সূরা আল-বাকারা ২ঃ৫৭ — মেঘের ছায়া ও মান্না-সালওয়া
বায়তুল মাকদিসে প্রবেশে অস্বীকারের শাস্তিস্বরূপ বনু ইসরাইল চল্লিশ বছর মরুপ্রান্তরে পথহারা হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছিল। অথচ সেই শাস্তির মধ্যেও আল্লাহর নিয়ামত থেমে থাকেনি — তিনি মেঘ দিয়ে তাদের ছায়া দিলেন, আর অলৌকিকভাবে মান্না ও সালওয়া নামক খাদ্য পাঠালেন। এই আয়াতে সেই বিনা-কষ্টের রিজিকের কথা স্মরণ করিয়ে, শেষে এক গভীর সত্য বলা হয়েছে: তাদের অবাধ্যতা আল্লাহর কোনো ক্ষতি করেনি, ক্ষতি করেছে কেবল নিজেদেরই।
وَظَلَّلْنَا عَلَيْكُمُ الْغَمَامَ وَأَنزَلْنَا عَلَيْكُمُ الْمَنَّ وَالسَّلْوَىٰ ۖ كُلُوا مِن طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ ۖ وَمَا ظَلَمُونَا وَلَٰكِن كَانُوا أَنفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ
Wa zallalnā ʿalaykumu-l-ghamāma wa anzalnā ʿalaykumu-l-manna wa-s-salwā, kulū min tayyibāti mā razaqnākum, wa mā zalamūnā wa lākin kānū anfusahum yazlimūn
“আর আমি তোমাদের উপর মেঘের ছায়া দিলাম এবং তোমাদের প্রতি মান্না ও সালওয়া অবতীর্ণ করলাম — ‘আমি তোমাদের যে উত্তম রিজিক দিয়েছি তা থেকে খাও।’ আর তারা আমার প্রতি কোনো জুলুম করেনি, বরং তারা নিজেদের প্রতিই জুলুম করছিল।”
মেঘের ছায়া ও মান্না-সালওয়া
“ওয়া জাল্লালনা আলাইকুমুল গামাম” — আমি তোমাদের উপর মেঘের ছায়া দিলাম। “গামাম” অর্থ মেঘ, বা এমন কিছু যা ঢেকে রাখে; কোনো কোনো মুফাসসির বলেছেন এটি ছিল বিশেষ ধরনের মেঘ, আমরা যে সাধারণ মেঘ দেখি তেমন নয়। এরপর “ওয়া আনজালনা আলাইকুমুল মান্না ওয়াস সালওয়া” — এবং তোমাদের প্রতি মান্না ও সালওয়া অবতীর্ণ করলাম। “মান্না” (মূল শব্দ “মান”) ছিল শিশিরের মতো পাতায় জমা মধুজাতীয় তরল খাদ্য — এক অলৌকিক রিজিকের উৎস। আর “সালওয়া” ছিল একটি পাখি (কারো মতে কবুতরের মতো, কারো মতে চড়ুইয়ের চেয়ে একটু বড়); খুব কষ্ট করে ধরতে হতো না, এটি তাদের আশেপাশেই আসত এবং তারা এর গোশত খেতে পারত। বিনা কষ্টে এমন উত্তম রিজিক — এক চমৎকার ব্যবস্থা।
এটি আমাদের বিশেষভাবে খেয়াল করা দরকার, যেন আমরা একই ভুল না করি। কারণ এত সহজ ও উত্তম রিজিক পেয়েও তারা একসময় এর প্রতি অধৈর্য হয়ে পড়েছিল — সেই বিবরণ সামনে আসবে।
“তারা আমার ক্ষতি করেনি, নিজেদেরই ক্ষতি করেছে”
আল্লাহ বলছেন, “কুলু মিন তাইবাতি মা রাজাকনাকুম” — আমি তোমাদের যে রিজিক দিয়েছি, তার উত্তম ও পবিত্র (তাইবাত) শ্রেণির জিনিসগুলো থেকে খাও। এরপর আসে গভীর একটি কথা — “ওয়া মা জালামুনা,” তারা আমার প্রতি কোনো জুলুম করেনি; অর্থাৎ তাদের অবাধ্যতায় আল্লাহর কোনো ক্ষতি হয়নি, কারণ আল্লাহর ক্ষতি করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। “ওয়ালাকিন কানু আনফুসাহুম ইয়াজলিমুন” — বরং তারা নিজেদের প্রতিই জুলুম করছিল। আল্লাহর অবাধ্যতা বা নিয়ামতের নাশুকরি করে মানুষ আসলে নিজেরই ক্ষতি সাধন করে — নিজেকেই শাস্তির যোগ্য করে তোলে।
এই নিয়ামত কখন পাওয়া গেল
এই নিয়ামতগুলো তারা পেয়েছিল সেই চল্লিশ বছরের যাযাবর জীবনে। বায়তুল মাকদিসে প্রবেশের আদেশ দেওয়া হলে তারা অজুহাত তুলেছিল যে সেখানে শক্তিশালী সম্প্রদায় আছে, আর প্রবেশে অস্বীকার করেছিল; ফলে চল্লিশ বছর সেই পবিত্র ভূমি তাদের জন্য নিষিদ্ধ থাকে ও তারা পথহারা হয়ে ঘুরে বেড়ায়। এই ঘুরে বেড়ানোর সময়েই মেঘের ছায়া ও মান্না-সালওয়ার এই অনুগ্রহ। (বায়তুল মাকদিসে প্রবেশের আদেশ ও অস্বীকারের বিস্তারিত বিবরণ সূরা বাকারায় এখানে আসেনি; তা সূরা মায়িদায় রয়েছে।)
এই পর্যায়ে আল্লাহর তিনটি বড় অনুগ্রহ সামনে আসছে — এক, মেঘের ছায়া; দুই, বিনা কষ্টে মান্না ও সালওয়ার রিজিক; আর তিন, পাথর থেকে অলৌকিকভাবে পানির ধারা নির্গত করা, যা পরবর্তী আয়াতে আসবে।
শিক্ষা
শাস্তির মধ্যেও আল্লাহর অনুগ্রহ থেমে থাকে না — চল্লিশ বছরের কঠিন যাযাবর জীবনেও তিনি বনু ইসরাইলকে ছায়া ও বিনা-কষ্টের উত্তম রিজিক দিয়েছেন। অথচ এই সহজ নিয়ামতেও একসময় তারা অধৈর্য হয়ে পড়ে, যা আমাদের জন্য সতর্কবার্তা: প্রাপ্ত নিয়ামতের কদর না করা ও নাশুকরি করাই পদস্খলনের পথ। আর আয়াতের চূড়ান্ত শিক্ষা — আল্লাহর অবাধ্যতায় আমরা আল্লাহর কিছুই ক্ষতি করি না, ক্ষতি করি কেবল নিজেদের; তাই কৃতজ্ঞতা ও আনুগত্যই প্রকৃতপক্ষে নিজেদেরই কল্যাণ।