সূরা আল-বাকারা ২ঃ৪০ — বনু ইসরাইলের প্রতি সম্বোধন
সূরা আল-বাকারার সূচনা-অংশে মানবজাতির শ্রেণিবিন্যাস ও আদম আলাইহিস সালামের ঘটনা উপস্থাপনের পর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এবার একটি বিশেষ জনগোষ্ঠীকে সরাসরি সম্বোধন করছেন — বনু ইসরাইল। এখান থেকে সূরার একটি দীর্ঘ ধারা শুরু হচ্ছে, যেখানে বারবার “ইয়া বানি ইসরাইল” বলে তাদের ডাকা হবে — কখনো নিয়ামত স্মরণ করিয়ে, কখনো সতর্ক করে, কখনো আশা ও উৎসাহ দিয়ে। এই ধারার সূচনা-আয়াতে আল্লাহ তাদের সামনে দুটি বিষয় তুলে ধরছেন: তাঁর দেওয়া নিয়ামত, আর তাদের সাথে কৃত অঙ্গীকার।
يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ اذْكُرُوا نِعْمَتِيَ الَّتِي أَنْعَمْتُ عَلَيْكُمْ وَأَوْفُوا بِعَهْدِي أُوفِ بِعَهْدِكُمْ وَإِيَّايَ فَارْهَبُونِ
Yā banī Isrāʾīla-dhkurū niʿmatiya-llatī anʿamtu ʿalaykum wa awfū bi-ʿahdī ūfi bi-ʿahdikum wa iyyāya farhabūn
“হে ইসরাইলের বংশধর, আমার সেই নিয়ামত স্মরণ করো যা আমি তোমাদের দিয়েছি; আর আমার সাথে কৃত অঙ্গীকার পূরণ করো, তাহলে আমিও তোমাদের সাথে কৃত অঙ্গীকার পূরণ করব; আর কেবল আমাকেই ভয় করো।”
বনু ইসরাইল কারা
নবী-রাসূলদের ধারায় ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম এক অনন্য মর্যাদার অধিকারী — তিনি একই সাথে নবী ও রাসূল, এবং আল্লাহর খালিল, অর্থাৎ তাঁর পরম ভালোবাসার পাত্র। আল্লাহ তাআলার দুইজন খালিলের একজন ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম, অন্যজন শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য মনে রাখা দরকার। প্রত্যেক মুমিন, প্রত্যেক ওয়ালি ও মুত্তাকি আল্লাহর ভালোবাসার পাত্র — এই অর্থে “হাবিব” শব্দটি সাধারণ। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কেবল “আল্লাহর হাবিব” বলা তাঁর মর্যাদার প্রতি পূর্ণ সুবিচার নয়; তিনি এর চেয়ে ঊর্ধ্বে — তিনি আল্লাহর খালিল, তাঁর বিশেষ ভালোবাসার পাত্র।
ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম মুওয়াহহিদীনের নেতা। সকল নবী-রাসূল তাওহীদের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন ও তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন, কিন্তু তাওহীদ প্রতিষ্ঠায় ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের সংগ্রাম ও ত্যাগ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর পুরস্কারস্বরূপ আল্লাহ পরবর্তী প্রায় সকল নবী-রাসূলকে তাঁরই বংশে প্রেরণ করেছেন।
ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের পরবর্তী নবী-রাসূলরা মূলত এসেছেন তাঁর ছেলে ইসহাক আলাইহিস সালামের বংশে। লুত আলাইহিস সালামের জাতিকে ধ্বংস করতে আসা ফেরেশতারা ইব্রাহিম আলাইহিস সালামকে ইসহাক আলাইহিস সালামের এবং তাঁর পর ইয়াকুব আলাইহিস সালামের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। এই ইয়াকুব আলাইহিস সালামই “ইসরাইল”। ইসরাইল আসলে একটি উপাধি — আল্লাহর অনুগত, সৎকর্মশীল বান্দা। ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের নাতি, আল্লাহর নবী ইয়াকুব আলাইহিস সালামের এই উপাধি থেকেই তাঁর বংশধরদের বলা হয় বনু ইসরাইল, যাদের আরেক নাম ইয়াহুদ বা ইহুদি।
ইয়াকুব আলাইহিস সালামের বারো সন্তান থেকে ইহুদিদের বারোটি গোত্রের উদ্ভব, আর এই গোত্রগুলো থেকেই অসংখ্য নবী-রাসূল এসেছেন। কুরআনে সরাসরি বিবরণ এসেছে ইউসুফ আলাইহিস সালামের। পরবর্তীতে এসেছেন মুসা ও হারুন আলাইহিমাস সালাম — দুই ভাই এবং উভয়েই নবী। এরপর দাউদ আলাইহিস সালাম, তাঁর ছেলে সুলাইমান আলাইহিস সালাম, এরপর যাকারিয়া ও তাঁর ছেলে ইয়াহিয়া আলাইহিস সালাম, এবং ঈসা আলাইহিস সালাম। ঈসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর বিশেষ কুদরতের নিদর্শন হিসেবে পিতা ছাড়াই জন্মগ্রহণ করেছেন, তাই পিতৃসূত্রে তাঁর বংশধারা নির্ণয় হয় না; তবে তাঁর মা মারিয়াম আলাইহাস সালাম বনু ইসরাইলেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
অন্যদিকে ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের আরেক ছেলে ইসমাইল আলাইহিস সালামের বংশধররাই হচ্ছে আরব। সেই বংশে বহু পরে এসেছেন শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। এই সূত্রে আরবরা ইহুদিদের চাচাতো ভাই। ইহুদিদের একটি গভীর ঈর্ষা এই জায়গাতেই — জাগতিক কোনো বিষয়ে নয়, বরং ধর্মীয় স্তরে। তারা তাদের কিতাবে শেষ নবীর বিবরণ পড়েছিল, তাঁর আগমনের কথা ভালোভাবেই জানত; কিন্তু সেই নবী এলেন ইসমাইল আলাইহিস সালামের বংশে, তাদের বংশে নয়। “আমাদের বংশে কেন নয়” — এই প্রশ্ন থেকেই তাদের শত্রুতার সূচনা।
সুতরাং বনু ইসরাইল বলতে ইহুদি জাতিকে বোঝানো হচ্ছে। বর্তমান মুসলিম উম্মাহর পূর্বে এই জাতিই ছিল শ্রেষ্ঠ উম্মাহ। এ কারণেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাদের বিশেষভাবে সম্বোধন করেছেন — সতর্ক করেছেন, আশা দিয়েছেন, উৎসাহ দিয়েছেন — যেন তারা শেষ নবীর অনুসারী হয়ে সেই শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে পারে। শ্রেষ্ঠত্ব অব্যাহত রাখার এক বিশাল সুযোগ তাদের সামনে রাখা হয়েছিল।
নিয়ামত স্মরণের আহ্বান
আয়াতের শুরুতেই আল্লাহ তাদের নিয়ামত স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। “নিয়ামত” (نِعْمَة) শব্দটি একবচন এবং ভাষাগতভাবে নির্দিষ্টতাহীন। কিন্তু আল্লাহ যখন একে নিজের সাথে সম্পৃক্ত করে বললেন “নিয়ামতি” (আমার নিয়ামত), তখন এর অর্থ ব্যাপক হয়ে গেল — অর্থাৎ আমার সকল নিয়ামত স্মরণ করো, যেসব নিয়ামত আমি তোমাদের দিয়েছি।
নিয়ামত স্মরণের সাথে কৃতজ্ঞতার সরাসরি সম্পর্ক — মানুষ যখন নিয়ামত স্মরণ করে, তখনই সে কৃতজ্ঞ হয়। এর মধ্যে একটি ব্যবহারিক শিক্ষাও রয়েছে: শয়তান যখন মনে কোনো কুধারণা প্রবেশ করায়, তখন আল্লাহর নিয়ামত স্মরণ করাই তার প্রতিকার। কারণ আল্লাহর নিয়ামত এতটাই সুস্পষ্ট যে অত্যন্ত অহংকারী কেউ না হলে তা উপেক্ষা বা অস্বীকার করা অসম্ভব।
ইহুদিরা অতীতে বারবার প্রমাণ করেছে যে তারা এক অবাধ্য জাতি; মুসা আলাইহিস সালামকে তারা বিশেষভাবে কষ্ট দিয়েছে, যার বিবরণ কুরআনে এসেছে। তবু আল্লাহ তাদের কর্কশভাবে নয়, বরং এমন কোমলভাবে সম্বোধন করছেন যা হিদায়াত গ্রহণের পথকে সহজ করে।
অঙ্গীকার: কী এবং কেন
এরপর আল্লাহ বলছেন “আমার অঙ্গীকার পূরণ করো” — অর্থাৎ আমাকে যে অঙ্গীকার তোমরা দিয়েছ তা রক্ষা করো — “তাহলে আমিও তোমাদের প্রতি আমার প্রতিশ্রুতি পূরণ করব।” মুফাসসিরগণ বলেছেন, এই অঙ্গীকারের বিবরণ এসেছে সূরা আল-মায়িদায়:
وَلَقَدْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ بَنِي إِسْرَائِيلَ وَبَعَثْنَا مِنْهُمُ اثْنَيْ عَشَرَ نَقِيبًا ۖ وَقَالَ اللَّهُ إِنِّي مَعَكُمْ ۖ لَئِنْ أَقَمْتُمُ الصَّلَاةَ وَآتَيْتُمُ الزَّكَاةَ وَآمَنْتُم بِرُسُلِي وَعَزَّرْتُمُوهُمْ وَأَقْرَضْتُمُ اللَّهَ قَرْضًا حَسَنًا لَّأُكَفِّرَنَّ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَلَأُدْخِلَنَّكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ
Wa laqad akhadha-llāhu mīthāqa banī Isrāʾīla wa baʿathnā minhumu-thnay ʿashara naqīban, wa qāla-llāhu innī maʿakum, la-in aqamtumu-s-salāta wa ātaytumu-z-zakāta wa āmantum bi-rusulī wa ʿazzartumūhum wa aqradtumu-llāha qardan hasanan la-ukaffiranna ʿankum sayyiʾātikum wa la-udkhilannakum jannātin tajrī min tahtihā-l-anhār
“আল্লাহ বনু ইসরাইলের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন এবং তাদের মধ্য থেকে বারোজন নেতা নিযুক্ত করেছিলেন। আল্লাহ বললেন: আমি তোমাদের সাথে আছি। যদি তোমরা সালাত কায়েম করো, যাকাত দাও, আমার রাসূলদের প্রতি ঈমান আনো ও তাঁদের সাহায্য করো, এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও — তবে অবশ্যই আমি তোমাদের পাপ মোচন করব এবং তোমাদের এমন জান্নাতে প্রবেশ করাব যার তলদেশে নদী প্রবাহিত।”
এই অঙ্গীকারে আল্লাহ বনু ইসরাইলের বারোটি গোত্র থেকে বারোজন প্রতিনিধি (নাকিব) নিযুক্ত করে তাদের সাথে আবদ্ধ হয়েছিলেন। কখন, কোথায় এই অঙ্গীকার হয়েছিল তার বিস্তারিত আমাদের জানা জরুরি নয় — কুরআনে এর উল্লেখ থাকাই যথেষ্ট। কিন্তু যাদের সম্বোধন করা হচ্ছে, সেই ইহুদি পন্ডিতরা এটি ভালোভাবেই জানত।
এই অঙ্গীকারের মধ্যে আমাদের প্রসঙ্গে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক অংশ হলো — রাসূলদের প্রতি ঈমান আনা ও তাঁদের সাহায্য করা। এর অন্তর্ভুক্ত ছিল শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ঈমান আনা এবং মানুষের কাছে স্পষ্ট করে দেওয়া যে ইনিই সেই সত্য নবী, যাঁর বিবরণ তারা তাওরাতে পেয়েছে। তাওরাত ও ইঞ্জিল উভয়েই শেষ নবীর বিবরণ ছিল, এবং আহলে কিতাব — বিশেষত ইহুদি পন্ডিতরা — জানত তাদের দায়িত্ব কী। এই অঙ্গীকার পূরণ করলে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি ছিল পাপ মোচন ও জান্নাত। কিন্তু শেষ নবীর প্রতি ঈমান না এনে, মুসলিমদের সাথে শত্রুতা ও সংঘাতে লিপ্ত হয়ে তারা এই অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে।
কুরআনের সত্যতার এক অসাধারণ প্রমাণ
ইমাম তবারি রহিমাহুল্লাহ উল্লেখ করেছেন, এই আয়াতে “ইয়া বানি ইসরাইল” বলে সমগ্র বনু ইসরাইলকে সম্বোধন করা হলেও বিশেষভাবে উদ্দেশ্য হলো ইহুদি পন্ডিতরা — কারণ সামনে যেসব ঘটনা ও বিবরণ আসবে, সেগুলো একমাত্র পন্ডিতরাই জানত।
এখানেই কুরআনের সত্যতার এক অসাধারণ প্রমাণ নিহিত। এই বিবরণগুলো যখন প্রথমবার তাদের সামনে উপস্থাপিত হলো, তখন ইহুদি পন্ডিতদের কাছে সামান্যতম সন্দেহেরও অবকাশ থাকল না যে এই ব্যক্তি সত্যিই আল্লাহর নবী। কারণ একজন নিরক্ষর আরব ব্যক্তি — যাঁর কাছে তাদের কিতাবের কোনো জ্ঞান ছিল না, এমনকি সেই কিতাবের ভাষাও যিনি জানতেন না, যিনি সর্বদা মক্কাতেই ছিলেন — তাঁর পক্ষে আল্লাহর জানানো ছাড়া এসব ঘটনা বলা সম্ভব ছিল না। এ যুগের মতো অনুসন্ধান করে তাওরাতের বিবরণ বের করে নেওয়ার কোনো উপায় তখন ছিল না; অধ্যয়ন করে জেনে নেওয়ার সুযোগও তাঁর ছিল না। ইহুদিদের সাথে মুসা আলাইহিস সালামের ঘটনা, তাদের প্রতি আল্লাহর নিয়ামত, তাদের কাছ থেকে নেওয়া অঙ্গীকার — এসবের নির্ভুল বিবরণ শুনে তাওরাতের জ্ঞান রাখা যে-কারো বোঝার কথা যে এই বাণী আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসছে।
যে নিয়ামতগুলো সামনে আসবে
আল্লাহ যে নিয়ামতগুলো স্মরণ করাচ্ছেন, সেগুলোর বিস্তারিত সামনের আয়াতগুলোতে ধারাবাহিকভাবে আসবে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় নিয়ামত নিঃসন্দেহে তাদের বংশে বহু নবী-রাসূল প্রেরণ, কারণ দ্বীন ও হিদায়াতের নিয়ামতের চেয়ে বড় কোনো নিয়ামত নেই। এরপর রয়েছে ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি, বিনা কষ্টে মান্না ও সালওয়া নামক খাদ্যপ্রাপ্তি, এবং বারবার অবাধ্যতা সত্ত্বেও পুনরায় সুযোগদান — এমনকি পবিত্র ভূমি জয়ের সুযোগ পর্যন্ত। এই সমস্ত নিয়ামতই আল্লাহ তাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন।
শিক্ষা
আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার পূরণ করলেই কেবল তাঁর প্রতিশ্রুত পুরস্কার লাভ হয়; বনু ইসরাইলের কাছ থেকে নেওয়া অঙ্গীকারের কেন্দ্রে ছিল প্রত্যেক রাসূলের প্রতি ঈমান ও তাঁদের সহায়তা, যার অনিবার্য দাবি ছিল শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে চিনে তাঁর প্রতি ঈমান আনা। নিয়ামত স্মরণ কৃতজ্ঞতার উৎস, আর কৃতজ্ঞতাই আনুগত্যের পথকে সহজ করে; তাই মনে সংশয় ও কুধারণা এলে আল্লাহর সুস্পষ্ট নিয়ামতগুলো স্মরণ করাই তার প্রতিকার। আর কুরআন যেভাবে একজন নিরক্ষর নবীর মুখে আহলে কিতাবের অজানা ইতিহাস ও অঙ্গীকার নির্ভুলভাবে তুলে ধরেছে, তা-ই তার ঐশী উৎসের এক জীবন্ত প্রমাণ।