আলিফ লাম মীম — যে অক্ষরগুলোর কোনো অর্থ নেই, তবু আছে
الم
“আলিফ লাম মীম”
কুরআন খুলুন, একদম শুরুতেই — সূরা আল-ফাতিহার পর সূরা আল-বাকারার প্রথমেই — তিনটা আলাদা আলাদা অক্ষর: আলিফ, লাম, মীম। কোনো বাক্য নয়, কোনো শব্দ নয়। শুধু তিনটা হরফ।
আর মজার ব্যাপার — এমন বিচ্ছিন্ন অক্ষর কুরআনের ২৯টি সূরার শুরুতে ছড়িয়ে আছে। কোথাও হা মীম, কোথাও ইয়াসীন, কোথাও শুধু কাফ, কোথাও নূন। এগুলোকে বলা হয় হুরুফে মুকাত্তাআত — বিচ্ছিন্ন অক্ষরসমূহ।
স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে — এগুলোর মানে কী?
প্রথমে একটা সৎ স্বীকারোক্তি
এই অক্ষরগুলোর নিজস্ব কোনো অর্থ নেই। এটা মেনে নিতে হবে।
কিন্তু একই সাথে এটাও নিশ্চিত — আল্লাহ নিশ্চয়ই কোনো কারণেই এগুলো নাযিল করেছেন। অর্থহীন কিছু কুরআনে থাকতে পারে না। এর একটা তাৎপর্য আছে।
তাহলে সেই তাৎপর্যটা কী? মজার ব্যাপার হলো — স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এর অর্থ নিয়ে কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। তিনি ব্যাখ্যা করে যাননি।
তাহলে আলেমরা কী নিয়ে কথা বলেন? সাহাবী ও তাবি’ঈনদের কাছ থেকে আসা মতামত নিয়ে। শুধু ইমাম তাবারীই (মৃত্যু ৩১০ হিজরি) এ বিষয়ে ১৩ ধরনের বক্তব্য সংগ্রহ করেছেন!
ইবনুল জাওযীর “জাদুল মাসীর” — ছয়টি মত
ইমাম তাবারীর পরের যুগের আরেক আলেম ইবনুল জাওযী, তাঁর গ্রন্থ “জাদুল মাসীর”-এ আলিফ লাম মীম ও হুরুফে মুকাত্তাআত নিয়ে ছয়টি ভিন্ন মত তুলে ধরেছেন। চলুন সংক্ষেপে দেখি — প্রতিটাই ভাবার মতো:
১। এগুলো আল্লাহর ইসমুল আজম-এর ইঙ্গিত
কারও মতে, এগুলো লুকিয়ে আছে আল্লাহর ইসমুল আজম (মহাসত্তা নাম)। যেহেতু এগুলো অর্থহীন অক্ষর, তাই এটা একধরনের সংকেত। যদি কেউ ডিকোড করতে পারে, তবে জানা যাবে আল্লাহর সেই মহান নামটি কী — আর সেই নামে ডাকলে আল্লাহ অবশ্যই দোয়া কবুল করেন।
২। এগুলো আল্লাহর নামে কসম
আরেক মতে, এগুলো এক প্রকার শপথ — আল্লাহ তাঁর নিজের নামের কসম খাচ্ছেন।
৩। এগুলো কুরআনেরই বিভিন্ন নাম
কারও মতে, এই অক্ষরগুলো আসলে কুরআনের নানা নাম।
৪। এগুলো সংশ্লিষ্ট সূরার নাম
আবার কারও মতে, এগুলো যে সূরার শুরুতে বসে আছে, সেই সূরার নাম।
৫। এগুলো আসলে বড় বাক্যের সংক্ষিপ্ত রূপ
এই মতটা দারুণ। কারও মতে, প্রতিটা অক্ষর একেকটা পুরো বাক্যের সংকেত। ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত — তিনি বলেছেন “আলিফ লাম মীম” মানে “আনাল্লাহু আ’লাম” — “আমি আল্লাহ, আমি সর্বজ্ঞ।” অর্থাৎ তিনটা অক্ষর দিয়ে এই পুরো বাক্যের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
আর সবচেয়ে শক্তিশালী মতটি — কুরআনের চ্যালেঞ্জ
শেষ মতটি সবচেয়ে জোরালো। বলা হয় — এই বিচ্ছিন্ন অক্ষরগুলো আসলে কুরআনের মু’জিযা (অলৌকিকত্ব)-র দিকে ইঙ্গিত করছে।
একটু ভেবে দেখুন ব্যাপারটা। “আলিফ লাম মীম” বলে যেন আরবদের মনোযোগ টেনে নেওয়া হচ্ছে — “দেখো, তোমাদের সামনে আল-কুরআন।”
এই কুরআন কী দিয়ে গঠিত? সেই একই অক্ষরগুলো দিয়েই — যেগুলো আরবদের হাতের মুঠোয়: আলিফ, লাম, মীম, হা, রা, সাদ, কাফ, নূন, হা, ইয়া, আইন, সাদ। এই হরফগুলো তো তোমাদেরই। তোমরা এগুলো দিয়েই কবিতা লেখো, ভাষণ দাও, গল্প বাঁধো।
অথচ — এই পরিচিত অক্ষর দিয়েই গড়া কুরআনের একটা সূরার মতোও তোমরা বানাতে পারবে না।
বার্তাটা স্পষ্ট: যদি উপকরণ তোমাদের চেনা, তবু ফলাফল তোমাদের সাধ্যের বাইরে হয় — তাহলে বুঝে নাও, এই কুরআন মানুষের নয়, এটি আল্লাহর কাছ থেকেই এসেছে।
এটাই এই বিচ্ছিন্ন অক্ষরগুলোর সবচেয়ে জোরালো ইঙ্গিত। অতীতের আলেমদের মধ্যে ইবনে কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) এবং সাম্প্রতিক আলেমদের মধ্যে ইবনে উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) এই মতটিকেই সমর্থন করেছেন।
শেষ কথা
তাহলে দাঁড়াল কী? অক্ষরগুলোর আক্ষরিক কোনো অর্থ নেই — এটা আমরা মেনে নিই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও এর ব্যাখ্যা দেননি। কিন্তু এর তাৎপর্য নিয়ে আলেমরা ভেবেছেন, আর সবচেয়ে সুন্দর ব্যাখ্যাটা আমাদের একটা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করে দাঁড় করায়:
তোমাদের চেনা অক্ষর, তবু অচেনা এক গ্রন্থ। ভেবে দেখো — এটি কোথা থেকে এল।
আর ঠিক পরের আয়াতেই আসে সেই উত্তর — যালিকাল কিতাবু লা রাইবা ফীহি — “এটি সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই।” 🌙