উপহাসের প্রতিফল

আগের আয়াতে আমরা দেখেছি, নিজেদের দলে ফিরে গিয়ে মুনাফিকরা বলে যে তারা মুমিনদের সাথে কেবল উপহাস করছিল। এই আয়াত সেই উপহাসের প্রতিফল ঘোষণা করে — আল্লাহ তাদের সাথে উপহাস করেন।

اللَّهُ يَسْتَهْزِئُ بِهِمْ وَيَمُدُّهُمْ فِي طُغْيَانِهِمْ يَعْمَهُونَ — সূরা আল-বাকারা, ২:১৫

Allāhu yastahziʾu bihim wa yamudduhum fī tughyānihim yaʿmahūn

“আল্লাহই তাদের সাথে উপহাস করেন এবং কুফরি ও অবাধ্যতায় বিভ্রান্ত হয়ে ঘুরতে থাকা অবস্থায় তাদের ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে তাদের সীমালঙ্ঘন আরও বাড়িয়ে দেন।”

‘ইয়ামুদ্দুহুম’: ছাড় দেওয়া, নাকি বাড়িয়ে দেওয়া

‘ইয়ামুদ্দুহুম’ শব্দটির অর্থ তাফসীরে দুই ধরনের পাওয়া যায় — একটি হলো ছাড় বা অবকাশ দেওয়া, আর অন্যটি হলো কোনো কিছু বাড়িয়ে দেওয়া। বাড়িয়ে দেওয়ার অর্থ ধরলে এরপরের শব্দ ‘ফী তুগইয়ানিহিম’ — ‘তুগইয়ান’ অর্থ সীমালঙ্ঘন — মিলিয়ে দাঁড়ায়, আল্লাহ তাদের সীমালঙ্ঘন বাড়িয়ে দেন। আবার যেহেতু ‘ইয়ামুদ্দু’-এর মধ্যে ছাড় দেওয়ার অর্থও আছে, ইমাম আত-তাবারী রহিমাহুল্লাহ এই দুই অর্থকে মিলিয়ে বলেছেন — আল্লাহ তাদের ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে তাদের সীমালঙ্ঘন বাড়িয়ে দেন। অর্থাৎ মুমিনদের নিয়ে উপহাস করার শাস্তিস্বরূপ আল্লাহ তাদের সাথে উপহাস করেন এবং তাদের অবকাশ দেন, আর সেই অবকাশের মাধ্যমেই তাদের সীমালঙ্ঘন বাড়িয়ে দেন।

ছাড়ের মাধ্যমে সীমালঙ্ঘন বৃদ্ধি

ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে সীমালঙ্ঘন বাড়ানো — এটি কেমন? পাপাচারী যখন পাপ করার পর দেখে তার কোনো বিপদ হচ্ছে না, বরং তার উন্নতি হচ্ছে, সে বেঁচে যাচ্ছে, তার চালাকি কেউ ধরতে পারছে না — তখন সে আর তওবার কথা ভাবে না, ফিরে আসে না, বরং আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এটিই ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে সীমালঙ্ঘন বাড়িয়ে দেওয়া।

‘তুগইয়ান’ ও ‘ইয়ামাহুন’: শব্দের অর্থ

‘তুগইয়ান’-এর মূল ভাষাগত অর্থ সীমালঙ্ঘন। সালাফ এই সীমালঙ্ঘনের ধরন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন — এটি কুফরি ও অবাধ্যতার সীমালঙ্ঘন। এজন্যই অনুবাদে ‘কুফরি ও অবাধ্যতা’ কথাটি যুক্ত করা হয়েছে, যেন বোঝা যায় তাদের সীমালঙ্ঘন কোন ধরনের ছিল। আর ‘ইয়ামাহুন’ অর্থ বিভ্রান্ত ও দিশেহারা হয়ে ঘুরতে থাকা — যেন কেউ গোলকধাঁধায় পড়ে গেছে, নিজের বিভ্রান্তি থেকে বেরোতে পারছে না। আল্লাহ যখন তাদের সীমালঙ্ঘন বাড়িয়ে দেন, তখন এই বিভ্রান্ত অবস্থাই হয় তাদের হাল।

আল্লাহর উপহাসের স্বরূপ

সাম্প্রতিক সময়ের মুফাসসির আব্দুর রহমান আস-সাদী রহিমাহুল্লাহ তাঁর তাফসীরে বলেছেন, এটি তাদের প্রতিফল, কারণ তারা আল্লাহর বান্দাদের নিয়ে উপহাস করত। তাদের সাথে আল্লাহর উপহাসের একটি দিক হলো, আল্লাহ তাদের নিকৃষ্ট অবস্থাকে তাদের কাছে সুশোভিত করে দেন। তারা যে এক নিকৃষ্ট অবস্থায় — নিফাকের মধ্যে — রয়েছে, সেটাই তাদের কাছে সুন্দর লাগতে শুরু করে; ফলে তারা ভাবতে থাকে তারা মুমিনদের সাথেই আছে এবং মুমিনদের সঙ্গে পার পেয়ে যাবে। কারণ পৃথিবীতে আল্লাহ মুমিনদেরকে তাদের ওপর চড়াও করেননি, যেহেতু মুমিনরা তাদের কুফরি প্রমাণ করতে পারেনি — তারা তো মুনাফিক, নিজেদের কুফর গোপন রেখেছে।

কিয়ামতের দিন আল্লাহর উপহাসের আরেকটি দিক প্রকাশ পাবে। আগের আলোচনায় আমরা সেরাত পার হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আলোর প্রসঙ্গ দেখেছিলাম — সেরাত পার হতে অনেক আলো লাগবে, আর সেই আলো অর্জিত হয় বহু নেক আমলের মাধ্যমে। আল্লাহ সেদিন মুমিনদের সঙ্গে মুনাফিকদেরও বাহ্যিক আলো দেবেন। তারপর যখন মুমিনরা নিজেদের আলো নিয়ে সামনে অগ্রসর হবে, তখন মুনাফিকদের আলো নিভে যাবে; ফলে আলো পাওয়ার পরও তারা অন্ধকারে নিমজ্জিত ও দিশেহারা হয়ে পড়বে। আলো পাওয়ার পর তা হারানোর এই হতাশা কতই না কঠিন!

সূরা আল-হাদীদের চিত্র

আস-সাদী এবং তাঁর পূর্বে অন্যান্য মুফাসসির বলেছেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে এই উপহাসের কথাই সূরা আল-হাদীদের ১৩ নম্বর আয়াতে এসেছে।

يَوْمَ يَقُولُ الْمُنَافِقُونَ وَالْمُنَافِقَاتُ لِلَّذِينَ آمَنُوا انظُرُونَا نَقْتَبِسْ مِن نُّورِكُمْ قِيلَ ارْجِعُوا وَرَاءَكُمْ فَالْتَمِسُوا نُورًا فَضُرِبَ بَيْنَهُم بِسُورٍ لَّهُ بَابٌ بَاطِنُهُ فِيهِ الرَّحْمَةُ وَظَاهِرُهُ مِن قِبَلِهِ الْعَذَابُ — সূরা আল-হাদীদ, ৫৭:১৩

Yawma yaqūlu’l-munāfiqūna wa’l-munāfiqātu li’lladhīna āmanu’nzurūnā naqtabis min nūrikum qīla’rjiʿū warāʾakum fa’ltamisū nūrā. Fa-duriba baynahum bi-sūrin lahu bābun bātinuhu fīhi’r-rahmatu wa zāhiruhu min qibalihi’l-ʿadhāb

“সেদিন মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারীরা ঈমানদারদের বলবে, ‘তোমরা আমাদের জন্য অপেক্ষা করো, আমরা তোমাদের আলো থেকে কিছু আলো নিই।’ বলা হবে, ‘তোমরা তোমাদের পেছনে ফিরে গিয়ে আলো খোঁজ করো।’ এরপর তাদের মাঝে একটি প্রাচীর তুলে দেওয়া হবে, যাতে থাকবে একটি দরজা; তার ভেতরে থাকবে রহমত, আর বাইরের দিক থেকে আসবে শাস্তি।”

আল্লাহর ক্ষেত্রে ‘উপহাস’: আকিদার দৃষ্টিকোণ

‘উপহাস’ বা ‘কৌশল’ — এই শব্দগুলো যখন আল্লাহর ক্ষেত্রে প্রযুক্ত হয়, তখন আমরা তা কীভাবে বুঝব? ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, উপহাস করা বা কৌশল অবলম্বন করা তখনই নিন্দনীয়, যখন তা করা হয় সত্যকে অস্বীকার করার জন্য কিংবা জুলুমের উদ্দেশ্যে — অর্থাৎ কেউ যখন অন্তরে মন্দ উদ্দেশ্য গোপন রেখে বাহ্যিকভাবে কল্যাণকামিতা প্রকাশ করে বিপরীত আচরণ করে, তখন তা নিন্দনীয়।

কিন্তু মুনাফিকদের সাথে আল্লাহর উপহাস কী? তা তাদের নিকৃষ্ট আচরণের প্রতিফল; তাই তা উত্তম ন্যায়বিচার ও প্রশংসনীয়। আল্লাহ উপহাস করেন — এতে আশ্চর্য হওয়ার বা খটকা লাগার কিছু নেই। কারণ আল্লাহ কেবল তাদের সাথেই উপহাস করেন যারা মুমিনদের সাথে নিকৃষ্ট আচরণ করেছে, তাদের শাস্তিস্বরূপ। তারা মুমিনদের উপহাস ও বিদ্রূপ করার চেষ্টা করেছে; আল্লাহ যখন তার প্রতিফলস্বরূপ তা করেন, সেটিই ন্যায়বিচার এবং প্রশংসনীয়।

বোঝার সুবিধার্থে একটি মানবিক উদাহরণ ধরা যাক: কেউ যখন কোনো ভালো মানুষকে প্রতারণা করতে যায়, আর সেই বুদ্ধিমান মানুষটি তার প্রতারণা এড়িয়ে উল্টো তাকেই তার নিজের ফাঁদে ফেলে দেয়, তখন আমরা একে ন্যায়বিচার ও প্রশংসনীয় বলি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি করে প্রযোজ্য। কাজেই আল্লাহ কি উপহাস করেন? হ্যাঁ — তবে তা নিঃশর্তভাবে বলা হয় না; বরং বলা হয়, যারা মুমিনদের সাথে উপহাস করে আল্লাহ তাদের সাথে প্রতিফল হিসেবে উপহাস করেন, আর সে ক্ষেত্রে তা উত্তম ন্যায়বিচার ও প্রশংসনীয়। এই আকিদাই আমাদের পোষণ করতে হবে।

শিক্ষা

মুমিনদের নিয়ে উপহাসের প্রতিফল আল্লাহর পক্ষ থেকে উপহাস — তবে তা কোনো স্থূল বিনিময় নয়, বরং আরও গভীর ন্যায়বিচার: যে অবকাশ তাদের সীমালঙ্ঘনকেই বাড়িয়ে দেয়, আর যে আলো কেবল কেড়ে নেওয়ার জন্যই দেওয়া হয়। যে ভাবে তার গোপন নিফাক সফল হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে সে-ই সবচেয়ে বেশি প্রতারিত; যে অবকাশকে সে নিরাপত্তা ভাবছে, সেটিই তার ধ্বংসের বৃদ্ধি। আর আল্লাহর এই উপহাস কোনো নিন্দনীয় প্রবঞ্চনা নয়, বরং অন্যায়কারীর প্রতি নিখুঁত ন্যায়বিচার।