সূরা আল-বাকারা — ইন্নাল্লাযীনা কাফারূ (আয়াত ৬) (তাফসীর: আশ-শানক্বীতী, আদওয়াউল বায়ান)

মুত্তাকীদের পরিচয়ের পর আল্লাহ তাআলা এবার কাফিরদের অবস্থা বর্ণনা করলেন — সতর্ক করা হোক বা না হোক, তারা ঈমান আনবে না। ইমাম শানক্বীতী তাঁর আদওয়াউল বায়ান-এ (এবং নিজ গ্রন্থ দাফʿউ ঈহামিল ইদতিরাব থেকে উদ্ধৃত করে) এই আয়াত ও অন্য কিছু আয়াতের আপাত-বিরোধের সমাধান দিয়েছেন; নিচে তারই সারনির্যাস।

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا سَوَاءٌ عَلَيْهِمْ أَأَنذَرْتَهُمْ أَمْ لَمْ تُنذِرْهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ

— সূরা আল-বাকারা, আয়াত ৬

উচ্চারণ: ইন্নাল্লাযীনা কাফারূ সাওয়াউন আলাইহিম আআনযারতাহুম আম লাম তুনযিরহুম লা ইউমিনূন।

অনুবাদ: “নিশ্চয়ই যারা কুফরি করেছে, তুমি তাদের সতর্ক করো বা না করো — তাদের জন্য সমান; তারা ঈমান আনবে না।”

আপাত-বিরোধ: কিছু কাফির তো ঈমান আনে

এই আয়াত তার আপাত-অর্থে বোঝায় যে কাফিররা ঈমান আনবে না। অথচ অন্য কয়েকটি আয়াতে ইঙ্গিত আছে যে কিছু কাফির আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনে, যেমন:

সূরা আল-আনফাল (৮:৩৮): “ক্বুল লিল্লাযীনা কাফারূ ইন ইয়ানতাহূ ইউগফার লাহুম মা ক্বাদ সালাফ” — “যারা কুফরি করেছে তাদের বলো, তারা যদি বিরত হয়, তবে যা গত হয়েছে তা ক্ষমা করা হবে।”

সূরা আন-নিসা (৪:৯৪): “কাযালিকা কুনতুম মিন ক্বাবলু ফামান্নাল্লাহু আলাইকুম” — “তোমরাও তো আগে এমন ছিলে, অতঃপর আল্লাহ তোমাদের অনুগ্রহ করলেন।”

সূরা আল-আনকাবূত (২৯:৪৭): “ওয়া মিন হাউলাই মাই ইউমিনু বিহি” — “আর এদের মধ্যেও কেউ কেউ এতে ঈমান আনে।”

সমাধান: এটি খাস কাফিরদের সম্পর্কে

সমন্বয়ের দিক স্পষ্ট — এই আয়াতটি ‘আম মাখসূস’ (ব্যাপক অথচ বিশেষায়িত), অর্থাৎ এটি সেই দুর্ভাগাদের সম্পর্কে বিশেষভাবে প্রযোজ্য, আল্লাহর জ্ঞানে যাদের জন্য দুর্ভাগ্য পূর্বনির্ধারিত হয়ে গেছে। এদের প্রতিই ইঙ্গিত করে আল্লাহর বাণী (১০:৯৬–৯৭): “ইন্নাল্লাযীনা হাক্কাত আলাইহিম কালিমাতু রাব্বিকা লা ইউমিনূন, ওয়া লাও জাআতহুম কুল্লু আয়াতিন হাত্তা ইয়ারাউল আযাবাল আলীম” — “নিশ্চয়ই যাদের বিরুদ্ধে তোমার রবের বাণী সত্য হয়ে গেছে, তারা ঈমান আনবে না — যদিও তাদের কাছে সব নিদর্শনই আসে — যতক্ষণ না তারা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেখে।”

এই বিশেষায়নের (তাখসিস) প্রমাণ পরের আয়াত (২:৭): “খাতামাল্লাহু আলা ক্বুলূবিহিম” — “আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন।” (অর্থাৎ আয়াতটি ওইসব নির্দিষ্ট কাফিরের কথা বলছে যাদের অন্তরে মোহর পড়ে গেছে, সব কাফিরের নয়।)

আরেকটি জবাব

কেউ কেউ আরেকভাবে জবাব দিয়েছেন: আয়াতের অর্থ — যতক্ষণ তাদের অন্তর ও কানে মোহর এবং চোখে আবরণ থাকবে, ততক্ষণ তারা ঈমান আনবে না; কিন্তু আল্লাহ যদি নিজ অনুগ্রহে তাদের থেকে সেই মোহর ও আবরণ তুলে নেন, তবে তারা ঈমান আনবে।

শিক্ষা

“ইন্নাল্লাযীনা কাফারূ… লা ইউমিনূন” আয়াতটি সব কাফির সম্পর্কে নয়, বরং ‘আম মাখসূস’ — বিশেষভাবে সেই দুর্ভাগাদের সম্পর্কে, আল্লাহর জ্ঞানে যাদের কুফরের ওপর মৃত্যু পূর্বনির্ধারিত এবং যাদের অন্তরে মোহর পড়ে গেছে (২:৭)। তাই যেসব আয়াতে কিছু কাফিরের ঈমান আনার কথা এসেছে, তার সঙ্গে এর কোনো বিরোধ নেই। বিকল্প ব্যাখ্যায়ও বিরোধ দূর হয় — অন্তরে মোহর ও চোখে আবরণ থাকা অবস্থাতেই তারা ঈমান আনবে না; আল্লাহ তা তুলে নিলে আনবে।