সূরা আল-বাকারা ২ঃ৪১ — কোরআন: তোমাদের কিতাবের সত্যায়নকারী
নিয়ামত স্মরণ করিয়ে (২ঃ৪০) এবার আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বনু ইসরাইলকে একটি সরাসরি নির্দেশ দিচ্ছেন — তিনি যা অবতীর্ণ করেছেন, অর্থাৎ আল কোরআন, তাতে ঈমান আনতে। আর এখানে এই কোরআনের একটি বিশেষ পরিচয় তুলে ধরা হচ্ছে: এটি “মুসাদ্দিক” — তাদের কাছে থাকা কিতাবের সত্যায়নকারী। এই আয়াতের কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয় সেই সত্যায়ন (তাসদিক): কোরআন কীভাবে তাওরাত ও ইঞ্জিলকে সত্যায়ন করে, এবং এর তাৎপর্য কী।
وَآمِنُوا بِمَا أَنزَلْتُ مُصَدِّقًا لِّمَا مَعَكُمْ وَلَا تَكُونُوا أَوَّلَ كَافِرٍ بِهِ ۖ وَلَا تَشْتَرُوا بِآيَاتِي ثَمَنًا قَلِيلًا وَإِيَّايَ فَاتَّقُونِ
Wa āminū bimā anzaltu musaddiqan limā maʿakum wa lā takūnū awwala kāfirin bihi wa lā tashtarū bi-āyātī thamanan qalīlan wa iyyāya fattaqūn
“আর আমি যা অবতীর্ণ করেছি তাতে ঈমান আনো, যা তোমাদের কাছে যা আছে তার সত্যায়নকারী; আর তোমরাই যেন এর প্রথম অস্বীকারকারী না হও; আর আমার আয়াতসমূহের বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ কোরো না; আর কেবল আমাকেই ভয় করো।”
আয়াতটিতে একাধিক নির্দেশ একত্র হয়েছে — অবতীর্ণ কিতাবে ঈমান আনা, এর প্রথম অস্বীকারকারী না হওয়া, আয়াতের বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ না করা, এবং কেবল আল্লাহকে ভয় করা। যাদের কিতাবে এই নবীর বিবরণ ছিল, ঈমান আনার ক্ষেত্রে তাদেরই তো সবার আগে থাকার কথা; তাই “তোমরা প্রথম অস্বীকারকারী হয়ো না” কথাটি তাদের জন্য বিশেষভাবে তীক্ষ্ণ। আর “আয়াতের বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য” বলতে সামান্য দুনিয়াবি স্বার্থে সত্য গোপন বা বিকৃত করাকে বোঝানো হয়েছে। তবে এই পাঠের কেন্দ্রীয় বিষয় প্রথম অংশ — কোরআনের “মুসাদ্দিক” হওয়া।
একটি প্রাসঙ্গিক কথা শুরুতেই বলা দরকার: ইঞ্জিলও বনু ইসরাইলের কাছে প্রেরিত কিতাব, কারণ ঈসা আলাইহিস সালাম প্রেরিত হয়েছিলেন বনু ইসরাইলের কাছেই। তাই “তোমাদের কাছে যা আছে” বলতে তাওরাত ও ইঞ্জিল উভয়কেই বোঝানো হয়েছে।
“মুসাদ্দিক”: সত্যায়নের দুই দিক
সত্যায়ন মানে কোরআন সাক্ষ্য দিচ্ছে যে তাওরাত ও ইঞ্জিল আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছিল। মুফাসসিরগণ এটি দুইভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
প্রথম দিক হলো ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তবায়ন। তাওরাত ও ইঞ্জিলে বলা হয়েছিল এমন এক নবী আসবেন; সেই বিবরণ অনুযায়ীই নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোরআন নিয়ে এলেন — মিলে গেল। এই মিলে যাওয়া নিজেই প্রমাণ করে যে তিনটি কিতাবই আল্লাহর পক্ষ থেকে। ভেবে দেখুন: তিনটি ভিন্ন সময়ে তিনজন রাসূল — মুসা, ঈসা ও মুহাম্মদ আলাইহিমুস সালাম — যাঁদের কারও সাথে কারও সাক্ষাৎ হয়নি। কেউ যদি নিজে থেকে বানিয়ে বলতেন, তবে ভবিষ্যতের নবীর সুনির্দিষ্ট বিবরণ তিনি দিতে পারতেন না; অথচ পূর্ববর্তী কিতাবের বিবরণ পরবর্তীকালে হুবহু মিলে গেল। এই মিল থেকে কেবল কিতাবগুলোর সত্যতা নয়, আল্লাহর অস্তিত্ব পর্যন্ত প্রমাণিত হয় — যদিও আল্লাহর অস্তিত্ব মানুষ বিবেক, সৃষ্টিজগতের নিদর্শন ও নিজের ভেতরের নিদর্শন দিয়েও বুঝতে পারে, এটি তার আরেকটি স্বতন্ত্র প্রমাণ।
দ্বিতীয় দিক হলো দ্বীনের মূলনীতিতে মিল। সকল নবী-রাসূলের বার্তার মূল এক: সবাই তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন, আখিরাতের কথা বলেছেন; প্রত্যেক নবীর শরীয়তে সালাত ছিল, সিয়াম ছিল। বিস্তারিত হয়তো ভিন্ন — যেমন বলা হয়, মুসা আলাইহিস সালামের অনুসারীদের সালাত ছিল দুই ওয়াক্ত, আর আমাদের পাঁচ ওয়াক্ত। তেমনি ব্যভিচার, মদ, পিতা-মাতার প্রতি অসদাচরণ, জাদু-টোনা — কোনো নবীর শরীয়তেই এগুলো বৈধ ছিল না। এই মৌলিক ঐক্যই দেখায় কিতাবগুলোর উৎস অভিন্ন। এমনকি বহু বিকৃতির পরও বর্তমান তাওরাত-ইঞ্জিলে স্পষ্ট তাওহীদের বাণী থেকে যাওয়ার কথা আলেমরা উল্লেখ করেন — যদিও তাওহীদের সেই স্পষ্ট বাণীগুলো ছেড়ে একাধিক অর্থ-সম্ভব অংশ থেকে ত্রিত্ববাদের মতো শিরক গ্রহণ করা হয়েছে।
সালাতের সংখ্যার প্রসঙ্গেই মিরাজের রজনীর ঘটনা স্মরণীয়। প্রথমে পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরজ হয়েছিল, পরে বারবার কমিয়ে পাঁচে আনা হয়; মুসা আলাইহিস সালাম নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আরও কমানোর অনুরোধ করতে বলেছিলেন, কারণ তাঁর অভিজ্ঞতায় উম্মত এতটাও পারবে না; কিন্তু নবী বারবার ফিরে গিয়ে চাইতে সংকোচ বোধ করলেন। আফসোসের বিষয়, কল্যাণে পরিপূর্ণ এই পাঁচ ওয়াক্ত সালাতও ঠিকমতো আদায় করতে ব্যর্থ হয়ে আমরা যেন মুসা আলাইহিস সালামের আশঙ্কারই সত্যতা প্রমাণ করি।
নবীদের চরিত্র ও ইসরাইলিয়াতের খটকা
ইহুদিরা — এবং কিছু ক্ষেত্রে খ্রিস্টানরাও, তবে বিশেষভাবে ইহুদিরা — যখন তাওরাতকে বিকৃত করেছে, তখন নবী-রাসূলদের চরিত্রেও তারা গুরুতর কলঙ্ক লেপন করেছে। আল কোরআন সেই একই ঘটনাগুলো বর্ণনা করেছে ঠিকই, কিন্তু নবী-রাসূলদের সেই কলঙ্ক থেকে মুক্ত করে — আর সেটাই সঠিক, কারণ নবী-রাসূলের চরিত্র কখনোই তেমন হতে পারে না যেমনটি ইহুদি বর্ণনায় এসেছে।
এ কারণেই তাফসীরের অনেক ইসরাইলিয়াত বর্ণনায় নবীদের সম্পর্কে এমন কিছু পড়ে খটকা লাগতে পারে — “নবীর চরিত্র এমন কী করে হয়?” এমন ক্ষেত্রে নিশ্চিত থাকুন: যদি সেটি কোরআনে না থাকে, তবে তা অবশ্যই ভুল। মুফাসসিরগণ ইসরাইলিয়াত বর্ণনা করেছেন কারণ তা বৈধ এবং অনেক সময় ঘটনার ফাঁক বুঝতে সাহায্য করে; কিন্তু তাঁরাই বলে গেছেন — প্রমাণ ছাড়া এগুলোকে সত্য-মিথ্যা বলা যাবে না, আর কোরআন-হাদিসের সাথে সাংঘর্ষিক অংশ নিশ্চিতভাবে বাতিল।
একজন নিরক্ষরের পক্ষে এটা অসম্ভব
কেউ যদি দাবি করে নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই কোরআন রচনা করেছেন, তবে সেই যুগের বাস্তবতায় তাঁকে যা করতে হতো তা একবার ভাবুন। তাওরাত ও ইঞ্জিলের তখন নানা সংস্করণ ছড়িয়ে ছিল; সেগুলো পৃথিবীজুড়ে ঘুরে সংগ্রহ করতে হতো, একত্র করে সম্পাদনা করতে হতো, বিভিন্ন ভাষা জানতে হতো — আজকের মতো অনুসন্ধান করে বের করে নেওয়ার কোনো উপায় ছিল না; এ যেন এক আধুনিক গবেষণা-অভিসন্দর্ভের কাজ। অথচ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কিছুই করেননি — তিনি ছিলেন নিরক্ষর, আরবি ছাড়া কোনো ভাষা জানতেন না, কোথাও ভ্রমণ করেননি, ইহুদি বা খ্রিস্টান পন্ডিতদের কাছে পড়েননি। তাই ঘটনাবলির এই মিল এবং দ্বীনের মূলনীতিতে এই ঐক্য — এই দুইয়ের মাধ্যমেই কোরআন কর্তৃক তাওরাত ও ইঞ্জিলের সত্যায়ন প্রতিষ্ঠিত হয়। মূল তিনটি কিতাবই আল্লাহর বাণী।
কোরআনই সত্যের মাপকাঠি
তবে কোরআন কর্তৃক তাওরাতের সত্যায়নের অর্থ এই নয় যে বর্তমানে ইহুদি-খ্রিস্টানদের হাতে থাকা ধর্মগ্রন্থ পুরোটাই আল্লাহর ওহী। তারা তাওরাতের বহু বক্তব্য বিকৃত করেছে, ফলে এসব গ্রন্থে যা আছে তার কতটুকু সঠিক তা স্বতন্ত্রভাবে জানার উপায় নেই — ওল্ড বা নিউ টেস্টামেন্টে কিছু আছে বলেই তা সঠিক, এমন বলা যাবে না। এক্ষেত্রে আল কোরআনই সত্যের মাপকাঠি: তাদের ধর্মগ্রন্থের যে অংশ কোরআনের সাথে মেলে তা সঠিক, আর যা কোরআন বা হাদিসের সাথে সাংঘর্ষিক তা বিকৃত বলে বুঝতে হবে।
শিক্ষা
কোরআন পূর্ববর্তী কিতাবকে অস্বীকার করতে আসেনি, বরং তার মূল সত্যকে সত্যায়ন করতে এসেছে — তাই যাদের কাছে সেই কিতাবের জ্ঞান ছিল, ঈমান আনার ক্ষেত্রে তাদেরই সবার আগে থাকার কথা ছিল। ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তবায়ন ও দ্বীনের মূলনীতির অভিন্নতা — এই দুই সাক্ষ্য দেখায় যে তাওরাত, ইঞ্জিল ও কোরআনের মূল উৎস এক, এবং একজন নিরক্ষর নবীর পক্ষে এমন মিল ঘটানো অসম্ভব ছিল। আর যেহেতু পূর্ববর্তী গ্রন্থ বিকৃত হয়েছে, সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের চূড়ান্ত মাপকাঠি এখন কেবল আল কোরআন। সবশেষে এই আয়াতের সতর্কবাণী চিরন্তন: সামান্য দুনিয়াবি স্বার্থে আল্লাহর আয়াতকে বিকিয়ে দেওয়া থেকে বেঁচে থেকে কেবল তাঁকেই ভয় করতে হবে।