দৃঢ়ভাবে কিতাব আঁকড়ে ধরা

নাজাতের সর্বকালীন মূলনীতির পর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আবার বনী ইসরাইলের ঘটনায় ফিরে আসেন — তূর পর্বতের অঙ্গীকারের প্রসঙ্গে। কিন্তু এই আয়াত কেবল একটি ঘটনার বিবরণ নয়; এটি আমাদের শেখায়, আল্লাহর দেওয়া কিতাবকে কীভাবে ধারণ করতে হয়।

وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَاقَكُمْ وَرَفَعْنَا فَوْقَكُمُ الطُّورَ خُذُوا مَا آتَيْنَاكُم بِقُوَّةٍ وَاذْكُرُوا مَا فِيهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ — সূরা আল-বাকারা, ২:৬৩

Wa idh akhadhnā mīthāqakum wa rafaʿnā fawqakumu’ṭ-ṭūra khudhū mā ātaynākum bi-quwwatin wa’dhkurū mā fīhi laʿallakum tattaqūn

“আর স্মরণ করো, যখন আমি তোমাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলাম এবং তোমাদের ওপর তূর পর্বতকে তুলে ধরলাম — ‘আমি তোমাদের যা দিয়েছি তা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো এবং এতে যা আছে তা স্মরণ রাখো, যেন তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হতে পারো।'”

আয়াতের শব্দে শব্দে

‘আখাজনা মিসাকাকুম’ — আমি তোমাদের অঙ্গীকার গ্রহণ করলাম; ‘আখাজা’ অর্থ গ্রহণ করা, ‘মিসাক’ অর্থ পাকাপোক্ত অঙ্গীকার। ‘ওয়া রাফাআনা ফাওকাকুমুত-তূর’ — আর আমি তোমাদের ওপর তূরকে তুলে ধরলাম; ‘রাফাআ’ অর্থ তুলে ধরা, ‘ফাওকা’ অর্থ ওপরে। এখানে ‘তূর’-এর অর্থ নিয়ে তিনটি মত রয়েছে: কেউ বলেছেন এটি একটি নির্দিষ্ট পর্বতের নাম; কেউ বলেছেন সাধারণভাবে পর্বতকেই ‘তূর’ বলা হয়; আবার কারও মতে এটি এমন বিশেষ ধরনের পর্বত যাতে উদ্ভিদ জন্মায় (আর যাতে জন্মায় না তাকে সাধারণভাবে ‘জাবাল’ বলা হয়)। প্রচলিত অনুবাদে ‘তূর’কে একটি পর্বতের নাম ধরা হয়, আর বাংলা অনুবাদগুলো সাধারণত সেভাবেই হয়ে থাকে; এখানেও সেই প্রচলিত অনুবাদই রাখা হয়েছে।

এরপর ‘খুজু মা আতাইনাকুম বিকুওয়াতিন’ — ‘খুজু’ অর্থ তোমরা গ্রহণ করো বা আঁকড়ে ধরো, ‘মা আতাইনাকুম’ অর্থ আমি তোমাদের যা দিয়েছি (‘আতা’ অর্থ দেওয়া), ‘বিকুওয়াতিন’ অর্থ শক্তির সাথে, অর্থাৎ দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো। ‘ওয়াজকুরু মা ফীহি’ — আর এতে যা আছে তা স্মরণ রাখো; অর্থাৎ যে তাওরাত তোমাদের দিলাম, তা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো এবং এর মধ্যে যা আছে তা স্মরণে রাখো। ‘লাআল্লাকুম তাত্তাকুন’ — যেন তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হতে পারো। অর্থাৎ তাওরাতকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরলে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারবে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট

এই ঘটনা আমরা এর আগে দেখেছি — কুরআনে এটি একাধিক জায়গায় এসেছে। ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি, এরপর তাওরাত লাভ; সেই সময় তারা বাছুরপূজায় লিপ্ত হলো, পরে বাছুরপূজা থেকে তওবা করল এবং আল্লাহ তা গ্রহণ করলেন। এরপর তাদের যখন তাওরাত ধারণ করতে বলা হলো, তারা অস্বীকার করল; শেষ পর্যন্ত আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাদের মাথার ওপর ফেরেশতাদের মাধ্যমে পর্বত তুলে ধরলেন এবং তাদের সতর্ক করা হলো — তাওরাত গ্রহণ না করলে এই পর্বত তোমাদের ওপর চাপা দেওয়া হবে। তখন তারা রাজি হলো এবং তাওরাত মেনে চলার অঙ্গীকার নিল। ঘটনাটি পূর্বেই আলোচিত হওয়ায় এখানে বিস্তারিত বলা হলো না।

কিতাব দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরার অর্থ

আল্লাহ যেমন বনী ইসরাইলকে তাওরাত দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরতে বলেছেন, ঠিক তেমনি আমাদেরও কুরআনকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে। আলিমগণ ব্যাখ্যা করেছেন, ‘তোমাদের যা দিয়েছি তা শক্তভাবে আঁকড়ে ধরা’র অর্থ — কিতাবের বিদ্যমান বিধিনিষেধ মেনে নেওয়া, কোনো শৈথিল্য বা ত্রুটি প্রদর্শন না করে তা আদায় করা, এবং তা অনুযায়ী আমল করতে সর্বাত্মক চেষ্টা (ইজতিহাদ) করা। তাওরাতের ক্ষেত্রে এটি যেমন প্রযোজ্য ছিল, কুরআনের ক্ষেত্রে আমাদের জন্যও তেমনি প্রযোজ্য — কুরআন মেনে চলতে আপ্রাণ চেষ্টা করা।

‘এর মধ্যে যা আছে স্মরণ রাখো’

‘ওয়াজকুরু মা ফীহি’ — এতে যা আছে তা স্মরণ রাখার অর্থ কেবল এমন হাফিজ হওয়া নয়, যে শব্দ মুখস্থ করেছে কিন্তু অর্থ কিছুই বোঝে না। এর প্রকৃত অর্থ কিতাব অধ্যয়ন করা। তাওরাতের প্রসঙ্গে এটি যেমন প্রযোজ্য, কুরআনের ক্ষেত্রেও আমাদের জন্য তেমনি — এ থেকে শিক্ষা নেওয়া, এ নিয়ে চিন্তাভাবনা করা, এর রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং এর শিক্ষা অনুযায়ী আমল করা। এ কথাগুলো আলিমদেরই ব্যাখ্যা।

কোরআনের সাথে আমাদের আচরণ

এখান থেকে বোঝা যায় কুরআনের সাথে আমাদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত — আর আমরা বাস্তবে কেমন আচরণ করছি। অনেক সময় কুরআন কেবল আনুষ্ঠানিক ব্যবহারে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে: কেউ মারা গেলে খতম পড়তে বসা, তাবিজ বানানো, কিংবা কুরআনকে শোকেসে সাজিয়ে রাখা; আমাদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো যারা, তারা হয়তো রমজান মাসে একবার খতম দেয়। কিন্তু কুরআনের অর্থ অধ্যয়ন, এর শিক্ষা স্মরণে রাখা, আর তা বাস্তবায়নের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা — এসবের কিছুই যেন আমাদের জীবনে থাকে না, কারণ আমরা জানিই না কুরআনের মধ্যে কী আছে। অথচ সামান্য অধ্যয়নেও ধরা পড়ে, আমাদের জন্য কুরআনের মধ্যে কত মণিমুক্তা, কত শিক্ষা লুকিয়ে আছে।

শিক্ষা

তূর পর্বতের এই অঙ্গীকার কেবল বনী ইসরাইলের ইতিহাস নয়; এটি প্রতিটি জাতির জন্য মানদণ্ড, যাদের আল্লাহ কিতাব দিয়েছেন — কিতাবকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা ও এর মধ্যে যা আছে তা স্মরণে রাখা, যেন তাকওয়া অর্জিত হয়। আমাদের জন্য এর অর্থ, কুরআন অধ্যয়ন করা, এ নিয়ে ভাবা ও একে জীবনে বাস্তবায়ন করা — কেবল মৃতের জন্য পাঠ করা বা তাকে সাজিয়ে রাখা নয়। কিতাবের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের মাপকাঠি এর মলাটকে কতটা সম্মান করি তা নয়, বরং এর ভেতরের কথাকে কতটা ধারণ করি — তা-ই।