সূরা আল-বাকারা : আয়াত ১১–১৬ — তাফসির আলোচনা

১. মুনাফিকদের পটভূমি

সূরা আল-বাকারার শুরুতে, আল্লাহ তাআলা মুত্তাকিদের পরিচয় দেওয়ার পর এবং এক শ্রেণির কাফিরের উল্লেখ করার পর, আল্লাহ তাআলা কয়েকটি আয়াতে মুনাফিকদের বিষয়টি আলোচনা করেছেন। সূরা আল-বাকারার ৮ থেকে ২০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের বিষয়টি আলোচনা করেছেন।

১.১ মুনাফিকদের আবির্ভাব কখন?

মুনাফিকদের সম্পর্কে একটি পটভূমিগত ইতিহাস আমাদের জানা দরকার। অর্থাৎ মুনাফিকরা প্রথম কখন আবির্ভূত হলো? সেটা হলো মদিনায়—যখন নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর সাহাবীগণ মদিনায় আশ্রয় পেলেন এবং যখন মদিনার লোকেরা তাঁদের নিশ্চয়তা দিল যে তাঁরা মদিনায় বসতি স্থাপন করতে পারবেন এবং রাষ্ট্রীয় ভিত্তিতে ইসলামের দাওয়াত ছড়িয়ে দিতে পারবেন। ফলে ইসলামে প্রথম ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলো মদিনায়, এবং ধীরে ধীরে বিভিন্ন যুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমে ইসলামি রাষ্ট্রের ভিত্তি মজবুত হলো। এই সময়েই মুনাফিকদের আবির্ভাব ঘটল।

১.২ কেন তারা মুসলিম পরিচয় নিল?

কারণ এখন ইসলাম শক্তিশালী, মুসলিম হিসেবে পরিচয় দিয়ে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ আছে। তাই এক দল লোক—মুসলিম সমাজে বসবাসের সুবিধা নেওয়ার জন্য—নিজেদের মুসলিম বলে দাবি করল, কিন্তু তাদের অন্তরে তারা ইসলামকে ঘৃণা করত। তারা শুধু কাফিরই ছিল না, বরং ইসলামবিরোধীও ছিল। ফলে মুসলিম সমাজে বসবাস করে তারা মুসলিমদের কাছ থেকে নিজেদের জান-মালের নিরাপত্তা নিল।

তারা যেসব দুনিয়াবি সুবিধা নিতে চেয়েছিল:

  • মুসলিমরা এখন শক্তিশালী, আর মুসলিমদের মধ্যে থেকে তারা মুসলিম নারীদের বিয়ে করতে পারত এবং সেখানে বসবাস করতে পারত।
  • তারা উত্তরাধিকারী হতে পারত—কারণ কোনো কাফির যদি প্রকাশ্যে কুফরি ঘোষণা করে কাফির হয়ে যায়, তবে সে তার মুমিন আত্মীয়দের উত্তরাধিকারী হবে না।

এজন্য তারা দাবি করল যে তারা মুসলিম, কিন্তু অন্তরে তারা ইসলামবিরোধী, এবং গোপনে তারা ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করত। এরাই হলো মুনাফিক।

১.৩ মক্কি যুগে মুনাফিক ছিল না কেন?

এর আগে, অর্থাৎ মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে, মুনাফিকদের অস্তিত্ব ছিল না। কারণ এর আগে মক্কি যুগে, অর্থাৎ নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নবুয়তের পর ১৩ বছর, নিজেকে মুসলিম হিসেবে পরিচয় দেওয়ার অর্থ ছিল নিজের উপর বিপদ ডেকে আনা। তাই কোনো সুবিধা নেওয়ার জন্য কেউ মুসলিম হওয়ার দাবি করেনি। এই ১৩ বছরে যারা নিজেদের মুসলিম বলে দাবি করেছিল, তাদের নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। যে কোনো রূপেই হোক, তাদের নিপীড়ন ও ত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়েছে, এমনকি দেশত্যাগ করে, সবকিছু হারিয়ে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, জান্নাতের আশায়, আল্লাহর চেহারার আশায় এসব ত্যাগ করতে হয়েছে। যদি কেউ শুধু নিজেকে মুসলিম বলে পরিচয় দিত, তবে সে সময় মুসলিম হিসেবে পরিচয় দেওয়ায় কোনো সুবিধা ছিল না।

১.৪ বর্তমান যুগে প্রাসঙ্গিকতা

যখন ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলো এবং ইসলাম শক্তিশালী হলো, তখন নিজেকে মুসলিম হিসেবে পরিচয় দেওয়ায় সুবিধা তৈরি হলো। আর বর্তমানে, যদিও অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্রই ইসলামি রাষ্ট্র নয়, সেসব রাষ্ট্র ইসলামের আইন অনুযায়ী চলে না, তবুও মুসলিমদের মধ্যে মুসলিম পরিচয়ে বসবাস করায় সুবিধা আছে। যা এক দল লোক মুসলিম সমাজে নিচ্ছেও। তারা নিজেদের মুসলিম হিসেবে পরিচয় দিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে কাজ করছে। তাই আমাদের মুনাফিকদের চেনার জন্য তাদের বৈশিষ্ট্যগুলো জানা জরুরি।

১.৫ কুরআনে মুনাফিকদের উপর এত গুরুত্ব কেন?

আপনি হয়তো ভাবতে পারেন যে মুনাফিকরা একটি ঐতিহাসিক দল, একটি জনগোষ্ঠী, যারা একটি নির্দিষ্ট সময়ে—মদিনার যুগে, মাদানি যুগে—ছিল, যখন নবী ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাহলে আজ তাদের বৈশিষ্ট্য জানার প্রাসঙ্গিকতা কোথায়? আর আপনি অবাক হবেন। আপনি সূরা আল-বাকারার শুরু থেকে দেখতে পাবেন যে মুত্তাকিদের জন্য পাঁচটি আয়াত, কাফিরদের জন্য দুটি আয়াত, আর মুনাফিকদের জন্য ১৩টি আয়াত। এটি বিস্ময়কর যে, বিভিন্ন সূরায় মুনাফিকদের আরও অনেক বর্ণনা রয়েছে। সূরা আন-নিসা, সূরা আত-তাওবা, সূরা মুনাফিকুন—মুনাফিকদের নামেই একটি সূরা রয়েছে। আর আরও অনেক সূরায় আপনি তা পাবেন। বারবার মুনাফিকদের প্রসঙ্গ এসেছে। কেন?

আল্লাহ তাআলা কি অতীতে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া একটি ছোট দলের সমালোচনা করে কিয়ামত পর্যন্ত তিলাওয়াতের জন্য এত আয়াত দিয়েছেন? না। আমাদের সমাজে মুনাফিক আছে, যারা মূলত আমাদেরই মতো, আর আমাদের তাদের চিনতে হবে। আর আমাদের নিজেদের নিফাক (মুনাফিকি) থেকে ভয় করতে হবে।


২. নিফাকের প্রকারভেদ

নিফাকের ভূমিকায় আমরা বলেছি নিফাক কী? আর আমরা দেখেছি যে নিফাক দুই প্রকার।

২.১ বিশ্বাসগত নিফাক (নিফাকে আকিদা/ইতিকাদি)

অর্থাৎ যে অন্তরে কুফর লালন করে, যার কোনো ঈমানই নেই, অথচ বাইরে সে বড় মুসলিম বলে দাবি করে। সে নিফাকে পতিত হয়েছে। কুরআন তার সম্পর্কে বলে যে সে জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকবে। কারণ সে কাফিরদের সকল শ্রেণির মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট।

২.২ আমলগত নিফাক (নিফাকে আমলি)

অর্থাৎ মুনাফিকদের কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যদি কারও মধ্যে সেগুলো পাওয়া যায়, তবে তার মধ্যে নিফাকের কিছু আলামত পাওয়া গেছে। এমন নয় যে এর কারণে সে চিরকাল জাহান্নামে থাকবে, তবে এ সম্পর্কে ভয় আছে, শাস্তির আশঙ্কা আছে—যেমন:

  • মিথ্যা বলা
  • ওয়াদা ভঙ্গ করা
  • বিতর্কে সত্য থেকে বিচ্যুত হওয়া
  • আমানতের খেয়ানত করা

আর আমি নিশ্চিত যে আমরা বাঙালিরা এই বৈশিষ্ট্যগুলো খুব ভালোভাবে বুঝি। এই সমাজে বসবাস করতে করতে বরং বলা যায় যে আমরা শৈশব থেকেই এগুলোতে প্রশিক্ষিত। যেদিন শিশু বলতে পারে যে তার বাবা বাড়িতে নেই (অথচ আছেন), সেদিন তার প্রশংসা করা হয়।


৩. আয়াত ১১–১২

যাই হোক, নিফাকের পরিচয় পাওয়ার পর এখন দেখি সূরা আল-বাকারায় মুনাফিকদের কী বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে। এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মনোযোগ দিয়ে পড়ি।

আল্লাহ তাআলা বলেন—”আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম”—

وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ قَالُوا إِنَّمَا نَحْنُ مُصْلِحُونَ ﴿١١﴾ أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ الْمُفْسِدُونَ وَلَٰكِن لَّا يَشْعُرُونَ ﴿١٢﴾

(১১) আর যখন তাদের বলা হয় “পৃথিবীর বুকে [আল্লাহর] অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ো না!” তারা বলে: “আমরা তো কেবল সংশোধনকারী।”

(১২) শোন! কেবল এরাই [আল্লাহর] অবাধ্যতায় লিপ্ত, যদিও তারা তা টের পায় না!


৪. “ফাসাদ” শব্দের বিশ্লেষণ

এই দুটি আয়াতে প্রথম যে শব্দটির প্রতি আমাদের মনোযোগ দেওয়া দরকার, সেটি হলো “লা তুফসিদু”—”ফাসাদ করো না।” যা এখানে “অবাধ্যতা” হিসেবে অনুবাদ করা হয়েছে |

৪.১ বাংলা ও শরিয়তের অর্থের পার্থক্য

“ফাসাদ” শব্দটি বাংলা অভিধানেও আছে। এই শব্দ শুনলে আমাদের মনে কিছু অর্থ ভেসে ওঠে। “ফাসাদ” শব্দটি শুনলে সাধারণত আমাদের মনে যা আসে তা হলো বিশৃঙ্খলা—সামাজিক বিশৃঙ্খলা, হত্যাযজ্ঞ ইত্যাদি। কেউ হয়তো বলতে পারেন, যেহেতু “ফাসাদ” শব্দটি বাংলায়ও আছে, তাহলে এখানে অনুবাদে “যমিনে ফাসাদ করো না”ও বলা যেত। তাহলে এক দিক থেকে আরও ভালো হতো। কারণ আরবি শব্দটি বাংলায় হুবহু একই আছে, তাই আমরা তা ব্যবহার করলাম। কিন্তু সেখানে একটি সমস্যা আছে।

শরিয়তে ফাসাদ বলতে যা বোঝায় তা একটু ব্যাপক। আর বাংলায় ফাসাদ বলতে আমরা যা বুঝি তা একটু সংকীর্ণ। এজন্যই আমরা একটি সাধারণ শব্দ ব্যবহারের চেষ্টা করেছি, যাতে আল্লাহর অবাধ্যতা অন্তর্ভুক্ত থাকে। ফলে ফাসাদ শব্দের ব্যাপক অর্থ এতে চলে আসে। এজন্যই আমার পছন্দ হলো “ফাসাদ” ব্যবহার না করে “অবাধ্যতা” শব্দটি ব্যবহার করা। আশা করি কারণটি বোঝাতে পেরেছি। কারণ আরবিতে ফাসাদ বলতে যা বোঝায়, বাংলায় এখন “ফাসাদ” বললে আমরা তা বুঝি না।

৪.২ কুরআন বোঝার মূলনীতি : দুই ধরনের অর্থ মেলানো

আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে যে, আপনি যদি আল-কুরআন বুঝতে চান, তবে আপনাকে দুটি জিনিস একসাথে মেলাতে হবে। সে দুটি জিনিস কী? আপনাকে দুই ধরনের অর্থ একসাথে মেলাতে হবে।

  1. আভিধানিক অর্থ (আল-মানা আল-লুগাবি)।
  2. শরিয়তের অর্থ (আল-মানা আশ-শারয়ি)।

আর শরিয়তের অর্থ বোঝার জন্য আপনাকে ভাষাবিদদের কথা দেখতে হবে। আর দেখতে হবে সালাফদের কথা। সাহাবা, তাবিয়ি, তাবি-তাবিয়ি—এই তিন প্রজন্ম এবং তাঁদের অনুসারীদের আমরা সালাফ বলি। মূলত এই তিন প্রজন্মের ভাষা সম্পর্কিত বক্তব্য দেখতে হবে। ভাষাবিদদের বক্তব্য দেখতে হবে—যারা ভাষাবিদ।

একইভাবে শুধু ভাষার অর্থই যথেষ্ট হবে না। আমাদের শরিয়তের অর্থ দেখতে হবে। কারণ শরিয়তে সেই শব্দ থেকে সামান্য পরিবর্তিত অর্থে গ্রহণ করা হতে পারে।

উদাহরণ — “সালাত” শব্দ: আপনি যদি কুরআনে “সালাত” শব্দের অর্থ বুঝতে চান, আপনি শুধু আভিধানিক অর্থ দিয়ে চলতে পারবেন না। “সালাত” শব্দের আভিধানিক অর্থ কী? আপনি বলেন? দোয়া। “সালাত”-এর আভিধানিক অর্থ দোয়া। কিন্তু আমরা মুসলিমরা যখন নামাজের কথা বলি, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের কথা বলি, আমরা শুধু দোয়ার কথা বলছি না, বরং একটি নির্দিষ্ট ইবাদতের কথা বলছি, যার অর্থ একটু ভিন্ন ভাষায় বোঝা যায়। সেই বিশেষ অর্থটি এলো কোথা থেকে? এই বিশেষ অর্থ পেতে হলে আমাদের কুরআনের অন্যান্য আয়াত, হাদিস দেখতে হবে, এবং আবার আরেকটি জিনিস যা আগে বললাম—ভাষার দিক থেকে সালাফদের বক্তব্য দেখতে হবে।

সুতরাং উভয় জায়গায়—আমাদের সাহাবা, তাবিয়ি, তাবি-তাবিয়িদের বক্তব্য দেখতে হবে। তাই “ফাসাদ” বলতে কী বোঝায় তা বুঝতে আমরা এর আভিধানিক অর্থ দেখব, এবং সেই সাথে দেখব কুরআন ও হাদিসে “ফাসাদ” শব্দটি কীভাবে প্রয়োগ হয়েছে, এবং এ সম্পর্কে সাহাবা ও তাবিয়িদের তিন প্রজন্মের তাফসিরে কী বর্ণিত হয়েছে।

৪.৩ ফাসাদের আভিধানিক অর্থ

প্রথমত, আভিধানিক অর্থ হলো—কোনো কিছুর কাঙ্ক্ষিত বা উপযুক্ত অবস্থার পরিবর্তন হওয়া। সুতরাং ফাসাদ হলো এমন কিছু যা আদর্শ, কাঙ্ক্ষিত, উপযুক্ত, সঠিক—”উপযুক্ত” শব্দটি সবচেয়ে সুন্দর। আমার পছন্দ হলো “উপযুক্ত”, “সঠিক”, “যথাযথ”, অথবা আপনি অনেক কিছু বলতে পারেন—একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা, একটি নিখুঁত অবস্থা, একটি সুবিন্যস্ত অবস্থা। এই অবস্থার যখন পরিবর্তন হয়, তখন তাকে ফাসাদ বলে।

অর্থাৎ, এমন নয় যে কোনো কিছু শুরু থেকেই ক্ষতিকর বা নষ্ট। বরং কোনো কিছু নষ্ট হয়ে যায় বা তার উপকারিতা হারিয়ে ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ, খাবারের ক্ষেত্রে আমরা এটা খুব সহজে বুঝতে পারি। আর বাংলায় আমরা আরেকটি শব্দ ব্যবহার করি—”পচন” (ক্ষয়/নষ্ট হওয়া)। কোনো কিছু নষ্ট হওয়া, পচে যাওয়া—এটাই ফাসাদ। আভিধানিকভাবে। ফলে খাবারটি আমাদের কাছে সুস্বাদু ছিল, সুন্দর ঘ্রাণ ছিল, আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী ছিল—তা নষ্ট হয়ে গেল, তার স্বাদ বিকৃত হলো এবং আমাদের জন্য তা খাওয়া ক্ষতিকর হয়ে গেল।

৪.৪ সালাফদের তাফসিরে ফাসাদ

তাফসিরকারকগণ ফাসাদের ব্যাখ্যায় কুফর ও গুনাহের কথা উল্লেখ করেছেন। দেখা যাক এখানে তাফসিরকারকগণ ফাসাদ বলতে কী বোঝাচ্ছেন।

(ক) আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ ও ইবনে আব্বাস (রা.)

অন্যান্য সাহাবা থেকে এবং আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত যে, তারা যে ফাসাদের কথা বলছেন তা হলো “আল-কুফর ওয়াল-মাসিয়া” (কুফর ও পাপ)। ফাসাদ হলো কুফর, আর “আল-আমাল বিল-মাসিয়া” (পাপ কাজ) —সব কুফর ও পাপই এখানে উদ্দেশ্য।

এক হলো কুফর—অবিশ্বাস, আর আমরা কুফরের প্রকারভেদ দেখেছি। তা অন্তরের কুফর হতে পারে। এমনকি অন্তরে কুফর না থাকলেও, যদি কেউ মুখে ঘোষণা দিয়ে অস্বীকার করে—সে হয়তো অন্তরে বিশ্বাস করে কিন্তু মুখে অস্বীকার করে—অথবা অহংকার করে ইসলাম অনুসরণ না করে অথবা তা নিয়ে ঠাট্টা করে। আমরা কুফরের বিভিন্ন প্রকার দেখেছি। 

তাহলে এই ফাসাদ কি একটি ব্যাপক পরিভাষা? আমরা যখন বাংলায় ফাসাদ বলি, আমরা যা সামাজিক বিশৃঙ্খলা হিসেবে বুঝি তাও অন্তর্ভুক্ত, আর আরও অনেক কিছু অন্তর্ভুক্ত। তো আগে যখন বাংলায় “ফাসাদ” শব্দ শুনতেন, আপনি হয়তো ভাবতেন যে, কেউ যদি ঘরে বসে দরজা বন্ধ করে কোনো অন্যায় করে, পাপ করে, তবে আমরা তাকে ফাসাদ বলি না। যে ব্যক্তি ঘরে বসে কারও কোনো ক্ষতি না করে—সে একা একা কোনো অন্যায় করছে। এখন যদি আমি বলি যে সে ফাসাদ করছে, (আপনি যদি বাংলায় শোনেন) আপনি বলবেন আপনার শব্দচয়ন ঠিক নেই।

এমনকি তার অন্তরে কুফর থাকলেও—সে মুসলিম সমাজে চলাফেরা করে, কারও ক্ষতি করে না, কারও হাতে পড়ে না; যদি আমি বলি সে কাফির, সে ফাসাদ সৃষ্টি করছে, কেউ যদি বাংলায় শোনে সে বলবে – না, এটা ফাসাদ নয়, আমরা এটাকে ফাসাদ বলি না। এর কারণ কী? কারণ সে বাংলা অর্থ সীমিত অর্থে বোঝে। এই কারণে আমাদের যেতে হবে—সালাফের বক্তব্যে ও আরবিতে—কোথায়?

(খ) আবুল আলিয়া (তাবিয়ি)

আবুল আলিয়া, তিনি একজন সিনিয়র তাবিয়ি এবং চমৎকার তাফসিরকারক, যদিও তাঁর থেকে খুব কম তাফসির বর্ণিত হয়েছে। আবুল আলিয়া কী বলেন—”লা তুফসিদু ফিল আরদ” এর অর্থ হলো, সে যমিনে আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হবে না। তারপর তিনি বলেন—”ও কানা ফাসাদুহুম জালিকা মাসিয়াতাল্লাহ”—তাদের ফাসাদ কী ছিল? আল্লাহর অবাধ্যতাই ছিল তাদের ফাসাদ।

কারণ কেউ যদি যমিনে আল্লাহর বিরুদ্ধে কাজ করে, আল্লাহর অবাধ্যতা করে বা মন্দ কাজের নির্দেশ দেয়—সে নিজে করে অথবা মন্দ কাজের নির্দেশ দেয়, মানুষকে মন্দ কাজের দিকে ডাকে, তাদের প্ররোচিত করে, নির্দেশ দেয়, এমন কিছু চালু করে যা মানুষকে পাপে লিপ্ত করে, আল্লাহর অবাধ্যতা করে—সে যমিনে ফাসাদ সৃষ্টি করেছে। তারপর তিনি এমন কিছু বলেন—”লি-আন্না সালাহাল আরদি ওয়াস-সামাই বিত-তাআ” (কারণ যমিন ও আসমানের সুস্থ অবস্থা আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমেই বিদ্যমান থাকে)। এই কথায় একটি ইঙ্গিত আছে যে, মানুষ যে প্রকাশ্য ফাসাদ দেখে তার কারণ হলো গোপন ফাসাদ। এই কথায় একটি ইঙ্গিত আছে।

কারণ আরবরাও যখন “ফাসাদ” শব্দ বলে, প্রথম দৃষ্টিতে তারা কী বোঝে? তারা প্রকাশ্য ফাসাদ বুঝবে, অর্থাৎ প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সামাজিক বিশৃঙ্খলা, খরা, বৃষ্টির অভাব, ফসলের ক্ষতি, মাঠ বিনষ্ট হওয়া, গবাদিপশুর ধ্বংস—এগুলো ফাসাদ হিসেবে বুঝবে। আবুল আলিয়া যেন বলছেন যে ফাসাদ হলো আল্লাহর অবাধ্যতা। কেন? কারণ আল্লাহর অবাধ্যতার কারণেই যমিনে প্রাকৃতিক ফাসাদ নেমে আসে। এজন্যই এটাও ফাসাদ।

(গ) মুজাহিদ (রহ.) — এবং তাঁর তাফসিরের গুরুত্ব

অনেক সহিহ বর্ণনায় বর্ণিত আছে যে, যখন তারা পাপ করে তখন তাদের বলা হয় “লা তুফসিদু”—পাপ করো না—তারা বলে “ইন্নামা নাহনু আলাল হুদা” (আমরা তো হেদায়েতের উপর আছি)। অর্থাৎ মুজাহিদও এই বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন যে এই আয়াতে ফাসাদ বলতে কী বোঝায়? পাপ

৪.৫ গোপন পাপও ফাসাদ কেন 

আপনার দৃষ্টিতে কেউ কারও ক্ষতি না করলেও, তার কুফর ও পাপই ফাসাদ। যেমন আবুল আলিয়া থেকে আমি ইঙ্গিত পেয়েছি। কারণ যখন কেউ গোপনে পাপ করে, তখনও|

আমরা একটু আগে বলেছি ফাসাদের আভিধানিক অর্থ কী? তার সঠিক অবস্থা থেকে পরিবর্তন। তো একজন বান্দার সঠিক বা উপযুক্ত অবস্থা কী ছিল? সে আল্লাহর আনুগত্যে থাকবে। তো যখনই সে পাপ করে, তার অবস্থা এই দিক থেকে নষ্ট হয়। তার কাঙ্ক্ষিত অবস্থা নষ্ট হয়।

দ্বিতীয়ত, পাপ কাজ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণ। ফলে পাপ কাজও এই দিক থেকে ফাসাদ—যেমন আবুল আলিয়া বলেছেন—আনুগত্যের কারণে যমিন ও আসমান নিশ্চয়ই বিদ্যমান থাকে, আর পাপের কারণে দুর্যোগ আসে।

৪.৬ সূরা রূম ৪১ নম্বর আয়াতের সাক্ষ্য

আল্লাহ কুরআনে জানিয়েছেন যে, দুনিয়ার মানুষের কৃতকর্মের কারণে সাগরে দুর্যোগ ছড়িয়ে পড়েছে—যাতে আল্লাহ মানুষকে তাদের মন্দ কাজের কিছু অংশের স্বাদ আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে। আল্লাহ সব পাপের শাস্তি দেন না, বরং আল্লাহ সামান্য পরীক্ষা দিচ্ছেন। মানুষের পাপের ভাণ্ডার অনেক বড়। তিনি তার সামান্য পরীক্ষা দিচ্ছেন, যাতে মানুষ সচেতন হয়। এটা আল্লাহর রহমত। এটা সূরা রূমের ৪১ নম্বর আয়াত – ফাসাদের অর্থ বোঝার জন্য আমাদের এই আয়াতে আসতে হবে।

সূরা আর রূম ৩০:৪১

ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ ﴿٤١﴾

“মানুষের কৃতকর্মের কারণে জলে-স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে, যেন [আল্লাহ মানুষের] অপকর্মের একাংশের স্বাদ তাদেরকে আস্বাদন করাতে পারেন – যাতে তারা ফিরে আসে।”

যদি আমরা এই আয়াতটি ব্যাখ্যা করি, এর সারমর্ম হলো—মানুষের পাপের কারণে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ফাসাদ, জুলুম ও নিপীড়ন স্থলে ও সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়ে। এগুলো রোগব্যাধি ছড়ায়, এবং অন্যান্য বিপদ-আপদ ছড়ায়। মানুষের মন্দ কাজের ফলের কিছু অংশ হিসেবে এগুলো ঘটে, যাতে মানুষ সতর্ক হয় এবং তাদের পাপ ত্যাগ করে আল্লাহর আনুগত্যের পথে ফিরে আসে। তবে এগুলো মানুষের পাপের পূর্ণ শাস্তি নয়, বরং তার একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। যারা সতর্ক হয় না এবং তাদের পাপ ত্যাগ করে না, তারা আখিরাতে তাদের পূর্ণ প্রতিফল ভোগ করবে, যা অত্যন্ত কঠিন।

৪.৭ ফাসাদের ব্যাপক পরিধি :

এ পর্যন্ত আমরা যা বললাম, আরবি “ফাসাদ” শব্দে সকল কুফর ও পাপ অন্তর্ভুক্ত—যেমন:

  • কুফর
  • আল্লাহর অবাধ্যতা
  • নিফাক
  • জুলুম
  • রক্তপাত
  • মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র
  • মানুষকে দ্বীনের পথে আসতে বাধা দেওয়া

৫. “মুসলিহুন” শব্দের বিশ্লেষণ

আর আপনি দেখেছেন কাদের এই ফাসাদ করতে নিষেধ করা হয়েছে। তখন তারা কী বলে? এখন এটা দেখতে হবে। তারা বলে “ইন্নামা নাহনু মুসলিহুন”—আমরা তো সংশোধনকারী। এই অনুবাদ ভালো নয়, কিন্তু আমি এর চেয়ে ভালো অনুবাদ দিতে পারিনি। আমি অনেক খুঁজেছি, হয়তো আপনি আরেকটু ভাবলে দেখবেন এই অনুবাদ ভালো নয়। এটি “মুসলিহুন” শব্দের অর্থ যথাযথভাবে বোঝায় না। আসুন একটু বিশ্লেষণ করি।

“মুসলিহ” শব্দটি “ইসলাহ” থেকে উদ্ভূত। আর সালাফদের থেকে ইসলাহের দুটি অর্থ বর্ণিত হয়েছে।

সালাফ প্রসঙ্গে পুনরায়: আশা করি আপনারা যারা নিয়মিত আমার আলোচনা শোনেন তারা “সালাফ” শব্দটির সাথে পরিচিত। যারা নতুন শুনছেন তাদের জন্য আবার বলছি—সাহাবাদের প্রথম তিন প্রজন্মকে মূলত সালাফ বলা হয়, আর তাঁদের অনুসারীদেরও গৌণ অর্থে সালাফ বলা হয়। কেন? তাঁদের বিশেষত্ব কী? তাঁদের বিশেষত্ব হলো আমাদের দ্বীন তাঁদের থেকে বুঝতে হবে। কুরআন কী বলে, হাদিস কী বলে, তাফসির কী বলে—তাঁরা যা বলেন তা তাঁদের থেকে বুঝতে হবে, আকিদা—কারণ তাঁরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সাক্ষ্য অনুযায়ী শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম। রাসূলুল্লাহ (সা.) এই তিন প্রজন্ম সম্পর্কে বলেছেন যে এই তিন প্রজন্ম শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম। তাই আমাদের দ্বীনের বোঝাপড়া তাঁদের থেকে নিতে হবে।

তাঁদের থেকে “মুসলিহ” শব্দের দুটি অর্থ পাওয়া যায়।

৫.১ প্রথম অর্থ : দুই পক্ষের মধ্যে মীমাংসা করা

এর একটি অর্থ—শব্দটি ইসলাহ, আর ইসলাহ থেকে মুসলিহ। “ইসলাহ” শব্দের একটি অর্থ হলো দুই পক্ষের মধ্যে মীমাংসা করা। এর একটি উদাহরণ হলো সেই তাফসির যা সালাফদের থেকে পাওয়া যায়। তারা বলেন যে, মুনাফিকদের দেখা যেত কাফিরদের—বিশেষত ইহুদিদের—সাথে সম্পর্ক রাখতে। কারণ মদিনা রাষ্ট্রে ইহুদিদের সাথে কিছু চুক্তি ছিল। কিন্তু ইহুদিরা ইসলামের বিরুদ্ধে বৈরী ছিল। কয়েকজন ছাড়া, যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল। যখন মুনাফিকদের জিজ্ঞাসা করা হতো—তোমরা ইহুদিদের প্রতি এত ভালোবাসা রাখো কেন? তারা বলত—আমরা আসলে দুই দলের মধ্যে একটি ঐক্য তৈরির চেষ্টা করছি, মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে ঐক্য। “ইন্নামা নাহনু মুসলিহুন”—এটি একটি অর্থ। যখন তাদের বলা হতো যমিনে ফাসাদ ছড়িয়ো না, অন্যায় করো না, আল্লাহর দ্বীনের পথে বাধা দিয়ো না, কাফিরদের সাথে ষড়যন্ত্র করো না—তারা বলত, না, আমরা কাফিরদের সাথে সুসম্পর্ক রাখছি, আমরা উভয় পক্ষের কল্যাণে তাদের মধ্যে আপস করাচ্ছি—এই অর্থে তারা বলে “ইন্নামা নাহনু মুসলিহুন”—এটি একটি অর্থ।

৫.২ দ্বিতীয় অর্থ : নেককার/সৎকর্মশীল

দ্বিতীয় অর্থ হলো একটু আগে মুজাহিদের তাফসির—আপনি সেখানে দেখেছেন, খেয়াল করেছেন কি যে, যখন তাদের বলা হতো “লা তুফসিদু” তারা বলত আমরা হেদায়েতের উপর আছি? এটি ইসলাহের দ্বিতীয় অর্থ, অর্থাৎ সংশোধনকারী—অর্থাৎ আমরা সৎকর্মশীল, নেককার—”মুত্তিন” অর্থে অথবা মুজাহিদ যেমন বলেছেন “নাহনু আলাল হুদা” অর্থে। এটি দ্বিতীয় অর্থ—অর্থাৎ আমরা ভালো মানুষ, তোমাদের ফাসাদ ব্যবস্থার ভালো মানুষ।

৫.৩ তৃতীয় সম্ভাব্য অর্থ : বিশৃঙ্খলা দূর করা (তাফসির-মূলনীতি)

এই ক্ষেত্রে আমাদের কি সালাফদের বর্ণিত এই দুটি অর্থেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত? কারণ সালাফরা প্রায়ই উদাহরণ দিয়ে একটি শব্দের আংশিক অর্থ ব্যাখ্যা করেন। খেয়াল করুন—এগুলো তাফসির বোঝার গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি—যদি সেই শব্দের আর কোনো অর্থ থাকে এবং সেই অর্থ প্রয়োগ করা কুরআন ও হাদিসের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়, তবে তাও গ্রহণ করা যায়। সুতরাং ইসলাহ মানে—কোনো কিছু তার সঠিক অবস্থায় নেই, তাকে সঠিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনাকেও ইসলাহ বলা যায়। তাই “ইন্নামা নাহনু মুসলিহুন” এই অর্থেও হতে পারে যে—আমরা এই অবাঞ্ছিত অবস্থা বা বিশৃঙ্খলা (ঠিক) করছি। আমরা একটি সমস্যা দূর করছি। যখন তাদের ডেকে বলা হয় “লা তুফসিদু ফিল আরদি” তারা বলে যে আমরা সংস্কার করছি—তারা সমাজের শান্তিস্থাপনকারী।

৫.৪ মুনাফিকদের ছদ্মবেশ : তারা কোন পরিচয়ে আসে

হ্যাঁ, তাহলে আমরা কী পেলাম? তারা কোন পরিচয়ে আসে দেখুন—মুনাফিকদের পরিচয় আল্লাহ স্পষ্ট করেছেন। তারা শান্তিস্থাপনকারী হিসেবে আসে। তারা সমাজকর্মী হিসেবে আসতে পারে—”আমি সমাজের সমস্যা সমাধান করছি, দারিদ্র্য দূর করছি, আমি কে? আমি মুসলিম, আমি নিজে মুসলিম, আমার বাবা-দাদা মুসলিম, আমি মুসলিম সমাজে কাজ করি, আমি দারিদ্র্য দূর করছি। কীভাবে দারিদ্র্য দূর করছ? আমি আমাদের মেয়েদের সুদের ভিত্তিতে গরু দিই, আমি ক্ষমতায়ন করছি, আমাদের নারীরা নিপীড়িত, দুর্বল, আমি তাদের ক্ষমতায়ন করছি, কারও তো ক্ষমতায়ন করা দরকার, আমি তাদের সুদে গরু দিই।” এটা ভালো কাজ, কোনো সমস্যা নেই, ইসলাম করছে। “আমরা পরিবারগুলোকে দরিদ্র থাকতে দেব না। আমি তাদের বোঝাব যে আমাদের ছোট ভাই—ছেলে হোক বা মেয়ে—দুটি সন্তানই যথেষ্ট।” এখন এমন হচ্ছে যে দুটির বেশি (নয়)। একটি হলে ভালো। সন্তান না থাকলে মুসলিমদের জন্য আরও ভালো। হ্যাঁ। মুসলিমদের জনসংখ্যা কম হওয়া উচিত। এটাই মূল উদ্দেশ্য। হ্যাঁ। তারা দেখায়।

এজন্যই আপনি দেখবেন তারা আসলে কাফিরদের পক্ষ থেকে কাজ করছে। তারা তাদের জন্য কাজ করে। কিন্তু তারা মুসলিম হিসেবে কাজ করে। তারা দ্বীনের বিরুদ্ধে নয়। তারা তাদের দ্বীনের বিরুদ্ধে কিছু বলে না। খেয়াল করুন—তারা কুরআনের বর্ণনার সাথে মিলিয়ে চলার চেষ্টা করে। তারা দ্বীনের বিরুদ্ধে বলে না। তারা ইসলামের বিরুদ্ধে বলে না। কিন্তু তারা কি বলে না যে নারী-পুরুষের সম্পত্তি সমান হওয়া উচিত—নাহলে এটা ন্যায়বিচার নয়, সমান নয়? তারপর আরও নতুন নতুন বিষয় আছে যা সে সময় ছিল না।

কারণ আপনি হয়তো ভাবতে পারেন যে এগুলো আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে নিয়ে বলা হচ্ছে—মুনাফিকদের যুগে, মদিনার নেতা—এগুলো আমাদের জন্য তেমন প্রাসঙ্গিক নয়। আপনাকে বর্তমান বিষয়গুলো দেখতে হবে। হ্যাঁ। যদিও আমি এগুলো নিয়ে খুব বেশি কথা বলি না। আমি ব্যক্তিগতভাবে সামাজিক বিষয় নিয়ে খুব বেশি কথা বলি না। কিন্তু দেখুন, আপনি কি ট্রান্সজেন্ডার, সমকামিতার সাথে তুলনা করেন—যা এখন শোনা যায়? এগুলো ব্যক্তিস্বাধীনতা, প্রতিটি ব্যক্তির অধিকার, আমরা এই অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছি। আমরা কোনো দ্বীনের বিরুদ্ধে নই। আমরা ভালো কাজ করছি। আমরা দারিদ্র্য দূর করছি। আমরা সামাজিক অসঙ্গতি দূর করছি। আমরা অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি করছি। তারা এই পরিচয়ে আসে। কিন্তু আল্লাহ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছেন—”ইন্নামা নাহনু মুসলিহুন।”


৬. আল্লাহর জবাব : “আলা ইন্নাহুম হুমুল মুফসিদুন”

তারপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাদের কথার জবাবে বললেন—”আলা ইন্নাহুম হুমুল মুফসিদুন।”

৬.১ “আলা” শব্দের ব্যাখ্যা

প্রথমে আমাদের “আলা” শব্দটি দেখতে হবে। আরবিতে “আলা” শব্দটি হলো “হারফুত তানবিহ ওয়াত-তাকিদ” (সতর্ককরণ ও জোর দেওয়ার অব্যয়)। এটি এমন একটি শব্দ—এটি একটি হরফ (অব্যয়)। আরবিতে “শব্দের অংশ” বলতে বোঝায়—তিন প্রকার: ইসম, ফিল, হরফ (বিশেষ্য, ক্রিয়া, অব্যয়)। ইসম হলো বিশেষ্য-বিশেষণ, ফিল হলো ক্রিয়া, আর বাকিগুলো হলো হরফ—preposition, conjunction—এগুলো হরফ। বাংলায় এগুলো কী? এগুলো অব্যয়।

যাই হোক, এই শব্দটি মনোযোগ আকর্ষণের জন্য বলা হয়, এবং ফলে যে বিষয়ের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করা হচ্ছে তার গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। বাংলায়, আমার মতে, সবচেয়ে কাছাকাছি শব্দ হলো “শোনো।” আপনি অনুবাদে আরও পাবেন—কেউ বলেন “মনোযোগ দাও,” কেউ বলেন “জেনে রাখো।” বাংলায় আমরা কাউকে “জেনে রাখো, মনোযোগ দাও” বলি না। বাংলায় আমরা বলি “শোনো।” “শোনো, ব্যাপারটা এমন,” আবার “শোনো, ব্যাপারটা এমন।” এজন্যই আমি মনে করি এখানে “শোনো”ই সব অনুবাদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো, যদিও এটা আক্ষরিক অনুবাদ নয়। কারণ আমাকে দেখতে হবে আরবিতে “আলা” দিয়ে যেভাবে মনোযোগ আকর্ষণ করা হয়, বাংলায় সেভাবে মনোযোগ আকর্ষণকারী একটি শব্দ দিয়ে (করা)। হ্যাঁ, হুবহু এমন কোনো শব্দ নেই—কারণ “শোনো” একটি ক্রিয়া, আর “আলা” শব্দটি একটি হরফ, ক্রিয়া নয়—যা আমি বললাম। তাই আমি হুবহু শব্দ পাব না, কিন্তু কাছাকাছি। এজন্যই আমি এটি অনুবাদ করতে একটি ক্রিয়া ব্যবহার করার প্রয়োজন অনুভব করি—বাংলায় “শোনো।”

তারপর আল্লাহ বলেন—কেবল এরাই ফাসাদকারী, আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত—”ইন্নাহুম হুমুল মুফসিদুন ওয়া লাকিল লা (ইয়াশউরুন)”—কিন্তু তারা তা উপলব্ধি করে না।

৬.২ চারটি ভাষাগত জোরদানকারী হাতিয়ার

আমি আপনাদের এখানে একটি শব্দ খেয়াল করতে বলব। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা চারটি ভাষাগত হাতিয়ার ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে কেবল তারাই পাপে লিপ্ত অন্যায়কারী।

  1. “আলা” — কারণ আমরা বলেছি “আলা” দিয়ে কী হয়? এটি মনোযোগ আকর্ষণ করে জোর দেয়।
  2. “ইন্না” — ইন্না মানে কোনো কিছুতে জোর দেওয়া। আপনি “তাকিদ” শব্দটি বোঝেন। “তাকিদ” শব্দটি বাংলায় “তাগিদ”—অর্থাৎ জোর দেওয়া।
  3. অতিরিক্ত “হুম” (দমিরুল ফাসল) — বলা হতে পারত “ইন্নাহুমুল মুফসিদুন।” কিন্তু এর সাথে আরেকটি “হুম” যোগ করা হয়েছে। এই “হুম” কে বলা হয় “দমিরুল ফাসল” (দ্যোতক সর্বনাম)। এর কাজ কী? আমরা এটা অন্য সময় ব্যাকরণের আলোচনায় করব। যদি সব একসাথে আলোচনা করি তবে মনে রাখতে পারব না। তবে একটি বিষয়—এর সুবিধা হলো এটি বিষয়টিকে আরও বেশি জোর দেয়।
  4. “আল” (হুমুল মুফসিদুন) — আর শেষে “হুম মুফসিদুন” এর পরিবর্তে “হুমুল মুফসিদুন”—”আল” ব্যবহার করা হয়েছে। এটি নম্বর চার। কারণ “আল” ব্যবহার করলে এর অর্থ কী হয়? এর অর্থ তারাই সকল ফাসাদকারী। মনে হয় যেন সকল ফাসাদকারী কেবল তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে মুনাফিকরা ফাসাদকারী, আর মুনাফিকদের বাইরেও ফাসাদকারী আছে। কিন্তু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা “আল” অব্যয় ব্যবহার করে ফাসাদকে মুনাফিকদের মধ্যে সীমিত করেছেন।

তো অর্থ হলো—শোনো, কেবল এরাই অবাধ্য লোক। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা চারটি নির্দেশক (জোরদানকারী) দিয়ে তাদের ফাসাদ সৃষ্টিকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ফলে আপনি বুঝতে পারছেন ফাসাদ কতটা গুরুতর, কিন্তু তারা তা উপলব্ধি করে না।


৭. “মানুষের মতো ঈমান আনো” — সাহাবাদের ঈমানই মানদণ্ড

যখন তাদের বলা হয়, “মানুষ যেভাবে ঈমান এনেছে সেভাবে তোমরাও ঈমান আনো”—অর্থাৎ সকল মানুষ, অর্থাৎ তোমরা ছাড়া সবাই। অর্থাৎ তাদের মতো প্রকৃতভাবে ঈমান আনো। অন্তর থেকে ঈমান আনো। মুখের ঘোষণার সাথে অন্তর থেকে বিশ্বাস করো এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাজের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করো। তাফসিরকারকগণ একমত যে “মানুষ” বলতে এখানে সবাইকে বোঝানো হয়েছে। তো এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আয়াত যা আপনাকে বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করবে। আমরা যদি কুরআন একটু গভীরভাবে পড়ি, আমরা কুরআনে এমন সব মূলনীতি পাব যা আমাদের বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করবে।

৭.১ “শুধু কুরআন মানি” দাবির খণ্ডন

এই আয়াত প্রমাণ করে যে আল্লাহর দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য ঈমান হলো সাহাবাদের ঈমান। তাই কেউ যদি বলে, “আমি শুধু কুরআনে বিশ্বাস করি, আর কিছুতে বিশ্বাস করি না,” তবে সে স্পষ্টভাবে বিভ্রান্ত—কারণ আপনাকে জানতে হবে সাহাবাদের ঈমান কী ছিল। কারণ আপনি যদি সত্যিই কুরআনে বিশ্বাস করেন, আল্লাহ কুরআনে স্পষ্ট করেছেন যে আপনাকে মানুষ যেভাবে ঈমান এনেছে সেভাবে ঈমান আনতে হবে। আর “মানুষ” বলতে এই আয়াতে সাহাবাদের ছাড়া আর কিছুই বোঝায় না। কারণ সে সময় সাহাবাদের ছাড়া অন্য কোনো মুমিন ছিল না। তো সাহাবারা হলেন ঈমানের কষ্টিপাথর। তাই আল্লাহ সাহাবাদের দ্বীনের বোঝাপড়াকে সংরক্ষণ করবেন—এটি এই আয়াত প্রমাণ করে।

৭.২ সাহাবাদের প্রতি ঘৃণা : নিফাকের আলামত

তারপর আপনি আরেকটি জিনিস দেখুন—কুরআন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে—তারা কী বলে, মুনাফিকরা কী বলে? “আমরা কি সেভাবে ঈমান আনব যেভাবে নির্বোধরা ঈমান এনেছে?” অর্থাৎ তারা সাহাবাদের নির্বোধ বলছে। এটি একটি ভয়ংকর ব্যাপার। তাই যখনই আপনি দেখবেন কেউ সাহাবাদের প্রতি কোনো ধরনের ঘৃণা পোষণ করছে, ঘৃণা ছড়াচ্ছে—আপনার বোঝা উচিত সেখান থেকে নিফাকের গন্ধ আসছে। সাবধান, সাবধান—কারণ এটি নিফাকের একটি আলামত। তারা বলে সাহাবারা নির্বোধ ছিল। সাহাবারা দ্বীন বুঝত না। আমরা সাহাবাদের চেয়ে ভালো বুঝি। আমরা কুরআন ব্যাখ্যা করব। আমরা সাহাবাদের ব্যাখ্যা নেব না। আমরা আমাদের মতো ব্যাখ্যা করব। আমরা নবী মুহাম্মাদের ব্যাখ্যা নেব না। আমরা সাহাবাদের ব্যাখ্যা নেব না। নিফাক।

আল্লাহ বলেছেন—”আলা ইন্নাহুম হুমুস সুফাহা” (একই ভাষায়)—একইভাবে প্রতিটি আয়াত থেকে আকিদার বিষয় উঠে আসছে। ঠিক তাই, আমরা যদি আয়াতের পর আয়াত আকিদা অধ্যয়ন করি, যদি কুরআন যথাযথভাবে অধ্যয়ন করি—আল্লাহ বলেন, “শোনো, কেবল তারাই নির্বোধ, কিন্তু তারা তা জানে না।” এখানে “মানুষ” বলতে নবী মুহাম্মাদ (সা.) এর সাহাবাদের বোঝানো হয়েছে—অর্থাৎ যেমন সাহাবারা আল্লাহ, ফেরেশতা, নবী-রাসূল, কিতাব, পরকাল ইত্যাদি সম্পর্কে প্রাপ্ত সংবাদের সত্যতা মুখে স্বীকার করেছেন এবং অন্তরে এসব বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস রেখে সত্যিকারভাবে ঈমান এনেছেন ও আল্লাহর আদেশ পালন করেছেন। এটাই আয়াতের অর্থ।

৭.৩ “সুফাহা” শব্দের অর্থ

“সুফাহা” শব্দের অর্থ কি “নির্বোধ”? এখানে আরেকটু দেখুন—”সাফিহ” এর বহুবচন “সুফাহা।” “সাফিহ” মানে যাদের বুদ্ধি ঠিক নয়, ভালো-মন্দ সম্পর্কে অজ্ঞ, যারা ভালো-মন্দ বুঝতে পারে না। ইবনুল কাইয়িম বলেছেন যে এটি চরম মূর্খতা। সে জানে না কোনটা ভালো। সে ক্ষতিকর জিনিসকেই বেছে নেয়। এজন্যই কেউ যদি অর্থের ব্যাপারে ব্যয়ে বিবেকহীন হয়—হয়তো তার বয়স ১৮ বা ২০ বছর কিন্তু সে শুধু খারাপ কাজে অর্থ ব্যয় করে, বারবার প্রতারিত হয়ে অর্থ নষ্ট করে এবং হারাম কাজে অর্থ ব্যয় করে অপচয় করে—ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী সে “সাফিহ,” এবং সেক্ষেত্রে শরিয়ত তার উপর বিধিনিষেধ আরোপ করবে যাতে সে তার সম্পদ নষ্ট করতে না পারে। তখন তার বয়স ১৮ বা ২০ হলেও, তার জন্য একজন অভিভাবক নিয়োগ করা হবে। সেই অভিভাবক তার অর্থের দেখাশোনা করবেন। তার অভিভাবক তার জন্য ব্যয় করবেন, তাকে অর্থ দেওয়া হবে না—কারণ সে নির্বোধ।

৭.৪ মুনাফিকরা সাহাবাদের “নির্বোধ” কেন বলল?

তো মুনাফিকরা সাহাবাদের নির্বোধ বলতে কী বোঝাচ্ছে? কারণ সাহাবারা সেই কৌশল বোঝে না যা মুনাফিকরা করছে—যে শুধু “আমি মুসলিম” বলাই যথেষ্ট। মুখে বললেই সব হয় না, মুখে সবকিছু করা যায় না। আমাদের সমাজে আপনি এটা এখন দেখেন না? মুখে মুসলিম বললে সব হয়ে যায়। বিয়ে থেকে শুরু করে সবকিছু:

  • আপনি বিয়ে করতে পারবেন।
  • উত্তরাধিকার পাবেন।
  • মুসলিমরা আপনার জানাজা পড়বে।
  • আপনাকে মুসলিম কবরস্থানে দাফন করা হবে।
  • আপনি মুসলিম পরিচয়ে মুসলিমদের সাথে বসবাস করতে পারবেন।
  • রমজানে আনন্দ করতে ও ইফতার করতে পারবেন।
  • ঈদে উৎসব করতে পারবেন।
  • গান গাইতে পারবেন।

যথেষ্ট যে আপনি মুসলিম। কেউ দেখবে না আপনি নামাজ পড়েন কি না। যারা এটা বোঝে না—সাহাবারা এই সহজ বুদ্ধি বোঝে না। সাহাবারা বোঝেনি। এজন্যই তারা অন্তরে ও ইসলাম বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় নিজেদের মুসলিম দাবি করে কত ত্যাগ স্বীকার করেছে—এটাই তো মূর্খতা, চরম মূর্খতা—এটাই মুনাফিকরা বলে। তারা নির্বোধ ছিল, আমরা আগের মতোই বললাম।


৮. মুনাফিকদের দ্বিমুখিতা ও আল্লাহর ঠাট্টা

মুমিনদের সামনে তারা বলে “আমরা ঈমান এনেছি,” কিন্তু যখন তারা গোপনে তাদের শয়তানদের সাথে মিলিত হয়—তাদের শয়তান বলতে কী বোঝানো হয়েছে? এখানে আমরা দেখব—তারা বলে “ইন্না মাআকুম, আমরা তোমাদের সাথেই আছি, ইন্নামা নাহনু মুসতাহজিউন।” আমরা মুমিনদের সাথে একটু ঠাট্টা করছিলাম, তাদের নিয়ে মজা করছিলাম, তাদের বোঝাচ্ছিলাম যে আমরা মুমিন, কিন্তু আসলে আমরা তোমাদের দলে।

৮.১ “শয়তান” শব্দের অর্থ

আরবিতে প্রতিটি মন্দ, অবাধ্য ব্যক্তিকে “শয়তান” বলা হয়। শয়তান মানুষ, জিন, প্রাণী হতে পারে। আরবিতে শয়তান বলতে শুধু জিন বোঝায় না। এখানে শয়তান বলতে মানব শয়তান বোঝায়—অর্থাৎ মুনাফিকদের সাথী, সঙ্গী ও নেতা। তো যখন তারা তাদের সাথী ও নেতাদের কাছে ফিরে যায় তখন কী বলে? তারা বলে যে আমরা মুমিনদের সাথে একটু ঠাট্টা করছিলাম। মুমিনদের নিয়ে ঠাট্টার পরিণাম কী? “আল্লাহু ইয়াসতাহজিউ বিহিম”—আল্লাহ তাদের নিয়ে ঠাট্টা করেন।

৮.২ “ইয়ামুদ্দুহুম” — দুই অর্থ

পরবর্তী অংশটি একটু বিশ্লেষণ করি। প্রথমত, “ইয়ামুদ্দুহুম” শব্দের অর্থ দেখলে তাফসিরে দুই ধরনের অর্থ পাবেন।

  1. অবকাশ/ঢিল দেওয়া।
  2. কোনো কিছু বৃদ্ধি করা।

আর বৃদ্ধি করার অর্থ ধরলে বলা হয় “ফি তুগইয়ানিহিম” (তাদের অবাধ্যতায়)—”তাগইয়ান” মানে সীমালঙ্ঘন—অর্থাৎ আল্লাহ তাদের সীমালঙ্ঘন বৃদ্ধি করেন। আর যেহেতু “ইয়ামুদ্দু”-এর অর্থ অবকাশ দেওয়া, ইমাম তাবারি বলেন যে তিনি অবকাশ দিয়ে তাদের বৃদ্ধি করেন—অর্থাৎ যারা মুমিনদের নিয়ে ঠাট্টা করে তিনি তাদের নিয়ে ঠাট্টা করেন। মুমিনদের নিয়ে ঠাট্টার শাস্তিস্বরূপ আল্লাহ তাদের নিয়ে ঠাট্টা করেন এবং তাদের অবকাশ দেন। অবকাশ দিয়ে তিনি তাদের সীমালঙ্ঘন বৃদ্ধি করেন।

এটা কীভাবে? কারণ পাপী যখন পাপ করার পর দেখে যে তার কোনো বিপদ নেই, সে আরও উন্নতি করছে, সে রক্ষা পাচ্ছে, তার কৌশল কেউ ধরতে পারছে না—তখন সে আর তওবার কথা ভাবে না। সে ফিরে আসে না। আর তখন কী হয়? সে আরও বেপরোয়া হয়। এটাই অবকাশ দিয়ে তার সীমালঙ্ঘন বৃদ্ধি করা।

অনুবাদে বন্ধনী প্রসঙ্গ: এখানে বন্ধনীতে “কুফর ও অবাধ্যতা” লেখা আছে। অর্থাৎ আমি সীমালঙ্ঘনকে কুফর ও অবাধ্যতা বলেছি, কারণ সালাফরা যখন “তুগইয়ান” শব্দের অর্থ বলেছেন তখন কুফর ও অবাধ্যতা বলেছেন। “তুগইয়ান”-এর মূল আভিধানিক অর্থ হলো সীমালঙ্ঘন। তো সালাফরা যা বুঝিয়েছেন তা হলো—তাদের সীমালঙ্ঘন কোন ধরনের ছিল, কুফর ও অবাধ্যতা। এজন্যই আমি বন্ধনীতে রেখেছি। কারণ পরে আমি “সীমালঙ্ঘন বৃদ্ধি” শব্দটি ব্যবহার করব।

তো আমার অনুবাদ চতুর্থবার পর্যালোচনা করার পর—প্রথম বার্তাটি, আমার মনে হয়, আট বছর আগে (দিয়েছিলাম)। আমি প্রায় আট বছর ধরে এই কাজ করছি। আলহামদুলিল্লাহ। আপনি মোটামুটি আট বছরের কাজের ফল দেখতে পারছেন। জানি না এখানে যা আছে তার কতটা আপনাদের জন্য (উপকারী)। আল্লাহ যেন কবুল করেন। এজন্যই যেহেতু “সীমালঙ্ঘন” শব্দটি আছে, আমি চতুরতার সাথে সাহাবা-পূর্বসূরিদের কথার তাফসির এখানে যুক্ত করেছি।

৮.৩ “ইয়ামাহুন” — দিশেহারা অবস্থা

“ইয়ামুদ্দুহুম ফি তুগইয়ানিহিম ইয়ামাহুন”—”ইয়ামাহুন” মানে তারা বিভ্রান্ত, দিশেহারা, হতভম্ব হয়ে ঘুরে বেড়ায়, যেন তারা একটি গোলকধাঁধায় পড়েছে—অর্থাৎ তারা তাদের বিভ্রান্তি থেকে বেরোতে পারে না, তারা তাদের দ্বিধা থেকে বেরোতে পারে না, তারা বিভ্রান্তিতে ঘুরে বেড়ায়। কারণ এই “ইয়ামুদ্দুহুম” হলো সেই অবস্থা যখন আল্লাহ তাদের বৃদ্ধি করেন। এটা আরবি, আমরা পরে ব্যাকরণ শিখব। বোঝা সহজ করতে বলি—আল্লাহ যখন তাদের সীমালঙ্ঘন বৃদ্ধি করেন তখন তাদের অবস্থা কী? অবস্থা হলো “ইয়ামাহুন।” এই “হুম” (তাদের) হলো সেই অবস্থা—”ইয়ামাহুন।” এজন্যই অনুবাদ এমন—”আল্লাহ তাদের নিয়ে ঠাট্টা করেন এবং তাদের অবকাশ দিয়ে তাদের সীমালঙ্ঘন বৃদ্ধি করেন, আর তারা তাদের কুফর ও অবাধ্যতায় দিশেহারা হয়ে ঘুরে বেড়ায়।” এটাই তাদের প্রতিফল।

৮.৪ আবদুর রহমান আস-সাদির ব্যাখ্যা : আল্লাহর ঠাট্টার স্বরূপ

আবদুর রহমান আস-সাদি, একজন সাম্প্রতিক তাফসিরকারক (আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন), তাঁর তাফসিরে বলেছেন যে এটাই তাদের প্রতিফল, কারণ তারা আল্লাহর বান্দাদের নিয়ে ঠাট্টা করত। আল্লাহ কি তাদের নিয়ে ঠাট্টা করছেন? এর একটি দিক হলো—আল্লাহ তাদের নিকৃষ্ট অবস্থাকে তাদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলেন। নিফাকের যে নিকৃষ্ট অবস্থায় তারা আছে তা তাদের কাছে সুন্দর দেখাতে শুরু করে। ফলে তারা মনে করে যে তারা মুমিনদের সাথেই আছে—অর্থাৎ তারা মুমিনদের সাথে পার পেয়ে যাবে। যেহেতু আল্লাহ মুমিনদের যমিনে তাদের বিরুদ্ধে লড়তে দেননি—কারণ মুমিনরা তাদের কুফর প্রমাণ করতে পারেনি—কারণ তারা মুনাফিক, তারা তা গোপন করেছে।

৮.৫ কিয়ামতের দিন আল্লাহর ঠাট্টা : আলোর দৃষ্টান্ত

আল্লাহর তাদের নিয়ে ঠাট্টার একটি দিক কিয়ামতের দিন হলো—তিনি তাদের মুমিনদের সাথে বাহ্যিক আলো দেবেন, যা আমরা গত আলোচনায় দেখেছি। সিরাতের পথ পার হওয়ার জন্য যখন আলো প্রয়োজন হবে—অনেক আলো লাগবে, সিরাত পার হতে আমাদের আলো প্রয়োজন হবে—আমাদের অনেক নেক আমল করতে হবে। আল্লাহ তখন তাদেরও মুমিনদের সাথে বাহ্যিক আলো দেবেন। তারপর যখন মুমিনরা তাদের নিজেদের আলো নিয়ে এগিয়ে যাবে, মুনাফিকদের আলো নিভে যাবে। ফলে আলো পাওয়ার পর তারা অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে এবং পথ হারাবে। পাওয়ার পর হতাশ হওয়া কত কঠিন! এটাই আবদুর রহমান সাদি ও তাঁর পূর্বসূরিরা ঠাট্টা বলেছেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে ঠাট্টা।

যেমন কুরআনের সূরা হাদিদের ১৩ নম্বর আয়াতে বর্ণিত আছে—যা আপনি গতবার দেখেছেন—মুনাফিক নারী-পুরুষ মুমিনদের বলবে, “একটু অপেক্ষা করো, আমরা তোমাদের আলো থেকে একটু আলো নিই।” তাদের বলা হবে, “পেছনে ফিরে যাও এবং আলো খোঁজো।” তারপর মুনাফিক ও মুমিনদের মধ্যে একটি প্রাচীর তুলে দেওয়া হবে, তাতে একটি দরজা থাকবে।

৮.৬ ইবনে তাইমিয়া : আল্লাহর ঠাট্টা কীভাবে প্রশংসনীয়

আল্লাহর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করলে এই কথাগুলো আমরা কীভাবে বুঝব? ইবনে তাইমিয়া বলেন যে ঠাট্টা বা কৌশল তখনই নিন্দনীয় যখন এমন আচরণ করা হয় যাতে সত্য অস্বীকারের উদ্দেশ্যে বা জুলুমের উদ্দেশ্যে মন্দ লুকানো থাকে, অথচ বাইরে দয়া দেখানো হয়। তো ঠাট্টা বা কৌশল কখন নিন্দনীয়? যখন তা সত্য অস্বীকারের জন্য বা জুলুমের উদ্দেশ্যে করা হয়। যখন মানুষ মন্দ উদ্দেশ্যে ও মন্দ নিয়ত গোপন করে প্রকাশ্যে বিপরীত আচরণ করে, তা নিন্দনীয়। কিন্তু মুনাফিকদের সাথে আল্লাহর ঠাট্টা কি তাদের মন্দ আচরণের প্রতিফল? তাই এটি উত্তম ন্যায়বিচার ও প্রশংসনীয়। অর্থাৎ আল্লাহ ঠাট্টা করেন—এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, এতে আপত্তির কিছু নেই—কারণ আল্লাহ কেবল তাদের নিয়েই ঠাট্টা করেন যারা মুমিনদের সাথে খারাপ আচরণ করেছে, তাদের শাস্তিস্বরূপ। তারা ঠাট্টা করার চেষ্টা করেছে, মুমিনদের নিয়ে ঠাট্টার চেষ্টা করেছে অথবা তা করেছে—তার প্রতিফল হিসেবে। আল্লাহ যখন এটা করেন, এটাই ন্যায়বিচার এবং এটাই প্রশংসনীয়।

যেমন কেউ যখন একজন ভালো মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করে—আমি বোঝার সুবিধার্থে ভালো মানুষের উদাহরণ দিচ্ছি—যখন সেই ব্যক্তি বুদ্ধিমান হয়, সে তার ধোঁকা এড়িয়ে যায়, বরং তাকে উল্টো ফাঁদে ফেলে—তখন আমরা একে কী বলি? এটা ন্যায়বিচার এবং প্রশংসনীয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি প্রযোজ্য। তো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ঠাট্টা করেন, হ্যাঁ—কিন্তু এটা শর্তসাপেক্ষে বলা হচ্ছে, নিঃশর্তভাবে নয়। যারা মুমিনদের নিয়ে ঠাট্টা করে, আল্লাহ তাদের প্রতিফল হিসেবে ঠাট্টা করেন, এবং সেক্ষেত্রে এটাই সর্বোত্তম ন্যায়বিচার—এই প্রশংসনীয় বিশ্বাস আমাদের ধারণ করতে হবে।


৯. মুনাফিকদের ব্যর্থ ব্যবসা

তারাই সেই লোক যারা হেদায়েতের বিনিময়ে বিভ্রান্তি কিনেছে। তারা কী কিনল? তারা ব্যবসা করল। মুনাফিকরা ব্যবসা করল। তারা কী ব্যবসা করল? তারা হেদায়েতের বিনিময়ে বিভ্রান্তি কিনল। তারা আল্লাহহীন (হয়ে) হেদায়েত বিক্রি করে তা (বিভ্রান্তি) কিনল। তাদের ব্যবসা লাভজনক হলো না। কেন তারা কিয়ামতের দিন হেদায়েতপ্রাপ্ত হলো না?


১০. মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্যের সারসংক্ষেপ

মুনাফিকদের যে বৈশিষ্ট্য আমরা পেলাম—এক নম্বর। তারা পাপ ও অপকর্ম করে এবং কাফিরদের সাথে যোগসাজশের দাবি করে। তারপর আপনি মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য বুঝবেন। তারা কীভাবে মন্দ কাজ ও অপকর্ম করে সমাজকে ধ্বংস করে?

  • তারা মুসলিমদের পরিবার ধ্বংস করে।
  • তারা অনেক মানুষকে কাফির বানায়।
  • তারা তাদের দ্বীন থেকে ফিরিয়ে দেয়।
  • তারা তাদের সুদ খাওয়ায় এবং দ্বীনের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করে।

এগুলোকে তারা কী বলে? তারা এসব ভালো কাজের ছদ্মবেশে করে এবং সুন্দর নাম দেয়—এটা সমাজের উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, ইত্যাদি। এভাবে চলতে থাকে, তারা প্রকৃত মুমিনদের নির্বোধ মনে করে। মুনাফিকদের চিনতে পারলে তারা কাফির হয়ে যাবে (তাই তারা সবার সাথে সুসম্পর্ক রাখে)। সবার সাথে সুসম্পর্ক রাখে। তারা প্রকাশ্যে দ্বীনের বিরুদ্ধে বলে না। তারা গোপনে মুমিনদের নিয়ে মজা করে।


১১. ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ (শব্দে শব্দে)

চলুন ব্যাকরণ করি। হ্যাঁ। খুব আকর্ষণীয়। আজকের ব্যাকরণ, ইনশাআল্লাহ, আমরা ১০টার মধ্যে শেষ করব। মসজিদে এশার নামাজ অনেক দেরিতে হয়। আমরা প্রোগ্রাম একটু দেরিতে শুরু করতে বাধ্য হই। আপনাদের কেউ যদি ক্লান্ত হন বা ফজরের নামাজ ধরতে না পারার ভয় থাকে, এখন শুয়ে পড়ুন। পরে শুনবেন। এটা থাকবে ইনশাআল্লাহ।

১১.১ “ওয়া ইজা কিলা লাহুম”

“ওয়া ইজা কিলা লাহুম”—যখন তাদের বলা হয়—চলুন বিশ্লেষণ করি। আমরা জানি “ওয়া” আমরা অনেকবার দেখেছি। “ওয়া” মানে “এবং” ইত্যাদি, আর “ওয়া” সাধারণত আরবিতে বাক্যের শুরুতে ব্যবহৃত হয়। “ইজা” মানে “যখন।” “কিলা” এসেছে “কালা” থেকে passive voice (কর্মবাচ্যে)। “কালা” মানে অতীত—”সে বলল।” “কিলা” মানে “বলা হয়েছিল”—passive voice। active-passive—”বলা হয়েছিল,” কিন্তু এখানে বলা হচ্ছে যে এটি বর্তমান অর্থে এসেছে।

কাল (tense) সম্পর্কে নীতি: একটি জিনিস মনে রাখবেন—আরবিতে কাল (tense) একটি বিষয়। একটি শব্দের গঠন অতীতকালে হলেও অর্থ বর্তমান হতে পারে, অর্থ ভবিষ্যৎ হতে পারে—তা অন্যান্য শব্দ দিয়ে বুঝতে হয়। যখন এটি “ইজা”-এর সাথে আসে—যখন এমন হয়—তখন সাধারণত “ইজা”-এর সাথে অতীতকালে আসে, কিন্তু অর্থ বর্তমান। তখন অনুবাদে বলা উচিত “বলা হয়” (হচ্ছে), “বলা হয়েছিল” নয়।

“লাহুম”: যখন “ইজা” বলা হয়—”লাহুম” মানে “তাদের জন্য।” “লাহুম।” “লাম” শব্দটি অনেক অর্থে আসে। এখানে আমরা বলতে পারি “জন্য।” কিন্তু “তাদের জন্য” বললে বাংলায় বোঝা যায় না। এর অর্থ “তাদের বলা হয়” এই অর্থে। “তাদের বলা হয়” (“বানানা”)—”লাম”-এর সাথে আসে।

হ্যাঁ, আমি তাকে বলেছি। আমি তাকে বললাম—আরবিতে বলতে চাইলে “লাম” দিয়ে বলতে হয়। “আমি মুহাম্মাদকে বললাম”—”কুলতু লি-মুহাম্মাদ”—”কুলতু মুহাম্মাদ” মানে “কুলতু লি-মুহাম্মাদ।” এখানে “লাহুম লিহুম” এভাবে বলা হয়নি, বরং “লি আলি” মানে একই “লাহুম।” অর্থাৎ তাদের বলা হয়।

১১.২ “লা তুফসিদু ফিল আরদ”

যখন তাদের বলা হয়, “লা তুফসিদু ফিল আরদ” (যমিনে ফাসাদ করো না)—অর্থ খুব স্পষ্ট—”লা” মানে নেতিবাচক নিষেধ। “তুফসিদু ফি” মানে “মধ্যে।” “আরদ” মানে “যমিন”—যমিনে ফাসাদ করো না। এখানে অনেক সময় আমরা যখন ব্যাকরণ ও শব্দভাণ্ডার ব্যাখ্যা করি, অনুবাদ একটু অদ্ভুত হবে—”যমিনের মধ্যে একটু ফাসাদ” শব্দের অর্থ ব্যাখ্যা করতে। হ্যাঁ, এখানে বলা হয়েছে “মধ্যে।” কিন্তু চূড়ান্ত অনুবাদে বলা হয় “যমিনে।” শোনাতে সুন্দর—”যমিনে ফাসাদ করো না।” “যমিনে ফাসাদ করো না”—শোনাতে সুন্দর। “যমিনের মধ্যে” শোনাতে সুন্দর নয়। কিন্তু এখন অর্থ ব্যাখ্যা করতে আমি এভাবে লিখেছি।

“তুফসিদু” ও জযম (সালত): আচ্ছা, “তুফসিদু” দেখুন—কী হলো? এটা “আফসাদা” থেকে এসেছে। অতীতকাল, অতীত। তারপর নিষেধ বোঝাতে “সালত” (জযম) পড়বে (হরকত পড়ে যাবে)। বলা হবে না “লা তুফসিদুনা।” বলা হবে “লা তুফসিদু।”

উদাহরণ ১ (নিষেধ নয়, খবর): আমি উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করি। ধরুন একজন শিক্ষক ও কিছু ছাত্র আমার কাছে এসে বলল, “উস্তাদ, আমাদের বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়া হচ্ছে যে আমরা ফাসাদ করছি,” তখন আমি তাদের আশ্বস্ত করলাম যে আমি জানি তোমরা ফাসাদ করছ না। এই বাক্যটি কী হলো, যখন আমি বললাম “তোমরা ফাসাদ করছ না”—আমি কি তাদের নিষেধ করলাম যে তোমরা ফাসাদ করো না, নাকি নিষেধ করিনি? আমি তাদের জানালাম যে তোমরা ফাসাদ করছ না—”আন্নাকুম লা তুফসিদুন।” তখন আমি “তুফসিদুন” বলব “সালত” (নুন) সহ—”আমি জানি আন্নাকুম লা তুফসিদুন,” আমি জানি যে তোমরা ফাসাদ করছ না, আমি জানি যে এটা অপবাদ। তো এখানে “নুন” সহ আসবে।

উদাহরণ ২ (নিষেধ): আর আরেকটি উদাহরণ দেখুন—আমি তাদের ডেকে নিষেধ করছি—”হে আল্লাহর বান্দারা, ছাত্ররা ফাসাদ করছে, তোমরা ফাসাদ করো না”—কিন্তু তোমরা ফাসাদ করছ—আমি কী বলব? আমি “সালত” (নুন) ছাড়া বলব। এখানে যা হচ্ছে তা হলো মুনাফিকদের বলা হচ্ছে “লা তুফসিদু ফিল (আরদ)” এবং নিষেধ করা হচ্ছে। তো এখানে কী হলো? “সালত” পড়ে গেল (নুন উঠে গেল)। হ্যাঁ, আশা করি বুঝতে পারছেন।

১১.৩ “কালু ইন্নামা নাহনু মুসলিহুন”

তারপর তারা বলে, “কালু ইন্নামা নাহনু মুসলিহুন”—আমরা তো কেবল সংশোধনকারী। “কালু” এসেছে “কালা” থেকে। “কালা”-এর সাথে “ওয়াও” যোগ করলে—”কালা” হলো অতীতকাল—”বলেছিল।” “মাজি” মানে “সে বলল।” যখন “ওয়াও” যুক্ত হয়, বহুবচন হয়—”তারা বলল।” “কালু”—এখানে এই আলিফ আসে, এটা লেখার নিয়ম, আলিফ ভুলে যান, কিন্তু মূল কথা হলো “কাল” “ওয়াও”-এর সাথে যুক্ত হয়ে “কালু।” অর্থাৎ “তারা বলল।” এখানে “তারা বলে” অর্থে আসে—কেন “বলে” অর্থে? কারণ একটু আগে দেখলাম যে এটি “ইজা”-এর সাথে অতীতকালে এসেছে; “ইজা” সহ বাক্যে আরবিতে আসলে বর্তমান অর্থ। এজন্যই অর্থ “কালু”—যখন তাদের বলা হয় “ফাসাদ করো না” তারা বলে “ইন্নামা”—”ইন্না” মানে “কেবল”—আমরা কেবল—”নাহনু” আমরা কেবল—”মুসলিহ” আমরা কেবল সংশোধনকারী, সংশোধন ছাড়া আর কিছু নই, সংশোধন ছাড়া আমরা কিছু করি না, আমরা অবাধ্যতায় লিপ্ত হই না।

এখন আমি “ফাসাদ” শব্দটি সরিয়ে দিয়েছি। আপনাদের বোঝার জন্য শুরুতে রেখেছিলাম। কেন অনুবাদে “ফাসাদ” দিই না—এটা আমি ব্যাখ্যা করেছি। তারা বলে, “আমরা তো কেবল সংশোধনকারী।”

১১.৪ “আলা ইন্নাহুম হুমুল মুফসিদুন”

“আলা ইন্নাহুম হুমুল মুফসিদুন”—শোনো, নিশ্চয়ই তারা—”ইন্নাহু, ইন্না” মানে “নিশ্চয়ই,” “হুম” মানে “তারা”—নিশ্চয়ই তারাই “তারা”—আবার তারাই “আল-মুফসিদুন,” ফাসাদকারী। “মুফসিদুন” এখানে কীভাবে আসে? একটু আগে দেখলাম “আসলাহা” থেকে “মুসলিহ” কীভাবে আসে—সংস্কারকারী। একইভাবে “আফসাদা” মানে “সে ফাসাদ ঘটাল।” “মুফসিদ” মানে “যে ফাসাদ ঘটায়।” বহুবচন “আল” সহ “মুফসিদুন,” আর “নুন।” আমি ব্যাখ্যা করেছি যে এটা যেন আল্লাহ এই সম্প্রদায়ের সকল ফাসাদকারীকে সেভাবে বানিয়েছেন। তো কেবল তারাই ফাসাদ করে আর অন্য কেউ করে না—এটা এক ধরনের অতিশয়োক্তি (মুবালাগা)। অর্থাৎ অতিরিক্ত জোর দেওয়া হচ্ছে। শোনো, নিশ্চয়ই তারাই ফাসাদকারী।

১১.৫ “লা ইয়াশউরুন”

কিন্তু “লা ইয়াশউরুন”—তারা বোঝে না। এখানে দেখুন—তারা বোঝে না। একটি বার্তা দেওয়া হচ্ছে। এটা “বোঝো না” এমন নিষেধ নয়—বরং “তারা বোঝে না” বলা হচ্ছে। এজন্য এই “সালত” (এখানে ভিন্ন)—”শাআরা” মানে সে বুঝল, “ইয়াশউরু” মানে সে বোঝে, আর “ওয়াও” যোগ করে “তারা বোঝে”; “লা ইয়াশউরু” মানে “তারা বোঝে না।” এখন আমি স্পষ্ট করতে বলছি যে তারা বোঝে না—শোনো, কেবল তারাই আল্লাহর (অবাধ্যতার) অবস্থায় লিপ্ত, যদিও তারা তা বোঝে না। এর আরেকটি অনুবাদ আমরা কেন লিখলাম না? কারণ আমরা এটা আগে একবার পেয়ে গেছি। “লাহু” মানে আমরা বুঝেছি।

১১.৬ “আমিনু কামা আমানান নাসু” ও “মা মাসদারিয়া”

যখন তাদের বলা হয় “আমিনু” মানে “তোমরা ঈমান আনো”—কীভাবে? এটা এসেছে “আমানু” থেকে—”সে ঈমান আনল।” আরবিতে আদেশ দিতে চাইলে বলা হয় “আমিন”—”তুমি ঈমান আনো।” কিন্তু এটা সরাসরি দেওয়া হয় যাকে বলা হচ্ছে তাকে, দ্বিতীয় পুরুষ—”আমিন” তুমি ঈমান আনো। এর সাথে “ওয়াও” যোগ করলে হয়ে যায়—তোমরা ঈমান আনো—”আমিনু।” তারপর “আমিনু” মানে তোমরা ঈমান আনো। “কামা আমানান নাসু” মানে একইভাবে—”কাফ” (কামা) সহ। “আমানান নাসু”—”নাস” মানে মানুষ, “আমানা” মানে দেখলাম “সে ঈমান আনল।” অর্থাৎ মানুষ ঈমান এনেছে। মানুষ ঈমান এনেছে। যেভাবে সে (মানুষ) ঈমান এনেছে সেভাবে ঈমান আনো—এই অর্থ হতে পারে।

“মা” কেন অনুবাদে নেই: এখানে “মা” কী, আর “মা” এখানে অনুবাদে নেই—কেন? এখন আমি ব্যাখ্যা করছি। আসলে “কাফির” (কাফ) এর সাথে একটি ইসম (বিশেষ্য) আসে—”আমানা” কিন্তু একটি ক্রিয়া। “কাফ” সরাসরি ক্রিয়া নিতে পারে না। এটা যদি আমরা কুরআনের বাইরে সাধারণভাবে বলতাম, তবে সাধারণত বলা হতো “আমিনু কা-ইমানিন নাস।” “ইমান” মানে ঈমান। “নাস” মানে মানুষের ঈমানের মতো। মানুষের ঈমানের মতো ঈমান আনো। এভাবে বলা হতো। কিন্তু এখানে যখন “ইমান” শব্দ ব্যবহার হয়—এটা কী ধরনের শব্দ, এই “ইমান”? একে “মাসদার” (ক্রিয়ামূল/ভাববাচক বিশেষ্য) বলা হয়। অর্থাৎ “আমানা” যে কাজ তার নাম হলো “ইমান” (ঈমান)। বলা উচিত ছিল এভাবে “আমিনু কা-ইমানিন নাস”—মাসদার সহ। কিন্তু যখন মাসদার নেই এবং তার পরিবর্তে একটি ক্রিয়া বা ফিল থাকে, তখন “কাফ” সরাসরি তা মাসদার হিসেবে নিতে পারে না। এই “মা” আসে তাকে মাসদারে রূপান্তরিত করতে। এজন্য এই “মা”-কে বলা হয় “মা মাসদারিয়া” (মিম আলিফ)।

আপনি যদি “কাফ” দেখেন, তবে এখানে সরাসরি “আমানান নাস” আছে—এখানে একটি ক্রিয়া, আপনি তা (সরাসরি) ধরতে পারবেন না, আপনাকে মাসদারের অর্থে নিতে হবে, মাসদারের অর্থে রূপান্তর করতে হবে—এই অর্থে রূপান্তর করতে, “মানুষের ঈমানের মতো,” এই “মা” আসে (মিম আলিফ, “মা”)। এই “মা” অনেক অর্থে আসে, যার মধ্যে এটি একটি—একে বলা হয় “মা মাসদারিয়া।” এখানে লেখা নেই, কিন্তু আপনি একটু নোট নিন বা মনে রাখুন—”মাসদারিয়া মা।” “মা” অনেক প্রকার—একটি হলো নেতিবাচক “মা” (মা নাফিয়া), একটু পরে আমরা দেখব নেতিবাচক “মা” আসবে। তো এটি মাসদারিয়া। অর্থাৎ এর পরে যে ক্রিয়া আসে তাকে মাসদারের অর্থ দেয়। অর্থাৎ “মানুষের ঈমানের মতো ঈমান আনো”—এই অর্থ। এজন্য “মা” অনুবাদে রাখা যায় না।

১১.৭ “আনুমিনু কামা আমানাস সুফাহা”

“কালু” তারা বলে “আনুমিনু”—আমরা কি ঈমান আনব? আমরা কি ঈমান আনব? “আনুমিনু কামা আমানাস সুফাহা”—নির্বোধদের ঈমানের মতো, নির্বোধদের ঈমানের মতো আমরা কি ঈমান আনব? হ্যাঁ। “কামা আমানা” বুঝেছি—আর আমি এখানে ভাঙিনি—একটু আগে “কামা আমানা” মানে কী দেখেছি, তাই বুঝেছি অর্থ। তারা বলে—আমরা কি ঈমান আনব? নির্বোধদের ঈমানের মতো আমরা কি ঈমান আনব? এখানে “আমানা” থেকে—সে ঈমান আনল, “ইউমিনু” সে ঈমান আনে, “নুমিনু” আমরা ঈমান আনি—”না” (নুন) মানে “নাহনু” (আমরা)—”নাহনু” মানে “আমরা,” “নুমিনু” আমরা ঈমান আনি, “আনুমিনু”—”আন” বা “আম্বো”—হ্যাঁ, আরবিতে আমরা একই শব্দ একসাথে বর্তমান-ভবিষ্যতে (বললাম)—”আমরা কি ঈমান আনব?” এই “হামজা” হলো “হামজাতুল ইসতিফহাম” (প্রশ্নবোধক হামজা)—আমরা কি ঈমান আনছি/আনব? “আনুমিনু কামা আমানাস সুফাহা”—যেমন নির্বোধরা ঈমান এনেছে—আমরা কি নির্বোধদের ঈমানের মতো ঈমান আনব? “সুফাহা”—”সাফিহ” এর বহুবচন—যার মানে নির্বোধ, আমরা ব্যাখ্যা করেছি।

১১.৮ “আলা ইন্নাহুম হুমুস সুফাহা ওয়া লাকিল লা ইয়ালামুন”

“আলা ইন্নাহুম হুমুস সুফাহা”—এর অর্থ স্পষ্ট, আমরা আগে দেখেছি। “ওয়া লাকিল লা ইয়ালামুন”—কিন্তু তারা জানে না। “আলিম, ইয়ালামুন”—”ইয়ালামুন” থেকে—”আলিমা” মানে সে জানল, “ইয়ালামু” মানে সে জানে, “ইয়ালামুন” মানে তারা—আসলে “তারা” অর্থ হলো। আচ্ছা, এই হলো পুরোটির অনুবাদ।

১১.৯ “ওয়া ইজা লাকুল লাজিনা আমানু কালু আমান্না”

তারপর, “ওয়া ইজা লাকু”—যখন “লাকিয়া” “ওয়াও”-এর সাথে মিলিত হয়—মানে “তারা মিলিত হলো।” এখানে “ইজা”-এর কারণে অর্থ হবে “মিলিত হয়।” যখন মিলিত হয়—”আল্লাজিনা”—বলছে যে একদল লোক, তাদের পরিচয় পরবর্তী অংশে পাওয়া যায়—”আল্লাজিনা” যারা—”আমানু” যারা ঈমান এনেছে। “আল্লাজিনা আমানু” মানে যারা ঈমান এনেছে। যখন তারা ঈমানদারদের সাথে মিলিত হয়—”কালু”—তখন তারা বলে “আমান্না”—আমরাও ঈমান এনেছি। “আমানা”—”ওয়াও” যোগ হয়ে “আমানু”—এটা আমরা আগে দেখেছি, তাই না? “আমানা” মানে সে ঈমান আনল, “ওয়াও” মানে তারা ঈমান আনল—এখানে অর্থ “আল্লাজিনা আমানু” মানে যারা ঈমান এনেছে। যখন তারা ঈমানদারদের সাথে মিলিত হয় তখন বলে “কালু”—আমরা দেখেছি তারা কী বলে—”কালা” “ওয়াও” যোগ হয়ে “কালু”—এটা আমরা আগে দেখেছি। “আমান্না”—”আমানা” সে ঈমান এনেছে; যদি যুক্ত না হয়, “আমান্না” আমরা ঈমান এনেছি। যদি “আমানা” শব্দের সাথে যুক্ত না হয় তবে মানে “আমরা ঈমান এনেছি।” তারপর যখন তারা ঈমানদারদের সাথে মিলিত হয় তখন বলে “আমরা ঈমান এনেছি।”

১১.১০ “ওয়া ইজা খালাউ ইলা শায়াতিনিহিম” — তাদমিন

আর “ওয়া ইজা খালাউ ইলা শায়াতিনিহিম”—আর যখন তারা তাদের শয়তানদের সাথে গোপনে মিলিত হয়—”শায়াতিন” হলো “শয়তান” এর বহুবচন—তাদের শয়তান, অর্থাৎ তাদের সাথী ও নেতাদের তাদের শয়তান বলা হয়, কারণ তারা শয়তান, তারা মন্দ। তারপর তারা কী বলে? আচ্ছা, প্রথমে একটা জিনিস দেখুন যা এখানে অনুবাদ করা হয়নি। আমি ব্যাখ্যা করব কেন। তার আগে আমরা “শয়তান” দেখি। “শয়তান” থেকে “শায়াতিন” বহুবচন—”হুম” বা “হিম” সবসময় মানে “তাদের” বা “তাদের শায়াতিন।” “তাদের শয়তানদের সাথে”—”খালা” মানে গোপনে/নির্জনে মিলিত হওয়া। বহুবচন হলে মানে “তারা গোপনে মিলিত হয়।”

অব্যয়ের পরিবর্তন — কেন “বা” এর বদলে “ইলা”: “খালা” সাধারণত “বা” (بـ) এর সাথে আসে। তো বলা উচিত ছিল “খালাউ বি-শায়াতিনিহিম।” কিন্তু যখন এটি “ইলা” (إلى) এর সাথে আসে—এটি আরবিতে একটি চমৎকার বিষয়। দেখুন, “খালা” এর “বি-শায়াতিনিহিম” হওয়া উচিত ছিল, তাই না? স্বাভাবিক নিয়ম—কারণ তারা গোপনে শয়তানদের সাথে মিলিত হয়। কিন্তু যে অব্যয় (হরফে জর) আসার কথা ছিল, তার পরিবর্তে অন্য একটি অব্যয় আসে—যা নির্দেশ করে যে এখানে আরেকটি ক্রিয়া (উহ্য) আছে। আপনাকে বুঝতে হবে এখানে আরেকটি ক্রিয়া আছে। সেটা কী? যে ক্রিয়াটি “ইলা” শব্দের সাথে যায়—”ইনসারাফু” (তারা ফিরে গেল/সরে গেল)।

তো এই কারণে কুরআন কয়েকটি শব্দে ব্যাপক অর্থ প্রকাশ করে। অর্থ হয়ে গেছে “ইনসারাফু ইলা শায়াতিনিহিম”—অর্থাৎ গোপনে মিলিত হওয়াও আছে, কিন্তু (এর সাথে সরে যাওয়াও আছে)। যে “বা” এর সাথে আসার কথা ছিল—”বা”—তা এখানে “ইলা”-তে পরিবর্তন করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যে ক্রিয়ার সাথে “ইলা” অব্যয় বসে—সেই ক্রিয়া কী? “ইনসারাফু” মানে সরে যাওয়া। অর্থাৎ যখন তারা মুমিনদের থেকে মুখ ফিরিয়ে তাদের শয়তানদের সাথে গোপনে মিলিত হয়—তখন “ওয়া খালা বিহিম” (তাদের সাথে নির্জনে মিলিত হওয়া) অর্থও থাকবে, কারণ এই (“খালা”) অর্থটি স্পষ্ট, আর “ইনসারাফ” (সরে যাওয়া) এর অর্থও এখানে অন্তর্ভুক্ত—কেবল “ইলা” অব্যয়ের কারণে।

“তাদমিন” নিয়মের সংজ্ঞা: এই নিয়মের নাম “তাদমিন” (تضمين)—অর্থাৎ এক ক্রিয়া আরেক ক্রিয়ার অর্থ ধারণ করে। “খালা” ক্রিয়াটি এই “ইলা” অব্যয়ের মাধ্যমে “ইনসারাফ”-এর অর্থও ধারণ করে এবং একটি ব্যাপক অর্থ দেয়। অর্থাৎ এখন পূর্ণ অর্থ কী হবে? পূর্ণ অর্থ হবে—যখন তারা তাদের শয়তানদের দিকে ফিরে যায় ও তাদের সাথে গোপনে মিলিত হয়। তো যথাযথভাবে অনুবাদ করলে এভাবে অনুবাদ করা উচিত—”আর যখন তারা তাদের শয়তানদের দিকে ফিরে যায় এবং (সরে গিয়ে) নির্জনে তাদের সাথে মিলিত হয়।” “ইলা” অব্যয় নির্দেশ করে যে এখানে আরেকটি ক্রিয়া—”ইনসারাফ” (সরে যাওয়া)—আছে, যা এখানে স্পষ্ট নয়, কিন্তু অর্থে আসবে। আর তাদের সাথে নির্জনে মিলিত হওয়া—কারণ “খালা”ও এখানে আছে।

এই দুটি একসাথে “খালা বিহিম” অর্থ দেয়—তাদের সাথে যুক্ত হওয়া—কারণ “খালা” এর সাথে “বা” আসে বা (এখানে ভিন্নভাবে) আসে, যেমন আমি আগে বলেছি, এবং তাদের সাথে বিশেষভাবে যুক্ত হয়।

১১.১১ “ইন্না মাআকুম ইন্নামা নাহনু মুসতাহজিউন”

তখন যখন তারা বিশেষভাবে যুক্ত হয়, তারা শয়তানের দিকে সরে যায় এবং তাদের সাথে বিশেষভাবে যুক্ত হয়—তখন বলে “ইন্না মাআকুম”—”ইন্না” মানে নিশ্চয়ই আমরা—”মাআকুম” তোমাদের সাথে—”মা” মানে “সাথে,” “কুম” মানে “তোমাদের,” “মাআকুম” তোমাদের সাথে—”ইন্নামা (নাহনু) মুসতাহজিউন”—”ইন্না” আমরা আগে দেখেছি—আমরা কেবল “মুসতাহজিউন,” ঠাট্টাকারী—”মুসতাহজি” একবচন, “উন” যোগ হয়ে “মুসতাহজিউন” মানে বহুবচন—আমরা ঠাট্টা করছি। “ইন্না মাআকুম” আমরা তোমাদের সাথে, আমরা কেবল ঠাট্টা করছি।

১১.১২ “আল্লাহু ইয়াসতাহজিউ বিহিম”

“আল্লাহু ইয়াসতাহজিউ বিহিম”—”আল্লাহু ইয়াসতাহজি” মানে ঠাট্টা করা—”বিহিম” “ইয়াসতাহজি”-এর সাথে যুক্ত—তাদের নিয়ে। “বি” একটি অব্যয়। যেমন বলা হয় “interested in,” বলা হয় “prefer to.” আরবিতে যেমন “ইয়াসতাহজিউ বিহিম।” অনুবাদ করার সময় আমরা বলতে পারি “নিয়ে/দিয়ে।” আল্লাহ তাদের নিয়ে ঠাট্টা করেন। এটা “আল্লাহু ইয়াসতাহজিহুম” বলে না। আরবিতে কী বলে? “ইয়াসতাহজি বিহিম” তাদের নিয়ে ঠাট্টা করেন। “ইসতাহজা” থেকে “ইয়াসতাহজি”—অতীত “সে ঠাট্টা করল,” “ইয়াসতাহজি” সে ঠাট্টা করে।

১১.১৩ “ওয়া ইয়ামুদ্দুহুম ফি তুগইয়ানিহিম ইয়ামাহুন”

“ওয়া ইয়ামুদ্দুহুম”—”ইয়ামুদ্দু” মানে আমরা ব্যাখ্যা করেছি—তাদের অবকাশ দেওয়া—”ফি তুগইয়ানিহিম” তাদের সীমালঙ্ঘনের মধ্যে—”ইয়ামাহুন” তারা বিভ্রান্তিতে ঘুরে বেড়ায়। “মাদ্দা, ইয়ামুদ্দু”—এই শব্দ “মাদ্দা” থেকে—অতীত “মাদ্দা” সে অবকাশ দিল, “ইয়ামুদ্দু” সে অবকাশ দেয়—বর্তমান-ভবিষ্যৎ। “আমাহা, ইয়ামাহু” মানে পথ হারানো—”আমাহা” মানে সে বিভ্রান্তিতে ঘুরে বেড়াল, “ইয়ামাহু” সে বিভ্রান্তিতে ঘুরে বেড়ায়, “ইয়ামাহুন” তারা ঘুরে বেড়ায় বা পথ হারায়।

১১.১৪ “উলাইকাল লাজিনাশ তারাউদ দালালাতা বিল হুদা”

“উলাইকা” তারা—”উলাইকা” মানে “তারা”—”আল্লাজিনা” তারা যারা—তারা কী করল—”ইশতারাউ”—”ইশতারা” মানে সে কিনল, “ওয়াও” যোগ হলে “তারা”—আমরা জানি “ইশতারাউ” তারা কিনল—কী? “আদ-দালালা” মানে বিভ্রান্তি—”বিল হুদা”—”হুদা” মানে হেদায়েত—হেদায়েতের বিনিময়ে। কেন “ইশতারা”-তেও “ওয়াও”-এর উপর (পেশ/হরকত) বসানো হয়েছে—কারণ তা “দাদ” থেকে নিতে হবে, কারণ এখানে “আল” আছে; যদি “আল” না পড়ে সরাসরি “দাদ” নেন, তবে সমস্যা হবে যদি “ওয়াও”-তে সুকুন থাকে। এজন্য পেশ দিয়ে পড়ার নিয়ম পরিবর্তন করা হয়েছে এবং একে “ইলতিকা” (দুই সাকিনের সম্মিলন) বলা হয়। নাহলে শব্দটি ছিল “ইশতারা।” তো এই পেশ কেবল পড়ার জন্য আসছে। “বিল হুদা” মানে হেদায়েতের বিনিময়ে।

১১.১৫ “ফামা রাবিহাত তিজারাতুহুম” — মা নাফিয়া

“ফামা রাবিহাত”—”ফা” এখানে “কিন্তু/তারপর” অর্থে নিন। “মা” এখানে বুঝবেন না (আগেরটার মতো নয়), (এখানে) “মা” “লা” অর্থে—”মা রাবিহাত” লাভজনক হলো না। “রাবিহা” মানে লাভবান হওয়া। যখন “রাবিহা” স্ত্রীবাচক হয়, হয় “রাবিহাত।” কেন স্ত্রীবাচক? কারণ এখানে এর কর্তা “তিজারা” (ব্যবসা)। বলা হচ্ছে যে ব্যবসা লাভজনক হলো না। এজন্য যেহেতু “তিজারা” (ব্যবসা) শব্দের শেষে গোল “তা” (তা মারবুতা) আছে—দেখুন এই “তিজারা”—এটা “হুম”-এর সাথে যুক্ত হয়েছে (তিজারাতুহুম)—যাই হোক তা আছে। এজন্য এটি স্ত্রীবাচক শব্দ। এজন্য “রাবিহাত।” হ্যাঁ, “রাবিহাত” মানে লাভবান হওয়া। “মা রাবিহাত” মানে লাভজনক হলো না। “রাবিহাত” মানে লাভজনক, “মা রাবিহাত” মানে (লাভজনক হয়নি)। তো এই “মা” সেই “মা মাসদারিয়া” নয় যা একটু আগে দেখেছি—এটি নেতিবাচক “মা” (মা নাফিয়া)—”লা” অর্থে। “মা রাবিহাত তিজারা”—তাদের ব্যবসা লাভজনক হলো না।

১১.১৬ “ওয়ামা কানু মুহতাদিন”

“ওয়ামা”ও তেমন স্পষ্ট নয়—”ওয়ামা কানু মুহতাদিন।” “কানু”—”কানা” মানে “সে ছিল।” “ওয়াও” যোগ করে “তারা”—”মা কানু” মানে “তারা ছিল না।” “কানু” মানে তারা ছিল, “মা কানু” মানে তারা ছিল না। “মুহতাদিন” মানে তারা হেদায়েতপ্রাপ্ত ছিল না—”মুহতাদিন” মানে হেদায়েতপ্রাপ্ত। “ইহতাদা” মানে সে হেদায়েতপ্রাপ্ত হলো। যে হেদায়েতপ্রাপ্ত তাকে “মুহতাদ” বলা হয়। এর সাথে “ওয়াও/ইন” যোগ করলে বহুবচন হয়—যেমন “ইন” যোগ করলে বহুবচন হয়। কেন বহুবচন করতে “ইন” যোগ করতে হলো—এটা একটি অবস্থার কারণে, তা আমরা পরে জানব। তো অর্থের দিক থেকে “মুহতাদুন” ও “মুহতাদিন” একই। মানে যারা হেদায়েতপ্রাপ্ত, অর্থাৎ তারা হেদায়েতপ্রাপ্ত ছিল না।

সহজ বাংলায়—তারা সঠিক পথে ছিল না। অর্থাৎ তারা যে ব্যবসা করল, তারা হেদায়েত বিক্রি করে হেদায়েতের বিনিময়ে বিভ্রান্তি কিনল। এই লেনদেনে তারা সঠিক পথে ছিল না। ফলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হলো।


সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, আশহাদু আল্লা (ইলাহা ইল্লা আন্তা…)।

……………………………………………………………….

SideNotes :

মুজাহিদ (রহ.) — এবং তাঁর তাফসিরের গুরুত্ব

মুজাহিদ একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাফসিরকারক। আপনি কুরআন বুঝতে চান—আপনাকে মুজাহিদের কাছে যেতে হবে, মুজাহিদের তাফসিরে যেতে হবে। মুজাহিদের তাফসিরের একটি বিশেষত্ব আছে। দেখুন, মুজাহিদ হলেন ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর ছাত্র। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে অনেক তাফসির বর্ণিত হয়েছে। ধরুন, ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে ১০,০০০ বর্ণনা আছে—আমি সঠিক সংখ্যা বলছি না, তবে কাছাকাছি। মুজাহিদ ইবনে আব্বাসের ছাত্র। মুজাহিদ থেকে হয়তো ৫,০০০ বর্ণনা বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু কখনো কখনো মুজাহিদের বর্ণনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কেন?

কারণ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে ১০,০০০ বর্ণনার মধ্যে অনেক দুর্বল বর্ণনা আছে। দুর্বল বর্ণনা। অন্যদিকে, এখানে মুজাহিদ থেকে একটি বর্ণনা আছে ইবনে জুরাইজের সনদে। আরেকটি পাওয়া যায় ইবনে আবি নাজিহের সনদে—এই দুটি। এই দুটি সনদে বর্ণিত অধিকাংশ বর্ণনাই সহিহ বর্ণনা। তো ইবনে আব্বাস থেকে দুর্বল সনদের সিলসিলায় যা বর্ণিত হয়েছে তা কি সঠিক? আপনি যদি নিশ্চিত হতে চান, আপনার মুজাহিদের তাফসির দেখা উচিত। কেন? কারণ মুজাহিদ ইবনে আব্বাস (রা.) এর সরাসরি ছাত্র। আর একথা বলা অত্যুক্তি হবে না যে, তাফসিরের ক্ষেত্রে মুজাহিদ (রহ.) হলেন ইবনে আব্বাস (রা.) এর শ্রেষ্ঠ ছাত্র। কারণ তিনি দীর্ঘ সময় ধরে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে সম্পূর্ণ কুরআনের তাফসির শিখেছেন। তিনি তাঁকে বারবার জিজ্ঞাসা করেছেন। তিনি তাঁর কাছে বারবার কুরআন পড়েছেন এবং বারবার তাঁর কাছ থেকে শিখেছেন। আর তিনি কুরআন তিলাওয়াতের একজন আলিমও ছিলেন—যা আমাদের বিষয়—এবং তাফসিরের একজন আলিম। এজন্য তিনি এখানে যা বলছেন তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।