দৃষ্টান্ত দিয়ে হিদায়াতের পাঠ
সূরা আল-বাকারার শুরু থেকেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের শিক্ষা দিচ্ছেন মানুষের বিভিন্ন শ্রেণিকে সামনে তুলে ধরার মাধ্যমে — মুত্তাকী কারা ও তাদের বৈশিষ্ট্য কী, অবিশ্বাসীদের বৈশিষ্ট্য কী, মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য কী, আর এরপর শুরু হলো বনী ইসরাইলের আলোচনা — তাদের কর্মকাণ্ড কেমন ছিল, আল্লাহ তাদের কী অনুগ্রহ দিয়েছিলেন, আর তার বিপরীতে তারা কেমন আচরণ করেছে। অর্থাৎ মানুষের দৃষ্টান্ত দিয়ে আল্লাহ আমাদের হিদায়াত ও পথভ্রষ্টতা — এই দুটি চিনিয়ে দিচ্ছেন। বনী ইসরাইলের পরবর্তী ঘটনায় প্রবেশের আগে আসুন বুঝে নিই, কুরআন কেন এই পদ্ধতিতে শেখায়।
اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ — সূরা আল-ফাতিহা, ১:৬-৭
Ihdinā’s-sirāta’l-mustaqīm. Sirāta’lladhīna anʿamta ʿalayhim ghayri’l-maghdūbi ʿalayhim wa la’d-dāllīn
“আমাদের সরল পথ দেখাও — তাদের পথ, যাদের প্রতি তুমি অনুগ্রহ করেছ; তাদের পথ নয়, যারা তোমার ক্রোধের শিকার হয়েছে, আর নয় পথভ্রষ্টদের পথ।”
হিদায়াতকে ফাতিহা কীভাবে সংজ্ঞায়িত করে
সূরা আল-ফাতিহাকে বলা হয় উম্মুল কিতাব, উম্মুল কুরআন — সমগ্র কুরআনের সারসংক্ষেপ; আর এ কথা মোটেও অতিরঞ্জন নয়। ফাতিহাকে যদি খুলে দেখা যায়, তবে তার ভেতরেই পুরো কুরআন পাওয়া যায়। কারণ ফাতিহায় আমরা আল্লাহর কাছে হিদায়াত চাই, আর সেই হিদায়াত চাওয়ার জবাবে আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন কুরআনের বাকি সূরাগুলো; আমাদের সামনের মুসহাফে ফাতিহার পরপরই আমরা পাই সূরা আল-বাকারা।
হিদায়াত বলতে কী বোঝায়? হিদায়াত হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর জান্নাতে পৌঁছানোর পথ (এর আরেকটি অর্থও আছে, তবে এখানে আমরা এই অর্থেই মনোযোগ দিচ্ছি)। এই পথে চলতে আমাদের জানা প্রয়োজন — আল্লাহর সন্তুষ্টি কোথায়, অসন্তুষ্টি কোথায়; আমাদের করণীয় কী, বর্জনীয় কী। এখন লক্ষণীয় একটি বিষয়: ফাতিহা হিদায়াতকে সংজ্ঞায়িত করেছে মানুষের শ্রেণির মাধ্যমে। ‘আমাদের সরল পথ দেখাও’ বলার পরপরই আমরা বলি ‘তাদের পথ, যাদের প্রতি তুমি অনুগ্রহ করেছ’ — অর্থাৎ যে শ্রেণির মানুষ আপনার অনুগ্রহ পেয়েছে তাদের পথ দেখান, আর যারা আপনার ক্রোধের পাত্র হয়েছে বা পথভ্রষ্ট হয়েছে তাদের পথে যেন আমরা না যাই। তাই শুরু থেকেই মানুষের শ্রেণিবিভাগ চেনার সঙ্গে আমাদের হিদায়াতের একটি সরাসরি যোগসূত্র গড়ে দেওয়া হয়েছে।
মানুষ দৃষ্টান্ত দেখে শেখে
মানুষকে চিনতে হবে কেন? কারণ প্রশ্ন হলো, আমরা কাদের মতো আচরণ করব — আর মানুষ শেখে দৃষ্টান্ত দেখে। সন্তান প্রতিপালনের একটি সোনালি নীতি এখানে স্মরণ করা যায়: আপনি আপনার সন্তানকে যে আকিদা, আমল ও আখলাকের ওপর দেখতে চান, তা নিজে দৃষ্টান্ত হিসেবে স্থাপন করুন। এই একটি নীতি বাস্তবায়ন করতে পারলে তারবিয়ার অনেক জটিলতাই সহজ হয়ে যায় — যদিও আমরা অধিকাংশই তা পুরোপুরি পারি না। কারণ মানুষ দৃষ্টান্ত দেখেই শেখে কী করা উচিত এবং কী করা উচিত নয়।
সন্তান যখন বাবা-মাকে চিৎকার-চেঁচামেচি করতে দেখে, স্বাভাবিকভাবেই সেসব ক্ষেত্রে সে-ও চিৎকার করার প্রবণতা পায়; আর যেখানে বাবা-মাকে শান্তভাবে, উত্তম আখলাকে, হাসিমুখে কথা বলতে দেখে, সেখানে সে-ও তেমনভাবে কথা বলে। বাবাকে সালাতের ব্যাপারে সিরিয়াস দেখলে সন্তানও সালাতের ব্যাপারে সিরিয়াস হয়; মাকে পর্দার ব্যাপারে যত্নশীল দেখলে সন্তানও পর্দার ব্যাপারে যত্নশীল হয়। বাবা-মা অফিস থেকে ফিরে কুরআন খুলে বসলে সন্তান কুরআনের গুরুত্ব বোঝে; কিন্তু বাবা যদি ফিরে এসেই সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে বসেন আর সন্তানকে বলেন ‘কুরআন পড়ো, কুরআন পড়ো’, তবে সন্তান বুঝে নেয় যে কুরআন পড়া আসলে গুরুত্বপূর্ণ নয় — সেটা কেবল মুখের কথা, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সোশ্যাল মিডিয়া।
বনী ইসরাইলের ঘটনাবলি কেন
সূরা আল-বাকারায় আমরা একের পর এক মানুষের ঘটনা — বিশেষত বনী ইসরাইলের ঘটনা — কেন দেখি? কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাদের আচরণের মাধ্যমে আমাদের চিনিয়ে দিচ্ছেন কোনটা করা যাবে আর কোনটা যাবে না; একের পর এক ঘটনা আসছে, যেন আমরা তাদের মতো হয়ে না যাই। এর দুটি ফায়দা আছে। এক, মানুষের ঘটনা গল্পের মতো সহজেই আমাদের আকর্ষণ করে — তারা কী করল, কেমন জাতি ছিল, আল্লাহ তাদের কী নিয়ামত দিলেন, তার বিপরীতে তারা কেমন আচরণ করল — আর আকর্ষণীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে মানুষ দ্রুত শেখে। দুই, এগুলো চোখের সামনে জীবন্ত দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে।
এ ঘটনা আমাদের জন্যই
এই ধারাবাহিকতায় সামনে আমরা বনী ইসরাইলের একটি নতুন ঘটনা দেখব — তাদেরই একটি গোত্রের, সবার নয়। বনী ইসরাইলের এই গোত্রটি সমুদ্রতীরে বসবাস করত; তারা সেখানে এক অপকর্ম করেছিল, আর আল্লাহ তাদের অত্যন্ত কঠিন শাস্তি দিয়েছেন — তাদের বানরে রূপান্তরিত করে দিয়েছেন। কেন এই ঘটনা ঘটল এবং কেন এত কঠিন শাস্তি এল, তা দেখে আমাদের নিজেদেরকে মিলিয়ে নিতে হবে। কারণ লক্ষণীয় একটি বিষয় — এই আয়াতগুলো তো ইহুদিরা পড়ছে না; এটি তাদেরই পূর্বসূরিদের ঘটনা, অথচ মুসলিমরাই এগুলো পড়ছে। মুসলিমদের কিতাবে বনী ইসরাইলের এই ঘটনা কেন এল? যেন আমরা তা থেকে শিক্ষা নিই।
শিক্ষা
সূচনা থেকেই কুরআন হিদায়াত ও পথভ্রষ্টতাকে বিমূর্ত ধারণা হিসেবে নয়, বরং মানুষের জীবন্ত দৃষ্টান্তের মাধ্যমে শেখায় — ফাতিহা নিজেই সরল পথকে সংজ্ঞায়িত করেছে অনুগ্রহপ্রাপ্তদের পথ হিসেবে, পথভ্রষ্টদের পথ থেকে দূরে থেকে। এজন্যই সূরা আল-বাকারা আমাদের সামনে একে একে হাজির করে মুত্তাকী, অবিশ্বাসী, মুনাফিক ও বনী ইসরাইলের আচরণ — কাউকে ছোট করার জন্য নয়, বরং যেন আমরা চিনে নিতে পারি কোন আচরণ আল্লাহর অনুগ্রহ টেনে আনে আর কোনটি তাঁর ক্রোধ, এবং সেই আয়নায় নিজেদের যাচাই করতে পারি। আর সেই আয়নার প্রথম প্রতিফলন আমাদের নিজেদের ঘর — কারণ যাদের প্রতিপালনের দায়িত্ব আমাদের, তারা আমাদের কথার চেয়ে আমাদের কাজ থেকেই বেশি শেখে।