সূরা আল-বাক়ারাহ, আয়াত ৩ — হিদায়াতপ্রাপ্তদের তিনটি গুণ

ٱلَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِٱلْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ ٱلصَّلَوٰةَ وَمِمَّا رَزَقْنَٰهُمْ يُنفِقُونَ

আল্লাযীনা ইউ’মিনূনা বিল-গ়ায়বি ওয়া ইউক়ীমূনাস্ সালাতা ওয়া মিম্মা রাযাক়্নাহুম ইউনফিক়ূন

“যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে, নামায কায়েম করে এবং আমি তাদের যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে।”

যেখানে এই আয়াত দাঁড়িয়ে আছে

সূরার সূচনায় ঘোষণা এসেছে যে এই কিতাব সন্দেহাতীতভাবে আল্লাহর কিতাব, আর তা হিদায়াত — কিন্তু হিদায়াত কাদের জন্য? আগের আয়াতে উত্তর এসেছে: মুত্তাক়ীদের জন্য। এখন এই আয়াতে সেই মুত্তাক়ীদের ছবি আঁকা হচ্ছে। লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, কুরআন এখানে শর্তের তালিকা দিচ্ছে না; বরং যারা বাস্তবেই এই কিতাব থেকে হিদায়াত পেয়েছিল — নবীর দাওয়াতে সাড়া দেওয়া প্রথম মানুষেরা, মুহাজির ও আনসারগণ — তাদের প্রকৃত চেহারাটি এঁকে দেখাচ্ছে। সূরার প্রধান শ্রোতা যেহেতু আহলে কিতাব, তাই এমন গুণগুলোই বেছে নেওয়া হয়েছে যেগুলোর অভাবেই তারা পথ হারিয়েছিল।

তিনটি গুণ: অদৃশ্যে ঈমান, সালাতের পরিচর্যা, এবং প্রাপ্ত রিযিক থেকে ব্যয়। প্রথমটি অন্তরের, দ্বিতীয়টি রবের দিকে মুখ করা, তৃতীয়টি সৃষ্টির দিকে মুখ করা।

গ়ায়ব কী

আক্ষরিক অর্থে গ়ায়ব (ٱلْغَيْب) হলো যা আমাদের ইন্দ্রিয়ের নাগালের বাইরে। কিন্তু এই সংজ্ঞা যথেষ্ট নয়, কারণ আমাদের উপলব্ধির ক্ষমতা পাঁচ ইন্দ্রিয়ের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত।

একই আকারের দুটি ব্যাগের কোনটি ভারী, তা চোখে দেখে বলা যায় না; কিন্তু দুই হাতে তুলে নিলেই বোঝা যায় — পেশির টান আমাদের জানিয়ে দেয়। দোকানে দুটি শার্টের কাপড় আঙুলে ঘষলে বোঝা যায় কোনটি মিলিমিটারের ভগ্নাংশ পরিমাণ মোটা — এটি বলে দেয় আঙুল দুটির মধ্যকার দূরত্ব। ক্ষুধা কোন ইন্দ্রিয় জানায়? ঘুম ভাঙায় কোনটি? সুতরাং “পাঁচ ইন্দ্রিয়ে ধরা পড়ে না” — এটুকু দিয়ে গ়ায়বের সংজ্ঞা হয় না। এই আয়াতের গ়ায়ব আমাদের সমস্ত উপলব্ধি-ক্ষমতার ঊর্ধ্বে।

আরও তিনটি সীমারেখা টানা যায়। ছাত্র বীজগণিতের সমীকরণ সমাধান করলে আমরা বলি না সে গ়ায়ব জেনেছে, কারণ সে নিয়ম প্রয়োগ করেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর আগামীকালের বৃষ্টির পূর্বাভাস দিলে তারা গ়ায়ব জানেনি, কারণ তারা গবেষণার উপর দাঁড়িয়েছে। আর কোনো বন্ধু যদি বলে দেয় চুরি যাওয়া ফোনটি কোথায়, সেও গ়ায়ব জানেনি — কারণ চোর জানত, ক্রেতা জানত, সাক্ষী জানত। গ়ায়ব সেটিই, যা আপনার সমকক্ষ কেউ জানে না, যা নিয়মের প্রয়োগে বের করা যায় না, এবং যা কোনো ইন্দ্রিয়ে ধরা পড়ে না।

আল্লাহর অন্য সৃষ্টিও এর বাইরে নয়। ফেরেশতাদের সম্পর্কে কুরআন বলে:

قَالُوا۟ سُبْحَٰنَكَ لَا عِلْمَ لَنَآ إِلَّا مَا عَلَّمْتَنَآ ۖ إِنَّكَ أَنتَ ٱلْعَلِيمُ ٱلْحَكِيمُ

“তারা বলল, আপনি পবিত্র! আপনি আমাদের যা শিখিয়েছেন তা ছাড়া আমাদের কোনো জ্ঞান নেই। আপনিই সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” (২:৩২)

এরপর আল্লাহ বলেন:

أَلَمْ أَقُل لَّكُمْ إِنِّىٓ أَعْلَمُ غَيْبَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضِ

“আমি কি তোমাদের বলিনি যে আমি আসমানসমূহ ও যমীনের গ়ায়ব জানি?” (২:৩৩)

জিনদের অবস্থাও একই। সুলাইমান আলাইহিস সালামের মৃত্যু তারা টের পায়নি যতক্ষণ না উইপোকা তাঁর লাঠি খেয়ে ফেলল:

فَلَمَّا خَرَّ تَبَيَّنَتِ ٱلْجِنُّ أَن لَّوْ كَانُوا۟ يَعْلَمُونَ ٱلْغَيْبَ مَا لَبِثُوا۟ فِى ٱلْعَذَابِ ٱلْمُهِينِ

“অতঃপর যখন তিনি পড়ে গেলেন, তখন জিনদের কাছে স্পষ্ট হলো যে, তারা যদি গ়ায়ব জানত তবে এমন লাঞ্ছনাকর শাস্তিতে পড়ে থাকত না।” (৩৪:১৪)

এমনকি নবী-রাসূলগণও নিজে থেকে গ়ায়ব জানেন না; তাঁরা যা জানেন তা আল্লাহর দেওয়া:

عَٰلِمُ ٱلْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَىٰ غَيْبِهِۦٓ أَحَدًا ۝ إِلَّا مَنِ ٱرْتَضَىٰ مِن رَّسُولٍ

“তিনি গ়ায়বের জ্ঞানী; তিনি তাঁর গ়ায়ব কারও কাছে প্রকাশ করেন না, তাঁর মনোনীত রাসূল ছাড়া।” (৭২:২৬-২৭)

‘বি’-এর ব্যাকরণ: দুটি পাঠ

بِٱلْغَيْب-এর ‘বি’ (بِ) নিয়ে মুফাসসিরদের মধ্যে দুটি পাঠ চালু আছে, আর দুটিই আয়াতের অর্থে ভিন্ন আলো ফেলে।

প্রথম পাঠ (সংখ্যাগরিষ্ঠের): এখানে ‘বি’ ক্রিয়াকে কর্মের সাথে যুক্ত করছে (بِ التعدية) — অর্থাৎ গ়ায়ব-ই ঈমানের বিষয়বস্তু। অনুবাদ: “তারা গ়ায়বের উপর ঈমান আনে।” এই পাঠে জোর পড়ে কীসের উপর ঈমান আনা হচ্ছে — আল্লাহ, ফেরেশতা, ওহি, আখিরাত।

দ্বিতীয় পাঠ (আমীন আহসান ইসলাহী ও জাভেদ আহমদ গ়ামিদীর): এখানে ‘বি’ অবস্থাবোধক (بِ الحال / المصاحبة) — অর্থাৎ গ়ায়ব ঈমানের বিষয়বস্তু নয়, বরং ঈমান আনার অবস্থা। অনুবাদ: “তারা না দেখেই ঈমান আনে” — গ়ায়বের পর্দার ভেতরে থেকেও তারা মেনে নেয়, এই শর্ত জুড়ে দেয় না যে “চোখে না দেখলে মানব না।” এই পাঠে জোর পড়ে কী শর্তে ঈমান আনা হচ্ছে।

টীকা: দ্বিতীয় পাঠটি সংখ্যালঘু অবস্থান, তবে ব্যাকরণগতভাবে বৈধ, এবং ইসলাহী তাঁর তাদাব্বুরুল কুরআন-এ এর পক্ষে বিস্তারিত যুক্তি দিয়েছেন। দুটি পাঠ পরস্পরবিরোধী নয় — প্রথমটি বিষয়বস্তু বলে, দ্বিতীয়টি মনোভাব বলে।

অদৃশ্যে ঈমান অন্ধ বিশ্বাস নয়

এখানেই লেসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুল ধারণাটি ভাঙা দরকার। বহু মানুষ — ধর্মবিমুখ বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে ধর্মীয় মহলের অনেকেও — মনে করেন “ঈমান বিল-গ়ায়ব” মানে চিন্তা না করে মেনে নেওয়া। বাস্তবতা ঠিক উল্টো। আয়াতটি চিন্তা নাকচ করছে না; নাকচ করছে একটি জেদ — “যা ইন্দ্রিয়ে ধরা পড়বে কেবল তা-ই মানব।”

এই জেদ যে কতটা আত্মঘাতী, তা বোঝা কঠিন নয়। আমাদের জ্ঞানের কতটুকু আসলে সরাসরি অভিজ্ঞতা থেকে আসে? খুব সামান্যই। বাকিটা আসে দুই জায়গা থেকে: এক, আমাদের ভেতরে গেঁথে দেওয়া সহজাত জ্ঞান — ক্ষুধা-তৃষ্ণার বোধ, ভালো-মন্দের নৈতিক চেতনা, ত্রিভুজের তিন কোণ, দুইয়ে দুইয়ে চার; দুই, এই ভেতরের জ্ঞানকে বাইরের জগতে প্রয়োগ করে অনুমানের (ইস্তিম্বাত) মাধ্যমে যা আমরা বের করি। বিজ্ঞান, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান — সর্বত্র যদি কেবল পরীক্ষালব্ধ জিনিসই গ্রহণযোগ্য হয়, তবে জ্ঞানের সিংহভাগই বাদ পড়ে যায়। বিজ্ঞান নিজেই আজ সেই পর্যায়ে, যেখানে তার সবচেয়ে বড় সত্যগুলো প্রত্যক্ষ নয়, অনুমানলব্ধ।

মানুষের মর্যাদা এখানেই। আগুন দেখে আগুন চেনা — এ তো গরু-গাধাও পারে। মানুষের বিশেষত্ব হলো দেয়ালের ওপাশে ধোঁয়া দেখে আগুনের অস্তিত্ব বুঝে ফেলা। এই অনুমানলব্ধ জ্ঞানই প্রকৃত জ্ঞান।

কুরআন ঠিক এই মর্যাদাটির দিকেই ডাকছে। বনী ইসরাঈল মূসা আলাইহিস সালামের কাছে দাবি করেছিল:

أَرِنَا ٱللَّهَ جَهْرَةً

“আমাদের আল্লাহকে প্রকাশ্যে দেখিয়ে দাও।” (৪:১৫৩)

এই দাবিটিই ইন্দ্রিয়ের দাসত্বের চূড়ান্ত রূপ। যাদের ফিতরাত জাগ্রত, তারা এমন দাবি করে না — কারণ তারা জানে, অনুভূত জগৎ থেকে যেসব সত্য স্পষ্টভাবে অনুমান করা যায়, সেগুলোও গ্রহণযোগ্য।

আরেকদিক থেকেও কথাটি স্পষ্ট। কোনো কিছুর অস্তিত্ব থাকা আর সেই অস্তিত্ব আমাদের জানা — দুটি আলাদা ব্যাপার। জীবাণু কোটি কোটি বছর ধরে ছিল; মানুষ জ্বর-সংক্রমণের প্রভাব দেখেছে অথচ কারণ জানেনি। অণুবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কারের মুহূর্তে ব্যাকটেরিয়া অস্তিত্বে আসেনি — তারা সারাক্ষণই ছিল। আরও কাছের উদাহরণ: আপনার দেহের রূহ আপনাকে প্রাণ দেয়, অথচ আপনি তাকে দেখেননি, শোনেননি, ঘ্রাণ নেননি; তার প্রভাব দিয়েই তাকে চিনেছেন। নিজের ভেতরকার জিনিসটিই যদি ধরাছোঁয়ার বাইরে হয়, তবে স্রষ্টাকে ইন্দ্রিয়ে ধরতে চাওয়া কতটা যৌক্তিক?

সুতরাং ঈমান বিল-গ়ায়ব দাঁড়ায় দুই পায়ে: এক, বিশ্বজগতের নিদর্শন থেকে বুদ্ধি দিয়ে অনুমান করা যে এর একজন স্রষ্টা আছেন — কারণ কাকতালীয় ঘটনা ক্ষণস্থায়ী ও বিশৃঙ্খল, এমন সুবিন্যস্ত ব্যবস্থা নিজে নিজে দাঁড়ায় না। দুই, সেই স্রষ্টার পক্ষ থেকে আসা রাসূল যখন মু’জিযাসহ সংবাদ দেন, তখন তাঁকে বিশ্বাস করা। অন্তরে একবার এই প্রত্যয় বসে গেলে, রবের পক্ষ থেকে আসা প্রতিটি সংবাদই সত্য — ইন্দ্রিয়ে ধরুক বা না ধরুক।

ইক়ামাতুস সালাহ: রক্ষা করা, নিছক আদায় করা নয়

দ্বিতীয় গুণ — وَيُقِيمُونَ ٱلصَّلَوٰةَ। কুরআন এখানে “সালাত পড়া” (يُصَلُّون) বলেনি, বলেছে ইক়ামাহ করা। আরবি ভাষায় ইক়ামাহর অর্থ কোনো জিনিসকে খাড়া রাখা, রক্ষা করা, তার উপর অবিচল থাকা। যখন কেউ কোনো কাজ নিয়মিত করে, তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না, তাতে ত্রুটি ঢুকতে দেয় না, তাকে জীবনের নিয়মে পরিণত করে — তখনই সেটি ইক়ামাহ। “সালাত কায়েম করা” অনুবাদটি অনেক সময় ভুল বোঝায়; “সালাতের পরিচর্যা করা” কথাটি শব্দটির দাবির কাছাকাছি।

এই পরিচর্যা কেন এত জরুরি? ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। শাহাদাহ জীবনে একবার। যাকাত বছরে একবার, তা-ও সামর্থ্যবানের উপর; দরিদ্রের উপর কিছুই নেই। হজ জীবনে একবার, তা-ও শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্য থাকলে; অসুস্থ ও দরিদ্র অব্যাহতিপ্রাপ্ত। সিয়াম বছরে এক মাস, তা-ও সক্ষমের জন্য; দীর্ঘমেয়াদি রোগী হয়তো কখনোই রাখতে পারবেন না।

অর্থাৎ অধিকাংশ স্তম্ভেই ছাড় আছে। ছাড়হীন থাকে কেবল দুটি — শাহাদাহ ও সালাত। আর শাহাদাহ যেহেতু একবারই যথেষ্ট, তাই আজীবন প্রতিদিনের দায় হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকে একমাত্র সালাত। দাঁড়িয়ে না পারলে বসে, বসে না পারলে শুয়ে, প্রয়োজনে চোখের ইশারায় — শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত এই সংযোগ ছিঁড়তে দেওয়া যায় না।

টীকা: এ প্রসঙ্গে বহুল প্রচলিত বাক্য “الصلاة عماد الدين” (সালাত দ্বীনের খুঁটি) — মুহাদ্দিসগণের অনেকে এর সনদকে দুর্বল বলেছেন। একই অর্থে সহীহতর বর্ণনা তিরমিযীতে এসেছে: “رَأْسُ الْأَمْرِ الْإِسْلَامُ، وَعَمُودُهُ الصَّلَاةُ” — “বিষয়ের মাথা ইসলাম, আর তার খুঁটি সালাত।” শিক্ষাদানে দ্বিতীয়টি ব্যবহার করাই নিরাপদ।

সালাত নতুন কিছু নয়

একটি ভুল ধারণা এখানে সংশোধন করা দরকার: কুরআন দ্বীনের প্রথম কিতাব নয়, শেষ কিতাব। ইসলাম কুরআন থেকে শুরু হয়নি; কুরআন বরং তার পুরো ইতিহাস বর্ণনা করে — আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু হয়ে নবীদের ধারাবাহিকতা, এবং ইবরাহীম আলাইহিস সালাম থেকে নবুওয়াতের দ্বিতীয় পর্যায়।

নবীর প্রত্যক্ষ শ্রোতারা ছিল বনী ইসমাঈল — ইবরাহীম আলাইহিস সালামের বংশধর। দুই হাজার বছর পেরিয়ে গেলেও তারা পিতৃপুরুষের ধর্মীয় ঐতিহ্য সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল না। হজ তারা করত, কিছু বিদআত মিশিয়ে হলেও। সালাতও তেমনি — তাদের পুণ্যবানরা তা আদায় করত। আবূ যর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর ইসলাম গ্রহণের বিবরণে বলেছেন, নবীর কথা শোনার অনেক আগেই তিনি সালাতের ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন।

এ কারণেই কুরআনে সালাতের খুঁটিনাটি বিবরণ নেই — কুরআন সালাতের উদ্বোধন করছে না। সে সালাতের প্রসঙ্গ তোলে তখনই, যখন অবহেলার প্রতি সতর্ক করার দরকার হয়, নতুন বিধান দিতে হয়, ছাড় দিতে হয়, বা পরিস্থিতির দাবিতে ব্যাখ্যা লাগে। সূরা মাঊনে যে সালাত-বিমুখতার নিন্দা এসেছে, ইহুদিদের ব্যাপারে যে সালাত নষ্ট করার অভিযোগ এসেছে — সবই এই কাঠামোতেই বোধগম্য।

ওয়া মিম্মা রাযাক়্নাহুম ইউনফিক়ূন

তৃতীয় গুণ — “আমি তাদের যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে তারা ব্যয় করে।” ‘ব্যয়’ আর ‘সম্পদ’ শুনলে আমাদের মন সোজা টাকার দিকে চলে যায়। এটি ভুল, এবং এই ভুল বহু মানুষকে অকারণে হতাশ করে।

লক্ষ করুন, আয়াতে বলা হয়নি “তাদের সম্পদ থেকে”; বলা হয়েছে مِمَّا رَزَقْنَٰهُمْ — “আমি তাদের যা দিয়েছি তা থেকে।” রিযিক শব্দটি টাকার চেয়ে অনেক প্রশস্ত। শারীরিক সুস্থতা রিযিক — তা অন্যের সেবায় ব্যয় করা যায়। জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা রিযিক — তা অজ্ঞের অজ্ঞতা দূর করতে ব্যয় করা যায়। প্রজ্ঞা, ধৈর্য, বিনয়, সময়, প্রভাব — সবই রিযিক। জীবনের উন্নতির কাজে লাগানো যায় এমন যেকোনো কিছুই সম্পদ।

সুতরাং হাতে টাকা না থাকলে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। জ্ঞান দিয়ে শেখান, শক্তি দিয়ে দুর্বলকে সাহায্য করুন — আয়াতটি জীবনের সব ক’টি দিক জড়িয়ে ধরে আছে। আর ‘মিম্মা’ শব্দের ‘মিন’ ইঙ্গিত দেয় আংশিকতার: সবটা নয়, তার থেকে কিছু। দাবিটি নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার নয়, হাত খুলে রাখার।

দুই দিকে মুখ করা এক ঈমান

সালাত আর ইনফাক় পাশাপাশি বসেছে — এটি আকস্মিক নয়। অন্তরে যখন স্রষ্টার প্রকৃত পরিচয় জন্মায় এবং কৃতজ্ঞতা জাগে, তখন তার প্রকাশ ঘটে দুই দিকে: রবের দিকে, এবং তাঁর বান্দাদের দিকে। রবের দিকে গেলে তা সালাতের রূপ নেয়; সৃষ্টির দিকে গেলে ইনফাক়ের।

আল্লাহ নিজেই সালাতের হেতু বলে দিয়েছেন:

وَأَقِمِ ٱلصَّلَوٰةَ لِذِكْرِىٓ

“আর আমার স্মরণের জন্য সালাত কায়েম করো।” (২০:১৪)

একবার এক ভদ্রলোক বলেছিলেন, তিনি বোঝেন দ্বীন মৌলিক নৈতিকতা শেখায়, কিন্তু দ্বীনে সালাত কেন? উত্তরটি সরল: নৈতিকতা তো সম্পর্কের দাবি পূরণ করা ছাড়া আর কিছু নয় — মায়ের সাথে, বাবার সাথে, আত্মীয়-প্রতিবেশী-সমাজের সাথে। আপনি যদি এই সব সম্পর্কের দাবি স্বীকার করেন, তবে যিনি আপনাকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর দাবি অস্বীকার করেন কীভাবে? মা যদি বলেন, “সকালে বেরোনোর আগে আর সন্ধ্যায় ফেরার পর দশটা মিনিট আমার সাথে কাটিয়ো” — সেটুকু না দেওয়া যেমন কার্পণ্য, রবের দৈনিক স্মরণটুকু না দেওয়া তার চেয়েও বড় কার্পণ্য।

গ়ামিদী এ প্রসঙ্গে মথি-লিখিত সুসমাচারের একটি সংলাপের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, যেখানে ঈসা আলাইহিস সালামকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল সবচেয়ে বড় বিধান কোনটি। উত্তরে দুটি কথা আসে: সমস্ত হৃদয়, সমস্ত আত্মা ও সমস্ত বুদ্ধি দিয়ে আল্লাহকে ভালোবাসা; আর প্রতিবেশীকে নিজের মতো ভালোবাসা। কুরআন যাকে ‘সালাত’ ও ‘ইনফাক়’ শব্দে ধরেছে, সেখানে তার ভেতরকার তত্ত্বটিই ভিন্ন ভঙ্গিতে বলা হয়েছে — ভালোবাসা যখন উপরের দিকে যায় তা সালাত, যখন পাশের দিকে যায় তা ইনফাক়।

শিক্ষা

গ়ায়ব সেটি নয় যা আপনি এখনো জানেন না; গ়ায়ব সেটি, যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।

অদৃশ্যে ঈমান চিন্তার বিকল্প নয়, চিন্তার ফল। কুরআন জেদটিকে নাকচ করে, বুদ্ধিকে নয়।

যা ইন্দ্রিয়ে ধরা পড়ে কেবল তা-ই মানব — এই শর্ত মানুষকে তার নিজস্ব মর্যাদা থেকে নামিয়ে আনে।

কোনো কিছুর অস্তিত্ব আপনার জানার উপর নির্ভর করে না।

সালাত আদায় করা আর সালাত রক্ষা করা এক নয়। ইক়ামাহর দাবি নিয়মিততা, অবিচলতা ও ত্রুটিহীনতা।

দ্বীনের প্রায় প্রতিটি স্তম্ভে ছাড় আছে; সালাতে নেই। অবস্থা বদলায়, সালাতের রূপ বদলায় — দায় বদলায় না।

আপনার হাতে ব্যয় করার মতো কিছু আছে। রিযিক টাকার চেয়ে অনেক প্রশস্ত শব্দ।

ঈমান একটাই, মুখ দুটি — উপরের দিকে সালাত, পাশের দিকে ইনফাক়। একটি ছাড়া অন্যটি পঙ্গু।