সূরা আল-বাকারা ২ঃ৬১ — “একই খাবারে ধৈর্য ধরতে পারব না”
এখনো আমরা যাযাবর জীবনের প্রেক্ষাপটে। বিনা কষ্টে পাওয়া মান্না ও সালওয়া খেতে খেতে বনু ইসরাইল একসময় অধৈর্য হয়ে সাধারণ শাকসবজি-জাতীয় খাবারের আবদার করল। এই দীর্ঘ আয়াতে সেই আবদার, মুসা আলাইহিস সালামের ভর্ৎসনা (উত্তমের বদলে নিকৃষ্ট নেওয়া), “কোনো শহরে নেমে যাও” নির্দেশ, এবং তাদের উপর লাঞ্ছনা, অন্তরের দীনতা ও আল্লাহর ক্রোধ চাপিয়ে দেওয়ার বিবরণ — সেই সাথে এর কারণগুলো — একত্রে এসেছে।
وَإِذْ قُلْتُمْ يَا مُوسَىٰ لَن نَّصْبِرَ عَلَىٰ طَعَامٍ وَاحِدٍ فَادْعُ لَنَا رَبَّكَ يُخْرِجْ لَنَا مِمَّا تُنبِتُ الْأَرْضُ مِن بَقْلِهَا وَقِثَّائِهَا وَفُومِهَا وَعَدَسِهَا وَبَصَلِهَا ۖ قَالَ أَتَسْتَبْدِلُونَ الَّذِي هُوَ أَدْنَىٰ بِالَّذِي هُوَ خَيْرٌ ۚ اهْبِطُوا مِصْرًا فَإِنَّ لَكُم مَّا سَأَلْتُمْ ۗ وَضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ الذِّلَّةُ وَالْمَسْكَنَةُ وَبَاءُوا بِغَضَبٍ مِّنَ اللَّهِ ۚ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ كَانُوا يَكْفُرُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ وَيَقْتُلُونَ النَّبِيِّينَ بِغَيْرِ الْحَقِّ ۗ ذَٰلِكَ بِمَا عَصَوا وَّكَانُوا يَعْتَدُونَ
Wa idh qultum yā Mūsā lan nasbira ʿalā taʿāmin wāhidin fa-dʿu lanā rabbaka yukhrij lanā mimmā tunbitu-l-ardu min baqlihā wa qiththāʾihā wa fūmihā wa ʿadasihā wa basalihā, qāla atastabdilūna-lladhī huwa adnā bi-lladhī huwa khayr, ihbitū misran fa-inna lakum mā saʾaltum, wa duribat ʿalayhimu-dh-dhillatu wa-l-maskanatu wa bāʾū bi-ghadabin mina-llāh, dhālika bi-annahum kānū yakfurūna bi-āyāti-llāhi wa yaqtulūna-n-nabiyyīna bi-ghayri-l-haqq, dhālika bimā ʿasaw wa kānū yaʿtadūn
“আর (স্মরণ করো) যখন তোমরা বলেছিলে, হে মুসা, আমরা একই খাবারে কিছুতেই ধৈর্য ধরতে পারব না; সুতরাং তুমি আমাদের জন্য তোমার রবকে ডাকো, যেন তিনি আমাদের জন্য ভূমি থেকে উৎপন্ন জিনিস বের করে দেন — শাকসবজি, শসা, গম, মসুর ডাল ও পিঁয়াজ। (মুসা) বলল, তোমরা কি যা উত্তম তার বদলে যা নিকৃষ্ট তা নিতে চাচ্ছ? তোমরা কোনো এক শহরে নেমে যাও, সেখানে তোমরা যা চাইছ তা পাবে। আর তাদের উপর লাঞ্ছনা ও অন্তরের দীনতা চাপিয়ে দেওয়া হলো, এবং তারা আল্লাহর ক্রোধ নিয়ে ফিরল। এটি এ কারণে যে, তারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহ অস্বীকার করত এবং নবীদের অন্যায়ভাবে হত্যা করত। এটি এ কারণে যে, তারা অবাধ্য হয়েছিল এবং সীমা লঙ্ঘন করত।”
“একই খাবারে ধৈর্য ধরতে পারব না”
“ইয়া মুসা, লান নাসবিরা আলা তাআমিন ওয়াহিদ” — হে মুসা, আমরা একই খাবারে কিছুতেই ধৈর্য ধরতে পারব না; অর্থাৎ মান্না-সালওয়া খেতে খেতে আমরা অস্থির হয়ে গেছি। তারা চাইল ভূমির উৎপন্ন সাধারণ খাবার — শাকসবজি, শসা, গম, মসুর ডাল, পিঁয়াজ।
এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় লক্ষণীয়। তারা বলল, “ফাদউ লানা রাব্বাকা” — তুমি আমাদের জন্য তোমার রবকে ডাকো। “তোমার রব” — “আমাদের রব” নয়। তাদের রবের সাথে এই দূরত্বটা খেয়াল করুন; এর আগেও তারা বলেছিল “তুমি আর তোমার রব গিয়ে যুদ্ধ করো।” অথচ কুরআনে আমরা যত দোয়া শিখি, প্রায় সবই “রাব্বানা” — হে আমাদের রব। এই ভাষাটুকুই তাদের অন্তরের দূরত্ব প্রকাশ করে দেয়।
এর জবাবে মুসা আলাইহিস সালাম বললেন, “আতাসতাবদিলুনাল্লাজি হুয়া আদনা বিল্লাজি হুয়া খাইর” — তোমরা কি যা উত্তম (খাইর) তার বদলে যা নিকৃষ্ট (আদনা) তা নিতে চাচ্ছ? বিনা কষ্টে পাওয়া মান্না-সালওয়ার মতো উত্তম খাবার ছেড়ে সাধারণ মুখরোচক খাবারের আবদার — এটি প্রকৃতপক্ষে নিয়ামতকে তুচ্ছ করা।
“কোনো শহরে নেমে যাও”
“ইহবিতু মিসরান ফা-ইন্না লাকুম মা সাআলতুম” — কোনো এক শহরে নেমে যাও, সেখানে তোমরা যা চাইছ তা পাবে। এখানে “মিসর” বলতে মিশর দেশ বোঝানো হয়নি; “মিসর” অর্থ শহর — যেকোনো একটি শহর বা জনপদ, আর “ইহবিতু” অর্থ নেমে যাওয়া, অবস্থান নেওয়া। অর্থাৎ আল্লাহ যত্ন করে বিনা কষ্টে তোমাদের এত উন্নত খাদ্য দিচ্ছেন; তা পছন্দ না হলে যেকোনো শহরে গিয়ে সেই সাধারণ জীবন বেছে নাও — এসব সেখানে পাবে।
লাঞ্ছনা ও অন্তরের দীনতা
“ওয়া দুরিবাত আলাইহিমুজ জিল্লাতু ওয়াল মাসকানা” — তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হলো দুটি জিনিস: “জিল্লা” অর্থাৎ লাঞ্ছনা, আর “মাসকানা।” মাসকানাকে অনেকে “দারিদ্র্য” অনুবাদ করেন, তবে এর প্রকৃত অর্থ কেবল বস্তুগত অভাব নয় — বরং অভাব বা অভাব-বোধের ফলে সৃষ্ট এক অন্তর্গত দীনতা ও দুর্দশা, যা প্রকৃত অভাব না থাকলেও অন্তরে থেকে যেতে পারে। ইমাম তবারিসহ মুফাসসিরগণ ব্যাখ্যা করেছেন, এর অর্থ এই নয় যে তাদের কখনো সম্পদ থাকবে না; বরং সম্পদ থাকা সত্ত্বেও অন্তরের এই অভাব-বোধ থেকে যেতে পারে।
এখান থেকে একটি সর্বজনীন সত্য স্পষ্ট হয়। অনেক মানুষ আছে যাদের আল্লাহ যথেষ্ট দিয়েছেন, তবু সামান্য কিছু অর্থের জন্য তারা নিকৃষ্ট কাজ করে বেড়ায় — এটি অন্তরের দীনতা। এর বিপরীতে আরেকজন, যার অন্তরে আত্মসম্মানবোধ আছে, সে অল্পতেই সসম্মানে জীবন কাটায়। প্রকৃত সচ্ছলতা তাই সম্পদে নয়, অন্তরের তৃপ্তিতে।
আল্লাহর ক্রোধ ও তার চার কারণ
“ওয়া বাউ বিগাদাবিম মিনাল্লাহ” — এবং তারা আল্লাহর ক্রোধ নিয়ে ফিরল, অর্থাৎ আল্লাহর ক্রোধের পাত্রে পরিণত হলো (সূরা ফাতিহার “মাগদুব আলাইহিম”-এর সাথে এর যোগ স্পষ্ট)। এই লাঞ্ছনা, দীনতা ও ক্রোধ কেন? আয়াতেই এর কারণ গোনা হয়েছে —
প্রথমত, তারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহ অস্বীকার করত (কুফরি করত)। দ্বিতীয়ত, তারা নবীদের অন্যায়ভাবে হত্যা করত — বনু ইসরাইলের ইতিহাসে বহু নবীকে তারা হত্যা করেছে বা হত্যার চেষ্টা করেছে। তৃতীয়ত, তারা আল্লাহর অবাধ্য হয়েছিল। আর চতুর্থত, তারা সীমা লঙ্ঘন করত — আল্লাহর সীমারেখা ও সৃষ্টির অধিকার উভয় ক্ষেত্রেই। এই চারটি কাজ থেকেই আমাদের সাবধান থাকতে হবে, যেন আমাদের পরিণতিও এমন না হয়।
নিয়ামতকে তুচ্ছ না করা: আমাদের আয়না
বনু ইসরাইলের এই ভুল — উত্তম নিয়ামত ছেড়ে তুচ্ছ জিনিসের পেছনে ছোটা — আমাদের জীবনেও নানা রূপে ফিরে আসে। আল্লাহ কাউকে সম্মানজনক, স্বাচ্ছন্দ্যের ও যথেষ্ট এক জীবন দিয়েছেন; তবু অস্থিরতা ও অকৃতজ্ঞতায় সে হয়তো কল্পিত “আরও ভালো” কিছুর পেছনে ছুটে গিয়ে বাস্তবে আরও কষ্টের জীবন বেছে নেয় — এ-ও সেই নিয়ামতকে তুচ্ছ করারই নমুনা। এমনকি ছোট পরিসরেও — যেমন খাবারের পেছনে অতিরিক্ত সময় ও আয়োজন, মুখরোচক না হলে যেন গলা দিয়ে নামে না — এতেও কি আমরা সেই অধৈর্য ও নিয়ামত-অবমূল্যায়নের দিকেই ঝুঁকছি না? মনে রাখা দরকার, আমরা খাওয়ার জন্য বাঁচি না, বাঁচার জন্য খাই।
শিক্ষা
এই আয়াত অকৃতজ্ঞতা ও অধৈর্যের পরিণতির এক স্পষ্ট চিত্র: আল্লাহর উত্তম নিয়ামতকে তুচ্ছ করে তুচ্ছ জিনিসের আবদার, রবের সাথে দূরত্ব, এবং শেষে লাঞ্ছনা, অন্তরের দীনতা ও আল্লাহর ক্রোধ। এর মূল কারণ চারটি — আল্লাহর নিদর্শন অস্বীকার, নবী-হত্যা, অবাধ্যতা ও সীমালঙ্ঘন — যা থেকে দূরে থাকাই আমাদের রক্ষা। আর সবচেয়ে বড় শিক্ষা: প্রাপ্ত নিয়ামতের কদর করা, রবের সাথে নৈকট্য রাখা, আর অন্তরে তৃপ্তি ও কৃতজ্ঞতা রাখা — কারণ প্রকৃত সম্মান ও সচ্ছলতা এখানেই।