নাজাতের সর্বকালীন মূলনীতি

বনী ইসরাইলের ঘটনাবলির মাঝখানে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা একটি মূলনীতি স্থাপন করেন — কে নাজাত পাবে, তার একটি সার্বজনীন নীতি। এই আয়াতটি প্রায়ই গুরুতরভাবে ভুল বোঝা হয়, তাই একে গভীরভাবে বোঝা জরুরি।

إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَادُوا وَالنَّصَارَىٰ وَالصَّابِئِينَ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَهُمْ أَجْرُهُمْ عِندَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ — সূরা আল-বাকারা, ২:৬২

Inna’lladhīna āmanū wa’lladhīna hādū wa’n-nasārā wa’s-sābiʾīna man āmana bi’llāhi wa’l-yawmi’l-ākhiri wa ʿamila sālihan fa-lahum ajruhum ʿinda rabbihim wa lā khawfun ʿalayhim wa lā hum yahzanūn

“নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে, আর যারা ইহুদি হয়েছে, খ্রিস্টান ও সাবিঈন — তাদের মধ্যে যে-ই আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান আনবে এবং সৎকর্ম করবে, তাদের প্রতিদান রয়েছে তাদের রবের কাছে; তাদের কোনো ভয় নেই, আর তারা দুঃখিতও হবে না।”

জীবনের দুই লক্ষ্য ও সাফল্য

জীবনের দুটি লক্ষ্য — যা কাঙ্ক্ষিত তা অর্জন করা, আর যা অনাকাঙ্ক্ষিত তা থেকে বাঁচা। এই আয়াতে আল্লাহ বলছেন, এই মানুষদের প্রতিদান তাদের রবের কাছে রয়েছে (কাঙ্ক্ষিত অর্জন), তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না (অনাকাঙ্ক্ষিত থেকে মুক্তি)। ভয় ও দুঃখ যদি না থাকে আর পুরস্কার যদি পাওয়া যায়, তবেই মানুষ সফল। এটি একটি মূলনীতি।

একটি সর্বকালীন মূলনীতি

এই আয়াত বোঝার জন্য প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় — এটি একটি সর্বকালীন, টাইমলেস মূলনীতি; কেবল বর্তমান সময়ের জন্য প্রযোজ্য এমন নয়। গভীরভাবে না দেখলে কারো মনে হতে পারে, আয়াতটি যেন বলছে — যে কেউ যেকোনো ধর্ম পালন করতে পারে, কেবল আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস থাকলেই হলো। এ থেকে কেউ ভুল করে ভাবতে পারে, ইহুদি বা খ্রিস্টান ইসলাম গ্রহণ না করলেও চলবে। এই ভুল ধারণা থেকে বাঁচতেই মূলনীতিটির সর্বকালীন প্রকৃতি বোঝা জরুরি।

আয়াতটির অর্থ হলো — যেকোনো যুগে যেকোনো জাতি বা সম্প্রদায়, তারা যদি তাদের কাছে বিদ্যমান ওহী অনুযায়ী আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান আনে এবং তাদের কাছে বিদ্যমান শরীয়ত অনুযায়ী সৎকর্ম করে, সে যে যুগেরই হোক, যে জাতিরই হোক, সে নাজাত পাবে। যখন মূসা আলাইহিস সালাম উপস্থিত ছিলেন, তখন তাঁর প্রকৃত অনুসারীরা — যারা তাওরাত মেনে চলেছে ও সেই অনুযায়ী ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে — তারা মুক্তি পেয়েছে। যখন ঈসা আলাইহিস সালাম এলেন, তখন উপস্থিত মানুষের কর্তব্য হয়ে দাঁড়াল ঈসা আলাইহিস সালামের প্রতি প্রেরিত বার্তা মেনে নেওয়া ও তাঁর শরীয়ত অনুযায়ী আল্লাহর ইবাদত করা। এমনকি যদি কোনো যুগে ওহী, নবী বা কিতাব অনুপস্থিত থাকে, তবে যে ব্যক্তি তার সহজাত ফিতরাতের টানে তাওহীদকে বেছে নেয় এবং শিরক থেকে মুক্ত থাকে, তার জন্যও নাজাত রয়েছে।

বাস্তবেও এমন ঘটেছে। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনের আগে সর্বশেষ নবী ছিলেন ঈসা আলাইহিস সালাম, আর ইঞ্জিলের শিক্ষা খুব দ্রুত বিকৃত হয়ে হারিয়ে যায়। এদিকে আরবদের ইব্রাহিম ও ইসমাইল আলাইহিমাস সালামের তাওহীদের ধর্মের ওপর থাকার কথা থাকলেও তা বিকৃত হয়ে তারা শিরকে লিপ্ত হয়ে পড়ে। তবু নবীজির আগমনের কিছু আগে সেই সমাজে কিছু মানুষ ছিল, যারা ধর্ম সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান না রাখলেও বুঝত যে এসব শিরক, যে ইবাদত কেবল এক আল্লাহকেই দিতে হবে, এবং জীবন্ত কন্যাসন্তানকে হত্যা করার মতো অন্যায় বুঝত। কারণ আল্লাহ মানুষের প্রকৃতিতে তাওহীদের প্রতি একটি সহজাত আকর্ষণ দিয়ে দিয়েছেন। মোট কথা, যেকোনো যুগে যার কাছে যে রিসোর্স বিদ্যমান — সেই যুগের নবী, বা তাঁর কিতাব, বা সেই কিতাবের আলোকে আলিমদের শিক্ষা, কিংবা আর কিছু না থাকলে তাওহীদের দিকে আহ্বানকারী তার সহজাত ফিতরাত — তার ভিত্তিতে সাধ্যমতো আল্লাহ ও আখিরাতে ঈমান এনে সৎকর্ম করলে তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।

এখানে একটি তুলনা প্রণিধানযোগ্য: পূর্ববর্তী উম্মতগুলোর ধর্ম বিকৃত হয়ে গেলেও মুসলিমদের মূল ধর্ম অক্ষত আছে — কুরআন ও সহীহ হাদিসের কাছে ফিরে এলেই যে কেউ মূল ধর্ম পেয়ে যাবে; এটি আমাদের প্রতি আল্লাহর বিরাট অনুগ্রহ যে তিনি একে সংরক্ষণ করেছেন। তবে সতর্কতার কথা হলো, বর্তমানে মুসলিম সমাজগুলোতেও শিরক ও ঈমান-বিধ্বংসী নানা বিষয় ঢুকে পড়েছে।

‘সব ধর্ম সমান’ — সহনশীলতা নাকি বিভ্রান্তি

আমাদের সমাজে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত — ‘যে যার যার ধর্ম পালন করলেই হলো, সব ধর্মই ভালো, সব ধর্মে ভালো কথা বলে।’ এটিকে অনেকে সহনশীলতা মনে করে। কিন্তু এটি সহনশীলতা নয়, বরং চরম বিভ্রান্তি। কেউ যদি ধ্বংসের পথে থাকে আর তাকে বলা হয় ‘তুমি ঠিক পথেই আছ’, তবে সেটি তার প্রতি কল্যাণ নয় — বরং তাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া। আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন:

وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ — সূরা আলে ইমরান, ৩:৮৫

Wa man yabtaghi ghayra’l-islāmi dīnan fa-lan yuqbala minhu wa huwa fi’l-ākhirati mina’l-khāsirīn

“আর যে ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন অন্বেষণ করে, তার কাছ থেকে তা কখনো গ্রহণ করা হবে না, আর আখিরাতে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।”

তাই সকল ধর্মকে সমানভাবে সঠিক বলা কল্যাণকামিতা নয়। প্রকৃত কল্যাণকামী সত্যটি বলে দেন, এমনকি তা যদি শ্রোতার কাছে অপ্রিয়ও হয়। মানুষ সাধারণত উপদেশদাতাকে ভালোবাসে না; প্রশংসা শুনলে খুশি হয়, কিন্তু সত্য উপদেশ শুনলে রেগে যায়। এজন্যই নবীগণ তাঁদের জাতিকে আন্তরিক উপদেশ দিয়েও শুনেছেন, ‘তোমরা উপদেশদাতাদের ভালোবাসো না।’ তবু প্রকৃত কল্যাণকামিতা এখানেই — মানুষকে মিথ্যা আশ্বাসে ধ্বংসের দিকে না ঠেলে, সত্যের দিকে ডাকা।

এক রাসূলকে অস্বীকার, সকলকে অস্বীকার

এখন প্রশ্ন — কেউ যদি সকল নবীকে স্বীকার করে কিন্তু একজন নবীকে মানতে না চায়, তবে কি আল্লাহর প্রতি তার ঈমান অটুট থাকবে? থাকবে না। কারণ আল্লাহর প্রতি ঈমানের মধ্যেই তাঁর প্রেরিত রাসূলদের প্রতি ঈমান অন্তর্ভুক্ত।

إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيُرِيدُونَ أَن يُفَرِّقُوا بَيْنَ اللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيَقُولُونَ نُؤْمِنُ بِبَعْضٍ وَنَكْفُرُ بِبَعْضٍ وَيُرِيدُونَ أَن يَتَّخِذُوا بَيْنَ ذَٰلِكَ سَبِيلًا ۝ أُولَٰئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ حَقًّا — সূরা আন-নিসা, ৪:১৫০-১৫১

Inna’lladhīna yakfurūna bi’llāhi wa rusulihi wa yurīdūna an yufarriqū bayna’llāhi wa rusulihi wa yaqūlūna nuʾminu bi-baʿdin wa nakfuru bi-baʿdin wa yurīdūna an yattakhidhū bayna dhālika sabīlā. Ulāʾika humu’l-kāfirūna haqqā

“নিশ্চয়ই যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের সাথে কুফরি করে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের মধ্যে পার্থক্য করতে চায়, এবং বলে ‘আমরা কারও প্রতি ঈমান আনি ও কাউকে অস্বীকার করি’, আর এর মাঝামাঝি একটি পথ বেছে নিতে চায় — তারাই প্রকৃত কাফির।”

বিষয়টি একটি উদাহরণে স্পষ্ট হয়। ধরুন, এক রাষ্ট্রপ্রধান আরেক রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে একের পর এক রাষ্ট্রদূত পাঠাচ্ছেন। প্রত্যেক রাষ্ট্রদূতকে নিরাপত্তা ও সম্মান দিতে হয়, তার কোনো ক্ষতি করা নিষেধ। ধরুন একশ জন রাষ্ট্রদূতকে সাদরে গ্রহণ করা হলো, কিন্তু একশ-এক নম্বর রাষ্ট্রদূতকে হত্যা করা হলো। তখন প্রেরক রাষ্ট্রপ্রধান যুদ্ধ ঘোষণা করবেন। কেন — একশ জনকে তো কিছু বলা হয়নি? কারণ সকলেই সেই একই প্রধানের দূত; একজনকে অপমান করা মানে প্রেরককেই অপমান করা। তেমনি সকল নবী-রাসূলকে একই আল্লাহ প্রেরণ করেছেন; যিনি মূসাকে পাঠিয়েছেন তিনিই ঈসাকে, তিনিই নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পাঠিয়েছেন। তাই কেউ যদি একজন নবীকেও অস্বীকার করে, দুটি জিনিস ঘটে — সে সকল নবীকেই অস্বীকার করে, এবং আল্লাহর প্রতি তার ঈমান নষ্ট হয়। কুরআনেই এর ইঙ্গিত রয়েছে: নূহের জাতির কাছে একজন রাসূল (নূহ) প্রেরিত হলেও বলা হয়েছে তারা ‘রাসূলগণকে’ (বহুবচনে) অস্বীকার করেছে; আদ জাতির কাছে হুদ, সামুদের কাছেও একজন — তবু বহুবচন ব্যবহৃত হয়েছে, কারণ একজন রাসূলকে অস্বীকার করা মানে সকল রাসূলকে অস্বীকার।

এখানে আরেকটি দিক আছে। কোনো ইহুদি যদি বলে ‘আমি মূসা পর্যন্ত সবাইকে মানি, ঈসাকে মানি না’, তবে দুই দিক থেকে তার ঈমান নষ্ট হয়: আল্লাহর একজন রাসূলকে অস্বীকার করায় আল্লাহর প্রতি ঈমান নষ্ট হয়, আবার সে প্রকৃতপক্ষে মূসাকেও অস্বীকার করে — কারণ মূসা নিজেই পরবর্তী নবীকে মেনে নেওয়ার আদেশ দিয়ে গেছেন। একইভাবে কোনো খ্রিস্টান যদি ঈসাকে মানে কিন্তু শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে না মানে, তারও ঈমান দুই দিক থেকে নষ্ট হয়।

নবীদের অঙ্গীকার

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সকল নবীর কাছ থেকে এই অঙ্গীকার নিয়েছেন।

وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ النَّبِيِّينَ لَمَا آتَيْتُكُم مِّن كِتَابٍ وَحِكْمَةٍ ثُمَّ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مُّصَدِّقٌ لِّمَا مَعَكُمْ لَتُؤْمِنُنَّ بِهِ وَلَتَنصُرُنَّهُ — সূরা আলে ইমরান, ৩:৮১

Wa idh akhadha’llāhu mīthāqa’n-nabiyyīna lamā ātaytukum min kitābin wa hikmatin thumma jāʾakum rasūlun musaddiqun limā maʿakum la-tuʾminunna bihi wa la-tansurunnah

“আর স্মরণ করো, যখন আল্লাহ নবীগণের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলেন — ‘আমি তোমাদের কিতাব ও হিকমাহ যা-ই দিই, এরপর তোমাদের কাছে যা আছে তার সত্যায়নকারী একজন রাসূল যখন আসবেন, তখন তোমরা অবশ্যই তাঁর প্রতি ঈমান আনবে এবং তাঁকে সাহায্য করবে।'”

সকল নবী-রাসূল এই অঙ্গীকার স্বীকার করেছেন, আর আল্লাহ তাঁদের সাক্ষী রেখেছেন। এজন্যই প্রত্যেক নবী তাঁর উম্মতকে জানিয়ে গেছেন — আমার পরে যখন কোনো রাসূল আসবেন, তোমরা অবশ্যই তাঁর আনুগত্য করবে ও তাঁকে নবী হিসেবে স্বীকার করবে। মূসা তা বলে গেছেন, ঈসাও বলে গেছেন।

শেষ নবীর পর মুক্তির একমাত্র পথ

নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই এই নীতিটি স্পষ্ট করে দিয়েছেন।

وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ، لَا يَسْمَعُ بِي أَحَدٌ مِنْ هَذِهِ الْأُمَّةِ يَهُودِيٌّ وَلَا نَصْرَانِيٌّ، ثُمَّ يَمُوتُ وَلَمْ يُؤْمِنْ بِالَّذِي أُرْسِلْتُ بِهِ، إِلَّا كَانَ مِنْ أَصْحَابِ النَّارِ — সহীহ মুসলিম

Wa’lladhī nafsu Muhammadin bi-yadihi, lā yasmaʿu bī ahadun min hādhihi’l-ummati yahūdiyyun wa lā nasrāniyyun, thumma yamūtu wa lam yuʾmin bi’lladhī ursiltu bihi, illā kāna min ashābi’n-nār

“সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মদের প্রাণ! এই উম্মতের যে-ই আমার কথা শোনে — ইহুদি হোক বা খ্রিস্টান — অতঃপর আমি যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছি তাতে ঈমান না এনে মারা যায়, সে অবশ্যই জাহান্নামের অধিবাসী হবে।”

তাহলে সূরা আল-বাকারার এই আয়াতটির অর্থ দাঁড়ায় — এটি অতীতে নবী-রাসূলদের প্রকৃত অনুসারীদের জন্য প্রযোজ্য ছিল; আর বর্তমানে, শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনের পর, তাঁর আনীত শরীয়তে ঈমান আনা বাধ্যতামূলক। এটি আয়াতের সাথে সাংঘর্ষিক নয়, বরং এরই দাবি; কারণ আল্লাহর প্রতি ঈমানের শর্তই হলো তাঁর শেষ রাসূলকে মেনে নেওয়া। কেউ বলতে পারবে না ‘আমি আল্লাহকে মানি কিন্তু নবীকে মানি না’ — বললে আল্লাহর প্রতি তার ঈমানের দাবিটাই মিথ্যা হয়ে যায়। একইভাবে ‘আমি কুরআন মানি কিন্তু সুন্নাহ মানি না’ — এ ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তাই ইহুদি, খ্রিস্টান, সাবিঈনসহ যেকোনো সম্প্রদায়ের মানুষের নাজাতের একমাত্র পথ এখন নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ঈমান আনা। আর যেই মুহূর্তে তারা তাঁর প্রতি ঈমান এনে সাক্ষ্য দেয় ‘আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু’, সেই মুহূর্তে তারা আর ইহুদি, খ্রিস্টান বা সাবিঈ থাকে না — সবাই মুমিন-মুসলিম হয়ে যায়।

সাবিঈন কারা

আয়াতে উল্লিখিত সাবিঈনদের পরিচয় এতক্ষণ দেওয়া হয়নি। সাবিঈন একটি প্রাচীন সম্প্রদায়, এবং গবেষকরা বলেন তাদের অস্তিত্ব এখনো রয়েছে। তারা ইরাক বা এর নিকটবর্তী অঞ্চলে, দজলা ও ফোরাত (টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস) নদীর তীরে বসবাস করত; নদীতীরে থাকার পেছনে তাদের কিছু আকিদাগত কারণও রয়েছে বলে বলা হয়। তারা কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় কিতাব বা ধর্মের অনুসারী নয় — পুরোপুরি ইহুদি নয়, খ্রিস্টান নয়, মাজুসি নয়, আবার পূর্ণ মূর্তিপূজারীও নয়; বরং প্রতিটি ধর্ম থেকে কিছু কিছু গ্রহণ করেছিল। এটিই তাদের অভিন্ন বৈশিষ্ট্য, যার কারণে তারা আলাদা একটি সম্প্রদায়রূপে চিহ্নিত — ‘সাবিঈ’ শব্দের একটি অর্থই হলো প্রচলিত ধর্মসমূহ ত্যাগ করা।

সালাফদের বক্তব্য ও ঐতিহাসিক প্রমাণ থেকে ধারণা করা যায়, তাদের মধ্যে তিনটি উপবিভাগ ছিল। এক দল ছিল একত্ববাদী, যারা সকল নবী-রাসূলের অভিন্ন মূল বার্তাগুলো মানত — কারণ সকল নবীই তাওহীদের দিকে ডেকেছেন এবং সত্যবাদিতা ও ইনসাফের নির্দেশ ও অশ্লীলতা ও জুলুমের নিষেধ সব ধর্মেই অভিন্ন; এই দল ফিতরাতের ওপর টিকে ছিল, আর যারা এর ওপর টিকে থাকত তারা মুক্তি পেত। আরেক দল আহলে কিতাবের অনুসারী হয়ে গিয়েছিল — বর্ণিত আছে তারা যাবুর পড়ত। তৃতীয় দল ছিল ফেরেশতা-পূজারী বা নক্ষত্র-পূজারী। বর্তমানেও এদের অস্তিত্ব আছে বলে বলা হয়, এবং কিছু ক্ষেত্রে মুসলিমদের সঙ্গে মিলও পাওয়া যায় — যেমন তাদের সালাত রয়েছে, কেউ কেউ বলেন তারা দিনে তিনবার সালাত আদায় করে। তবে অন্য সকল সম্প্রদায়ের মতো তাদের নাজাতের পথও এখন এক — শেষ নবীর প্রতি ঈমান আনা।

আয়াতের শব্দ ও অর্থ

আয়াতের কয়েকটি শব্দ একটু দেখা যাক। ‘ইন্নাল্লাজিনা আমানু’ — যারা ঈমান এনেছে, এখানে মূলত মুসলিম সম্প্রদায়কে বোঝানো হয়েছে। ‘হাদু’ অর্থ ইহুদি, ‘নাসারা’ অর্থ খ্রিস্টান, আর ‘সাবিঈন’ — শব্দটি ‘সাবিউন’-এরই একটি রূপ; বাক্যে ব্যাকরণিক অবস্থান অনুযায়ী কখনো ‘সাবিঈন’, কখনো ‘সাবিউন’ আসে। এরপর ‘মান আমানা বিল্লাহি ওয়াল ইয়াওমিল আখির’ — তাদের মধ্যে যে-ই আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি প্রকৃত ঈমান আনবে। এখানে যেনতেনভাবে বিশ্বাস করলে হবে না; আল্লাহ ও আখিরাত সম্পর্কে ওহীর মাধ্যমে যেভাবে সঠিক তথ্য এসেছে, ঠিক সেভাবে বিশ্বাস করতে হবে — আর তা জানার একমাত্র উপায় এখন কুরআন ও হাদিস। এদিক থেকেও বলা যায়, যে কুরআন-হাদিস মানে না, সে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমানদার নয়; তা তার নিজস্ব ধারণা, ঈমান নয়। এরপর ‘ওয়া আমিলা সালিহান’ — এবং সৎকর্ম করবে। তখন ‘ফালাহুম আজরুহুম ইনদা রাব্বিহিম’ — তাদের প্রতিদান তাদের রবের কাছে; ‘ওয়ালা খাওফুন আলাইহিম’ — তাদের কোনো ভয় নেই, ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো আশঙ্কা নেই; ‘ওয়ালা হুম ইয়াহজানুন’ — আর তারা দুঃখিতও হবে না, অতীত নিয়ে কোনো আক্ষেপ থাকবে না। মানুষকে দুটি জিনিস জর্জরিত করে — ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা ও ভয়, আর অতীতের দুঃখ; বিশ্বাসীরা এই দুই থেকেই মুক্ত।

আয়াতটি এখানে কেন এল: প্রেক্ষাপট ও শানে নুযূল

এখন প্রশ্ন — এই সার্বজনীন মূলনীতি আল্লাহ কেন বনী ইসরাইলের ঘটনাবলির ঠিক মাঝখানে নিয়ে এলেন? এর অনেক কারণ থাকতে পারে; তবে একটি কারণ অনুমান করা যায়। বনী ইসরাইলের ঘটনাগুলো যখন কেউ একের পর এক পড়ে — অবাধ্যতার পর অবাধ্যতা — তখন মনে ধারণা জন্মাতে পারে যে এরা বুঝি সম্পূর্ণ বদ ও নিকৃষ্ট একটি জাতি, এদের সবাই বুঝি খারাপ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এখানে যেন একটি ইঙ্গিত দিলেন — এদের মধ্যেও ভালো মানুষ আছে, আর এদের মধ্যেও যারা আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি প্রকৃত ঈমান এনেছে তারা মুক্তি পাবে। কাজেই তাদের সবাইকে খারাপ ভাবার কোনো কারণ নেই; একটি জাতি সম্পর্কে ঢালাও নেতিবাচক ধারণা যেন আমরা পোষণ না করি — এটিই এই আয়াতের একটি উদ্দেশ্য।

আবার কেউ কেউ এই আয়াতের শানে নুযূল হিসেবে সালমান আল-ফারিসি রাদিয়াল্লাহু আনহুর প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন। তিনি মূলত মাজুসি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, পরে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেন, এবং এমন অনেকের সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন যাঁরা বিকৃত খ্রিস্টধর্মে নয়, বরং ঈসা আলাইহিস সালামের মূল তাওহীদভিত্তিক ধর্মের ওপর টিকে ছিলেন। এই মানুষদের পরিণতি সম্পর্কে তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলে আল্লাহ এই আয়াত নাযিল করে জানিয়ে দেন — অতীতে হয়তো অনেক মানুষ চলে গেছে যাদের কাছে নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াত পৌঁছায়নি, তার আগেই তারা মৃত্যুবরণ করেছে; তারা যদি নিজ নিজ নবীর অনুসারী হয়ে থাকে এবং আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান এনে থাকে, তবে তারা মুক্তি পাবে। এই প্রসঙ্গেই আয়াতটি এসেছে বলে কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন।

শিক্ষা

এই আয়াত একটি সর্বকালীন মূলনীতি ঘোষণা করে: যেকোনো যুগে যে ব্যক্তি তার কাছে বিদ্যমান ওহী অনুযায়ী আল্লাহ ও আখিরাতে প্রকৃত ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, সে নাজাত পায়, তার ভয় ও দুঃখ থাকে না। কিন্তু এই নীতি ‘যে যার ধর্মে থাকলেই মুক্তি’ — এমন কথা বলে না। কারণ প্রতিটি যুগে আল্লাহর প্রতি ঈমানের অন্তর্ভুক্ত ছিল সে যুগের রাসূলকে মেনে নেওয়া, আর শেষ নবীর আগমনের পর তাঁকে মেনে নেওয়া সকলের জন্য বাধ্যতামূলক — একজন রাসূলকে অস্বীকার করা মানে সকলকে এবং স্বয়ং আল্লাহকে অস্বীকার করা। তাই সকল ধর্মকে সমান বলা সহনশীলতা নয়; প্রকৃত কল্যাণকামিতা হলো সত্যের দিকে ডাকা। আর নাজাতের এই মানদণ্ড কেবল অন্যদের যাচাইয়ের নয় — এটি প্রথমে নিজেদের ঈমানকেই কুরআন-সুন্নাহর আলোকে যাচাই করার আহ্বান।