সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৬-২৯: মশার দৃষ্টান্ত এবং ফাসিকদের বৈশিষ্ট্য

আল-বাকারা তাফসীর সিরিজের সপ্তম আলোচনা

ভূমিকা: জ্ঞানার্জনের মূল উদ্দেশ্য

সূরা আল-বাকারার ২৬ নম্বর আয়াতে পৌঁছে, এই তাফসীর যাত্রার মূল লক্ষ্য নিয়ে আবার একটা গুরুত্বপূর্ণ স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। কুরআনের আয়াতের অর্থ, শিক্ষা, ব্যাকরণ, শব্দভাণ্ডার, বাক্যগঠন, এবং পুরনো-নতুন তাফসীরের গভীর আলোচনা খুঁটিয়ে দেখার এই কাজ শুধু তথ্য সংগ্রহের জন্য নয় — বরং আল্লাহ কুরআনের মাধ্যমে কী বার্তা দিচ্ছেন, কী আদেশ দিচ্ছেন, কী বিশ্বাস করতে বলছেন, তা নিজের জীবনে ধারণ করা ও প্রয়োগ করাই মূল লক্ষ্য। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো, নামাজে বা তিলাওয়াতের সময় কুরআনের অর্থ বুঝে প্রভাবিত হওয়া — কারণ নামাজ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর সাথে একটা ব্যক্তিগত মোনাজাত, আর এই মুহূর্তে আল্লাহ আমার কাছে কী বলছেন তা না বুঝলে নামাজের প্রকৃত তাৎপর্য অনুপস্থিত থেকে যায়।

একটা গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে: আজকের যুগে ইন্টারনেটে অসংখ্য নির্ভরযোগ্য জ্ঞানের উৎস সহজলভ্য থাকা সত্ত্বেও, প্রকৃতপক্ষে যারা এই সঠিক জ্ঞান থেকে উপকৃত হয় তাদের সংখ্যা খুবই সীমিত — কারণ সাফল্য সবার ভাগ্যে থাকে না, এবং মানুষ প্রায়ই অবিশ্বস্ত বা কম উপকারী উৎসের দিকে ঝুঁকে পড়ে, ঠিক যেমন সহজলভ্য পুষ্টিকর খাবার থাকা সত্ত্বেও মানুষ প্রায়ই অস্বাস্থ্যকর খাবারের দিকে ঝোঁকে। এই কারণেই বাংলা ভাষায় সালাফের বোঝাপড়ার আলোকে বিশুদ্ধ কুরআন-হাদিসভিত্তিক একটা তাফসীরের সংরক্ষিত উৎস তৈরি করার এই প্রচেষ্টা — যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই জ্ঞান থেকে উপকৃত হতে পারে।

আয়াতের মধ্যে সংযোগ: একটা তাফসীরগত নীতি

আজকের আয়াত (২৬) নিয়ে আলোচনা শুরুর আগে একটা গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতিগত পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে — কুরআনের প্রতিটা আয়াত সাধারণত পূর্ববর্তী আয়াতের সাথে একটা সম্পর্ক বহন করে। এই সম্পর্ক প্রমাণ করার কোনো সুনির্দিষ্ট, নিশ্চিত দলিল না থাকলেও, অনেক আলিম এই বিষয়ে বিশ্বাসী এবং এ নিয়ে “নাজমুদ দুরার” নামে একটা বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ রচিত হয়েছে (আল-বিকাঈ রচিত), যার মূল উদ্দেশ্যই হলো এক আয়াতের সাথে আরেক আয়াতের, এমনকি এক সূরার সাথে আরেক সূরার সংযোগ ব্যাখ্যা করা। এই বিষয়টা তাফসীর শাস্ত্রে “মুনাসাবাত আল-আয়াত” নামে একটা স্বতন্ত্র শাখা হিসেবেও পরিচিত।

সূরা আল-বাকারার শুরু থেকে দেখলে বোঝা যায়: প্রথমে “কিতাব”-এর পরিচয়, তারপর মুত্তাকীনদের পরিচয় (যারা এই হিদায়াত থেকে উপকৃত হয়), তারপর অবিশ্বাসী এবং একটা বিশেষ শ্রেণি মুনাফিকদের পরিচয় — অর্থাৎ প্রথম বিশ আয়াতে মানবজাতির সম্পূর্ণ শ্রেণীবিভাগ (মুমিন, প্রকাশ্য কাফির, এবং গোপন কাফির/মুনাফিক)। এই শ্রেণীবিভাগের পর আল্লাহ সবাইকে সম্বোধন করে তাওহীদের আদেশ দেন, সৃষ্টির নিদর্শন দেখান, এবং কুরআনের অলঙ্ঘনীয় চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করেন — যদি সন্দেহ থাকে তবে একটা অনুরূপ সূরা নিয়ে আসতে বলেন। আজকের আয়াতটা (মশার দৃষ্টান্ত) সরাসরি এই চ্যালেঞ্জের প্রসঙ্গের সাথে যুক্ত।

আয়াত ২৬: মশার দৃষ্টান্ত

إِنَّ اللَّهَ لَا يَسْتَحْيِي أَن يَضْرِبَ مَثَلًا مَّا بَعُوضَةً فَمَا فَوْقَهَا ۚ فَأَمَّا الَّذِينَ آمَنُوا فَيَعْلَمُونَ أَنَّهُ الْحَقُّ مِن رَّبِّهِمْ ۖ وَأَمَّا الَّذِينَ كَفَرُوا فَيَقُولُونَ مَاذَا أَرَادَ اللَّهُ بِهَٰذَا مَثَلًا ۘ يُضِلُّ بِهِ كَثِيرًا وَيَهْدِي بِهِ كَثِيرًا ۚ وَمَا يُضِلُّ بِهِ إِلَّا الْفَاسِقِينَ “নিশ্চয় আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিতে লজ্জাবোধ করেন না, তা মশা কিংবা তার চেয়েও তুচ্ছ কিছু হোক না কেন। যারা ঈমান এনেছে তারা জানে এটা তাদের রবের পক্ষ থেকে সত্য, আর যারা কুফরী করেছে তারা বলে, ‘আল্লাহ এই দৃষ্টান্ত দিয়ে কী বোঝাতে চেয়েছেন?’ এর দ্বারা তিনি অনেককে পথভ্রষ্ট করেন, আবার অনেককে হিদায়াত দেন — আর তিনি এর দ্বারা কেবল ফাসিকদেরই পথভ্রষ্ট করেন।”

প্রেক্ষাপট: কেন এই আয়াত?

এই আয়াতের প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে আগের আয়াতগুলোর সাথে এর সংযোগ লক্ষ্য করতে হবে। আগের আলোচনায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে কুরআন আল্লাহর বাণী — একটা অশিক্ষিত, নিরক্ষর ব্যক্তির পক্ষে এমন সুগভীর, বৈজ্ঞানিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ কথা বলা অসম্ভব, এবং কুরআনের সাহিত্যিক সৌন্দর্যের চ্যালেঞ্জ কেউ কখনো পূরণ করতে পারেনি। এই প্রেক্ষাপটে, কিছু কাফির একটা আপত্তি তুলেছিল: যদি কুরআন সত্যিই আল্লাহর বাণী হয়, তাহলে এতে মশার মতো তুচ্ছ, নগণ্য একটা প্রাণীর কথা কেন উল্লেখ করা হলো? মশার এত গুরুত্ব কী যে আল্লাহ তা নিয়ে কথা বলবেন? আজকের আয়াতটা সরাসরি এই আপত্তির জবাব — আল্লাহ স্পষ্ট করছেন যে তিনি যেকোনো সৃষ্টির উদাহরণ দিতে দ্বিধা করেন না, তা যতই ছোট হোক না কেন, কারণ তাঁর উদ্দেশ্য মানুষকে শিক্ষা দেওয়া, আর শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় হলে যেকোনো উপমা ব্যবহার করাই যথাযথ।

“মশা কিংবা তার চেয়ে বড়/ছোট” — দুই ব্যাখ্যা

আয়াতে “বাউদাতান ফামা ফাওকাহা” বাক্যাংশের দুটো ব্যাখ্যা মুফাসসিরদের কাছে পাওয়া যায়:

১. “তার চেয়ে বড়” — অর্থাৎ মশা বা তার চেয়ে আকারে বড় কোনো প্রাণী দিয়ে তুলনা। ২. “তার চেয়ে ছোট/তুচ্ছ” — অর্থাৎ মশা বা তার চেয়েও ক্ষুদ্র, নগণ্য কিছু দিয়ে তুলনা।

উভয় ব্যাখ্যাই ভাষাগতভাবে গ্রহণযোগ্য এবং একই মূল বার্তা প্রকাশ করে — আল্লাহ শিক্ষার প্রয়োজনে ক্ষুদ্রতম থেকে বৃহত্তম, যেকোনো সৃষ্টির উদাহরণ ব্যবহার করতে দ্বিধা করেন না।

দুই প্রতিক্রিয়া: মুমিন বনাম কাফির

আয়াতে একটা “শর্তযুক্ত” গঠনের মাধ্যমে (আম্মা…ফা…) দুই ধরনের মানুষের বিপরীত প্রতিক্রিয়া তুলে ধরা হয়েছে:

  • মুমিনরা জানে যে এই দৃষ্টান্ত তাদের রবের পক্ষ থেকে সত্য — তারা এর গভীর তাৎপর্য উপলব্ধি করে এবং এতে সন্দেহ পোষণ করে না।
  • কাফিররা বলে, “আল্লাহ এই দৃষ্টান্ত দিয়ে কী বোঝাতে চাইলেন?” — এই প্রশ্নের মাধ্যমে তারা আসলে ইঙ্গিত করতে চায় যে কুরআন আল্লাহর বাণী নয়, বরং মানুষের রচিত, কারণ তাদের ধারণায় এত তুচ্ছ বিষয় আল্লাহর মহান বাণীতে থাকার কথা নয়।

মশার উদাহরণের গভীর তাৎপর্য

এই আয়াতের অনুরূপ ভাবনা সূরা আল-হাজ্জেও পাওয়া যায়, যেখানে আল্লাহ বলেন, যাদের মানুষ আল্লাহ ছাড়া উপাস্য বানিয়েছে, তারা সবাই একত্রিত হয়েও একটা মাছি সৃষ্টি করতে পারবে না — এমনকি মাছি যদি তাদের কাছ থেকে কিছু ছিনিয়ে নেয়, তারা তা উদ্ধারও করতে পারবে না। এই ক্ষুদ্র প্রাণীটার সৃষ্টি — তার জটিল দেহকাঠামো, তার কার্যক্ষমতা — এতটাই বিস্ময়কর যে বৃহৎ মস্তিষ্কের বড় বড় বিজ্ঞানীও তা তৈরি করতে অক্ষম। এটাই আল্লাহর ক্ষমতা ও একত্বের একটা সুস্পষ্ট প্রমাণ। যারা সত্যিকারের সত্য খোঁজে, তারা এই ক্ষুদ্র প্রাণীর মধ্যেই আল্লাহর মহত্ত্বের প্রমাণ খুঁজে পাবে।

কারা পথভ্রষ্ট হয় — এবং কেন

আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, এই দৃষ্টান্তের মাধ্যমে আল্লাহ অনেককে পথভ্রষ্ট করেন, আবার অনেককে হিদায়াত দেন — কিন্তু তিনি এর দ্বারা কেবল ফাসিকদেরই পথভ্রষ্ট করেন। এখানে একটা স্বাভাবিক প্রশ্ন উঠতে পারে: আল্লাহ কি তবে মানুষকে অন্যায়ভাবে পথভ্রষ্ট করেন? উত্তর হলো, না — যেমন আগের আলোচনায়ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, আল্লাহ শুরু থেকে কাউকে পথভ্রষ্ট করেন না; বরং যখন একজন মানুষ ইতিমধ্যেই অবাধ্য (ফাসিক) হয়ে ওঠে — অর্থাৎ আল্লাহর আদেশ-নিষেধ লঙ্ঘন করতে থাকে — তখন এই পথভ্রষ্টতা তাদের সেই অবাধ্যতার একটা ন্যায্য শাস্তি হিসেবে আসে। যার মনে ইতিমধ্যে অবাধ্যতার প্রবণতা আছে, সে কুরআন পড়েও সেই একই অবাধ্যতা নিয়ে থাকে, ফলে কুরআনের মাধ্যমেও পথভ্রষ্ট হয়। পরের আয়াতেই আল্লাহ এই ফাসিকদের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন।

আয়াত ২৭: ফাসিকদের বৈশিষ্ট্য

الَّذِينَ يَنقُضُونَ عَهْدَ اللَّهِ مِن بَعْدِ مِيثَاقِهِ وَيَقْطَعُونَ مَا أَمَرَ اللَّهُ بِهِ أَن يُوصَلَ وَيُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ ۚ أُولَٰئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ “যারা দৃঢ় অঙ্গীকারের পরও আল্লাহর সাথে করা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, এবং আল্লাহ যা জোড়া লাগাতে আদেশ দিয়েছেন তা কেটে ফেলে, এবং পৃথিবীতে অবাধ্যতা ছড়ায় — তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।”

এই আয়াতে ফাসিকদের তিনটা বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথম বৈশিষ্ট্যটা বুঝতে গভীরভাবে ডুব দিতে হবে “আহদ” (প্রতিশ্রুতি/অঙ্গীকার) শব্দটার অর্থে, কারণ এই শব্দটা কুরআনে বহুবার আসে এবং একে না বুঝলে কুরআনের অনেক আয়াত সঠিকভাবে বোঝা যাবে না।

“আহদ” শব্দের ভাষাগত বিশ্লেষণ

আরবি ভাষায় “আহদ” শব্দটার একাধিক অর্থ আছে:

১. আদেশ: আল্লাহর সমস্ত আদেশ-নিষেধ, বিধিনিষেধ — এসবই এক ধরনের “আহদ”। ২. ওয়াসিয়্যাহ (গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা): এটাও এক ধরনের আদেশ, তবে বিশেষত্ব হলো — এটা এমন একটা আদেশ যা অত্যন্ত জোর দিয়ে, দৃঢ়ভাবে পালন করার অনুরোধসহ দেওয়া হয়। যেমন কেউ জীবনের শেষ মুহূর্তে কাউকে যে পরামর্শ দেয় তাকে “ওয়াসিয়্যাহ” বলা হয়, কারণ তা অন্তর থেকে, আন্তরিকতা সহকারে দৃঢ়ভাবে পালনের আহ্বান বহন করে। এই কারণেই কুরআনে মা-বাবার প্রতি সদাচরণের আদেশকে “ওয়াসাইনাল ইনসানা বিওয়ালিদাইহি” (আমরা মানুষকে তার মা-বাবার প্রতি সদাচরণের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিয়েছি) বলা হয়েছে — কারণ এই আদেশ ইতিমধ্যেই বিদ্যমান ছিল, কিন্তু আল্লাহ এখানে অতিরিক্ত জোর দিয়ে তা পুনর্ব্যক্ত করছেন। ৩. শপথ: কোনো কিছুর উপর শপথ নেওয়া। ৪. প্রতিশ্রুতি: প্রচলিত অনুবাদে যেমন লেখা হয়। ৫. পরিচিত ও স্মরণীয় কিছু: এমন কিছু যা দুই পক্ষের মধ্যে ভালোভাবে জানা এবং বারবার স্মরণ ও সতর্কতা অবলম্বনের যোগ্য।

এই সব অর্থের মূল সাধারণ সুতোটা হলো: এগুলো এমন কিছু যা দুই পক্ষের মধ্যে বোঝাপড়া তৈরি করে, ভালোভাবে জানা এবং বারবার মনে রাখার যোগ্য, দৃঢ়তার সাথে পালনের দাবি রাখে।

“আহদুল্লাহ” (আল্লাহর প্রতিশ্রুতি) নিয়ে সালাফের ছয়টি মত

ইমাম আল-কুরতুবী তাঁর তাফসীরে পাঁচটা মত এবং আবু হাইয়ান তাঁর “আল-বাহরুল মুহীত”-এ নয়টা মত উল্লেখ করেছেন — এখানে ছয়টা প্রধান, গ্রহণযোগ্য মত সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরা হলো:

প্রথম মত — প্রথম আদি প্রতিশ্রুতি (আহদুল আজাল): পৃথিবীতে আসার আগে মানুষ আল্লাহর সাথে একটা প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হয়েছিল, যা সূরা আল-আরাফ (৭:১৭২) থেকে জানা যায়: “স্মরণ করো, যখন তোমার রব আদম সন্তানদের পিঠ থেকে তাদের বংশধরদের বের করে নিলেন এবং তাদেরকে নিজেদের সম্পর্কে সাক্ষী করে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমি কি তোমাদের রব নই?’ তারা বলল, ‘হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি।'” — এই আয়াতের উদ্দেশ্য যেন কিয়ামতের দিন কেউ বলতে না পারে “আমরা এ ব্যাপারে অজ্ঞ ছিলাম।” ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত একটা হাদিসে নবী ﷺ বলেছেন, আল্লাহ আদম (আলাইহিস সালাম)-এর পিঠ থেকে তাঁর সমস্ত বংশধরকে পিঁপড়ের মতো সারিবদ্ধ করে দাঁড় করিয়ে সরাসরি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “আমি কি তোমাদের রব নই?” আর তারা সবাই সাক্ষ্য দিয়েছিল, “হ্যাঁ।” এই ঘটনা মানবজাতির স্মৃতিতে সরাসরি অবশিষ্ট না থাকলেও, এটাই আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যের প্রথম প্রতিশ্রুতি, যাকে অনেকে মানবপ্রকৃতির (ফিতরাত) মধ্যে সহজাতভাবে গেঁথে দেওয়া তাওহীদের বীজ হিসেবেও ব্যাখ্যা করেন।

দ্বিতীয় মত — নবী-রাসূলদের কাছ থেকে নেওয়া প্রতিশ্রুতি: সূরা আলে-ইমরান (৩:৮১)-এ বর্ণিত: আল্লাহ নবীদের থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন, “আমি তোমাদের কিতাব ও হিকমত দেব, এরপর তোমাদের কাছে এমন একজন রাসূল আসবেন যিনি তোমাদের কাছে থাকা বিষয়কে সত্যায়িত করবেন — তখন তোমরা অবশ্যই তাঁর প্রতি ঈমান আনবে এবং তাঁকে সাহায্য করবে।” আল্লাহ জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমরা কি এই অঙ্গীকার স্বীকার করছ এবং এই শর্তে আমার ভার গ্রহণ করছ?” তাঁরা বললেন, “আমরা স্বীকার করছি।” আল্লাহ বললেন, “তবে সাক্ষী থাকো, আমিও তোমাদের সাথে সাক্ষী।” এই অর্থে, প্রতিটা নবীর কাছ থেকে অঙ্গীকার নেওয়া হয়েছিল যে চূড়ান্ত নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর যুগে বেঁচে থাকলে তাঁরা তাঁর প্রতি ঈমান আনবেন এবং সাহায্য করবেন — আর তাঁরা এই একই অঙ্গীকার তাঁদের নিজ নিজ উম্মতের কাছ থেকেও নিয়েছিলেন (যেমন মূসা আলাইহিস সালাম ইহুদিদের থেকে, ঈসা আলাইহিস সালাম খ্রিস্টানদের থেকে)। এই কারণেই ইহুদি ও খ্রিস্টান আলিমরা নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর পরিচয় ও সত্যতা সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে অবগত ছিলেন, তবু অনেকে তা অস্বীকার করেছিলেন।

তৃতীয় মত — চূড়ান্ত নবীর প্রতি ঈমান ও আনুগত্যের শপথ: এটা মূলত দ্বিতীয় মতেরই একটা শাখা বা রূপ — নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর প্রতি নেওয়া নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতিটাই এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

চতুর্থ মত — ওহী দ্বারা নাযিলকৃত সকল আদেশ-নিষেধ: এই মত অনুসারে “আহদুল্লাহ” বলতে আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী-রাসূলদের মাধ্যমে অবতীর্ণ সমস্ত আদেশ ও নিষেধকে বোঝানো হয়েছে, যা মানুষকে পালন করার আহ্বান জানানো হয়েছে। ইমাম আল-কুরতুবী উল্লেখ করেছেন যে এই মতটা সবচেয়ে বিস্তৃত এবং প্রকৃতপক্ষে বাকি সব মতকে নিজের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে নেয় — কারণ প্রথম আদি প্রতিশ্রুতিও, নবীদের কাছ থেকে নেওয়া প্রতিশ্রুতিও, সবই মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ একটা নির্দেশনার অংশ।

পঞ্চম মত — কুরআনের নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ: কিছু আলিম মনে করেন এটা বিশেষভাবে কুরআনে বর্ণিত হালাল-হারামের নির্দিষ্ট বিধিনিষেধকে নির্দেশ করে। এই মতটা মূলত চতুর্থ মতেরই একটা নির্দিষ্ট রূপ বা উপশাখা।

ষষ্ঠ মত — মানুষের বিবেক-বুদ্ধি ও সৃষ্টির নিদর্শন: এই মতটা তুলনামূলক কম শক্তিশালী হলেও ব্যাখ্যাযোগ্য — কিছু আলিমের মতে, মানুষের অন্তর্নিহিত বিবেক-বুদ্ধি এবং তার চারপাশে ছড়িয়ে থাকা সৃষ্টির নিদর্শনসমূহও একটা ধরনের “প্রতিশ্রুতি” হিসেবে গণ্য — কারণ আল্লাহ মানুষকে বুদ্ধি দিয়েছেন এবং অসংখ্য নিদর্শন দেখিয়েছেন যাতে তারা আল্লাহর একত্ব ও নবী-রাসূলদের সত্যতা উপলব্ধি করতে পারে। যারা এই নিদর্শনগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং সত্য জানা ও স্মরণ করা থেকে বিরত থাকে, তারা এই “পরিচিত ও স্মরণীয়” প্রতিশ্রুতি থেকেও বিচ্যুত হয়।

ছয়টা মত একত্রীকরণ: চার স্তরের প্রতিশ্রুতি

এই ছয়টা মত পরস্পরবিরোধী নয়, বরং একসাথে প্রয়োগ করা যায় — এগুলো একত্রে আল্লাহর সাথে মানুষের সম্পর্কের একটা চার-স্তরের কাঠামো তৈরি করে:

১. প্রথম স্তর: আদম (আলাইহিস সালাম)-এর পিঠ থেকে বংশধরদের বের করে নেওয়ার সময়কার আদি প্রতিশ্রুতি — তাওহীদ স্বীকারের প্রথম মুহূর্ত। ২. দ্বিতীয় স্তর: পৃথিবীতে সৃষ্ট হওয়ার সময় মানবপ্রকৃতির (ফিতরাত) মধ্যে তাওহীদের ধারণা সহজাতভাবে গেঁথে দেওয়া। ৩. তৃতীয় স্তর: মানুষকে বিবেক-বুদ্ধি ও সৃষ্টির নিদর্শন দান করা, যাতে তারা যুক্তি দিয়ে আল্লাহর একত্ব উপলব্ধি করতে পারে। ৪. চতুর্থ স্তর: সময়ে সময়ে নবী-রাসূল প্রেরণ ও কিতাব অবতীর্ণ করে বারবার স্মরণ করানো।

এই চার স্তরের যেকোনো একটাকে অস্বীকার করাই — নবীকে অস্বীকার করা, কিতাবকে অস্বীকার করা, কিংবা একজন নবীকে মেনে অন্যজনকে অস্বীকার করা (যেমন কেউ যদি সব নবীকে মানে কিন্তু মুহাম্মাদ ﷺ-কে অস্বীকার করে, বা মূসা পর্যন্ত মানে কিন্তু ঈসা ও মুহাম্মাদ ﷺ-কে অস্বীকার করে) — এই “আহদুল্লাহ” ভঙ্গ করার শামিল।

দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য: “যা জোড়া লাগাতে আদেশ দেওয়া হয়েছে তা কেটে ফেলা”

এই বাক্যাংশের দুটো প্রধান ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, যা একে অপরের বিরোধী নয়, বরং একসাথে প্রযোজ্য:

প্রথম ব্যাখ্যা — আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা (কাত’ আর-রাহিম): এটা এমন একটা গুরুতর অপরাধ যাকে অত্যাচারীদের (ফাসিক) একটা বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারিক শিক্ষা এখানে তুলে ধরা হয়েছে: আমরা প্রায়ই ধরে নিই কুরআনের আয়াতগুলো কাফির, মুনাফিক, বা পূর্ববর্তী উম্মতদের জন্য প্রযোজ্য, আমাদের জন্য নয়। কিন্তু এই আয়াত স্পষ্ট করছে যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা সরাসরি অত্যাচারী/পথভ্রষ্টদের একটা বৈশিষ্ট্য — যা আমাদের প্রত্যেককে নিজের জীবনে এই বিষয়ে সতর্ক থাকতে অনুপ্রাণিত করা উচিত। কোনো আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন থাকলে, তা আমাদের পথভ্রষ্টতার একটা কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে — এটা একটা বাস্তব ভয়ের বিষয়।

দ্বিতীয় ব্যাখ্যা — নবী-রাসূলদের প্রতি ঈমানের ধারাবাহিকতা ছিন্ন করা: কুরআনের একটা মূলনীতি হলো, কোনো আয়াতের একাধিক অর্থ যদি পরস্পরবিরোধী না হয়, তবে সবগুলো একসাথে গ্রহণ করা যায়। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, “যা জোড়া লাগাতে বলা হয়েছে তা কেটে ফেলা” মানে হলো — সমস্ত নবী-রাসূলকে সমানভাবে (মর্যাদায় নয়, বরং ঈমানের দিক থেকে) বিশ্বাস করার নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কাউকে গ্রহণ করে কাউকে প্রত্যাখ্যান করা — এটাও এই বন্ধন ছিন্ন করার একটা রূপ।

তৃতীয় বৈশিষ্ট্য: পৃথিবীতে ফাসাদ ছড়ানো

আগের আলোচনায় বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, “ফাসাদ” শব্দের ব্যাপক অর্থে কুফর, আল্লাহর প্রতি অবাধ্যতা, মুনাফিকী, অন্যায়, রক্তপাত, মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, এবং মানুষকে ধর্মের পথে যেতে বাধা দেওয়া সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত।

“তারাই ক্ষতিগ্রস্ত”

আয়াতটা শেষ হয় “উলাইকা হুমুল খাসিরুন” (তারাই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত) দিয়ে। “খাসির” শব্দটা এসেছে ব্যবসায়িক ক্ষতির ধারণা থেকে — যে ব্যক্তি ব্যবসায় মূলধন হারিয়ে ফেলে, লাভ তো দূরের কথা, মূল পুঁজিটাও শেষ হয়ে যায়, তাকে “খাসির” বলা হয়। এখানে ফাসিকদের এই তিন বৈশিষ্ট্যের কারণে তাদের সমগ্র জীবনের প্রকৃত “মূলধন” — ঈমান ও আখিরাতের সাফল্য — সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে যায়।

আয়াত ২৮: সৃষ্টির যুক্তি দিয়ে তাওহীদের প্রমাণ

كَيْفَ تَكْفُرُونَ بِاللَّهِ وَكُنتُمْ أَمْوَاتًا فَأَحْيَاكُمْ ۖ ثُمَّ يُمِيتُكُمْ ثُمَّ يُحْيِيكُمْ ثُمَّ إِلَيْهِ تُرْجَعُونَ “তোমরা কীভাবে আল্লাহকে অস্বীকার করছ, অথচ তোমরা মৃত ছিলে, তারপর তিনি তোমাদের জীবন দিলেন? এরপর তিনি তোমাদের মৃত্যু দেবেন, তারপর আবার জীবন দেবেন, তারপর তোমরা তাঁরই কাছে ফিরে যাবে।”

এই আয়াতের সাথে আগের আয়াতের সংযোগ স্পষ্ট: আগের আয়াতে কুফরকে অন্যতম গুরুতর অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার পর, এই আয়াতে আল্লাহ সরাসরি প্রশ্ন করছেন — তোমরা কীভাবে তাঁকে অস্বীকার করতে পারো, যখন তিনিই এই মহাবিশ্বের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক এবং তোমাদের অস্তিত্বের একমাত্র উৎস?

“তোমরা মৃত ছিলে” — একটা অস্তিত্বের প্রতিফলন

এখানে “মৃত” বলতে বোঝানো হয়েছে সৃষ্টি হওয়ার আগের সেই অবস্থা যখন কোনো অস্তিত্বই ছিল না — অর্থাৎ সম্পূর্ণ অ-অস্তিত্বের অবস্থা। এই আয়াতটা একটা গভীর, ব্যক্তিগত অস্তিত্বতাত্ত্বিক প্রতিফলনের আহ্বান জানায়: একটু ভেবে দেখা — একদিন আমার কোনো অস্তিত্বই ছিল না। পঞ্চাশ বছর আগে হয়তো আমি ছিলাম না। অথচ আজ আমি হাঁটছি, কথা বলছি, চিন্তা করছি, বিশাল এই জগৎ প্রত্যক্ষ করছি, বিভিন্ন শব্দ শুনছি, বিভিন্ন খাবারের স্বাদ নিচ্ছি, বিভিন্ন গন্ধ অনুভব করছি। এই বিস্ময়কর অস্তিত্বের ব্যাখ্যা কী হতে পারে আল্লাহর সৃষ্টিকর্মকে বাদ দিয়ে? আমরা নিশ্চিতভাবে জানি যে একদিন মৃত্যু আসবে — চারপাশে মানুষের মৃত্যু প্রত্যক্ষ করেই এই সত্য আমাদের কাছে সুস্পষ্ট। জন্ম থেকে শৈশব, যৌবন, বার্ধক্য পর্যন্ত ক্রমান্বয়ে পরিবর্তনের এই প্রক্রিয়া, এবং শেষে মৃত্যু ও পুনরুত্থানের এই সম্পূর্ণ চক্র — সবকিছুই আল্লাহর সরাসরি নিয়ন্ত্রণাধীন, যদিও আমরা তাঁকে সরাসরি চোখে দেখিনি।

চার ধাপের চক্র

আয়াতে চারটা পরপর ধাপ উল্লেখ করা হয়েছে: (১) মৃত ছিলে (অ-অস্তিত্ব), (২) তিনি জীবন দিলেন, (৩) তিনি মৃত্যু দেবেন, (৪) তিনি আবার জীবন দেবেন, এবং শেষে তাঁর কাছেই ফিরে যাওয়া হবে। এই সম্পূর্ণ চক্রটাই আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতার একটা অকাট্য প্রমাণ — জন্ম, মৃত্যু, পুনরুত্থান সবকিছুই তাঁর ইচ্ছাধীন।

আয়াত ২৯: সৃষ্টির ব্যাপকতা — পৃথিবী থেকে সাত আসমান

هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُم مَّا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا ثُمَّ اسْتَوَىٰ إِلَى السَّمَاءِ فَسَوَّاهُنَّ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ ۚ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ “তিনিই সেই সত্তা যিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীর সবকিছু সৃষ্টি করেছেন, তারপর আকাশের দিকে মনোনিবেশ করলেন এবং তা সাতটা আসমানরূপে সুবিন্যস্ত করলেন। আর তিনি সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ।”

এই আয়াতটা আগের আয়াতগুলোর সৃষ্টিতাত্ত্বিক যুক্তিকে আরও সম্প্রসারিত করে — পৃথিবীর সবকিছু মানুষের কল্যাণে সৃষ্ট, এবং তারপর আল্লাহ আকাশকে সুশৃঙ্খলভাবে সাতটা আসমানে বিন্যস্ত করেছেন, যা তাঁর অসীম জ্ঞান ও ক্ষমতার একটা প্রমাণ।

আয়াত ২৬-২৯-এর একটি ব্যাকরণ-ভিত্তিক পর্যালোচনা

আয়াত ২৬

ইন্নাল্লাহা লা ইয়াস্তাহি — “নিশ্চয় আল্লাহ লজ্জাবোধ করেন না” (ইস্তাহইয়া [মাদি, লজ্জাবোধ করা] থেকে ইয়াস্তাহি [মুদারি’, সে লজ্জাবোধ করে]; এখানে আলিফ পড়ে গেছে সংক্ষিপ্ত রূপে লেখার নিয়মের কারণে। লা যুক্ত হয়ে নেতিবাচক অর্থ তৈরি করেছে — আল্লাহ কখনো কোনো উপমা দিতে দ্বিধা করেন না)। আন ইয়াদরিবা মাসালাম — “যে দৃষ্টান্ত দিতে” (মাসালান এখানে অনির্দিষ্ট, “মা” যুক্ত হয়ে মাসালাম মা আরও অনির্দিষ্টতা যোগ করে — “যেকোনো দৃষ্টান্ত”)। বাউদাতান ফামা ফাওকাহা — “মশা কিংবা তার চেয়ে [বড়/ছোট]” (ফা এখানে সংযোগসূচক; মা + ফাওকাহা [তার উপরে/চেয়ে], “হা” সর্বনামটা মশার দিকে ইঙ্গিত করছে — দুই ব্যাখ্যাই সম্ভব: আকারে বড় বা আকারে ছোট)।

ফাআম্মাল্লাযীনা আমানু ফাইয়া’লামুনা আন্নাহুল হাক্কু মির রাব্বিহিম — “যারা ঈমান এনেছে তারা জানে এটা তাদের রবের পক্ষ থেকে সত্য” (আম্মা শর্তযুক্ত/বিভাজনসূচক গঠনের সূচনা — এখানে দুই ধরনের মানুষের ভিন্ন প্রতিক্রিয়া উপস্থাপনের জন্য “আম্মা…ফা…” কাঠামো ব্যবহৃত হয়েছে, যা আরবিতে একটা শর্তের সাথে ফলাফলকে সংযুক্ত করে; “ফা” এখানে শর্তের ফলাফল/জাওয়াবের চিহ্ন হিসেবে আসে, যা ব্যাকরণে “জুমলা শারতিয়্যাহ” গঠনের একটা বৈশিষ্ট্য। ইয়া’লামুনা = তারা জানে, আলিমা [সে জানত] থেকে)।

ওয়া আম্মাল্লাযীনা কাফারু ফাইয়াকুলুনা মাযা আরাদাল্লাহু বিহাযা মাসালা — “আর যারা কুফরী করেছে তারা বলে, আল্লাহ এই দৃষ্টান্ত দিয়ে কী বোঝাতে চেয়েছেন” (আরাদা = ইচ্ছা করা/চাওয়া; বিহাযা = এর দ্বারা, “বি” এখানে ইচ্ছার সাথে সংযুক্ত হরফে জার হিসেবে কাজ করছে; মাসালান এখানে “তামীয” — একটা স্পষ্টীকরণকারী বিশেষ্য যা আগের বাক্যের অস্পষ্টতা দূর করে, “এই” (হাযা) কীসের দিকে ইঙ্গিত করছে তা স্পষ্ট করে দেয় — “এই দৃষ্টান্তের দ্বারা”)।

ইউদিল্লু বিহি কাসিরাউ ওয়া ইয়াহদি বিহি কাসিরা — “এর দ্বারা তিনি অনেককে পথভ্রষ্ট করেন এবং অনেককে হিদায়াত দেন” (ইউদিল্লু = তিনি পথভ্রষ্ট করেন, আদাল্লা থেকে; বিহি = এর দ্বারা/মাধ্যমে, “হি” সর্বনাম মশার উপমার দিকে ইঙ্গিত করছে; ইয়াহদি = তিনি হিদায়াত দেন)।

ওয়া মা ইউদিল্লু বিহি ইল্লাল ফাসিকিন — “আর তিনি এর দ্বারা কেবল ফাসিকদেরই পথভ্রষ্ট করেন” (মা…ইল্লা = নিষেধাত্মক-ব্যতিক্রম গঠন, “শুধুমাত্র”)।

আয়াত ২৭

আল্লাযীনা ইয়ানকুদুনা আহদাল্লাহি মিম বা’দি মিসাকিহি — “যারা দৃঢ় অঙ্গীকারের পর আল্লাহর সাথে করা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে” (ইয়ানকুদুনা = তারা ভঙ্গ করে; মিসাক = দৃঢ় অঙ্গীকার/চুক্তি, আহদ শব্দের সাথে সংযুক্ত হয়ে জোর প্রদান করছে — যে প্রতিশ্রুতি একবার দৃঢ়ভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে তাই ভঙ্গ করা হচ্ছে, নিছক একবার বলা কথা নয়)।

ওয়া ইয়াকতাউনা মা আমারাল্লাহু বিহি আই ইউসালা — “এবং আল্লাহ যা জোড়া লাগাতে আদেশ দিয়েছেন তা কেটে ফেলে” (ইয়াকতাউনা = তারা কাটে, কাতাআ থেকে; আই ইউসালা — “আন” ব্যাকরণগতভাবে ক্রিয়াকে “মানসুব” করছে, অর্থাৎ ইউসালা [যুক্ত করা হোক] ক্রিয়াটাকে নির্দিষ্ট একটা রূপে রূপান্তরিত করছে; ইউসালা প্যাসিভ রূপ, “সংযুক্ত করা হোক”)।

ওয়া ইউফসিদুনা ফিল আরদি — “এবং পৃথিবীতে অবাধ্যতা/ফাসাদ ছড়ায়” (ইউফসিদুনা = তারা ফাসাদ সৃষ্টি করে, আফসাদা থেকে)।

উলাইকা হুমুল খাসিরুন — “তারাই ক্ষতিগ্রস্ত” (খাসিরুন = ক্ষতিগ্রস্তদের বহুবচন, খাসিরা [সে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে] থেকে)।

আয়াত ২৮

কাইফা তাকফুরুনা বিল্লাহি — “তোমরা কীভাবে আল্লাহকে অস্বীকার করছ” (কাইফা = কীভাবে; তাকফুরুনা = তোমরা কুফর করো, কাফারা থেকে। এখানে “বি” আল্লাহর সাথে সংযুক্ত হয়ে “অস্বীকার করা”-কে “কুফর করা” থেকে পৃথক করে না — উভয়ই একই মূল ধারণা, আল্লাহকে অস্বীকার করার কাজ)।

ওয়া কুনতুম আমওয়াতান ফাআহইয়াকুম — “অথচ তোমরা মৃত ছিলে, তারপর তিনি তোমাদের জীবন দিলেন” (কুনতুম = তোমরা ছিলে, কানা থেকে; আমওয়াত = মৃতদের বহুবচন; আহইয়া = তিনি জীবন দিয়েছেন, কুম = তোমাদের)।

সুম্মা ইউমিতুকুম সুম্মা ইউহইকুম সুম্মা ইলাইহি তুরজাউন — “তারপর তিনি তোমাদের মৃত্যু দেবেন, তারপর জীবন দেবেন, তারপর তোমরা তাঁরই কাছে ফিরে যাবে” (সুম্মা = তারপর, ক্রমিক সংযোগসূচক অব্যয়; ইউমিতু = তিনি মৃত্যু দেন, আমাতা থেকে; ইউহই = তিনি জীবন দেন; তুরজাউন = তোমরা ফিরে যাবে, রাজাআ [সে ফিরে গেল] → প্যাসিভ তুরজাউ [তুমি ফিরিয়ে নেওয়া হবে] + বহুবচন নুন = তুরজাউন)।

আয়াত ২৯

হুওয়াল্লাযী খালাকা লাকুম মা ফিল আরদি জামিআ — “তিনিই যিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীর সবকিছু সৃষ্টি করেছেন” (জামিআন = সম্পূর্ণরূপে/সবকিছু, জোরদানকারী বিশেষণ)। সুম্মাস তাওয়া ইলাস সামা’ই — “তারপর আকাশের দিকে মনোনিবেশ করলেন” (ইস্তাওয়া = সে উঠল/মনোনিবেশ করল, মূল অর্থে “উপরে ওঠা” বোঝালেও এখানে “তাদমীন” ব্যাকরণগত কৌশলের মাধ্যমে — যেখানে একটা প্রত্যাশিত অব্যয়ের জায়গায় ভিন্ন একটা অব্যয় বসে ভিন্ন একটা অন্তর্নিহিত ক্রিয়ার অর্থ যোগ করে — এখানে ইলা অব্যয়ের সাথে যুক্ত হয়ে “উদ্দেশ্য নিয়ে অগ্রসর হওয়া” অর্থ যুক্ত করেছে, অর্থাৎ আকাশ সুবিন্যস্ত করার উদ্দেশ্যে তার দিকে মনোনিবেশ)।

ফাসাওয়াহুন্না সাবা সামাওয়াতিন — “এবং তা সাতটা আসমানরূপে সুবিন্যস্ত করলেন” (সাওয়া = সে সুসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে সাজিয়েছে/সমান করেছে; হুন্না = তাদের, স্ত্রীবাচক বহুবচন সর্বনাম, সাত আসমানের দিকে ইঙ্গিত করছে; সাবা সামাওয়াতিন = সাতটা আসমান, সামা-র বহুবচন সামাওয়াত)।

ওয়া হুওয়া বিকুল্লি শাইয়িন আলিম — “আর তিনি সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ” (আলিম = সর্বজ্ঞ, ব্যাপক জ্ঞানের অধিকারী — আল্লাহর একটা নাম/গুণবাচক বিশেষণ)।

সমাপনী প্রতিফলন

এই আয়াতগুলোর মূল সুর একটাই — আল্লাহর সৃষ্টিকর্মের প্রতিটা স্তর, ক্ষুদ্রতম মশা থেকে শুরু করে সুবিশাল সাত আসমান পর্যন্ত, তাঁর অসীম জ্ঞান ও ক্ষমতার একটা সাক্ষ্য বহন করে। মুমিনদের জন্য এই সাক্ষ্য ঈমান দৃঢ় করার উপকরণ, আর ফাসিকদের জন্য এই একই সাক্ষ্য — তাদের নিজেদের পূর্ববর্তী অবাধ্যতার কারণে — আরও পথভ্রষ্টতার উপলক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। মশার দৃষ্টান্ত থেকে শুরু করে সৃষ্টির ব্যাপকতার বর্ণনা পর্যন্ত, পুরো অংশটাই একটা সরল, অথচ গভীর প্রশ্নে নিহিত: যিনি আমাদের অ-অস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে এনেছেন, যিনি সৃষ্টির প্রতিটা স্তরে তাঁর ক্ষমতার সাক্ষ্য রেখে দিয়েছেন, তাঁকে কীভাবে অস্বীকার করা যায়?

সুবহানাকাল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা, আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লা আনতা, আস্তাগফিরুকা ওয়া আতুবু ইলাইক।