থ হতে পারে, এতে এমন কিছু নেই যা নিয়ে সন্দেহ করা যায় — অর্থাৎ, পুরো কিতাবের ক্ষেত্রে বলা যায় কুরআনের সত্যতা সম্পর্কে কোনো সন্দেহ নেই। আবার এর অর্থ হতে পারে, কুরআনের কোনো অংশ নিয়েই কোনো সন্দেহ নেই — অর্থাৎ কুরআনে কোথাও কোনো ভুল নেই, এবং কোনো ভুলের সম্ভাবনা নিয়ে সন্দেহেরও অবকাশ নেই।

৩. তৃতীয় ব্যাখ্যা হলো — এটি রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে নাযিলকৃত হওয়া নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

কুরআনের ব্যাখ্যা কুরআন দ্বারা (তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন)

এই তিনটি সম্ভাব্য অর্থের প্রতিটি একে অপরের বিপরীত নয়, তাই সবগুলো একসাথে সঠিক হওয়ায় কোনো বাধা নেই। এটি তাফসীরের একটি মৌলিক নীতি — অনেক সময় একটি আয়াতের একাধিক অর্থ পাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে দেখতে হয়, অর্থগুলো পরস্পরবিরোধী কি না — একটি সঠিক হলে অন্যটি সঠিক হতে পারবে কি না। যদি তা না হয়, তাহলে দেখতে হয় অন্য আয়াত বা হাদিসের সাথে কোনো সংঘাত আছে কি না। তা না থাকলে, একাধিক অর্থ একসাথে সঠিক হওয়া সম্ভব। এ কারণেই অনেক সময় কুরআনের একটি আয়াত থেকে বিস্তৃত পরিসরের অর্থ পাওয়া যায়।

এখানে বর্ণিত তিনটি অর্থই কুরআনের অন্যত্র প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত। যেমন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন: “আফালা ইয়াতাদাব্বারুনাল কুরআন” — তারা কি কুরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে না? আল্লাহ বলছেন, যদি তারা কুরআন নিয়ে চিন্তা করত, তাহলে দেখতে পেত যে এটি যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছ থেকে আসত, তাহলে তারা এতে অনেক অসঙ্গতি খুঁজে পেত।

কুরআনে এত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে — মানুষের বিশ্বাস, ব্যক্তিগত ইবাদত, আমল, অর্থনীতি, সামাজিক নীতি, রাজনীতি, যুদ্ধ — এসব বিষয়ে কুরআন পথনির্দেশনা দিয়েছে, এবং প্রকৃতি, পৃথিবী, আসমান, মহাবিশ্ব নিয়েও অনেক কথা বলা হয়েছে। তবুও কুরআনের একাংশ অন্য অংশের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। প্রথম দর্শনে মনে হলেও যে কোনো একটি আয়াত অন্য আয়াতের সাথে মিলছে না — কেউ যদি একটু গভীরে যায়, তাহলে দেখবে সেখানে কোনো সংঘাত নেই। বরং সে সেখান থেকে এমন সব তথ্য আবিষ্কার করবে যা তাকে কুরআনের বিশুদ্ধতা দেখে বিস্মিত করবে।

তাই আমরা দেখছি, কুরআনে এমন কিছু নেই যা নিয়ে সন্দেহ করা যায় — এই ব্যাখ্যা আমরা এই আয়াত থেকে পেয়েছি। এটি কুরআনের তাফসীরের একটি পদ্ধতি — কুরআনের একটি আয়াতকে অন্য আয়াত দিয়ে ব্যাখ্যা করা। لَا رَيْبَ فِيهِ (কিতাব যাতে কোনো সন্দেহ নেই) এই আয়াতকে যখন সূরা আন-নিসার ৮২ নম্বর আয়াতের সাথে মিলিয়ে ব্যাখ্যা করা হয় — যেখানে বলা হয়েছে, “এটি যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছ থেকে হতো, তাহলে এতে অনেক অসঙ্গতি পাওয়া যেত” — তখনও একই ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এই পদ্ধতিকে বলা হয় তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন — কুরআন দ্বারা কুরআনের তাফসীর। এটি তাফসীরের অনেক পদ্ধতি ও পন্থার মধ্যে একটি, এবং এটি কুরআনের তাফসীরের ক্ষেত্রে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছে।

এই পদ্ধতিতে দুইজন আলেম বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন। একজন হলেন প্রয়াত ইবনে কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ), যাঁর গ্রন্থের ছবি আগে দেখানো হয়েছে। অন্যজন সাম্প্রতিক — তাঁর নাম মুহাম্মাদ আল-আমীন আশ-শানকীতী, তাঁর গ্রন্থের নাম “আদওয়াউল বায়ান”। তিনি শানকীত (মৌরিতানিয়া) অঞ্চলের, আফ্রিকান — তিনি সৌদি আরবে হিজরত করে সেখানে একজন মহান আলেম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। শুধু তিনি নন, তাঁর পরিবার, তাঁর সন্তানরাও এখন সৌদি আরবে বড় আলেম, এবং তাঁর এক ছেলে তাফসীরের বিশেষজ্ঞ, তিনি মদিনায় শিক্ষকতা করেন। 

মুহাম্মাদ আল-আমীন আশ-শানকীতী রাহিমাহুল্লাহ প্রায় ১৩৯৩ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন। “আদওয়াউল বায়ান” গ্রন্থটিও কুরআন দ্বারা কুরআনের তাফসীরের একটি অসাধারণ, সাম্প্রতিক নিদর্শন।

এই সূরা আল-বাকারার দ্বিতীয় আয়াত (যালিকাল কিতাবু লা রাইবা ফীহি) সূরা আস-সাজদার প্রথম আয়াতের সাথেও মিলিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় — যা শুরু হয় আলিফ লাম মীম, তানযীলুল কিতাবি লা রাইবা ফীহি মির রাব্বিল আলামীন দিয়ে — “এই কিতাবের নাযিল হওয়া নিয়ে, যাতে কোনো সন্দেহ নেই, রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে।” এখানে “কোনো সন্দেহ নেই” বলতে বোঝানো হচ্ছে এর উৎস বা মূল সম্পর্কে — যে এটি রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে এসেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

সুতরাং এই তিনটি ব্যাখ্যাই কুরআনের অন্যান্য আয়াতের সমর্থন পায়, আর এটিই কুরআনের আয়াত দিয়ে কুরআন ব্যাখ্যা করার একটি নমুনা।


“হুদাল্লিল মুত্তাকীন” — মুত্তাকী ও তাকওয়ার সংজ্ঞা

তৃতীয় শব্দগুচ্ছটি হলো “হুদাল্লিল মুত্তাক্বীন” — মুত্তাকীদের জন্য পথনির্দেশ। এখানে দুটি শব্দ আছে — আল-মুত্তাকীন মানে মুত্তাকীগণ, যাদের তাকওয়া আছে। বহুবচনে এই শব্দ দুইভাবে আসতে পারে — মুত্তাকীন বা মুত্তাকুন। এই শব্দের ব্যাকরণগত অবস্থানের কারণে কখনো “ইয়া-নূন” দিয়ে, কখনো “ওয়াও-নূন” দিয়ে আসে, তবে অর্থে কোনো পার্থক্য নেই।

হুদা মানে পথনির্দেশ/হিদায়াত — এই শব্দটি আমাদের কাছে পরিচিত। এখন এর গভীরে গিয়ে দেখতে হবে হিদায়াত আসলে কী।

এখান থেকে একটি প্রশ্ন ওঠে — তাহলে কি কুরআন শুধু মুত্তাকীদের জন্যই হিদায়াত? কুরআন কি সবার জন্য হিদায়াত নয়? এই প্রশ্ন ওঠে কারণ অন্যত্র আল্লাহ নিজেই বলেছেন: হুদাল্লিন্নাস, শাহরু রামাদানাল্লাযী উনযিলা ফীহিল কুরআন” — রামাদান মাস, যাতে কুরআন নাযিল হয়েছে সমগ্র মানবজাতির জন্য পথনির্দেশ হিসেবে — এই আয়াতটিও সূরা আল-বাকারাতেই আছে। তাহলে কুরআন কি সমগ্র মানবজাতির জন্য পথনির্দেশ, নাকি শুধু মুত্তাকীদের জন্য? এখানে আবার বলা হচ্ছে না মুত্তাকীদের জন্য পথনির্দেশ কেন — উভয়ই সঠিক, কারণ হিদায়াতের অর্থ এখন আমাদের দেখতে হবে।

তাকওয়া সম্পর্কে ব্যাখ্যা করার আগে, মুত্তাকী শব্দের সংজ্ঞা দেখা যাক। মুত্তাকী হলো সেই ব্যক্তি যার তাকওয়া আছে। তাকওয়া কী? তাকওয়া হলো আল্লাহর আদেশ পালন করে ও নিষেধ থেকে বিরত থেকে নিজেকে আল্লাহর ক্রোধ ও শাস্তি থেকে রক্ষা করা।

সুতরাং তাকওয়ার একটি অভ্যন্তরীণ দিক আছে এবং একটি বাহ্যিক দিক আছে। অভ্যন্তরীণ দিকটি শুরু হয় কোথা থেকে? ভয় থেকে। যদি আমি আল্লাহর অবাধ্যতা করি, আল্লাহ আমাকে শাস্তি দেবেন, তিনি আমার প্রতি ক্রুদ্ধ হবেন — এই ভয় থেকেই নিজেকে রক্ষা করার তাগিদ আসে। তখন মনে হয় — আমাকে নিজেকে রক্ষা করতে হবে, আল্লাহর শাস্তি থেকে নিজেকে বাঁচাতে হবে, আল্লাহর ক্রোধ থেকে নিজেকে বাঁচাতে হবে। আর নিজেকে বাঁচানোর জন্য কিছু আমল করতে হবে — তাঁর আদেশ ও নিষেধ মেনে চলতে হবে। এটিই তাকওয়ার বাহ্যিক দিক। সম্পূর্ণ বিষয়টিই তাকওয়া — আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ মেনে, তাঁর শরীয়াহ বাস্তবায়ন করে আমরা নিজেদেরকে তাঁর ক্রোধ ও শাস্তি থেকে রক্ষা করেছি। এটিই তাকওয়া। আর এই তাকওয়ার অধিকারী ব্যক্তিকেই বলা হয় মুত্তাকী।


হিদায়াতের দুই অর্থ

হিদায়াতের আসলে দুটি অর্থ রয়েছে। এই কারণেই এখন আমরা মিলিয়ে দেখতে পারি কেন কখনো বলা হয় হুদাল্লিন্নাস (সমগ্র মানবজাতির জন্য পথনির্দেশ) আর কখনো বলা হয় হুদাল্লিল মুত্তাক্বীন (মুত্তাকীদের জন্য পথনির্দেশ)।

প্রথম অর্থ – হিদায়াতুল ইলম : হিদায়াত হলো এমন জ্ঞান যা সত্যকে চিহ্নিত করে দেয়। এই অর্থে আল-কুরআন সবার জন্যই হিদায়াত। এই অর্থে হুদাল্লিন্নাস ব্যাখ্যা পাওয়া যায় — কোন অর্থে আল-কুরআন মানবজাতির জন্য হিদায়াত? এই অর্থে, আল-কুরআন আমাদের এমন জ্ঞান দিচ্ছে যার মাধ্যমে সত্য ও মিথ্যা চিহ্নিত করা যায়। এটি সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রযোজ্য — কুরআন সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করে দেয়।

দ্বিতীয় অর্থ – হিদায়াতুল আমল বা হিদায়াতুত তাওফিক : (সফলতার অর্থে হিদায়াত) হিদায়াতের আরেকটি অর্থ হলো, এই জ্ঞান অনুযায়ী চলার সামর্থ্য/তাওফিক। এই অর্থে কুরআন সবার জন্য হিদায়াত নয়, কারণ সত্য জানার পরও সবাই সেই সত্য গ্রহণ করবে না। এই কারণেই যখন আমরা আল্লাহর কাছে হিদায়াত চাইব, তখন এটা মনে রাখার চেষ্টা করব যে — এখন থেকে আমরা দুটোই চাই, শুধু জ্ঞান চাই না, জ্ঞান এবং সেই জ্ঞান অনুযায়ী আমল করার সামর্থ্য — উভয়ই চাই। কারণ, কত মানুষ সত্য জানার পর, জ্ঞান অর্জনের পর, বোঝার পরও ভুল/গোমরাহির মধ্যেই মৃত্যুবরণ করেছে!

উদাহরণ — আবু তালিব: আবু তালিবের কথা ভাবুন, যিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেছিলেন যে, “আমি জানি তুমি যা করছ তা সঠিক, কিন্তু আমার বাবা-দাদার ধর্ম ত্যাগ করার অসম্মান আমি মেনে নিতে পারছি না।” ভাবুন, কত তুচ্ছ বিষয়! কেন চিরস্থায়ী জাহান্নাম বেছে নেওয়া হলো? এক ধরনের তুচ্ছ আত্মমর্যাদাবোধের কারণে — মানুষ বলবে আবু তালিব তার বাবা-দাদার ধর্ম ত্যাগ করেছে, এই ভয়ে। কতটা হাস্যকর! কিন্তু দেখুন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচা হওয়া সত্ত্বেও তিনি হিদায়াত পাননি — তবুও তিনি সত্যকে চিনতে পেরেছিলেন।

এই কারণেই যখন আমরা আল্লাহর কাছে সাহায্য চাই, তখন অন্তর থেকে চাওয়া উচিত। আল্লাহ যেন আমাদের সত্যকে সত্য হিসেবে জানার ও তা গ্রহণ করার তাওফিক দেন, আর মিথ্যাকে মিথ্যা হিসেবে চিনে তা এড়িয়ে চলার তাওফিক দেন।

এই দ্বিতীয় অর্থটিকে বলা হয় হিদায়াতুল আমল বা হিদায়াতুত তাওফিক — সফলতার অর্থে হিদায়াত। এই অর্থে কুরআন সবার জন্য হিদায়াত নয়, কারণ কুরআন অনুসরণের সফলতা সবাই পাবে না — শুধু মুত্তাকীরাই, যারা তাকওয়ার অধিকারী, কুরআন অনুসরণ করে উপকৃত হয়।

………………. A DISCUSSION FROM LESSON:2 INTRO………………………………..

হিদায়াতের দুটি ভিন্ন অর্থ রয়েছে:

১. জ্ঞান হিসেবে হিদায়াত — সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করা, আল্লাহর পথ ও জান্নাতের পথ দেখানো। এই অর্থে কুরআন সবাইকে হিদায়াত দেয়, এবং নবী-রাসূলগণ ও তাঁদের পরবর্তী আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীরা এই হিদায়াত পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে থাকেন। এই অর্থেই আল্লাহ নবীকে বলেন: “নিশ্চয়ই আপনি একটি সরল পথের দিকে পথ দেখান” (৪২:৫২) — হিদায়াত এখানে স্পষ্টীকরণের অর্থে, বাধ্য করার অর্থে নয়।

২. সফলতা হিসেবে হিদায়াত (তাওফিক) — দেখানো পথে প্রকৃতপক্ষে হাঁটার সামর্থ্য। এই দ্বিতীয় প্রকার হিদায়াত একমাত্র আল্লাহরই এখতিয়ারে — যত প্রিয় বা যত আন্তরিক প্রচেষ্টাই হোক না কেন, কোনো মানুষ এটি অন্য কাউকে দিতে পারে না।

এই দ্বিতীয় বিষয়টি সত্যিকার অর্থেই ভারী — একইসাথে বেদনাদায়ক ও সান্ত্বনাদায়ক। বেদনাদায়ক এই কারণে যে, আমরা যাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি — বাবা-মা, সন্তান, স্বামী/স্ত্রী — তাকে যতই চেষ্টা করি না কেন, আমরা যে পথে দেখতে চাই সেই পথে আনতে পারি না। সান্ত্বনাদায়ক এই কারণে যে, এটি আল্লাহ কাকে বলছেন তা লক্ষ্য করলে বোঝা যায়: কোনো সাধারণ মানুষকে নয়, বরং তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বান্দাকে, ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও সফল দাঈকে — স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে। আল্লাহ তাঁকে স্পষ্টভাবে বলেন: “নিশ্চয়ই আপনি যাকে ভালোবাসেন তাকে হিদায়াত দিতে পারেন না, বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দেন” (২৮:৫৬)। যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই তাঁর সবচেয়ে প্রিয়জনদের এই হিদায়াত দিতে না পারেন, তাহলে আমরা যাকে ভালোবাসি তাকে হিদায়াত দিতে না পারা কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয় — এটি নিছক মানুষের সাধ্যের বাইরে। এই অর্থে হিদায়াত একমাত্র আল্লাহই সৃষ্টি করেন এবং দান করেন।

এই কারণেই কুরআন বলে হুদাল্লিল মুত্তাক্বীন: কিতাব সফলতার হিদায়াত হিসেবে তখনই কাজ করে যখন কেউ তাকওয়া নিয়ে তা গ্রহণ করে। যত বেশিই কুরআন পড়া হোক, বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সত্য-মিথ্যা পার্থক্য করা হোক, তা কোনো ফল দেয় না যতক্ষণ না তা এমন একটি অন্তরে পৌঁছায় যা ইতিমধ্যে আল্লাহর অসন্তুষ্টির ভয়ে চেষ্টারত। আর আল্লাহ ওয়াদা করেছেন — সূরা আল-আনকাবুতের শেষ আয়াতে — যে, “যারা আমাদের জন্য চেষ্টা করে, আমরা অবশ্যই তাদের আমাদের পথে (সুবুলানা) হিদায়াত দেব।” লক্ষণীয়, শব্দটি বহুবচন, সুবুল — ইসলামের মধ্যে অনেক ভিন্ন ভিন্ন সৎপথ ও আমল, একটিমাত্র সংকীর্ণ পথ নয়। একজন মানুষ যত বেশি তাকওয়া নিয়ে আসে, তত বেশি হিদায়াত আসে; হিদায়াত আসে তাকওয়ার পরিমাণ অনুযায়ী।

তাই হুদাল্লিন্নাস (সমগ্র মানবজাতির জন্য হিদায়াত) — এটিও সঠিক, কারণ কুরআন সমগ্র মানবজাতির জন্য সত্যকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। আবার হুদাল্লিল মুত্তাক্বীন (মুত্তাকীদের জন্য হিদায়াত) — এটিও সঠিক, কারণ শুধু মুত্তাকীরাই — যাদের তাকওয়া আছে, যারা আল্লাহর শাস্তি ও ক্রোধ থেকে বাঁচতে ব্যাকুল এবং তাঁর আদেশ মেনে নিরাপদ থাকতে আগ্রহী — তারাই কুরআন দ্বারা হিদায়াতপ্রাপ্ত হয়।