সূরা আল-বাকারা ২ঃ৪৪ — অন্যকে আদেশ, নিজেকে ভুলে

আগের আয়াতগুলোতে বনু ইসরাইলকে সত্য গোপন না করা, বিকৃত না করা ও ইসলামে প্রবেশ করার আহ্বান জানানোর পর এই আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাদের আলেম-সমাজের সামনে এক তীক্ষ্ণ প্রশ্ন রাখছেন — তোমরা মানুষকে সৎকর্মের আদেশ দাও, অথচ নিজেদের ভুলে যাও? এটি ওয়াজ করে নিজে আমল না করার এক কঠিন ভর্ৎসনা।

أَتَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَتَنسَوْنَ أَنفُسَكُمْ وَأَنتُمْ تَتْلُونَ الْكِتَابَ ۚ أَفَلَا تَعْقِلُونَ

Ataʾmurūna-n-nāsa bi-l-birri wa tansawna anfusakum wa antum tatlūna-l-kitāb, afalā taʿqilūn

“তোমরা কি মানুষকে সৎকর্মের আদেশ দাও, অথচ নিজেদের কথা ভুলে যাও — যদিও তোমরা কিতাব তিলাওয়াত করো? তবুও কি তোমরা বুঝবে না?”

নিজেকে ভুলে অন্যকে আদেশ

“আতাউমুরুনান নাসা বিল বিরর” — তোমরা কি মানুষকে সৎকর্মের আদেশ দাও, “ওয়া তানসাওনা আনফুসাকুম” — অথচ নিজেদের ভুলে যাও, “ওয়া আনতুম তাতলুনাল কিতাব” — যদিও তোমরা কিতাব তিলাওয়াত করো? এখানে “কিতাব” বলতে তাওরাত বোঝানো হয়েছে। শেষে “আফালা তালিকুন” — তবুও কি তোমরা বুঝবে না, চিন্তা করবে না?

ইহুদি পন্ডিতরা মানুষকে বলত তাওরাত অনুসরণ করো, তার উপর আমল করো; অথচ তারা নিজেরাই তা করত না। কারণ তাওরাতেই তাদের আদেশ দেওয়া হয়েছিল — শেষ নবী যখন আসবেন, তাঁর আনুগত্য করতে হবে, তাঁকে স্বীকার করতে হবে, মানুষের সামনে তাঁর কথা তুলে ধরতে হবে। তারা অন্যকে তাওরাত মানতে বলছে, অথচ তাওরাতের এই মূল আদেশটিই তারা লঙ্ঘন করছে।

ওয়াজ করে নিজে আমল না করার পরিণতি

আলেমের বড় বিপদ এখানেই — সে মানুষকে ওয়াজ করে, কিন্তু নিজে আমল করে না। আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: মিরাজের রজনীতে আমি এমন এক দলের পাশ দিয়ে গেলাম যাদের ঠোঁট আগুনের কাঁচি দিয়ে কেটে দেওয়া হচ্ছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা? বলা হলো — এরা তোমার উম্মতের সেই বক্তা-খতিব, যারা মানুষকে সৎকর্মের আদেশ দিত অথচ নিজেদের ভুলে যেত, যদিও তারা কিতাব তিলাওয়াত করত।

অন্য একটি হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তিকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, তার নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে যাবে, আর সে জাহান্নামে ঘুরতে থাকবে যেভাবে গাধা ঘানি নিয়ে ঘোরে। জাহান্নামীরা তার চারপাশে জড়ো হয়ে বলবে, “হে অমুক, তোমার কী হলো? তুমি না আমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করতে?” সে বলবে, “আমি তোমাদের সৎকাজের আদেশ দিতাম, অথচ নিজে তা করতাম না; আর অসৎকাজে নিষেধ করতাম, অথচ নিজেই তা করতাম।”

আমাদের জন্য সতর্কতা

এই বিপদ কেবল অতীতের পন্ডিতদের নয়, আমাদেরও। আমরাও মানুষকে কত ভালো কথা বলি, অথচ নিজেদের জিজ্ঞেস করলে দেখি নিজেরা সে অনুযায়ী আমল করি না। একটি পরিচিত উদাহরণ: সন্তান কোরআন হিফজে একটু পিছিয়ে পড়লে আমরা রেগে যাই, কখনো মারধরও করি — অথচ এতে তাদের কোরআন থেকে আরও দূরে সরিয়ে দিই। অথচ আমরা নিজেরা ক’টা সূরা মুখস্ত করেছি, একবারও কি কোরআন নিয়ে বসি? অফিস থেকে ফিরে নিজে মোবাইল বা ফেসবুক নিয়ে বসি, আর সন্তান কোরআন নিয়ে বসলে তার সামান্য ত্রুটিতে রেগে যাই। নিজে আমল না করে অন্যকে আদেশ করা — এ থেকে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।

শিক্ষা

এই আয়াত জ্ঞানকে দায়িত্বের সাথে বেঁধে দেয়: যে সত্য তুমি জানো ও অন্যকে শেখাও, তার প্রথম দাবিদার তুমি নিজে। মানুষকে সৎকর্মের আদেশ দেওয়া মহৎ কাজ, কিন্তু নিজেকে ভুলে গিয়ে তা করলে সেই জ্ঞানই কাল হয়ে দাঁড়ায় — যেমন হাদিসে ওয়াজকারী অথচ আমলহীন ব্যক্তিদের কঠিন পরিণতির কথা এসেছে। তাই প্রকৃত সংশোধন শুরু হয় নিজেকে দিয়ে; অন্যকে যা বলি, আগে তা নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠা করাই এই আয়াতের মূল দাবি।