দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও মুত্তাকীদের উপদেশ
শনিবারের সীমালঙ্ঘনকারীদের রূপান্তরের বিবরণের পর এই আয়াত সেই শাস্তির উদ্দেশ্য জানিয়ে দেয় — অতীত ও ভবিষ্যতের জন্য একটি দৃষ্টান্তমূলক সতর্কতা, আর মুত্তাকীদের জন্য একটি উপদেশ। আর এর শিক্ষা আমাদের নিজেদের যুগেও এসে পড়ে।
فَجَعَلْنَاهَا نَكَالًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهَا وَمَا خَلْفَهَا وَمَوْعِظَةً لِّلْمُتَّقِينَ — সূরা আল-বাকারা, ২:৬৬
Fa-jaʿalnāhā nakālan limā bayna yadayhā wa mā khalfahā wa mawʿizatan li’l-muttaqīn
“অতঃপর আমি এটিকে করলাম দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি — যারা সে সময়ে উপস্থিত ছিল এবং যারা পরে আসবে তাদের জন্য, আর মুত্তাকীদের জন্য উপদেশ।”
আয়াতের শব্দে শব্দে
‘ফা জাআলনাহা’ — অতঃপর আমি এটিকে পরিণত করলাম; ‘জাআলা’ অর্থ পরিণত করা, আর ‘হা’ একটি স্ত্রীবাচক সর্বনাম, যা এখানে শাস্তিকে (মাসখ বা উকুবা) বোঝাচ্ছে — কারণ আরবিতে ‘শাস্তি’ শব্দটি স্ত্রীবাচক। ‘নাকালান’ — দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। ‘লিমা বাইনা ইয়াদাইহা’ — ‘বাইনা ইয়াদাই’ অর্থ সামনে; মুফাসসিরগণ বলেছেন, এর অর্থ এই শাস্তির সময়ে যা উপস্থিত ছিল, অর্থাৎ তাদের সেই অপকর্ম — সেই অপকর্মের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। ‘ওয়া মা খালফাহা’ — এবং এর পরে যা আসবে; ‘খালফ’ অর্থ পেছনে বা পরবর্তী, অর্থাৎ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, যেন তারাও এমন অন্যায় না করে। কাজেই আল্লাহ এই শাস্তিকে অতীত ও ভবিষ্যৎ — উভয় প্রজন্মের গুনাহের জন্য দৃষ্টান্তমূলক করলেন। ‘ওয়া মাওইজাতান লিল-মুত্তাকিন’ — আর মুত্তাকীদের জন্য উপদেশ; এতে রয়েছে হৃদয়স্পর্শী শিক্ষা ও উপদেশ, যা পড়ে মুত্তাকীরা সাবধান হয়, যেন আমরাও এমন কাজে না জড়াই।
আজও আমরা কী করছি: হালালের চেহারায় হারাম
এই একই প্রবণতা — ছলচাতুরির মাধ্যমে হারামকে হালালের চেহারা দেওয়া — আজও মুসলিমদের মধ্যে বিদ্যমান। একটি দৃষ্টান্ত পরিকল্পিত হিল্লা বিয়ে। ইসলামের বিধান হলো: কেউ স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়ে দিলে সে আর সরাসরি তাকে ফিরিয়ে নিতে পারে না; সেই নারী যদি স্বাভাবিকভাবে অন্যত্র বিয়ে করে এবং সেই বিয়ে স্বাভাবিকভাবে ভেঙে যায় (দ্বিতীয় স্বামীর তালাকে বা মৃত্যুতে), কেবল তখনই ইদ্দতের পর প্রথম স্বামী তাকে পুনরায় বিয়ে করতে পারে। কিন্তু কেউ কেউ পূর্বপরিকল্পনা করে একে একটি কৌশলে পরিণত করে — কোনো বন্ধুকে দিয়ে এক রাতের চুক্তিভিত্তিক বিয়ে করিয়ে, মিলন ঘটিয়ে, তারপর তালাক দিইয়ে, যেন প্রথম স্বামী আবার বিয়ে করতে পারে। এটি প্রকৃতপক্ষে হারাম কাজকেই হালালের চেহারা দেওয়া। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই হিল্লার সঙ্গে জড়িত উভয় পক্ষকেই লানত করেছেন:
لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمُحَلِّلَ وَالْمُحَلَّلَ لَهُ — সুনানে তিরমিযী
Laʿana rasūlu’llāhi sallā’llāhu ʿalayhi wa sallama’l-muhallila wa’l-muhallala lah
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিল্লাকারী (মুহাল্লিল) এবং যার জন্য হিল্লা করা হয় (মুহাল্লাল লাহু) — উভয়কে লানত করেছেন।”
দুঃখজনকভাবে, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত অনেকেও এই পরিকল্পিত হিল্লাকে জায়েজ করে দেন — অথচ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ওপর লানত করেছেন। এটি শনিবারওয়ালাদের সেই কৌশলেরই ভাইবোন — পদ্ধতি বদলে দিলেও হারামের প্রকৃতি বদলায় না।
শিক্ষা
শনিবারের শাস্তির উদ্দেশ্য কখনোই কেবল প্রতিশোধ ছিল না, বরং শিক্ষা — প্রতিটি প্রজন্মের চোখের সামনে রাখা একটি দৃষ্টান্তমূলক সতর্কতা, আর মুত্তাকীদের অন্তরের জন্য একটি উপদেশ। কিন্তু সেই উপদেশ বৃথা যায়, যদি আমরা একে কেবল অন্য এক জাতির ইতিহাস হিসেবে পড়ি, নিজেদের কৌশলের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা হিসেবে নয়। কারণ যে প্রবণতাকে এটি নিন্দা করে — নিষিদ্ধকে বৈধের পোশাক পরানো — তা সেই জাতির সঙ্গে মরে যায়নি; যেখানেই কোনো আইনি কৌশলে আল্লাহর নিষিদ্ধ বস্তুতে পৌঁছানো হয়, সেখানেই তা টিকে থাকে। মুত্তাকীর পরিচয় এই নয় যে সে কখনো প্রলোভনের মুখোমুখি হয় না, বরং এই যে সে নিজেকে প্রবঞ্চিত করতে অস্বীকার করে।