সূরা আল-বাকারা: আয়াত ৭৫–৮২ — আলিম সমাজের বিকৃতি ও সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা
এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলের অবনতির একটি মর্মান্তিক দিক উন্মোচন করেছেন, আর আয়াতগুলো একটি অখণ্ড একক হিসেবেই পাঠ করা উচিত। যেকোনো ধর্মকেন্দ্রিক জাতির ভেতরে সাধারণত দুটি শ্রেণি থাকে—একদল আলিম, আর একদল তাদের অনুসরণকারী সাধারণ মানুষ। বনি ইসরাইলের আলিম শ্রেণির বৈশিষ্ট্য ছিল, পার্থিব স্বার্থে তারা ওহির শিক্ষাকে বিকৃত করতে দ্বিধা করত না; আর সাধারণ মানুষের বৈশিষ্ট্য ছিল, ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে যাওয়াতেই তারা তৃপ্ত ছিল। এই দুই ব্যাধির মূলে ছিল আকিদার দুটি ত্রুটি—আল্লাহ সম্পর্কে এবং পরকাল সম্পর্কে ভুল বিশ্বাস। আয়াতগুলো পড়ে আমাদের কাজ বনি ইসরাইলের দোষ নিয়ে আনন্দ করা নয়, বরং সতর্ক হওয়া—যেন আমাদের আলিম সমাজ ও আমাদের সাধারণ মানুষ সেই একই পথে পা না বাড়ায়।
أَفَتَطْمَعُونَ أَن يُؤْمِنُوا۟ لَكُمْ وَقَدْ كَانَ فَرِيقٌ مِّنْهُمْ يَسْمَعُونَ كَلَامَ ٱللَّهِ ثُمَّ يُحَرِّفُونَهُۥ مِنۢ بَعْدِ مَا عَقَلُوهُ وَهُمْ يَعْلَمُونَ وَإِذَا لَقُوا۟ ٱلَّذِينَ آمَنُوا۟ قَالُوٓا۟ آمَنَّا وَإِذَا خَلَا بَعْضُهُمْ إِلَىٰ بَعْضٍ قَالُوٓا۟ أَتُحَدِّثُونَهُم بِمَا فَتَحَ ٱللَّهُ عَلَيْكُمْ لِيُحَآجُّوكُم بِهِۦ عِندَ رَبِّكُمْ ۚ أَفَلَا تَعْقِلُونَ أَوَلَا يَعْلَمُونَ أَنَّ ٱللَّهَ يَعْلَمُ مَا يُسِرُّونَ وَمَا يُعْلِنُونَ وَمِنْهُمْ أُمِّيُّونَ لَا يَعْلَمُونَ ٱلْكِتَابَ إِلَّآ أَمَانِيَّ وَإِنْ هُمْ إِلَّا يَظُنُّونَ فَوَيْلٌ لِّلَّذِينَ يَكْتُبُونَ ٱلْكِتَابَ بِأَيْدِيهِمْ ثُمَّ يَقُولُونَ هَٰذَا مِنْ عِندِ ٱللَّهِ لِيَشْتَرُوا۟ بِهِۦ ثَمَنًا قَلِيلًا ۖ فَوَيْلٌ لَّهُم مِّمَّا كَتَبَتْ أَيْدِيهِمْ وَوَيْلٌ لَّهُم مِّمَّا يَكْسِبُونَ وَقَالُوا۟ لَن تَمَسَّنَا ٱلنَّارُ إِلَّآ أَيَّامًا مَّعْدُودَةً ۚ قُلْ أَتَّخَذْتُمْ عِندَ ٱللَّهِ عَهْدًا فَلَن يُخْلِفَ ٱللَّهُ عَهْدَهُۥٓ ۖ أَمْ تَقُولُونَ عَلَى ٱللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ بَلَىٰ مَن كَسَبَ سَيِّئَةً وَأَحَاطَتْ بِهِۦ خَطِيٓئَتُهُۥ فَأُو۟لَٰٓئِكَ أَصْحَابُ ٱلنَّارِ ۖ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ وَٱلَّذِينَ آمَنُوا۟ وَعَمِلُوا۟ ٱلصَّالِحَاتِ أُو۟لَٰٓئِكَ أَصْحَابُ ٱلْجَنَّةِ ۖ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
অনুবাদ: (হে মুমিনগণ,) তোমরা কি আশা কর যে তারা তোমাদের কথায় ঈমান আনবে? অথচ তাদের একটি দল আল্লাহর বাণী শুনত, তারপর তা বুঝে নেওয়ার পর জেনেশুনে তা বিকৃত করত। (৭৫) আর যখন তারা মুমিনদের সাথে মিলিত হয়, তখন বলে, “আমরা ঈমান এনেছি।” আর যখন তারা নিরিবিলিতে একে অপরের কাছে যায়, তখন বলে, “আল্লাহ তোমাদের কাছে (তাওরাতে) যা প্রকাশ করেছেন, তা কি তোমরা তাদের বলে দিচ্ছ, যাতে তারা তোমাদের রবের কাছে সেটি দিয়ে তোমাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ পেশ করে? তোমরা কি বোঝ না?” (৭৬) তারা কি জানে না যে, তারা যা গোপন করে এবং যা প্রকাশ করে—আল্লাহ তা সবই জানেন? (৭৭) আর তাদের মধ্যে কিছু নিরক্ষর লোক আছে, যারা কিতাব সম্পর্কে অলীক আশা ছাড়া কিছুই জানে না; তারা কেবল অনুমানই করে। (৭৮) সুতরাং দুর্ভোগ সেই লোকদের জন্য, যারা নিজ হাতে কিতাব লেখে, তারপর বলে, “এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে,” যাতে তারা এর বিনিময়ে সামান্য মূল্য গ্রহণ করতে পারে। সুতরাং তাদের হাত যা লিখেছে তার জন্য তাদের দুর্ভোগ, আর তারা যা উপার্জন করে তার জন্যও তাদের দুর্ভোগ। (৭৯) আর তারা বলে, “গোনা কয়েক দিন ছাড়া আগুন আমাদের স্পর্শ করবে না।” বল, “তোমরা কি আল্লাহর কাছ থেকে কোনো অঙ্গীকার নিয়েছ? তাহলে আল্লাহ কখনো তাঁর অঙ্গীকার ভঙ্গ করবেন না। নাকি তোমরা আল্লাহর সম্পর্কে এমন কথা বলছ, যা তোমরা জান না?” (৮০) হ্যাঁ, (আগুন অবশ্যই স্পর্শ করবে;) যে ব্যক্তি পাপ অর্জন করেছে এবং তার পাপ তাকে ঘিরে ফেলেছে, তারাই জাহান্নামের অধিবাসী; তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। (৮১) আর যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, তারাই জান্নাতের অধিবাসী; তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। (৮২)
আয়াতগুলোর ঐক্য ও মূল বার্তা
কেউ যদি সূরা আল-বাকারা শুরু থেকে পড়ে, তাহলে ২৮৬টি আয়াত তার কাছে বিশাল এক পাহাড় মনে হতে পারে। কিন্তু মনোযোগ দিয়ে পড়লে দেখা যায়, কয়েকটি আয়াত মিলে একটি করে একক তৈরি করে, যেখানে আল্লাহ তাআলা একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে আমাদের সামনে একটি শিক্ষা উপস্থাপন করেন। এই বিন্যাস আমাদের নিজেদের করতে হয় না; অতীতের মুফাসসিরগণ তা করে গেছেন। যেমন তাফসির ইবনে কাসিরে দেখা যায়, ইবনে কাসির (রাহিমাহুল্লাহ) বিষয়ভিত্তিক আয়াত নির্বাচন করে সেগুলোর শিক্ষা ও অর্থ আলোচনা করেছেন।
৭৫ থেকে ৮২ নম্বর আয়াতগুলোকে একত্রে নেওয়ার কারণ, এদের মধ্যে একটি সাদৃশ্য রয়েছে: এখানে আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলের আলিম সমাজের একটি ভয়ানক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন, যা এই জাতির অবনতির অন্যতম কারণ। প্রশ্ন দুটি—তাদের আলিমদের আচরণ কেমন ছিল, আর সাধারণ মানুষের সাথে তাদের সম্পর্ক কেমন ছিল। উত্তর হলো, আলিমদের বৈশিষ্ট্য ছিল—পার্থিব স্বার্থে ধর্মকে বিকৃত করতে তারা দ্বিধা করত না; আর সাধারণ মানুষের বৈশিষ্ট্য ছিল—এ ব্যাপারে অজ্ঞ থেকে যাওয়াতেই তারা সন্তুষ্ট ছিল। যেকোনো ধর্মীয় জাতিতে এই দুটি শ্রেণি থাকে—আলিম, আর আলিমদের অনুসারী সাধারণ জনগণ। যখন আলিমদের মধ্যে পার্থিব স্বার্থ, নেতৃত্ব বা সম্পদের লোভে ওহির শিক্ষা বদলে ফেলার প্রবণতা ঢোকে, আর জনগণ ধর্ম সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন থাকে, তখন একটি জাতি ধ্বংসের প্রান্তে এসে দাঁড়ায়।
এতসব পড়ার পর পাঠকের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—তারা এত দুঃসাহসী হলো কীভাবে? এত বড় অবাধ্যতা ও অপরাধ তারা করল কীভাবে? আল্লাহ তাআলা এখানে সেই কারণটিই ব্যাখ্যা করেছেন: তাদের অবাধ্যতা ও কুফরে অবিচলতার মূলে ছিল আকিদার দুটি সমস্যা। মনে রাখতে হবে, সমস্ত পথভ্রষ্টতার উৎস আকিদার ত্রুটি। অনেকে মনে করেন, আকিদা ও ঈমান সংশোধন নিয়ে বেশি আলোচনার প্রয়োজন নেই, আমলে ব্যস্ত থাকাই যথেষ্ট। এই ধারণা ভুল। সমস্ত বিভ্রান্তি, অবাধ্যতা ও সত্য থেকে বিচ্যুতি এখানেই শিকড় গেড়ে থাকে। এই আয়াতগুলোতে দেখা যাবে, আল্লাহ সম্পর্কে এবং পরকাল সম্পর্কে তাদের বিশ্বাসে গুরুতর ত্রুটি ছিল—আর এই দুই ভুল ধারণাই তাদের এত অবাধ্যতাকে সম্ভব করে তুলেছিল।
এখান থেকেই বোঝা যায়, ঈমানের ছয়টি রুকনের মধ্যে কুরআনের বহু জায়গায় আল্লাহর প্রতি ঈমান ও পরকালের প্রতি ঈমান একসাথে উল্লেখ করা হয়, বাকিগুলো নয়। কারণ, বাকি রুকনগুলো হয় আল্লাহর প্রতি ঈমানের সাথে, নয়তো পরকালের প্রতি ঈমানের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই দুটি বিশুদ্ধ হলে বাকিগুলোও ঠিক থাকে। বনি ইসরাইলের আলিম ও জনগণ—উভয়ের বিভ্রান্তির মূলেই ছিল এই দুই জায়গার ত্রুটি: আল্লাহর গুণাবলি সম্পর্কে এবং মৃত্যুর পরের জীবন সম্পর্কে ভুল বিশ্বাস।
আমাদের লাভ তাদের সাথে ঝগড়ায় নয়, তাদের দোষ দেখে আনন্দ করাতেও নয়। মানুষ স্বভাবতই অন্যের দোষ নিয়ে আলোচনা করতে ভালোবাসে—এ কারণেই গিবত হয়, আর মানুষ গিবতে তৃপ্তি পায়। এটি আমাদের হৃদয়ের ব্যাধি। বনি ইসরাইলের এই অবস্থা জানার পর আমাদের কাজ হলো সাবধান হওয়া—আমাদের আলিম সমাজকে সাবধান হতে হবে, আমাদের জনগণকেও, যেন আমরা এই পথে না চলি।
আলিম সমাজের বিকৃতি (৭৫)
আয়াতের শুরুতে আফাতাতমাউন—এখানে “ফা”-এর পর একটি হামযা, যার কাজ প্রশ্ন করা, আর মূল ক্রিয়া “তাতমাউন” এসেছে তামিআ / ইয়াতমাউ থেকে, অর্থ কোনো কিছুকে প্রবলভাবে আশা করা বা কামনা করা। অর্থাৎ, তোমরা কি প্রবলভাবে এই আশা কর যে তারা তোমাদের কথায় ঈমান আনবে? একজন ভালো মুসলিম নিঃসন্দেহে চায় দুনিয়ার সব মানুষ হিদায়াত পাক, ঠিক যেভাবে আল্লাহ তাকে হিদায়াত দিয়েছেন। মুসলিমের মূল আকাঙ্ক্ষা কারও সাথে দুনিয়াবি সংঘাত নয়; বরং মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে আনা, সৃষ্টির দাসত্ব থেকে স্রষ্টার দাসত্বে আনা, সত্য পৌঁছে দেওয়া—যেন তারা জাহান্নাম থেকে বাঁচে ও চিরস্থায়ী জান্নাত লাভ করে। এটিই একজন মুসলিমের দায়িত্ব।
কিন্তু আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে সেই আশাকে খানিকটা প্রশমিত করেছেন। তিনি বলছেন, তাদের অভ্যাস কী? তাদের একটি দল আল্লাহর বাণী—অর্থাৎ তাওরাত—শোনার পর, তা বুঝে নেওয়ার পরও জেনেশুনে বিকৃত করত (ইউহাররিফূনাহু মিন বাদি মা আকালূহু ওয়া হুম ইয়ালামূন)। “হাররাফা / ইউহাররিফু” অর্থ বিকৃত করা। এরা ছিল আলিম—তারা তাওরাত শুনত, তার অর্থ বুঝত, তারপর জেনেশুনেই তা বিকৃত করত। যাদের কাছে মুসা (আলাইহিস সালাম)-কে দেওয়া তাওরাতের মতো মহান নিয়ামত ছিল, আর যারা তা বুঝেও বিকৃত করত, তারা যে আরবদের মধ্যে আগত নতুন নবীকে অনুসরণ করবে—এমন আশা করাই কঠিন। কারণ নিজেদের হাতে থাকা ওহি বিকৃতকারীর পক্ষে অন্য এক জাতির মধ্যে আগত নবীকে অনুসরণ করা আরও কঠিন এক ধাপ।
বিকৃতির দুই স্তর ও কুরআনের সুরক্ষা
তাহরিফ বা বিকৃতি দুই ধরনের হতে পারে: এক, শব্দের বিকৃতি (তাহরিফুল লাফয)—শব্দ বদলে ফেলা; দুই, অর্থের বিকৃতি (তাহরিফুল মানা)—অপব্যাখ্যা। বনি ইসরাইল তাওরাতের ক্ষেত্রে দুই স্তরেই বিকৃতি ঘটিয়েছিল—শব্দও বদলেছে, অর্থও বিকৃত করেছে।
শব্দ বদলে ফেলা অত্যন্ত গুরুতর। আল্লাহ তাআলা কুরআনকে এই শব্দগত বিকৃতি থেকে সুরক্ষিত রেখেছেন। কেউ কুরআনের একটি শব্দও বদলে সেটিকে কুরআন বলে চালাতে পারবে না; চেষ্টা করলে তা ধরা পড়া অত্যন্ত সহজ। একসময় কুরআন সংরক্ষিত ছিল কেবল মানুষের অন্তরে ও লিখিত মুসহাফে; পরে এর সাথে যুক্ত হয়েছে অডিও রেকর্ডিং, আর এখন ভিডিও রেকর্ডিংও—একজন দক্ষ ক্বারী কীভাবে তিলাওয়াত করছেন, তা-ও সংরক্ষণের অংশ হয়ে গেছে। এই কারণে কুরআনের শব্দ বিকৃত করা সম্ভব নয়; কেউ তিলাওয়াতে একটি শব্দ বাদ দিলেও দশ বছরের একজন হাফিজ সঙ্গে সঙ্গে তা ধরে ফেলবে। এমনকি কেউ যদি কুরআনের নামে কিছু রচনা করেও ফেলে, তা কখনো কুরআন হয়ে উঠবে না—তা ছড়িয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার কোনো সুযোগ নেই, কারণ অগণিত হাফিজ ও তিলাওয়াত-বিশেষজ্ঞ তা তৎক্ষণাৎ শনাক্ত করবেন। এখানেই তাওরাতের তাহরিফ ও কুরআনের সুরক্ষার মৌলিক পার্থক্য।
আর অর্থের অপব্যাখ্যা তুলনামূলক সহজ, এবং তা ঘটেও থাকে। কিন্তু কোনটি অপব্যাখ্যা আর কোনটি সঠিক অর্থ—তা যাচাইয়ের জন্য আমাদের সামনে তিনটি জিনিস সংরক্ষিত রয়েছে: এক, সংরক্ষিত হাদিস; দুই, সাহাবা ও সালাফের বক্তব্য; তিন, আরবি ভাষা। এই তিনের আলোকে কুরআন ও হাদিস বুঝলে ইনশাআল্লাহ আমরা পথভ্রষ্ট হব না। এ কারণেই হাদিস অস্বীকারকারীরা প্রকৃতপক্ষে কুরআনকেই ধরে রাখতে পারে না—কারণ অপব্যাখ্যা যাচাইয়ের অন্যতম প্রধান মানদণ্ড হাদিসকে তারা হারিয়ে ফেলে। “হাদিস সংরক্ষিত হয়নি”—এই ধারণা অজ্ঞতাপ্রসূত। কোনো বিষয়ে যে অজ্ঞ, সে-ই সে বিষয়ে বেশি কথা বলে; আরবির একটি লাইন ঠিকমতো পড়তে না পারা কেউ যদি দাবি করে হাদিস সংরক্ষিত হয়নি, তার সে দাবির কোনো মূল্য নেই।
অর্থের অপব্যাখ্যা: একটি দৃষ্টান্ত
অর্থের অপব্যাখ্যা কীভাবে ঘটে, তার একটি দৃষ্টান্ত—আল্লাহর “হাত” (ইয়াদ) গুণটিকে নিছক “কুদরত” বা “শক্তি” অর্থে ব্যাখ্যা করা। কুরআনে আল্লাহর হাতের উল্লেখ রয়েছে; যেমন ইবলিসকে সম্বোধন করে আল্লাহ বলছেন, “আমি নিজ দুই হাতে যাকে সৃষ্টি করেছি, তাকে সিজদা করতে তোমাকে কীসে বাধা দিল?” আমরা জানি না আল্লাহর সেই হাত কেমন, আর আমরা কখনো “কেমন” জিজ্ঞাসাও করি না। সালাফের মানহাজ হলো—আল্লাহর শানের সাথে যেমন মানায়, তেমনভাবে এই গুণটি সাব্যস্ত করা; সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য না দেওয়া, আবার অপব্যাখ্যা করে গুণটিকে অস্বীকারও না করা (বিলা কাইফ)। যদি “হাত” মানে কেবল “শক্তি” হতো, তাহলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও সাহাবায়ে কেরাম প্রথমেই তা স্পষ্ট করে দিতেন—তাঁরা এই আয়াত তিলাওয়াত করে গুণটি সাব্যস্ত রেখেই চলে গেছেন। এই দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাহরিফুল মানা কীভাবে ঘটে, এবং কেন ঘটে: যখন একটি সমাজ প্রশ্নহীনভাবে ধর্মকে একটি শ্রেণির হাতে ছেড়ে দেয়, তখন এই অপব্যাখ্যা অবাধে চলতে পারে। আর এর বিরুদ্ধে সুরক্ষা সেই একই তিনটি—হাদিস, সালাফের বোধ, এবং আরবি ভাষা।
এখান থেকে সাধারণ মানুষের করণীয়ও স্পষ্ট হয়। সাধারণ মানুষ কখনো আলিম হয়ে উঠবে না—ঠিক যেমন রোগী কখনো ডাক্তার হয় না। কিন্তু রোগী ডাক্তারকে যেভাবে প্রশ্ন করতে পারে, “এটা কেন করতে হবে?”—সেভাবে সাধারণ মানুষও কিছু মৌলিক প্রশ্ন করতে পারে, এবং করা উচিত: এই আমলের উৎস কী? এই বিশ্বাস কি কুরআনে আছে, নাকি হাদিসে? একজন প্রকৃত আলিম এই প্রশ্নে বিরক্ত হন না; ব্যাখ্যা করা তো তাঁরই কাজ। প্রকৃত মুসলিম আলিমের বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি বলেন—আমার কথা যদি কুরআন-হাদিসের সাথে না মেলে, তা ছুঁড়ে ফেলে দিন; আমি ভুল করতে পারি, আমি ফিরে আসব। ইমাম শাফিঈ (রাহিমাহুল্লাহ) সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তাঁর কামনা ছিল—সত্য যেন আমার প্রতিপক্ষের মুখ থেকেও বেরিয়ে আসে, যাতে আমি তা গ্রহণ করতে পারি; কারণ সত্যই আমার লক্ষ্য, বিতর্কে জেতা নয়। এই মনোভাবই মুসলিম আলিমের বৈশিষ্ট্য, আর এমন আলিমের কাছে ধর্মকে “ইজারা” দিয়ে দেওয়া নয়—বরং ধর্মশিক্ষার্থী (তালিবুল ইলম) হয়ে কুরআন-হাদিসের সাথে সংযোগ রাখাই সাধারণ মানুষের করণীয়।
গোপন পরামর্শ ও আল্লাহর জ্ঞান (৭৬–৭৭)
মুমিনদের সাথে সাক্ষাতে তারা বলে “আমরা ঈমান এনেছি,” কিন্তু নিরিবিলিতে একে অপরের কাছে গিয়ে বলে: “আল্লাহ তোমাদের কাছে (তাওরাতে) যা প্রকাশ করেছেন, তা কি তোমরা মুসলিমদের বলে দিচ্ছ, যাতে তারা তোমাদের রবের কাছে সেটি দিয়ে তোমাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ পেশ করে?” “হাদ্দাসা” অর্থ বলা, জানানো; “ইউহাজ্জু” অর্থ পরস্পরের বিরুদ্ধে দলিল পেশ করা।
তারা কেন “আমরা ঈমান এনেছি” বলত—এ নিয়ে দুটি মত রয়েছে। প্রথম মত: তাদের একদল মুনাফিকদের মতো বাহ্যত ঈমানের দাবি করত, যাতে মুসলিমদের সাথে মিশে কিছু তথ্য সংগ্রহ করা যায়। মুসলিমরা যখন জিজ্ঞেস করত, “রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বর্ণনা কি তোমাদের তাওরাতে আছে?”—তখন কেউ কেউ স্বীকার করত, “হ্যাঁ, আছে।” পরে ফিরে গিয়ে তাদের নিজেদের লোকেরা তিরস্কার করত: তোমরা এসব বলে দিলে কেন? এখন তো এটি কিয়ামতের দিন তোমাদের বিরুদ্ধেই দলিল হয়ে দাঁড়াবে। দ্বিতীয় মত: তারা স্বীকার করত যে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কথা তাওরাতে আছে এবং তিনি সত্য রাসূল, কিন্তু বলত—”তিনি তোমাদের (আরবদের) জন্য প্রেরিত, আমরা তাঁকে মানতে বাধ্য নই।” ফিরে গিয়ে যখন তারা একে অপরের কাছে স্বীকার করত যে তাওরাতে আসলে তাদের ওপরও এই নবীকে মানার নির্দেশ আছে, তখন সতর্ক করত—এ কথা মুসলিমদের বলো না, নইলে কিয়ামতের দিন তারা এটি তোমাদের বিরুদ্ধে দলিল বানাবে।
“ফাতাহাল্লাহু আলাইকুম”—এর দুটি সম্ভাব্য অর্থ: এক, আল্লাহ অনুগ্রহ করে যা প্রকাশ করেছেন, যার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পরিচয় তাদের কাছে স্পষ্ট হয়েছে; দুই, আল্লাহর ফয়সালা—অর্থাৎ ইহুদিরাও যে এই নবীকে মানতে বাধ্য, সেই সিদ্ধান্ত।
৭৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলছেন: তারা কি জানে না যে, তারা যা গোপন করে ও যা প্রকাশ করে, আল্লাহ তা সবই জানেন? এখানেই তাদের আকিদার একটি গুরুতর ত্রুটি ধরা পড়ে। তারা ভাবত—তাওরাতে যা আছে তা মুসলিমদের না বললে কিয়ামতের দিন তারা রক্ষা পাবে। অথচ আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান; তিনি যেকোনোভাবেই তাদের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ করতে পারেন। আল্লাহর জ্ঞান ও ক্ষমতা সম্পর্কে এই দুর্বল ধারণাই এই জাতির পথভ্রষ্টতার অন্যতম কারণ।
সাধারণ মানুষ: অলীক আশা ও অনুমান (৭৮)
এতক্ষণ আলিমদের অবস্থা আলোচিত হয়েছে; এবার সাধারণ মানুষের প্রসঙ্গ। “ওয়া মিনহুম উম্মিয়্যূন”—তাদের মধ্যে কিছু নিরক্ষর/অজ্ঞ লোক আছে। “উম্মি” অর্থ লিখতে-পড়তে না জানা, অথবা কিতাবের জ্ঞান সম্পর্কে অজ্ঞ। এই “উম্মি” শব্দটি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়েছে—তাঁর নিরক্ষরতা তাঁর নবুওয়াতের সত্যতারই প্রমাণ, কারণ লিখতে-পড়তে না জানা একজনের মুখ থেকে কুরআনের মতো মহাগ্রন্থ নিজে থেকে রচিত হওয়া অসম্ভব।
এই সাধারণ মানুষ কিতাব সম্পর্কে কেবল “আমানি” ছাড়া কিছু জানে না। “আমানি” শব্দের তিনটি অর্থ সম্ভব: এক, মিথ্যা; দুই, অলীক আশা; তিন, নিছক তিলাওয়াত বা মুখস্থ আওড়ানো। তিনটি অর্থই এখানে খাটে—তারা কিতাবের অর্থ সম্পর্কে কিছুই জানত না, কেবল (আলিমদের শেখানো বিকৃত তাওরাত) মুখস্থ আওড়াত, আর ধর্ম সম্পর্কে নানা অলীক আশা পোষণ করত। “ওয়া ইন হুম ইল্লা ইয়াযুন্নূন”—তারা কেবল অনুমান করে; এখানে “যান্ন” অর্থ ধারণা ও আন্দাজ। কিতাবে এই আছে, ধর্ম বোধহয় এই বলে—এমন ভাসা-ভাসা অনুমানই তাদের সম্বল।
আমরাও এখানে সাবধান হওয়ার শিক্ষা পাই। আমাদের অনেকেই কিতাবের অর্থ না জেনে কেবল তিলাওয়াত করি, আর নানা অলীক আশা পোষণ করি—”আমরা তো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলেছি, তাই যা-ই করি জান্নাত নিশ্চিত।” এগুলো আমাদেরই “আমানি,” অলীক আশা।
নিজ হাতে কিতাব রচনা (৭৯)
“ফাওয়াইলুল লিল্লাযীনা ইয়াকতুবূনাল কিতাবা বিআইদীহিম”—দুর্ভোগ সেই লোকদের জন্য, যারা নিজ হাতে কিতাব লেখে, তারপর বলে “এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে,” যাতে তারা সামান্য মূল্য গ্রহণ করতে পারে। ইহুদি আলিমরা তাওরাতে থাকা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বর্ণনা বদলে দিত, যাতে তাদের অনুসারীরা সত্য জেনে নবীর অনুসারী না হয়ে যায়—কারণ তাহলে তাওরাতের ধারক হিসেবে তারা যে নেতৃত্ব ও উপঢৌকন পেত, তা বন্ধ হয়ে যেত। সাধারণ মানুষ ধর্মকে তাদের হাতে ইজারা দিয়ে রেখেছিল—”আপনারা ধর্ম সামলান, আমরা কিছু বুঝতে চাই না, আমাদের দুনিয়া ঠিক থাকুক, আমরা আপনাদের উপঢৌকন দেব।” এই স্বার্থ রক্ষার্থেই তারা বর্ণনা বিকৃত করত। কারও কারও মতে, তারা নিজ হাতে বই রচনা করে দাবি করত সেগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে, এবং তা বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করত।
“ওয়াইল” শব্দটি কঠোর হুমকি ও দুর্ভোগের অর্থ বহন করে; আল্লাহ যখন কারও সম্পর্কে “ওয়াইল” বলেন, তখন কঠিন শাস্তি অবধারিত। যেমন সূরা আল-মুতাফফিফীনে ওজন-মাপে কম দেওয়ার জন্য “ওয়াইল”-এর ঘোষণা এসেছে—তা শুনে ঈমানদার কোনো ব্যবসায়ী তৎক্ষণাৎ কম দেওয়া বন্ধ করে দেবে। “মিম্মা ইয়াকসিবূন” (তারা যা উপার্জন করে)—এর দুই অর্থ: যে পাপ তারা অর্জন করে, অথবা আয়াত বিক্রি করে যে সামান্য মূল্য তারা পায়; দুই অর্থই এখানে প্রযোজ্য।
মুজাহিদ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মতে, এই আয়াত ইহুদি আলিমদের হাতে তাওরাত বিকৃতির প্রতি ইঙ্গিত করে। আবুল আলিয়া (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মতে, তারা তাওরাতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বৈশিষ্ট্য বিকৃত করেছিল। এ-ও বর্ণিত আছে যে, ইহুদি বিচারকদের কেউ কেউ ঘুষের বিনিময়ে মিথ্যাকে তাওরাতের বিধান বলে চালিয়ে দিত—এভাবেও তাওরাত বিকৃত হতো। এদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর ছিল নবীর বৈশিষ্ট্য বিকৃত করা, কারণ তা মানুষকে হিদায়াত থেকে বঞ্চিত করা।
অলীক আশা: “কয়েক দিনের আগুন” (৮০)
এবার আসে তাদের দুঃসাহসের মূল উৎস—পরকাল সম্পর্কে বিকৃত বিশ্বাস। “লান তামাসসানান নার ইল্লা আইয়ামাম মাদূদা”—গোনা কয়েক দিন ছাড়া আগুন আমাদের স্পর্শ করবে না। তাদের দাবি ছিল, জাহান্নামে তারা কেবল অল্প কয়েক দিন থাকবে, তারপর মুক্তি পাবে।
আল্লাহ জবাব দিতে বলছেন: “বল, তোমরা কি আল্লাহর কাছ থেকে কোনো অঙ্গীকার নিয়েছ? তাহলে আল্লাহ কখনো তাঁর অঙ্গীকার ভঙ্গ করবেন না। নাকি তোমরা আল্লাহর সম্পর্কে এমন কথা বলছ, যা তোমরা জান না?” অর্থাৎ, দুটোর একটি: হয় তোমাদের কাছে আল্লাহর নিশ্চিত অঙ্গীকার আছে (যা নেই), নয়তো তোমরা আল্লাহর নামে না-জানা কথা বলছ। এমন কোনো অঙ্গীকার তাদের দেওয়া হয়নি, আর জাহান্নাম থেকে সময়মতো মুক্তি পাওয়ার মতো কোনো আমলও তারা করেনি—তারা কি শেষ নবীকে মেনেছে? তারা কি অতীতের সবকিছু থেকে তওবা করেছে? না। তাহলে তাদের এই দাবি মিথ্যা।
পরকাল সম্পর্কে এই ধরনের অলীক আশা আমাদের সমাজেও রয়েছে। কেউ কেউ ভাবে, “আমি যা-ই করি, আমার পীর সাহেব কিয়ামতের দিন আমাকে অবশ্যই পার করে দেবেন।” মৃত ব্যক্তি বা পীরের কাছে এমনভাবে শাফাআত প্রার্থনা করা—যেখানে আল্লাহর একচ্ছত্র অধিকারকে অন্যের হাতে তুলে দেওয়া হয়—ঈমান-বিধ্বংসী শিরক। আর যে ব্যক্তি শাফাআতের আশায় বসে থেকে এই শিরকে লিপ্ত হয়, সে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর শাফাআতও পাবে না; কারণ সেই শাফাআত আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাওহিদপন্থীদের জন্যই নির্ধারিত। সঠিক আকিদাহীন এই অলীক আশা প্রকৃতপক্ষে ঈমানকেই ধ্বংস করে।
প্রকৃত বিধান ও চিরস্থায়িত্ব (৮১–৮২)
আল্লাহ তাদের দাবি খণ্ডন করতে বলছেন “বালা।” আরবিতে “বালা” শব্দটি একটি নেতিবাচক বাক্যকে অস্বীকার করে ইতিবাচক অর্থ প্রতিষ্ঠা করে। যেমন আল্লাহ যখন জিজ্ঞেস করেন “আলাসতু বিরাব্বিকুম” (আমি কি তোমাদের রব নই?), তখন উত্তর দিতে হয় “বালা”—অর্থাৎ “অবশ্যই, আপনি আমাদের রব।” এখানে “না’আম” বলা গুরুতর ভুল হবে, কারণ তাতে অর্থ দাঁড়াবে “আপনি আমাদের রব নন।” তেমনি এখানে তাদের নেতিবাচক দাবি—”আগুন আমাদের স্পর্শ করবে না”—”বালা” দিয়ে খণ্ডন করা হয়েছে; অর্থাৎ, না, তোমাদের দাবি সঠিক নয়, আগুন অবশ্যই তোমাদের স্পর্শ করবে।
এরপর একটি সাধারণ নীতি: “মান কাসাবা সাইয়িআতান ওয়া আহাতাত বিহি খাতীআতুহু ফাউলাইকা আসহাবুন নার, হুম ফীহা খালিদূন।” এখানে “সাইয়িআ” ও “খাতীআ” দুটি ভিন্ন শব্দ—দুটোরই সাধারণ অর্থ পাপ হলেও, একই আয়াতে দুটি ভিন্ন শব্দ ব্যবহৃত হওয়ায় অর্থও ভিন্ন হবে (ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ এ প্রসঙ্গটি উল্লেখ করেছেন)। সালাফের ব্যাখ্যায় সবচেয়ে শক্তিশালী মত হলো: “সাইয়িআ” এখানে ঈমান-বিধ্বংসী শিরক বা কুফর; আর “খাতীআ”-র দ্বারা ঘিরে ফেলা হওয়া মানে—সেই শিরকের ওপরই তওবা না করে মৃত্যুবরণ করা, যার ফলে সমস্ত নেক আমল বিনষ্ট হয়ে যায় এবং তার বড় বড় পাপগুলো অমার্জনীয় থেকে যায়। এই কারণে সে চিরকাল জাহান্নামে থাকবে।
আরেকটি মত মুজাহিদ (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত: “সাইয়িআ” অর্থ এমন কবিরা গুনাহ, যার জন্য জাহান্নামের হুমকি রয়েছে; আর ঘিরে ফেলা মানে—ক্রমাগত পাপে অন্তর পাপের আস্তরণে ঢেকে যাওয়া। কিন্তু এই মতে “খালিদূন” (চিরস্থায়ী) শব্দটি একটি সমস্যা তৈরি করে, কারণ আমাদের আকিদা ও অন্যান্য দলিল অনুযায়ী, কারও অন্তরে বিন্দুমাত্র ঈমান থাকলেও সে একসময় জাহান্নাম থেকে বেরিয়ে আসবে। এর সমাধান হলো, “খুলুদ” শব্দটির দুই অর্থ: এক, চিরস্থায়ী অবস্থান—যা শিরকের ওপর মৃত্যুবরণকারীদের জন্য (“খালিদীনা ফীহা আবাদা”); দুই, দীর্ঘকাল অবস্থান—যা আহলুল কিবলার জন্য, যাদের ঈমানের মূল সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়নি। এভাবে আয়াতটির দুই অর্থই সঙ্গতিপূর্ণ থাকে।
শেষে আল্লাহ বিপরীত চিত্র তুলে ধরেন: “ওয়াল্লাযীনা আমানূ ওয়া আমিলুস সালিহাত উলাইকা আসহাবুল জান্নাহ, হুম ফীহা খালিদূন।” আর যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, তারাই জান্নাতের অধিবাসী; তারা সেখানে চিরকাল থাকবে।
শিক্ষা
পার্থিব স্বার্থে ওহির শিক্ষাকে বিকৃত করা ও গোপন করা—এটিই আলিম সমাজের অবক্ষয়ের প্রধান কারণ, আর এ ব্যাপারে আলিম সমাজকে সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হবে। এই উম্মতের প্রতি আল্লাহর একটি বিশেষ অনুগ্রহ হলো, যত ছোটই হোক, একটি দল সর্বদা সত্যের ওপর অবিচল থেকে মানুষকে সত্য জানিয়ে যায়; আমাদের একটু খুঁজে নিয়ে তাঁদের অনুসরণ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ওহি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞতাই সাধারণ মানুষের পথভ্রষ্টতার কারণ। সাধারণ মানুষের দায়িত্ব কুরআন ও হাদিসের সাথে সংযোগ রাখা—অজ্ঞতার স্তর থেকে ধর্মশিক্ষার্থীর (তালিবুল ইলম) স্তরে উঠে আসা। ধর্মকে অন্ধভাবে কারও হাতে “ইজারা” দিয়ে দেওয়াও ভুল, আবার নিজেই সব বিষয় গবেষণা করে সিদ্ধান্ত নিতে চাওয়াও ভুল; মাঝের এই পথটিই আমাদের ধরতে হবে। আলিম সমাজের কোনো অংশে বিভ্রান্তি দেখা দিলে সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের জন্য আমাদের অন্তরে অন্তত একটি ছোট “অ্যান্টেনা” থাকা চাই—আর মূল মানদণ্ড হলো, কুরআন-হাদিস এবং সাহাবা ও সালাফের বোঝাপড়া কী বলে; তা যদি আমার মাযহাব, আমার আকাবির বা আমার শিক্ষকের কথার বিপরীত হয়, তবু সত্যই গ্রহণীয়।
তৃতীয়ত, এই দুই ব্যাধি একত্র হলে—আলিমরা যখন ধর্ম বিক্রি করে বা সত্য গোপন করে, আর জনগণ যখন অজ্ঞতাবশত ধর্ম তাদের হাতে ইজারা দিয়ে দেয়—তখন একটি জাতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়।
সবশেষে, এই পথভ্রষ্টতার গভীরতম শিকড় হলো আকিদার বিকৃতি। আল্লাহ সম্পর্কে তাদের ভুল ধারণা (গোপন করলেই আল্লাহর জ্ঞান থেকে বাঁচা যাবে ভাবা) এবং পরকাল সম্পর্কে ভুল ধারণা (স্বল্পকালীন ও নিশ্চিত মুক্তির অলীক আশা)—এই দুই-ই তাদের দুঃসাহসের উৎস। তাই আল্লাহ ও শেষ দিবস সম্পর্কে বিশুদ্ধ বিশ্বাসই সমস্ত সংশোধনের ভিত্তি।